আলো_আঁধার পর্ব ১

আলো সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আজ তার স্বামী তাকে দুশ্চরিত্রা অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। শুধু ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি,বেল্ট দিয়ে মেরে ওর সমস্ত শরীরে দাগ ফেলে দিয়েছে। শরীরের কিছু কিছু জায়গা কেটে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। আবার অনেক আঘাত নীল হয়ে ফোলে রক্ত জমাট হয়ে গেছে। শেষের দিকে তার স্বামীর বলা কথাগুলো এরকম ছিল।

-“মা** তুই কি মনে করস আমি জানি না? আমি ভালো করেই জানি, তোর পেটের ওইটা আমার না। অন্য কারো পাপ আমার নামে চাপিয়ে দিতে চাইছিস তুই। আমি এটাও জানি, কার পাপ পেটে নিয়ে ঘুরছিস তুই। তোর মত চরিত্রহীন মা** সাথে আমি ঘর করতে পারব না। গরীব ঘরের মেয়ে, সহজ সরল হবে ভেবে বাবা মা’র কথায় বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু তুই যে একটা বেশ্যা তা এতদিন বুঝতে পারি নি। আমারই ভুল হয়েছে, বিয়ের আগেই তোর ভার্জিনিটি পরীক্ষা করে দেখে নেওয়ার দরকার ছিল। তোর মত লোভী মেয়েরা দুই পয়সার জন্য যার তার সাথে শুয়ে পড়তে পারিস। আমার শালার কপাল! এত এত মেয়ে দেখার পরেও তোকেই বিয়ে করলাম।”

কথাগুলো শুনে হতবুদ্ধি হয়ে কয়েক মুহূর্ত পাথর হয়ে দাঁড়িয়েছিল আলো। ওর চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার দেখতে পাচ্ছিল। নাসির কী বলছে এসব! দুই বছর সংসার করার পর স্বামীর মুখে এমন কথা শুনবে কখনও কল্পনাও করেনি আলো। বড় ভাবী পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। উনিও দেবরের সাথে তাল মিলালেন।

-“আমি অনেকদিন আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। এই মেয়ের স্বভাব চরিত্র ভালো না। বয়স কম হলে কী হবে? মনের মধ্যে ঝোকঝোকানি তো কম না। তখন বুঝতে পারি নি বিয়ের আগেই যে এই মেয়ে এসব কাণ্ড করে বসে আছে। এখন তোমার কাছে শুনছি, এর পেটের বাচ্চা তোমার না! ভাবো একবার কত বড় দুশ্চরিত্রা এই মেয়ে। ঘরে স্বামী রেখে পর পুরুষের সাথে সম্পর্ক রাখে। আবার ওই লোকের সাথে শুয়ে ওর বাচ্চাও পেটে ধরে! ছি, ছি, ছি! এসব নোংরামি করার আগে একবার ভাবলো না। ধরা পারলে বাড়ির মানুষের সামনে মুখ দেখাবে কীভাবে? অবশ্য কাকে কী বলছি আমি। এই ধরনের মেয়েদের মনে ডর ভয় থাকলে, প্রেমিকের সাথে রাত কাটাতে পারত! বাবা গো বাবা! কী ধান্দাবাজ মেয়ে! এতদিন গাছেরও খেয়েছে, তলারও কুড়িয়েছে।”

আলো আর শুনতে পারছিল না। এসব কথা তার সহ্য হচ্ছে না। গা গুলিয়ে বমি আসছে তার। দুই হাতে কান চেপে ধরে প্রতিবাদ করতে চাইল আলো। রূদ্ধ কন্ঠে বলল,

-“আপনারা এসব কী বলছেন ভাবী! আমি এমন কিছুই করিনি। আপনারা যা যা বলছেন তার মধ্যে একটা কথাও সত্য না। আমি দুশ্চরিত্রা নই। আপনাদের পায়ে পড়ি ভাবী, দোহাই লাগে আমার নামে এত বড় অপবাদ দিবেন না। আপনি নিজেও তো একটা মেয়ে। আমার বাচ্চাটা তো কোন অপরাধ করেনি, ওকে সুস্থ ভাবে পৃথিবীতে আসতে দিন। কেন জন্মের আগেই ওর গায়ে কলঙ্কের দাগ লাগাচ্ছেন? ”

আলোর স্বামী হুংকার দিয়ে বলেছে,

-“চুপ মা** চুপ। একটা কথা বলবি না তুই। এই বাচ্চা নিয়ে আর একটা কথা বললে ওকে তো শেষ করবই সাথে তোর জিভ টেনে ছিড়ে ফেলব।”

আলো চোখের জল ফেলে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,

-“বিশ্বাস করুন, ও আপনারই সন্তান। আমি আল্লাহ নামে কসম কেটে বলতে পারি। আমি কোন অন্যায় কাজ করিনি। কোন পাপ আমার চরিত্রে লাগতে দিইনি। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।”

বড় ভাবীর দিকে ফিরে আলো বলল,

-“কেউ আপনাকে ভুল বোঝাচ্ছে। আমার নামে আপনার কানে বিষ ঢালছে। আপনি একটা বার আমাকে বিশ্বাস করুন।”

কিন্তু আলোর স্বামী তার কোন কথাই শুনল না। বরং প্যান্টের বেল্ট খুলে ওকে ইচ্ছে মত মারল। বেল্টের একেকটা বাড়ি যখন পেটে লাগছিল তখন আলোর মনে হচ্ছিল ও মনে হয় মরেই যাবে। ওর বাচ্চাটাও মনে হয় পৃথিবীর আলো দেখতে পাবে না। অসহ্য যন্ত্রণায় মা, মা বলে কাতড়াচ্ছিল আলো। তখনই তার স্বামী ওর চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে দাঁড় করায় ওকে। দাঁত কিড়মিড় করে বলেছে,

-“আমার বাড়িতে তোর মত বেশ্যার কোন জায়গা নেই। এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যা তুই। আমার চোখের সামনে থাকলে আমি তোকে মেরে ফেলব।”

ব্যথায় আলোর সারা শরীর অবশ হয়ে আসছিল। ঠিক মত দাঁড়াতে পারছিল না আলো। এই অবস্থায় নাসির তাকে বাইরে বের করে দিয়ে ওর মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেয়। শরীরে অসহনীয় যন্ত্রণা আর চোখের সামনে একরাশ অন্ধকার নিয়ে মধ্যরাতে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াল আলো। সাত মাসে তার পেটের আকার অনেকটা বড় হয়েছে। পায়েও পানি এসেছে মনে হয়। ইদানিং পা গুলো কেমন ফোলা ফোলা লাগছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে আলোর। চোখ দিয়ে আর পানি বের হচ্ছে না। আলোর মনে হয় তার চোখের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। একটু কান্না করার পরেই চোখ দিয়ে আর পানি বেরোয় না। দুই বছর ধরে সে তো আর কম কাঁদেনি। বিয়ের পর থেকে তো চোখের পানিই তার নিত্য দিনের সাথী ছিল। স্বামী কখনও তাকে বোঝার চেষ্টা করেনি। তার কাছে সে শুধু ভোগের পণ্য ছিল। যাকে উনি ‘বিয়ে’ নামক দাম দিয়ে বাজার থেকে কিনে নিয়েছিল। ওর ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দামই ছিল না লোকটার কাছে। তবুও আলো মানিয়ে নিয়েছিল। প্রথম প্রথম মানাতে কষ্ট হলেও এক সময় ঠিকই কিন্তু মানিয়ে নিতে পেরেছিল। লোকটাকে সে কতবারই ভালোবাসতে চেষ্টা করেছিল। কতটা বাসতে পেরেছিল তা সে-ও জানে না। শ্বশুর শাশুড়ির মন কোন দিনই পায়নি আলো। সে গরীব ঘরের মেয়ে ছিল। শাশুড়ির চাওয়া মত কিছুই দিতে পারেননি তারা। সেসব নিয়েও আলোকে কম কথা শুনতে হয়নি। আলো ওর বড় জা’য়ের চোখের কাটা ছিল। অপ্রকাশিত কোন একটা কারণে বিয়ের দিন থেকেই জা তার শত্রু হয়েছে। সব কাজে তাকে ছোট করাই ভাবীর একমাত্র উদেশ্য ছিল। ভাবী কোন কারণ ছাড়া কেন তাকে এতটা অপছন্দ করে তার কারণটা বিয়ের প্রথম বছর পার হবার পর আলো একটু একটু আন্দাজ করতে পেরেছিল। ভাবী নিজের স্বামীর থেকে তার দেবরকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। আর তাই দেবরের বিয়েটা মন থেকে মেনে নিতে পারেননি তিনি। আলো সব বুঝেও কাউকে কিছু বলেনি। কারণ তার স্বামীর চরিত্রে সে ভাবীর প্রতি কোন দুর্বলতা কোনোদিনই লক্ষ্য করেনি।

নিস্তব্ধ জনমানবহীন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আলো ভাবছে কোথায় যাবে সে এখন? বাবার বাড়ি ছাড়া যাওয়ার মত আর কোন জায়গা নেই তার। নাসির কি বাবা মা’কে সব জানিয়ে দিয়েছে? বাবা মা কি নিজের মেয়েকে বিশ্বাস করবে? নাকি বাকি সবার মত বাবা মা’ও তাকে অবিশ্বাস করে তাড়িয়ে দিবে?
ক্লান্ত শরীরে এলোমেলো ভাবে পা ফেলতে ফেলতে আলো নিজের বাবার বাড়ির কাছে চলে এলো। বাড়ির সামনে এতো মানুষ কেন? হঠাৎ ভাবনাটা মনে আসতে বুকে ছ্যাত করে উঠল আলোর। বাবার কিছু হয়নি তো? অনেকদিন ধরেই বাবা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে ছিলেন। তাহলে কি বাবা মারা গেছে? তাই এত রাতে বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়!
একটু এগোলে আলো চাপা কান্নার শব্দ শুনতে পেল। মা কাঁদছে। তাহলে আলো যা ভেবেছিল সেটাই হয়েছে। বাবা আর এই দুনিয়ায় নেই। বাবার মৃত্যুর ভাবনা মনে এলেও আজ আলোর কান্না পেল না। কাঁদবে কেন সে? বাবা তো উনার কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মানুষটা সারাজীবন শুধু কষ্টই করে গেছে। কখনও সুখ করতে পারেননি।
আলো মানুষের ভীড় ঠেলে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাবাকে একটা সাদা চাদর দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে রাখা হয়েছে। বাবার মাথার পাশেই বসে মা কাঁদছে। আলোকে দেখে মায়ের চোখ জ্বলে উঠল যেন। আলোর দিকে এগিয়ে আসছেন উনি। আলো বুঝলো বাবা মারা গেল ঠিকই কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে তার কলঙ্কের কথা বাবা ঠিকই জেনে গেছেন। মা ঝাঁঝালো গলায় চিৎকার করে বললেন,

-“হতভাগী, মুখপুড়ি এখানে কেন এসেছিস তুই? কী দেখতে এসেছিস এখন? মানুষটা জীবনের শেষ সময়টুকু কীভাবে লজ্জায় অপমানে তরপাতে তরপাতে মরেছে তা দেখতে এসেছিস। অমন নোংরা কাজ করার আগে লজ্জা করলো না তোর? তুই আমার মেয়ে! এই মেয়েকে আমি পেটে ধরেছি! ছি! এই দিন দেখার আগে আল্লাহ আমার মরণ দিলেন না কেন? তোর মত কালনাগিনী আমার মেয়ে হতে পারে না।”

আলো কিছুই বলল না। নীরবে মা’র সব অভিযোগ, অপমান গ্রহণ করল। তার চোখ জ্বালা করছে। কিন্তু চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি বের হচ্ছে না।

-“মানুষটা সারাজীবন মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছে। কখনও কারো কাছে মাথা নিচু করেনি। শেষে কি-না ওর নিজের মেয়ে এভাবে মানুষটার মান সম্মান মাটিতে মিশিয়ে দিল। আমরা কি দোষ করেছিলাম রে আলো। কেন আমাদের এত বড় শাস্তি দিলি।”

আলো খেয়াল করল এখানে উপস্থিত প্রতিটা
মানুষ তাকে ঘৃণার নজরে দেখছে। আলো নিজেও জানে না কেন তার কপালে এই বদনাম জুটল। সে কী করেছে যার জন্য তার চরিত্রে কলঙ্কের কালি লাগল।
আলোর মা বিলাপ করে কাঁদছেন। আলো কোনরকমে উচ্চারণ করল,

-“মা, একটা বার তোমরা আমাকে বাবাকে দেখতে দিবে? আমি বাবার কাছে যাব না মা। এখান থেকেই একটা বার শুধু বাবার মুখটা দেখব। বাবার কবর দেয়া হয়ে গেলেই আমি চলে যাব। তোমাদের থেকে অনেক দূরে…

শেষের দু’টা লাইন আলো নিজেকে শোনাল যেন।

-“খবরদার তোর ওই নোংরা মুখে আমার স্বামীকে বাবা বলবি না তুই। তোর মত মেয়ের বাবা হয়ে মানুষটা মরার আগেও কষ্ট পেয়ে গেছে। তুই ওর মুখ দেখলে ওর কষ্ট বাড়বে বইকি কমবে না।”

আলো আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। পা দু’টো পাথর হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখন তার চোখের সামনেও সবকিছু অন্ধকার ঠেকছে। বেরিয়ে পড়ল আলো। কোথায় যাবে জানে না সে। আসার সময় ভীড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলে উঠল,

-“এমন মেয়ে পেটে ধরলে কপালে তো বদনাম জুটবেই। ভালোই হয়েছে বাপটা মরে গেছে। বেঁচে থাকলে এসব সহ্য করতে পারত না বেচারা।”

অন্য একজন বলল,

-“শুনলাম ওর পেটেরটা নাকি অন্য কারো পাপ। দেখো মেয়ে! স্বামীর সাথে ঘর করে অন্য বেডার পাপ পেটে নিয়ে ঘুরে। এই মেয়েরও তো মরে যাওয়া উচিত।”

-“এরা মরবে না। দেখো না স্বামী বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে কীভাবে নির্লজ্জের মত বাপের কাছে এসে উঠল।”

-“আমি তো একটা কথাই ভাবছি শুধু। না জানি কোন মেয়ের ঘর ভেঙেছে। কার স্বামীকে নিজের জালে ফেলেছে! এদের মত মেয়েদের জন্যই তো আমাদের মত সহজ সরল মেয়েরা স্বামীকে ধরে রাখতে পারে না। আল্লাহ এদের রূপ দেয়। রূপ দেখিয়েই তো পুরুষ পাগল করে। এদের রঙঢঙ দেখে বেটাছেলেদের মাথা ঠিক থাকবে কী করে বলো দেখি?”

আলো আর শুনতে পেল না। তার কান ঝিঝি করছে। মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। অন্ধকার রাস্তায় আলো হেঁটে যাচ্ছে। যাবার কোন জায়গা নেই ওর। আজ থেকে আপন বলতেও কেউ রইল না।
ব্রিজের উপর দিয়ে হাঁটার সময় আলো দাঁড়াল। উঁকি দিয়ে ব্রিজের নিচে তাকাল। ভীষণ খাদ কলকল ধ্বনি তৈরি করে পানি বয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে লাফিয়ে পড়লে আলোর লাশ কেউ খুঁজে পাবে না। পানির স্রোত তাকে ভাসিয়ে দূরে কোথাও নিয়ে যাবে। চোখ বন্ধ করল আলো। না, সে ঝাঁপ দিতে পারবে না। নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার অধিকার তার থাকলেও, তার ভেতরে যে আছে তার জীবন শেষ করার অধিকার আলোর নেই। যে এখনও এই পৃথিবীর আলো দেখেনি, নিজের কষ্টের ভাগ আলো ওই মাসুমকে কেন দিবে? তার ভাগের কষ্ট তাকেই পেতে হবে। দূর থেকে দু’টা লাইট ক্রমশ আলোর দিকে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ করে তীব্র আলোয় আলোর চোখ ঝলসে যাচ্ছে। ভালো করে তাকাতে পারছে না সে। সে দুই হাত চোখের সামনে এনে ধরল। আর ঠিক তখনই পিচ ঢালা রাস্তার বুকে টায়ারে কর্কশ শব্দ তুলে আলোর দুই হাত সামনে একটা গাড়ি এসে ব্রেক কষল।

চলবে___

#আলো_আঁধার [১]
#জেরিন_আক্তার_নিপা
প্রথম পর্বে সবার গঠনমূলক মন্তব্য আশা করছি। নতুন গল্প কেমন লাগল জানাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here