আমার গল্পে আমি খলনায়িকা পর্ব -১০

#আমার_গল্পে_আমি_খলনায়িকা
পর্ব—১০
কাহিনী ও লেখা : প্রদীপ চন্দ্র তিয়াশ।

সাহিলের কথা শুনে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম!এটা কিকরে সম্ভব?প্রত্যয় আর বেঁচে নেই, এদিকে ওদের কোনো জমজ নেই।কিন্তু এই দুজনের ডিএনএ রিপোর্ট মিললো কিকরে?

—তুই সত্যি বলছিস সাহিল।দুজনের ডিএনএ রিপোর্ট ম্যাচ করে গিয়েছে?

—তো কি মজা করবো আমি তোর সাথে।আর রিপোর্টটা তো আমি পাঠিয়েই দিচ্ছি।বিশ্বাস না হলে তুই দেখি নিস।

—আচ্ছা আমি তোকে একটা অ্যাড্রেস পাঠিয়ে দিচ্ছি,তুই সেখানেই ছাড়বি রিপোর্টটা।

—ঠিক আছে।

ফোনটা কেটে আমি কিছুক্ষণ বিছানার ওপরে বসে রইলাম।কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।মাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে এসেছি এতোদিন,সে কি তবে মিথ্যে বললো আমায়?কিন্তু মা আমায় মিথ্যে কেনো বলবে,কি লাভ তার মিথ্যে বলে?প্রত্যয়ের যদি সত্যিই কোনো জমজ নাই থেকে থাকে তাহলে এই লোকটার সাথে মায়ের ডিএনএ মিললো কিকরে?মা এর ভেতরে কোনো একটা গন্ডগোল আছে আমি নিশ্চিত।আমি ভাবতেও পারছি না কোনোদিন মাকে সন্দেহ করতে হবে।একবার সন্দেহ যখন করেই ফেলেছি এর শেষ প্রান্ত অবধি না গিয়ে ছাড়ছি না আমি।এমন কিছু করতে হবে যাতে মায়ের আসল অভিসন্ধির ব্যপারে বুঝতে পারি।প্রত্যয় যেমন মায়ের ছেলে কল্লোলও তাই, কোনো মা ই এক সন্তানের বিপক্ষে গিয়ে অন্য সন্তানকে সাপোর্ট করতে পারে না।তাই আমাকে আগে জানতে হবে মা কেনো এই মিথ্যাচার করলো আমার সাথে?





রাতের বেলা।মায়ের রুমে আমি আগে থেকেই প্ল্যান করে তিনটে ছবি ফেলে রেখেছিলাম।একটা কল্লোলের আর বাকি দুটো প্রত্যয়ের ছবি।ছবি তিনটাতে পরপর ক্রমিক নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা।১,২,৩।মা ঘরে ঢুকতেই ছবিগুলো তার চোখে পড়ে।ছবিগুলো তুলে বেশ অবাক হলো সে।আমি জানালা দিয়ে লুকিয়ে সবটা দেখছি।একটা জিনিস ভালো করেই জানি কোনো মানুষ দুনিয়ার সামনে মিথ্যাচার করলে কখনোই নিজের সাথে নিজে মিথ্যাচার করে না,নিজে নিজেকে ধোঁকা দিতে পারে না।প্রত্যয়ের জমজের কথা শুনে মা আমার সামনে নাটক করতেই পারে কিন্তু সেতো বদ্ধ ঘরে কখনোই নিজের সাথে নিজে নাটক করবে না।দুজন প্রত্যয়ের ছবিগুলো দেখা মাত্রই তার এক্সপ্রেশন ঠিক কিকরম হয় আমি তাই দেখার অপেক্ষায় আছি।ছবিগুলো তুলে মা খুব একটা অবাক হলো না,বা আতংঙ্কিতও হলো না।নিজে থেকেই বলে উঠলো।

—কি ব্যপার,ছবিগুলো আমার ঘরে এলো কিকরে?আর তিনজনের ছবি কেনো এখানে,আমার তো দুজন ছেলে।
এটা নিশ্চয়ই দোয়েলের কাজ।ও কালকেও আমায় প্রত্যযের জমজ নিয়ে প্রশ্ন করেছিলো।কে জানে এই জমজের ভুত কিভাবে চাপলো ওর মাথায়।

এরপর মা ছবিগুলো ড্রয়ারে রেখে দিলো।তারপর লাইটটা বন্ধ করে দেয়।আমি নিরাশ হয়ে ফিরে আসলাম।যা যা ভেবেছি সব ভুল।প্রত্যয়ের কোনো জমজ নেই,সবটাই আমার কল্পনা‌প্রসূত।প্রত্যয়ও বেঁচে নেই আমি নিজের চোখে ওকে রোদেলার ফোনে খুন হতে দেখেছি।তাছাড়া এটা প্রত্যয় হলে সেই এক্সিডেন্টের দাগটাও শরীরে থাকতো নিশ্চয়ই।তার থেকেও বড়ো কথা যদি জমজও হয়ে থাকে যার সাথে দীর্ঘদিন এই পরিবারের যোগাযোগ ছিলো না সে হঠাৎ এসে নিজের পরিবারের সম্পর্কে এতোকিছু জানবে কিকরে,এতোগুলো দিন প্রত্যয়ের কোনো ব্যবহারে আমাদের কারোর বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি ও আসলে অন্য কারোর রোল প্লে করছে।দূরের কোনো মানুষের পক্ষে এতো নিঁখুত আর নির্ভূল অভিনয় করা অসম্ভব।কথাগুলা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা খটকা আমার মাথায় এসে ঠেকলো।আর সেটা হলো কল্লোল?কল্লোলকে আমি আর ফেইক প্রত্যয় মিলে খুন করেছি ঠিক,কিন্তু ওর লাশ কেউ নিজের চোখে দেখিনি।এমনটা কি হতে পারে না কল্লোল আসলে মারাই যায় নি।ও বেঁচে আছে।আর যা ঘটছে সব ওর কাজ।এই পৃথিবীতে অনেক মিরাক্কেল ঘটে,কোনো মৃতপ্রায় মানুষকে খুঁজে না পাওয়া মানে এটা নয় তার অস্তিত্ব সত্যিই এই দুনিয়ায় নেই।
কল্লোল কোনোভাবে প্রত্যয় হয়ে ফিরে আসেনি তো?

হঠাৎ দেখতে পাই প্রত্যয় রুমের দিকে চলে গেলো।গিয়ে নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজবে।আমি তাড়াতাড়ি রুমের দিকে চলে গেলাম।দরজা খুলতেই দেখি প্রত্যয় আমার সামনেই দাঁড়িয়ে।আমি হাসিমুখে ওকে উদ্দেশ্য করে বললাম।

—কল্লোল,তুমি?কোথায় ছিলো এতোক্ষণ?

আমার মুখে কল্লোল উচ্চারণ শুনে চমকে উঠলো প্রত্যয়।ও কথাটা ঠিক ধরতে পেরেছে।

—কি বললে,কল্লোল?(হাহাহাহা)

—হাসার কি হলো,ঠিক মানুষকে তো ঠিক নাম ধরেই ডেকেছি,তাই না?

—আর ইউ জোকিং উইথ মি দোয়েল,আমাকে তোমার মৃত স্বামী মনে হলো?পাগল টাগল হলে নাকি?

—কে মৃত?

—কেনো কল্লোল ভাইয়া?

—কি জানি?

—মানেটা কি?

—হয়তো কল্লোল এখনো মরে নি,কে বলতে পারে?এই পৃথিবীতে তো অনেক কিছুই ঘটে।

—আজ এতো হেয়ালি করে কথা বলছো কেনো,কি হয়েছে বলবে?

—না,হেয়ালি করবো কেনো।তবে আমার মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানো?

—কি মনে হয় শুনি,

—মনে হয় কল্লোল ম রে নি,ও বেঁচে আছে।আমাদের সামনেই ঘুরছে,অথচ কেউ চিনতে পারছি না।

—বুঝেছি আজ ভাইয়ার কথা খুব বেশীই মনে পড়ছে তোমার।যে মানুষটা আর নেই তাকে নিয়ে এতো চিন্তা করে কি লাভ,

—বারবার কেনো প্রমাণ করতে চাইছো তোমার ভাইয়া মৃত,সে বেঁচে উঠলে কি তুমি খুশি হবে না।

—কল্লোল আমার ভাই হয়,আমার থেকে ওকে কেউ ভালোবাসে না।যদি তোমার কথা সত্যি হয় আমার থেকে খুশি কেউ হবে না।কিন্তু আমি তোমার মতো অবাস্তব চিন্তা করতে পারি না।

আমি যতোবার কল্লোলের কথা বলে প্রত্যয়কে ভরকে দিতে চাইছে ও ঠিক পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।বড্ড সোয়ানা এই মানুষটা।আর যেই হোক ও প্রত্যয় নয় এটা তো ঠিক।কতো নিঁখুতভাবে প্রত্যয়ের অভিনয় করে যাচ্ছে,অবিশ্বাস্য লাগে মাঝে মধ্যে।তবে এ যদি সত্যিই কল্লোল হয়ে থাকে আমার এক্সপোস করতে খুব বেশী সময় লাগবে না।কারণ কল্লোলের সাথে দীর্ঘদিন সংসার করেছি আমি,একবার যখন সন্দেহ হয়েছে ঠিক ধরে ফেলবো।যদিও ও কল্লোল এটা নিছকই আমার একটা ধারণা।যা সত্যি হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।




বহুদিন ধরে ফেইক প্রত্যয়ের ডায়েরীটায় হাত দেয় নি।ওর অনুপস্থিতিতে ডায়েরীটা খুলে একটু হাতে নিলাম।ডায়েরীর ভেতরে সেই ছেঁড়া কাগজের টুকরোটাও আছে।

১.প্রথমে আসল প্রত্যয়কে খুন করা
২.কল্লোলকে খুন করা
৩.আমাকে ওয়ার্নিং লিস্টে রাখা।

তিন তিনটে মাস্টার প্ল‌্যান।এখনো কাগজে জ্বলজ্বল করছে।আমি জানি না ফেইক প্রত্যয় আমাকে কেনো মারার প্ল্যান করছে,কল্লোলকে কেনো খুন করেছে সেটা জানারও আগ্রহ নেই।প্রত্যয়ের মতো ভালো মানুষের সাথে ওর কি এমন শত্রুতা ছিলো।একবার এক্সপোস করি ওকে তারপরে সবার আগে প্রত্যয়কে খুন করার শাস্তি দেবো ওকে আমি।আর যাই হোক এর জন্য কখনোই ক্ষমা করতে পারবো না ওকে আমি।প্রত্যয়কে পাবার জন্য নিজের স্বামীকে পর্যন্ত খু ন করেছি আমি,ওর খুনির পরিণতি তার থেকে ভয়ানক হবে আর সেটা আমার হাতেই।




সকালে কল্লোলের পুরোনো ফাইল ঘেঁটে কয়েকটা কাগজ বের করলাম।যা দিয়ে ওর হাতের লেখা আইডিনটিফাই করা যায়।এরপর প্রত্যয় যখন ঘরে আসলো আমি ওকে নিজের পরিকল্পনা অনুসারে বললাম।

—-প্রত্যয় কোথাও কি বের হচ্ছো?

—এক্ষুণি না,কেনো?কি হয়েছে?

—একটু ফার্মেসিতে যেতে হবে,কয়েকটা ওষুধ আনার আছে….,

—এখনই?

—হ্যাঁ,

—বলো তাড়াতাড়ি কী ওষুধ আনতে হবে?

—বলবো মনে থাকবে তোমার,লিস্ট নিয়ে যাও বরং।প্রেসক্রিপশনটাও নেই যে সেইটা দেখিয়ে আনবে।

—হুমমম,দাও।

আমি একটা কাগজ এনে কল্লোলকে দিলাম।ওকেই লিস্টে লিখতে বলি।

ও নামগুলো লিখে নিয়ে তারপর বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো।এরপর আবারও বাসায় ফিরলে লিস্টটা নিয়ে নিলাম।ফেইক প্রত্যয়ের হাতের লেখা কালেক্ট করার জন্য এছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না আমার কাছে।এই বাড়িতে আরোও অনেক ডায়েরী খাতায় লেখা আছে, তবে কার কোনটা বোঝা মুশকিল।প্রত্যয়কে কখনো লিখতেও দেখিনি কাগজে,তাই এই চালাকিটুকু করে ওর হাতের লেখাটা নিয়ে নিলাম।এবার কল্লোলের আর ওর হাতের লেখা ম্যাচ করালেই সবটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।একটা মানুষ নিজেকে যতোই আড়াল করুক হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্টদের চোখ ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব।তারা ঠিক বলে দিতে পারবে দুটো হাতের লেখা একই মানুষের না আলাদা কারোর।সাহিলের সাথে আবারো যোগাযোগ করি আমি।ওর মোবাইলে হাতের লেখার স্যাম্পল দুটো পাঠালাম।ও কনফার্ম হয়ে জানাবে বলেছে নিশ্চিত করেছে আমায়।




পরেরদিন সাহিলের ফোনকল এলো আমার কাছে।আবারোও একটা রেজাল্টের অপেক্ষা‌।জানিনা এবার কি শুনতে হবে আমায়।

—হ্যাঁ,সাহিল বল।হ্যান্ড রাইটিং এক্সটার্টরা কি জানালো?

—তারা যা জানালো খুবই শকিং!

—শকিং মানে,কি জানালো বল।

—ঐ হাতের লেখা দুটো একই ব্যক্তির নয়।অনেক ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সম্ভবনা থাকে।কিন্তু তোর পাঠানো স্যাম্পল দুটো দেখে তারা নিশ্চিত করেছে এই হাতের লেখা একই ব্যক্তির হবার সম্ভাবনা 0%!তাতে সে যতোই চালাকি করে লেখুক না কেনো।

তার মানে আমি আগের বারের মতো ভুল প্রমাণিত হলাম।ফেইক প্রত্যয় কল্লোল নয়।প্রত্যয়ও বেঁচে নেই,এদিকে ওর কোনো জমজও নেই।তাহলে কে এই ব্যক্তি?এর সাথে মায়ের রক্তের সম্পর্ক আছে অথচ মা জানেই না।এটাও সম্ভব আদৌ?আর আমি নিজের চোখে যা যা দেখলাম সেগুলোও বা ভুল বা মিথ্যে হয় কীকরে?
চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here