আপন যে জন পর্ব -০২ ও শেষ

#আপন_যে_জন (শেষপর্ব)

৩.

সুইসাইড নোটটা ড্রেসিং টেবিলের উপরেই পেয়ে যায় পুলিশ। তাই আর বেশী ঝামেলায় পড়তে হয়নি কাউকে। দাফন শেষ করেই হৃদয় হৃদির ঘরে আসে। টেবিলের ড্রয়ার খুলতেই কালো মলাটের তিনটা ডায়েরী পেয়ে যায়। কিন্তু ফাবিহার কথা মতে হৃদি লাল মলাটের ডায়েরীতে কিছু লিখছিল। ভেতরের দিকে হাত দিতেই বেরিয়ে আসে লাল ডায়েরী।

প্রথম পাতায় লাল কালিতে লিখা “ আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন। (অয়ন)।”

শেষ পাতায় চলে আসে সে…

“কেন তুমি এলে?”

দাওয়াত দিলেই বুঝি আসতে হয়? আমার কষ্ট কি তোমাকে একটুও কাঁদায় না। কত অবলিলায় প্রমা আপুকে নিয়ে আমার সামনে ঘুরছো। আমার মনের মধ্যে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হল। কপালে তোমার স্পর্শ সেই ঝড় থামিয়ে দিল। মনে হল এটাই তো চেয়েছিলাম। আমি তো এজীবনে আর কিছু চাই না। তোমার স্পর্শই হোক আমার জীবনের সবচেয়ে মুল্যবান উপহার। আমি চলে যাব…. অনেক অনেক দূরে। যেখান থেকে চাইলেও আর ফোন করতে পারবো না। অনেক ভাল থাকো। হৃদি….

হৃদয় চুপ করে বসে থাকে। পুরো ডায়েরী কি পড়বে? তার পক্ষে পড়া সম্ভব না।
সবটাই তার দোষ। তার জন্যই হৃদি এমন করেছে। বিয়ে নিয়ে কেন যে সে বাড়াবাড়ি করতে গেল। কিন্তু সে তো ভেবেছিল বিয়ে হলে অয়নকে ভুলে যাবে। হৃদিকে মেরেওছিল। এত নিষ্ঠুর সে হল কি করে? হৃদির বালিশে মাথা রাখে। বাবার কোরআন তিলাওয়াত শোনা যাচ্ছে। মা কে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। হু হু করে কেঁদে ওঠে সে। ঘরময় কত স্মৃতি। সব ফেলে যেতে তোর একটুও কষ্ট হলো না?

অয়ন তো চলে গেছে, তা না হলে ডায়েরী টা ওকে দিয়ে দিতে পারতো। এটা তো ওরই জিনিস। কাল কোন এক সময় কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দেবে।

বালিশেও হৃদির গন্ধ। চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে হৃদয়।

-এখানে কি কর? যাও নিজের ঘরে।

হৃদয় চমকে উঠে বসে। সে কি স্বপ্ন দেখছিল? ডায়েরীটা নিয়ে বেরিয়ে আসে।

শত ব্যস্ততায় ডায়েরী পাঠানো হয়ে ওঠে না। বাসায় যারা এসেছিল প্রায় সবাই চলে গেছে। তারও অফিস যেতে হবে কাল থেকে। আলমারি খুলে কাপড় বাহির করবার সময় ডায়েরীটা পায়ের কাছে পড়ে। তুলে সেটা টেবিলে রেখে দিল হৃদয়। কাল সকালেই পঠিয়ে দেবে অয়নের ঠিকানায়।

অফিসের ঠিকানায় পার্সেল পেয়ে খুব অবাক হল অয়ন। হৃদয় আবার কি পাঠালো। তাড়াতাড়ি করে প্যাকেট খুলে ফেলে সে। ডায়েরীর প্রথম পাতা পড়েই মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে সে। তারপর ব্যাগে ভরে ফেলে। বাসায় যেয়ে পড়বে বলে। কিন্তু প্রমা যদি দেখে? দেখুক তাতে কি?
যে যাবার সে তো চলেই গেছে।

৪.

*ভাইয়ার বন্ধু এসেছে আজ। যাকে দেখেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান মাথায় ঘুরতে থাকে। “আমারও পরানো যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো।”

সারাদিন ওদের আশেপাশে ঘুরি। ছোট বলে আমাকে পাত্তাই দেয় না। আমি কি এতটাই ছোট?

অয়ন পাতা ওল্টায়..

*আজ অয়ন ভাইয়া চলে গেল। যাবার সময় আমাকে শুধু বলল, যাই।

“এত গম্ভীর কেন আপনি বলেন তো?”

*ভাইয়ার কাছে আজ অয়ন ভাইয়ার ফোন নাম্বার নিয়েছি। ফোন করে একটু কথা বলেছি। ফোনে তার কন্ঠস্বর যে অদ্ভুত রকমের সুন্দর তা কি তিনি যানেন?

*অয়ন ভাইয়া আর প্রমা আপুর কথা আজ ভাইয়া গল্প করছিল। আমার মনে হল কেউ আমার হৃদপিন্ড কিছুক্ষনের জন্য চেপে ধরেছে।

*আমার কোনো টেক্সটের উত্তর অয়ন ভাইয়া আমায় দেয় না। ফোনও করে না। আমি শুধু এক তরফা যোগাযোগ করে যাই।

*মাঝে মাঝে তাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করে।

*আজ তার বিয়ে। আমার কি করা উচিৎ। ভাইয়া গেছে বিয়ের দাওয়াতে। ভাইয়াকে বলেছি ছবি পাঠাতে।

“আমার প্রানের পরে চলে গেল কে…বসন্তের বাতাস টুকুর মত… সে চলে গেল বলে গেল না। সে কোথায় গেল ফিরে এল না…”

*বিয়ের ছবিতে কি হাসিখুশি দুজনে। আমার অস্তিত্ব কোথাও নেই।

“তুমি কোন্‌ ভাঙনের পথে এলে সুপ্তরাতে।
আমার ভাঙল যা তা ধন্য হল চরণপাতে।।

আমি রাখব গেঁথে তারে রক্তমণির হারে
বক্ষে দুলিবে গোপনে নিভৃত বেদনাতে।।”

-এত রাত জেগে কি করছো?
চমকে পেছন ফিরে তাকায় অয়ন। হঠাৎ করে মনে হয়েছিল হৃদি কথা বলছে।
-ঘুমাবে না?
-তুমি যাও আমি আসছি।

ফোনটা হাতে নেয় সে। ইনবক্সে যেয়ে হৃদির টেক্সটগুলো খোঁজে। খুব ভাল করেই জানে সেগুলো নেই। প্রমা যাতে সন্দেহ না করে তার জন্য হৃদির টেক্সট আসা মাত্রই পড়ে বা না পড়েই মুছে ফেলতো।

বেশির ভাগ সময় কবিতা পাঠাতো হৃদি। গল্প, উপন্যাস, কবিতা। এইসব পড়েই পড়েই মাথায় সব কল্পনার ভূত ঘুরতো। হুমায়ূন আহমেদ আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বই পড়ে আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তো আছেন। হৃদয় কিছুদিন পর পর বই কিনে পাঠাতো। মানুষ কি করে এত বোকা হয়। জীবন কি এতটাই তুচ্ছ? পরিবারের কারো কথা এক বারও মনে পড়লো না। বাবা মায়ের মুখটা কি একবারও ভেসে ওঠেনি?

হাতমুখ ধুয়ে ঘুমাতে আসে সে।
-কি করছিলে বলোতো? এত রাত জেগে?
-অফিসের কাজ ছিল কিছু?
-অফিসের কাজ? আমি তো দেখলাম কিছু পড়ছিলে। তোমার প্রেমিকার চিঠি নাকি?
-কি সব আজে বাজে কথা বলছো বলোতো?
-তুমি আজে বাজে কাজ করতে পারো। আর আমি বললেই দোষ।
-আর একটা কথা বলবে না প্রমা। একটা মেয়ে মরে গেছে তাকে নিয়ে এইসব বলতে তোমার বিবেকে বাঁধছেনা?
-না বাঁধছেনা। আমি তো আর জানি না কি করে এসেছিলে বন্ধুর বাসায় গিয়ে যে বিয়ে হবার পরেও সে মেয়ে পিছু ছাড়ে না।
-তুমি অসুস্হ হয়ে গেছ প্রমা। দয়া করে চুপ কর। আমি তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব।

৫.

হৃদি চলে যাবার শোক হৃদির মা ঠিক কাটিয়ে উঠতে পারলেন না। উচ্চ রক্ত চাপের কারণে স্ট্রোক করলেন। পক্ষাঘাতে বামদিক আক্রান্ত হয়ে বিছানাগত হয়ে পড়েছেন। জামাল সাহেবও ঘরে থাকেন না। মসজিদে গিয়ে বসে থাকেন। কাজের লোকের উপর সব দায়িত্ব দিয়ে কি আর থাকা যায়। হৃদয়ের জীবনটাই এলেমেলো হয়ে গেল। বাড়িটাও কেমন ভূতের বাড়ি হয়ে গেছে। নিশ্চুপ…

মাঝে মাঝে মধ্যরাতে সে এসে হৃদির ঘরে বসে থাকে। ফিসফিস করে নিজে নিজে কথা বলে।
-কি করলি বলতো? এমন কেউ করে। রাগ করে না হয় মেরেছিলাম। তাই বলে এমন শোধ নিলি।

মায়ের ঘর থেকে গোঙ্গানোর আওয়াজ আসে। হৃদয় উঠে মায়ের ঘরের দিকে যায়। কাজের মানুষ দিয়ে হবে না। সব সময়ের জন্য একজন নার্সের দরকার।

বাবা মেঝেতে জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। মায়ের পাশে এসে বসে সে। নীলুফারের কথা স্পষ্ট বোঝা যায় না। তবুও বলার চেষ্টা করেন।
হৃদয় মায়ের কথায় অবাক হয়।
-কি বলছো মা? হৃদি কোথা থেকে আসবে। স্বপ্ন দেখেছো মনে হয়। ঘুমিয়ে পড় মা।
বাবাকে ডেকে তুলে ঠিক করে শুইয়ে দেয়। কাল থেকে বাবার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করতে হবে। আর মায়ের জন্য নার্সের।

নিজের ঘরের শুয়ে পড়ে। সকাল সকাল অয়নের ফোন দেখে অবাক হয় হৃদয়।
-কেমন আছিস হৃদয়।
-কেমন আর থাকা যায় বল। পুরো পরিবারটাই এলোমেলো হয়ে গেল। তুই কেমন আছিস?
– আছি কোনো রকম। প্রমা মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছেরে। মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে নিয়েছিলাম। স্কীতসোফ্রেনীয়্যা বলেছে ডাক্তার। আজকাল তো হৃদি কেও দেখে। হৃদি নাকি ওর গলা চেপে ধরে।
-কি বলিস এসব। তোর শাশুড়ীকে এনে রাখ ওর কাছে। তুইও পাশে থাক যতটা পারিস।
-কাল তো হৃদির চল্লিশা। কি করবি ঠিক করেছিস।
-তুই তো জানিস বাসার অবস্থা। এতিম খানার বাচ্চাদের খাবার দিয়ে দেব। আর ওদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিছু কিনে দেব ভেবেছি।
-কেনো সাহায্য লাগলে জানাস। আমি আবার ফোন করবো।

শাশুড়ীকে ফোন করে অয়ন। ভেবেছিল সমস্যার কথা বলবে না। কেননা প্রমা সবার সাথেই স্বাভাবিক আচরন করে। ফোনেও সবার সাথে সুন্দর করে কথা বলে। শুধু তাকে দেখলেই সন্দেহ।

প্রমা এখনও ঘুমিয়ে। পড়ার ঘরে লুকিয়ে রাখা ডায়েরীটা আবার বাহির করে। সত্যি কি হৃদি তাকে এতটা ভালবাসতো? তার সব সময় মনে হয়েছে অতিরিক্ত আবেগ। যেটা বয়সন্ধির পর হয়। কিন্তু একটা সময় সেটা কেটেও যায়।

*আজ ভাইয়া আমাকে মেরেছে। সে ভাইয়া কখনও আমাকে ধমক দিয়ে কথাও বলেনি সেই ভাইয়া মেরে আমাকে রক্তাক্ত করে দিয়েছে। আমি জানি আমি ঠিক করছি না। কিন্তু আমি যত চেষ্টা করি অয়ন ভাইয়াকে ভুলে যাবার ততই উনি আমার মনে শেকড় ছড়িয়ে দেন। পরম যত্নে লাগানো ভালবাসার গাছ এখন বিষাক্ত হয়ে গেছে।

*এই যে মিস্টার অয়ন… আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আপনাকে আর বিরক্ত করবো না।

*মিস্টার অয়ন আপনি কি জানেন পিয়াল আমাকে অনেক পছন্দ করে। আপনি যে কষ্ট আমাকে দিয়েছেন তা তো আমি পিয়ালকে দিতে পারি না।

*ভাইয়া বলছিল আপনাকে দাওয়াত দিয়েছে। দয়াকরে আপনি আসবেন না।

*কেন তুমি এলে?

শেষ পাতাটা পড়ে অয়ন নিজেকে আটকাতে পারে না। কষ্টগুলো বেরিয়ে আসে কান্না হয়ে। কি করে পারল সে এটা করতে। নিজে ভাল থাকবে বলে প্রমাকে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এতে যে আরেকজনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয় কেন সে বুঝতে পারেনি সেটা। ভুল তো তার। শত প্রত্যাখ্যান সে সহ্য করছিল। কিন্তু অপমান সে সহ্য করবে কি করে?

সত্যি যদি সে আপনজন হত তবে এই ভুলটা কখনও করতো না। বোকা মেয়েটা বুঝতেই পারেনি ওর আসল আপনজন তার বাবা মা, ভাই। যারা প্রতি মুহূর্তে তাকে মনে করে কষ্ট পাচ্ছে।

ডায়েরীটা হৃদয়কে পাঠিয়ে দেবে আজই। তার কাছে থাকলে অযত্ন হতে পারে। তাকে প্রমাকে সুস্থ্য করে তুলতে হবে।

সমাপ্ত….

* কিছু কথা- আমি আত্মহত্যা, পরকিয়া কে প্রাধান্য দেবার জন্য গল্পটা লিখিনি। বরং বলতে চেয়েছি নিজের পরিবারের চেয়ে আপন কিছু হতে পারে না। যত কঠিন পরিস্থিতি সামনে আসুক না কেন আমাদের সবার আগে নিজের পরিবারের কথা চিন্তা করতে হবে।

এমি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here