ইতিপূর্বে পর্ব ৭

#ইতিপূর্বে [০৭]

মন খারাপ করে যেই গাড়ি ঘোড়াতে যাবে তখনি ডান পাশ থেকে কিছু হাসির শব্দ কানে এলো তার..
হাসির শব্দ অনুসরণ করে জানালা দিয়ে ডান দিকে তাকাতেই চোখ আটকে যায় তার।
একটি মেয়ে আশ্রম এর ভিতর কতোগুলো বাচ্চার সঙ্গে কানামাছি খেলছে।নাক অবধি নিকাব এবং চোখে কাপর বাধা থাকলেও ড্রেসাপ দেখে আরাধ্য বুঝে গেলো এটাই সেই মেয়েটি।গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা সামনে যেতেই নিলাঞ্জনা ওকে দেখে ফেলে দ্রুতগতিতে গলায় ঝুলতে থাকা রুমাল টা খুলে ছুটে যায় অন্যদিকে।
এদিকে আরাধ্য তার পিছনে দৌড়ে চলেছে কিন্তু সে কোনো সারা দিচ্ছে না।

আরাধ্য:আরে আজব তো।এইযে শুনুন আমার কথাটা।
মেয়েটি এতক্ষন সাধারণ গতিতে দৌড়োলেও এবার থামে সে।একবার পিছনের দিকে তাকিয়ে এমন ভাবে দৌড় দেয় যাতে করে তাকে খুজেও পেলো না আরাধ্য।
মেয়েটি পালিয়ে যাওয়ায় কষ্ট পাওয়ার যেও বেশি বিষ্মিত হলো আরাধ্য।তার থেকে পালাতে শুধু একজন ই পারে।আপনমনে বিড়বিড়ালো,
আরাধ্য:এভাবে পালাতে তো শুধু… ন না না কি ভাবছি আমি।
ভাবনা বাদ দেয় সে।জায়গাটা বেশ নিরব।চারপাশে সামান্য গাছপালা তার সঙ্গে এক পাশ দিয়ে নদী। পরিষ্কার আকাশে সবে সূর্যাস্ত নামছে।

মেয়েটির কথা ভাবা বন্ধ করে দু হাত পিছনে গুজে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়ায় সে।চশমা টা খুলে ফেলে এবার।পকেট থেকে একটা মাক্স বের করে মুখে দিয়ে নেয়।বাকা হাসে সে।আকাশের দিকে তাকিয়ে একা একাই মনে করে কিছু ঘটনা–

ইতি: কি ব্যাপার গ্যাংস্টার এফ আর পি!আপনার যে হঠাত আমার কথা মনে পরলো?
কথাটা শোনা মাত্রই পূর্ব পিছন ঘুরে দেখলো ব্লাক চেক এর শার্ট পরিহিত একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মুখে মাক্স থাকলেও তাকে চিনতে সমস্যা হলো না ওর।

পূর্ব: সয়ং মাফিয়া লিডার তুরফা ইতি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে ভাবা যায়!আমার তো মনে হচ্ছে আমি সপ্ন দেখছি।

ইতি:তার মানে তুমি বোধ হয় জেগে জেগে সপ্ন দেখো রাইট?

পূর্ব:হুম দেখি তো তবে সেই সপ্নেও ইদানিং শুধু একজন কেই দেখি।

ইতি:(পূর্বের কিছুটা সামনে গিয়ে) তাই না?

পূর্ব:জি ম্যাম।ওকে ফাইন,এবার আসল কথায় আসি।তুমি ফ্রি থাকলে আজ রাতেই বেড়োতে পারি।দেড়ি করা আই থিংক ঠিক হবে না।

ইতি:অন্যের জন্য ইতি অলওয়েজ ফ্রি।আর এমনিতেও দু দিন ধরে হাত টা চুলকাচ্ছে।

পূর্ব:ভয় নেই তোমার?

ইতি:ইতি কাউকে ভয় পায় না।

পূর্ব:তাই নাকি? (ইতির কাছে এগোতে এগোতে বলে)

ইতি:অ অভিয়াসলি বাট তুমি এদিকে আ আসছো কেনো?

পূর্ব: (ইতির সামনে গিয়ে হেচকা টানে ওর কোমড় চেপে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে)ভাবা যায়? ইতি এখন তোতলাচ্ছে?

ইতি:আ আ আমি..

পূর্ব:হুম বলো

ইতি:আমায় ছ ছাড়ো পূর্ব

পূর্ব:যদি না ছাড়ি?

ইতি:কিভাবে ছাড়িয়ে নিতে হয় তা আমি জানি।
(কথাটা বলে নিজের হাত দিয়ে এক ঝটকায় পূর্বের হাত মুচড়ে ছাড়িয়ে নেয়)

পূর্ব:আউচ..এই এটা তোমার হাত নাকি লোহা? সবসময় জেনেছি মেয়েদের হাত নরম তুলোর মতো হয় এখন দেখছি সব ই উল্টো।

ইতি:হা হা হা..অনেক ধরণের তুলোই কিন্তু ভারের চাপে শক্ত হয়ে যায়।

পূর্ব:কি লজিক..বাপরে বাপ..

ইতি:ওকে বায়।

পূর্ব:ঐ ইতি দাড়াও

ইতি:হুম বলো। (পিছন ঘুড়ে বলে)

পূর্ব: এখন ও কিন্তু বললেনা আমায়।তবে কি ভেবে নেবো ইতিপূর্বের দিন শুরু?

ইতি:এতই সোজা নাকি।আর হ্যা আমার হাত যেমন লোহা মনটাও তেমনি পাথর।চাইলেও গলাতে পারবে না।

পূর্ব:গলাতে নাহয় পারবোনা।যদি একেবারেই সরিয়ে দেই?

ইতি:পারবেনা,তার ভার প্রচুর।

পূর্ব:যদি আমি সবটা বহন করে দেখাতে পারি?

ইতি এবার কিছুক্ষন পূর্বের দিকে তাকিয়ে থেকে এক দৌড়ে উধাও হয়ে যায়।

পূর্ব:যাহ বাবা,এটা মেয়ে নাকি এলিয়েন কে জানে।
কথাটা বলেই নিজের বাইক এর সামনে যায়।তখন ই তার চোখ পরে লুকিং গ্লাস এ।ভ্রুযুগল কুচকে বলে ওঠে,
পূর্ব:দিস ইজ গ্যাংস্টার এফ আর পি,যে একটা মেয়ে এমনকি মাফিয়া লিডার ইতির পিছনে ঘুড়ছে।ভেরি ফানি..উমমমম..
কিছুক্ষন ভাবার পর মাস্ক টা খুলে ফেলে এবং চোখে চশমা দিয়ে নেয়।

–এন্ড দিস ইজ আরিয়ান আরাধ্য..উম হু,আরাধ্য কারোর পিছনে ঘুড়ছে না।
কথাটা বলেই বাকা হেসে আবারো পূর্বের রূপ ধারণ করে বাইক এ চেপে বসে।মাথায় হেলমেট দিয়ে স্টার্ট দেয় বাইক।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আরাধ্য।চোখ থেকে চশমা খুলে খোলা আকাশের দিকে তাকয়ে থাকে।

আরাধ্য:সত্যি ই পাথর টার ভার খুব বেশি ই ছিলো। তাইতো হেরে গেলাম আমি।তবে এখন আমার খটকা অন্য বিষয়।কে এই মেয়েটা?ইতির মতো ওর উপস্থিতি ও আমায় কেনো এতটা টানে?অদ্ভুত বিষয় এটা,ইতির চোখ তো আমায় কখনো এতটা নেশা ধরিয়ে দেয়নি।তবে এই মেয়েটি কেনো?

কোনো প্রশ্নের উত্তর পেলোনা আরাধ্য।প্রায় দেড় বছর আগের ঘটনা।কাকতালীয় ভাবে একদিন পুর্ব এবং ইতি একই জায়গায় কিছু নারী পাচার কারিদের ধরতে গিয়েছিলো।তখন ই দেখা হয়ে যায় দুজনের।পূর্ব ইতিকে আগে থেকে চিনলেও ইতি পূর্বের নাম আগে শোনেনি।
সেদিন এর পর থেকেই দুজনের মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হতো,যদিও ইতি ইচ্ছাকৃত ভাবে পূর্বের সঙ্গে কখনোই যোগাযোগ করেনি পূর্বই স্বেচ্ছায় ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে।ইতির মন কখনোই গলাতে পারেনি পূর্ব।কিন্তু হুট করেই ছয় মাস আগে থেকে ইতি অদ্ভুত আচরণ শুরু করে,কেনো এমন হয়ে গেলো হুট করে তাও সে জানেনা।

আর কিছু ভাবলো না আরাধ্য।ইতির কথা না ভাবতে চাইলেও বারবার তার ভাবনাতে চলে আসে সে।

অন্যদিকে,,
দেওয়ালে ঠেস দিয়ে এক পা মাটিতে রেখে এবং অন্য পা কিছুটা উচু করে দেওয়াদের সঙ্গে চেপে রেখে চোখ বন্ধ করে আছে ইতি।তার কিছুটা দূড়ে দাঁড়িয়ে ইতির অবস্থা পপর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করছে প্রিয়াঙ্কা।তবে প্রতিবার ই ব্যার্থ হচ্ছে এবং তার চেয়েও বড় কথা ইতিকে অনেকটা বিদ্ধস্ত লাগছে তার যা আগে কখনো লাগেনি।

ইতি:কাউকে কখনো ভালোবেসেছো প্রিয়ু? (চোখ বন্ধ রেখেই বলে ইতি)
ইতির মুখে প্রিয়ু ডাক শুনে অবাক হয় প্রিয়াঙ্কা। কারণ চার বছরে শুধু এক থেকে দু বার ই এই ডাক শুনেছে।

প্রিয়াঙ্কা: জ জি ম্যাম কি বললেন?

ইতি:উফফফ,বয়সে তো আমরা সেইম।তাহলে এতো ম্যাম বলার কি দরকার? সেসব ছাড়ো আগে বলো কখনো কাউকে ভালোবেসেছো?

প্রিয়াঙ্কা:হুম.. (মাথা নিচু করে বললো)

ইতি:বাহ,তার ফল হিসেবে কি পেয়েছো?

প্রিয়াঙ্কা: সবার ভালোবাসা কি প্রকাশ করা যায়? থাক না কিছু ভালোবাসা না বলা হয়ে।

ইতি: আসলে সত্তিটা কি জানো?আবেগ,আবেগ কে কখনো মূল্য দিতে হয়না।নাহলে তার ফল হিসেবে শুধুই কষ্ট ভোগ করতে হয়।

প্রিয়াঙ্কা: সবকিছু তো আবেগ হয়না ম্যাম।আর সবার থেকেই মানুষ কষ্ট ও পায়না।অনেকে আলাদা ও হয়।

ইতি:নাহহ(চোখ খুলে বেশ জোড়ে বললো)

প্রিয়াঙ্কা: আপনি এমন বলছেন কেনো ম্যাম?

ইতি: একটা কথা জেনে রাখো প্রিয়াঙ্কা।সবাই এক, কেউ ভালোবাসার মূল্য দিতে জানেনা। আর তাদের এই কাজের কারণে অনেকে হারায় তাদের প্রিয়জন কে।কারোর বন্ধু কিংবা কারোর বোন।

প্রিয়াঙ্কা:মানছি ম্যাম।কিন্তু এটা আপনি ভুল বললেন,সব মানুষ এমন হয় না।

ইতি:না না না,সবাই এক হয়,সবাই,সবাই..
বেশ জোড়ে কথাটা বলেই চলে গেলো ইতি। প্রিয়াঙ্কা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো,এর আগে ইতির এমন রূপ সে কখনোই দেখেনি।

এদিকে,
রাত ১ টা বাজতে চললো কিন্তু এখনো আরাধ্য বাড়িতে না আসায় নিলাঞ্জনা কিছুটা অবাক হলো কারণ ও সাধারণত ১০ টার মধ্যেই চলে আসে। কিছু একটা ভেবে নিধি কে সঙ্গে নিয়ে বাহিড়ে বেরোতেই…..

#চলবে
#সাদিয়া_আফরিন_প্রতিভা

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here