ইতিপূর্বে পর্ব ৮

#ইতিপূর্বে [০৮]

প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে বাইকে চড়ে একটা ইনফরমেশন কালেক্ট করতে যাচ্ছিলো ইতি।রাস্তাটা বেশ নির্জন। আশেপাশে মানুষের দেখা পাওয়াও অসম্ভব মনে হয়।সন্ধ্যা হিয়ে যাওয়া কিছুটা অন্ধকার ছেয়ে গেছে আশেপাশে।ল্যাম্পপোস্ট এর আলোতেই সামান্য আলোকিত চারিপাশ। ইতি বাইক চালাচ্ছে আর প্রিয়াঙ্কা পিছনে বসে আছে।
হঠাত করেই চোখের সামনে তীব্র আলো পরতেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে নেয় ইতি।দ্রুতগতিতে ব্রেক করে।মুহূর্তেই চোখ খুলে সামনে তাকাতেই বিষ্মিত হয়। মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে বেড়িয়ে এলো,
–পূর্ব!
পূর্বের নাম শোনা মাত্রই প্রিয়াঙ্কার চোখ বড়বড় হয়ে গেলো।আজ পর্যন্ত পূর্বের নাম হাজারোবার শুনলেও তাকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি।
পূর্ব বাইক থেকে নেমে হেলমেট টা খুলেই জ্যাকেট এর পিছন থেকে বন্দুক বের করে ইতির দিকে তাক করে।মুখে তার এখনো মাস্ক তবে চোখদুটো রক্তবর্ন হয়ে আছে।
ইতির এবার মাথায় রাগ উঠে যায়।নিজেও বাইক থেকে নেমে জিন্স এর পিছন থেকে বন্দুক এনে পূর্বের নিকটে গিয়ে ওর মাথায় ধরে।পূর্ব ও তার বন্দুকটি এবার ইতির মাথায় ছোয়ায়।
দুজনের চোখ এখন পলক ফেলা বন্ধ করে দিয়েছে।একে অপরের দিকে তাকিয়ে তাদের চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করে চলেছে।
এদিকে প্রিয়াঙ্কা হুট করেই এমন কোনো ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলো না।কিছু বুঝতে না পেরে নিজের বন্দুক বের করে হাতে রাখে।না জানি কখন প্রয়োজন পরে।

ইতি: বাহ মিস্টার সমৃদ্ধ আরিয়ান আরাধ্য আপনি তো দেখছি নিজে থেকেই আমার কাছে চলে এলেন।

পূর্ব: (নিজের মুখ থেকে মাস্ক ছুড়ে ফেলে দেয়,চোখে চশমা দিয়ে নেয়) উম হু, ভুল বলছিলে। দু সেকেন্ড আগে ছিলো পূর্ব আর এখন? অনলি আরিয়ান আরাধ্য।আর হ্যা, আমি তোমার কাছে ধরা দিতে আসিনি।তোমার পরিচয় জানতে এসেছি।বলো আমায় কে তুমি?কি তোমার আসল পরিচয়?

ইতি:আরে কুল ডাউন পূর্ব,এতো উতলা হচ্ছো কেনো?তুমিও তো নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলে।কই আমি তো খুজেই নিলাম,তবে আমার পরিচয় কেনো খুজে বের করতে পারছোনা বলতো? আসলে কি জানোতো? আমি চেয়েছিলাম তোমায় আরো কিছুদিন বাচতে দেবো কিন্তু তুমি তো দেখছি একেবারে মরার জন্য উঠেপরে লেগেছো।তো আমি আর কি ই বা করতে পারি বলো? (কথাটা বলেই এক ঝটকায় পূর্বের হাত থেকে বন্দুক টা ফেলে দেয়।এক হাত দিয়ে ওর কলার চেপে ধরে অন্য হাতে বন্দুক মাথায় চেপে ধরে) জেনে রাখো পূর্ব,ইতির থেকে পালানো এতো সহজ নয়।

পূর্ব এবার বাকা হাসলো।কিছুক্ষন নিরব থেকে এক ঝটকায় ইতির থেকে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে।চোখের চশমা মা ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিচে পরে থাকা বন্দুক টা হাতে তুলে নিলো।

পূর্ব: আরাধ্য কে তুমি এতো সহজে ধরতে পারলেও পূর্ব কে ধরতে পারবেনা ইতি।কারণ পূর্বকে ধরার ক্ষমতা কারোর নেই।
কিছুক্ষন নিরবতা বজায় রইলো দুজনের মাঝে। পূর্ব এবার ছলোছলো নয়নে ইতির পানে তাকিয়ে হাত আগলা করে দিলো।সঙ্গে সঙ্গে হাত থেকে পড়ে গেলো বন্দুক।
প্রিয়াঙ্কা দূড়ে দাঁড়িয়ে সকল দৃশ্য দেখে যাচ্ছে।এদের মাঝে ঠিক কি হচ্ছে তা ওর বোধগম্য নয়।

পূর্ব: আজ নিজে থেকেই ধরা দিলাম তোমার কাছে। যা খুশি করো আমার সঙ্গে।মেরে ফেলবে?এরে ফেলো তাহলে। তবে আমি জানি পারবেনা তুমি,এর একটাও করতে পারবেনা তুমি।

ইতি এবার চোখ বন্ধ করে নেয়।নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করে বারংবার।তবে সে ব্যার্থ।চোখ খুলে তাকায় সে।পূর্ব দু দিকে দু হাত ছড়িয়ে ঠোটের কোনে হাসি নিয়ে তার পানে তাকিয়ে আছে।যেনো স্ব ইচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করছে সে। ইতি নিজের মনকে শক্ত করে কাপা কাপা হাতে চেপে ধরে বন্ধুক।পূর্বের দিকে তাক করে সেই বন্দুক তবে তার হাত যেনো অবাস হয়ে আসছে।চেষ্টা করেও পারছেনা ধরে রাখতে।যেই হাতে আগে শত মানুষকে মেরেছে সেই হাত আজ এমন লাগছে কেনো?প্রশ্নের উত্তর বোধগম্য হলো না ইতির। দীর্ঘ পাচ মিনিট পর বাধ্য হয়ে হাত নিচে নামিয়ে নিলো সে,চোখদুটো আজ ছলছল করছে তার।
ইতিকে এভাবে দেখে হৃদয়ে যেনো স্বস্তির নিঃশ্বাস বয়ে গেলো পূর্বের।হাত নামিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির হাসি দিলো,তার চোখেও জল। আগে বুঝতে পারলেও আজ সিওর হয়ে গেলো ইতির মনেও তার জন্য অনুভূতি রয়েছে।

পূর্ব: কি হলো মিস তুরফা ইতি?আজ আপনার হাত চলছে না কেনো?কোনো শক্তি পাচ্ছেন না হাতে তাই না?তবে আমার কথাটাই সত্যি হলো কি বলো?

ইতি এবার চোখ তুলে তাকিয়ে একবার হাতে থাকা বন্দুক এর দিকে তাকায়।এবার পূর্বের কাছে গিয়ে ওর হাত চেপে ধরে বন্দুক ঠেকায় নিজের মাথায়।

প্রিয়াঙ্কা:ম্যাম আপনি কি করছেন টা কি?

ইতি: তুমিও তো আমায় মারতে চাও তাই না?তোমার শত্রু তো আমি।তাহলে মেরে ফেলো আমায়,নিজে থেকে বলছি।মেরে ফেলো..

পূর্ব এক ঝটকায় হাত থেকে বন্দুক ফেলে দিয়ে ইতির দুই বাহু চেপে ধরে।

পূর্ব: তুমি ভালো করে জানো চাইলেও আমি এটা করতে পারবোনা।কারণ এই মেয়েটিকে আঘাত করলে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি আঘাত আমি অনুভব করি।এর মানে কি জানো?আমার অর্ধেক টা জুড়ে শুধু সেই রয়েছে,আর সেটা তুমি। তাহলে জেনেশুনে নিজের হৃদয়ে আঘাত করতে কেই বা চায়। অবশ্য তুমি এসব বুঝবেনা,কারণ তা বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই।

ইতি:হ্যা হ্যা কিচ্ছু বুঝিনা আমি কিচ্ছু না।আমার তো মন বলতেই কিছু নেই তাই না?তাহলে বুঝবো কি করে বলো?বুঝিনা আমি,বুঝিনা.. (পূর্বের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কয়েক পা পিছোতে পিছটে বললো।গাল বেয়ে অশ্রু গরিয়ে পড়লো তার।তবুও নিজের হাতের সাহায্যে দ্রুত মুছে নিলো)
পূর্ব এবার ইতির কিছুটা কাছে গিয়ে আবারো ওকে নিজের সঙ্গে চেপে ধরলো।ইতি কিছুক্ষন ছটফট করলেও তা স্থায়ী হলো না।একপর্যায় তার মাথা গিয়ে ঠেকালো পূর্বের বুকে,নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেলো তার।পূর্ব ও এবার তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।সময়টা থমকে গেলো সেখানেই।

নিজের অজান্তেই চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো প্রিয়াঙ্কার।এর কারণ তার অজানা।এত বছরে ইতির চোখে কখনো জল দেখেনি সে।আর সেই ইতিকে এই রূপে দেখে যেনো চিনতে কষ্ট হচ্ছে তার।
এদের দুজনের মধ্যে ঠিক কি হয়েছে তা বোধগম্য না হলেও এটুকু বেশ ভালোই বুঝতে পারলো দুজন দুজনের হৃদয়ের কতটা কাছের।নিজের অজান্তেই মনে পরে গেলো কিছু কথা।
আপন মনেই ভাবলো, আচ্ছা তাকেও তো কেউ এভাবে জড়িয়ে ধরতে পারতো?মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে পারতো,”ভয় কিসের?আমিতো আছি”।
তবে তা এখন কল্পনা ছাড়া কিছুই না।হয়তোবা নিজের ভিতর জমে থাকা অনুভূতি প্রকাশ করতে পারলে সে তাকে মেনে নিতো।কিন্তু তা না হয়ে যদি উল্টোটা হতো?যদি ফিরিয়ে দিতো তাকে? না না এটা সজ্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।তার চেয়ে বরং না বলাই থাক অনুভূতি গুলো।নিজের মনের খাচায় খুব যত্নসহকারে তুলে রাখা হোক অনুভূতি গুলো।ভালোবাসলেই তাকে পেতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই!কিছু ভালোবাসা নাহয় অপূর্ণ ই থেকে যাক।
আজও একটা কথা ভেবেই নিজের মনকে বুঝ দেয় প্রিয়াঙ্কা, “হয়তো তাকে কাছে পাওয়া ওর ভাগ্যে ই ছিলোনা।কাছাকাছি থাকলে বোধ হয় কষ্টটা আরো বারতো।তার চেয়ে বরং নিজে থেকে দূড়ে সরে আসাই শ্রেয়। প্রিয় মানুষটির খুশিতেই নাহয় নিজেও আনন্দিত হবে”

#চলবে
#লেখনীতে_সাদিয়া

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here