আবছায়া পর্ব ৮

আবছায়া
writer::প্রিয়া

বাড়ির সবাই মিলে নিয়াজের বাড়িতে যাচ্ছে আজ নিয়াজের বিয়ে।
ইনায়া যেতে রাজি হচ্ছে না।ইকরাম অনেকবার বলছে যাওয়ার জন্য।

-দেখ নিয়াজ নিজে থেকে এসে দাওয়াত দিয়েছে তোকে এতোবার করে বলছে তা ও কেনো যাবিনা।

“ভাইয়া আমার ইচ্ছে করছে না।

-নিয়াজ রাগ করবে প্লিজ চল।

ভাইয়ার এমন রিকুয়েস্ট ফেলতে পারিনি ইনায়া।

-ওয়েট করো আসতেছি।

রুমে গিয়ে সাদা গ্রাউন পরে হালকা মেকাপ করলো,চুলগুলো খুলা রাখলো।
সময় আধাঘণ্টা লাগেনি চলে আসে।

ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ওর মায়ের ভিতরটা হাহাকার করে উঠে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনি বলে উঠলেন।

-আজ নিয়াজের পাশে তুই থাকতি আর আমরা চিন্তামুক্ত হতাম।

ইনায়া কিছু বললো না।উনার কথায় সবাই মনেমনে আফসোস করলো।

গাড়ি এসে থামলো একটা কনভারসেশন সেন্টারে।খুব সুন্দর করে সাজানো চারপাশে।
সুন্দর তো হতেই হবে এতো বড় ডাক্তারের বিয়ে।

ওরা গিয়ে এক পাশের টেবিলে বসলো।
নিয়াজের মা আর বোন এসে ওদের সাথে সাক্ষাৎ করলো।
ইনায়া কে দেখে নিয়াজের মা বললেন।

-ইনায়া এসেছো।এসো এসো আমার ছেলের বউকে দেখবে।

উনি হয়তো মশকরা করে কথাটা বললেন।
তবুও ইনায়া হাসি মুখে বললো।

-জ্বি আন্টি অবশ্যই চলুন।

ওরা সবাই বউ দেখার জন্য ষ্টেজের দিকে যায়।

নিয়াজ আর ওর বউ দুজনেই ছবি তোলায় ব্যস্ত।

ইনায়াদের দেখে হাত দিয়ে ইশারা করলো।

ওরা সবাই স্টেজে উঠে গেলো।

নিয়াজ ওর বউয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো।ওর বউ গাইনী বিশেষজ্ঞ।
খুব গর্ব করে পরিচয় দিচ্ছে।

সবাই ওর সাথে ছবি তুলে ইনায়া ও তুলে।
ছবি তুলে আসার সময় নিয়াজ ইনায়াকে ডাকে।

সবাই নেমে আসলে ইনায়া যায় নিয়াজের সামনে।

-আসলে ইনায়া কপাল বলে একটা কথা আছে দেখো আমার কপাল ভেবেছিলাম তুমি আমার জন্য পারফেক্ট হবে।কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অপি আমার জন্য পারফেক্ট দুজনের পেশা ও সেইম।
নিয়াজের বউ অপি পাশে থেকে বাঁকা হাসি দিচ্ছে।

‘হুম ঠিক বলেছেন ভাইয়া আসলেই আপুকে আপনার পাশে খুব মানাচ্ছে।

-আমাকে রিজেক্ট করে ভুল করলে।

‘কি জানি হয়তো ভুল নয়তো ঠিক।

নিয়াজের সামনে থেকে চলে আসতে গিয়ে ইনায়া শুনে নিয়াজ ওর বউকে বলছে।
-কি চেহারার ঝিলিক আর এতো ডিমান্ড ও তোমার নকের ও যোগ্য না।

ইনায়া মুচকি হাসি দিয়ে ভাবে, নিয়াজের আমার প্রতি যা ছিলো তা মোহ।কারণ ভালোবাসলে ভালোবাসার মানুষকে কেউ কখনোই ছোট করে না।

বিয়েতে নিয়াজের মা,বোন অনেক ভাবেই অপমান করে ইনায়াকে।
নিয়াজকে ফিরিয়ে দিয়েছে এতে যেনো ইনায়া কত বড় অপরাধ করে ফেলছে।

খাওয়াদাওয়া শেষ করেই ওরা বাসায় ফিরে।
গাড়িতে সবাই মিলে ইনায়াকে কত ভাবে হেনস্তা করে।
আনায়া আর ওর ভাবি দুজন মিলে বারবার নিয়াজের বউয়ের শাড়ি গহনা নিয়ে কত কথা।

ইনায়া যেনে শুনে ও শুনলো না।
বাসায় ফেরার পর নিজের রুমে গিয়ে শুইয়ে থাকে।

দু দিন পর বিয়ে কিন্তু এই বাড়িতে কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই।
রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে থাকে ইনায়া।
সকালে হইহোল্লুড় শুনে ঘুম ভাঙ্গে।

কি হলো ভাবছে,এতো সকাল কিসের এতো চিৎকার চেঁচামেচি।

ওয়াসরুম থেকে ফিরে বাইরে বের হয়।
সোফায় মামা,মামি চাচা,চাচি সবাইকে দেখে অবাক হয় ইনায়া।

তখন ইনায়ার মামি বলে উঠেন।

-তোর বাবা ফোন দিয়ে পাগল করে দিচ্ছেন উনার মেয়ের বিয়েতে আসতেই হবে তাই চলে আসলাম।
চাচি ও এই কথা বললেন।

ইনায়ার মুখটা খুশিতে ভরে উঠে।
বাইরে তাকিয়ে দেখে চারদিকে মরিচ বাতি লাগানো।
তখনি বাবা রুমে আসলেন।
ইনায়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।ওর বাবা এসে ওকে বুকে জড়িয়ে নেন।

-আমার কলিজা রে তুই মা।তোর বিয়েতে আমি কমতি রাখবো না।
তুই সুখী হলেই আমরা সুখী।
শুধু প্রাণ ভরে দোয়া করবো তোর সুখের জন্য।

ইনায়া বাবার বুকেই কেঁদে দেয়।
ইনায়ার মা এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন।

-আমরা যতো কঠিন হইনা কেনো মা সব তোর ভালোর জন্য।
তুই যখন নিজেই তোর ভালো বুঝে নিয়েছিস তাহলে আর আমাদের কি।

ওদের কান্না দেখে সবারই কান্না চলে আসে।

সবাই মিলে একসাথে নাস্তা করে।ইনায়ার মামি মর্ডান মানুষ সারাদিন শুধু শরীরচর্চা নিয়েই থাকেন।

নাস্তা শেষ করেই ইনায়া কে বললেন।

-তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আয়।

‘কেনো।

-পার্লারে যাবি।

-আজ কেনো।

-আয়নায় দেখেছিস নিজেকে চোখের নিচে কত কালি পড়ছে।চল ফেসিয়াল করবি কাল বিয়ে সাজ সুন্দর করতে হলে আজ ফেসিয়াল করতেই হবে।

ইনায়া কিছু বললো না মামির সাথে পার্লারে গেলো।
বিকাল হয়ে যায় ওদের বাসায় ফিরতে।

বাসায় ফিরে দেখে গাঁয়ে হলুদের স্টেজ বাঁধা।সবকিছু যেনো স্বপ্ন মনে হচ্ছে।
ইকরাম,ইসহাক সবাই মিলে কত কাজ করছে।
আনায়া,ভাবি রান্নাঘর সামলাচ্ছেন।

সবকিছু যেনো কানাই কানাই পরপূর্ণ।

রুমে এসে লম্বা শাওয়ার নিলো।তারপর খাবার খেয়ে সবার সাথে গল্প করা শুরু।

সন্ধ্যের পর পার্লার থেকে মহিলারা এসে ইনায়াকে সাজিয়ে যায়।
একদম পুতুল লাগছে ওকে।একা একা আয়নায় নিজেকে দেখছে ইনায়া।তখনি আইজান কে দেখতে পায়।
পিছন ফিরে তাকিয়ে সত্যি চমকে যায় ইনায়া।

আইজানের পাশে আনায়া দাঁড়িয়ে আছে।

-কেমন সারপ্রাইজ দিলাম আপু।

‘আইজান তুমি এখন এখানে।

-আনায়া কে ফোন দিয়ে বললাম তোমার আপুকে আমি প্রথম হলুদ ছোঁয়াতে চাই।
আনায়া বললো চলে আসুন। তারপর এক ঘণ্টা ধরে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছি

-সবাই ষ্টেজ যাওয়ার পর ভাইয়াকে নিয়ে ভিতরে আসলাম।

‘তাই বুঝি।

-আপু আমি বাইরে আছি।
ভাইয়া একটু তাড়াতাড়ি হলুদ লাগিয়ে দিন।

আনায়া হলুদের বাটি রেখে বাইরে গেলো।

আইজান এক চিমটি হলুদ নিয়ে ইনায়ার গালে লাগিয়ে দিলো।
ইনায়া ও আইজান কে হলুদ ছুঁইয়ে দিলো।

আইজান ইনায়ার কপালে চুমু দেয়।

কাল থেকে তুমি শুধু আমার।

ইনায়া লজ্জামাখা হাসি দিলো।

আইজান চলে যাওয়ার পর হলুদের প্রোগাম শুরু হয়।
সবকিছু ভালোই ভালোই শেষ হয়।

বিয়ের দিন সকালে আনায়া একটা ডায়রি নিয়ে আসে ইনায়ার রুমে।
-আপু এই ডাইরি তোর জন্য।

‘কি লেখা এতে।

-সেটা আজ না তোর যেদিন খুব খারাপ লাগবে একা একা লাগবে মনে কষ্ট হবে সেদিনই এইটা পড়বে।

-আগে পড়লে কি হবে।

‘মর্ম বুঝবি না।কথা দেয় তুই সেদিনই এই ডাইরি পড়বি।

-ওকে ঠিক আছে।

আনায়া ডাইরিটা ইনায়ার লাগেজে দিয়ে দিলোম

বিয়েতে আইজান দের বাড়ি থেকে ১০জন মানুষ আসে।
ইনায়াকে এই কম দামি বেনারসিতে অপূর্ব লাগছে।
আইজান বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে।

হঠাৎ হাতে একটা গিফটের প্যাকেট নিয়ে অরিত্রি আর আবেগ আসে।
দুজনকে দেখে ইনায়ার খুশির শেষ নেই।একসাথে জড়িয়ে ধরে।

আবেগ-তোকে খুব সুন্দর লাগছে মুটকি।

-আজ আমার বিয়ে না হলে নির্ঘাত তোকে এতো মাইর দিতাম তোর হাত পা ভেঙ্গে যেতো।

“যাক তাহলে বাঁচলাম আমি।

স্টেজের মুখোমুখি চেয়ার নিয়ে বসে আছে আবেগ।এক দৃষ্টিতে ইনায়াকে দেখছে।ইনায়া যতবার তাকায় ততোবারই আবেগকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইশারা করলো কি।

আবেগ হাত দিয়ে কেবলি বুঝালো তোকে খুব সুন্দর লাগছে।
বিয়ের কাজ সম্পন্ন হলো।বিদায়ের মূহুর্তের সবারই চোখে জল।
গাড়ি ছেড়ে দিতেই সবাই গেইটের ভিতরে চলে গেলো।
আবেগ হঠাৎ চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়লো।
অরত্রি ওর কাঁধে হাত রাখতেই কান্নায় ভেঙ্গে পরে আবেগ।
-অরত্রি আমার ইনায়া আজ অন্যের বউ হয়ে গেলো।অরিত্রি আমি কি নিয়ে বাঁচবো।ওকে ভুলে যাওয়ার জন্য দেড় বছর পালিয়ে ছিলাম।পারিনি আমি পারিনি রে।

‘তোকে বলেছিলাম বিয়েতে আসিস না কেনো আসলি এবার সামলা নিজেকে।

-ও অন্যের হয়ে যাচ্ছে সেটা নিজের চোখে দেখার জন্যই এসেছিলাম।এবার আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম।
অরিত্রি আমি মরে যাচ্ছি না কেনো।আমি যে শ্বাস নিতে পারছিনা।
এই অরিত্রি আমার ইনায়া ও কেনো আমার ভালোবাসা বুঝলো না।
আমি ওর জন্য শুধু ওর জন্য জীবন দিতে পারতাম তা ও কেনো আমার সাথে এমন হলো।
কি দোষ করেছি আমি কি করেছি আল্লাহ কেনো ইনায়া আমার হলো না।উত্তর দাও যে আমার জন্য না তার জন্য কেনো আমার মনে এতো ভালোবাসা দিলে তুমি।

অরিত্রি নিজে ও কাঁদছে ও জানে আবেগ ইনায়াকে পাগলের মতো ভালোবাসে।
আবেগকে শান্ত করতে পারছেনা অরিত্রি।ড্রাইভারকে ডেকে এনে ওকে টেনে গাড়িতে তুলে।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here