একটি নির্জন প্রহর চাই পর্ব -৬৫

#একটি_নির্জন_প্রহর_চাই
৬৫
#WriterঃMousumi_Akter.

চার মাস পর,

ভর দুপুরে তরী দাঁড়িয়ে আছে মেইন রাস্তায়। রাস্তার ওপাশে রোহানের জন্য আইসক্রিম কিনতে যাবে। রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। অনেক সময় দাঁড়িয়ে থেকে অধৈর্য হয়ে পড়েছে। এই দিকে মৃন্ময় বার বার ফোন দিচ্ছে, আর তরী কেটে দিচ্ছে। ইদানিং তরীও ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। এই যে মৃন্ময়কে এতবার উপেক্ষা করার পরেও মৃন্ময় তার পিছু ছাড়ছে না। তরীর জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে মৃন্ময়ের অবদান তরী কখনো অস্বীকার করতে পারবে না। তাছাড়া মৃন্ময়ের ভালোবাসাও উপেক্ষা করতে পারছে না। ইদানিং তরীর প্রায় সময়ই মৃন্ময়ের কথা ভেবে ভালো লাগে, মনের মাঝে অন্যরকম প্রশান্তি কাজ করে। মৃন্ময় প্রায়শই তার জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। রোজ একটা করে রজনীগন্ধার মালা ছুঁড়ে মারে।তরীর সকল চাওয়া-পাওয়া মৃন্ময় তরীর অজান্তেই পূর্ণ করে থাকে। তরী এসব বুঝেও মৃন্ময়ের সাথে জড়াতে চাচ্ছে না। কেননা মৃন্ময়ের মা-বাবা বা আত্মীয়রা সহজেই মেনে নিবে না। মানুষ অনেক কটুক্তি করবে। সমাজে একটা বাচ্চা সহ ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করলে সে ছেলেকে অনেক কথা শুনতে হয়। তরী চাচ্ছে না মৃন্ময় সেইসব বাজে পরিস্থিতে পড়ুক। মৃন্ময় জীবনে অনেক ভালো কিছু ডিজার্ভ করে, অনেক ভালো কিছু। তরী তার অভিশপ্ত জীবনটাকে মৃন্ময়ের মতো ভালো ছেলেকে ব্যবহার করে নিজের জীবন আলোকিত করতে চাচ্ছে না।কিন্তু মন বড়ো বেপরোয়া। ইদানিং তরী নিজেকে কন্ট্রোলও করতে পারছে না। হুট হাট মৃন্ময়ের কথা মনে পড়ছে, মৃন্ময় সামনে এলেই তার ভালো লাগে। গতরাতে মৃন্ময় অনেক রিকুয়েষ্ট করেছে তরী যেন তাকে একটা শার্ট কিনে দেয়। তরীর হাতের একটা কিছু সে গায়ে জড়াতে চায়। তাহলে নাকি মনে হবে তরী তার সাথেই আছে। কী ভেবে তরীর মনে হলো সে মৃন্ময়ের জন্য একটা শার্ট কিনবে এবং নিজ হাতে দিবে। এসব ভেবে তরীর একটু লজ্জা করছে। তরী কয়েকটা দোকান ঘুরে ঘুরে মৃন্ময়ের জন্য আকাশী রঙের একটা শার্ট কিনল। শার্টটা আজ নিজ হাতে দিবে। মনে মনে দারুণ খুশি লাগছে তরীর। খুশি মনে রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে হঠাৎ গাড়ি আসায় ধাক্কা লেগে গেল তরীর। হাতে থাকা জিনিস পত্র সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এক্সিডেন্টে *র* ক্তা*ক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে আছে তরী। সাথে সাথেই মানুষ জন সেখানে এগিয়ে এলো। তরীকে দ্রুত হসপিটালে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তরীর ফ্যামিলির লোকজনদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন কেউ একজন ওর ফোনটা বের করে। ফোনের লক থাকায় কারো সাথে কেউ যোগাযোগ করতে পারল না। ফোনের ওয়াল পেপারে একটা বাচ্চা ছেলের ছবি শুধু। তরীর তখন অবস্থা অনেক খারাপ। র* ক্ত দিতে হবে সেই মুহূর্তেই তরীর ফোনে মৃন্ময়ের কল এলো। হসপিটাল থেকে কেউ একজন ফোন রিসিভ করে বলল,’ আপনি যে-ই হন না কেন দ্রুত হসপিটালে আসুন। যাকে ফোন দিয়েছেন তার অবস্থা ভালো নয়।’

মৃন্ময় দশ মিনিটের মাঝে ছুটে এলো হসপিটালে। এসে তরীর এমন অবস্থা দেখে দিশেহারা হয়ে পড়ল। একটা ছেলে মানুষ তবুও হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিয়েছে।তরীর হাত ধরে বারবার মায়াবিনী বলে বলে ডাকছে। হসপিটালের সকলের ধারণা মৃন্ময় তরীর স্বামী। নিজের স্বামী ছাড়া কেউ এইভাবে ভেঙে পড়ে না। তরীর তখন হালকা জ্ঞান আছে। মৃন্ময় তরীর হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘আমি তোমাকে আর চাইব না তবুও তুমি বেঁচে থাকো। তুমি আমার না হও তবুও নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিব দুজনে একসাথে নেই তবুও আমাদের আকাশটা তো এক। আমরা এক আকাশের নিচেই আছি। তুমি আমার না হও তবুও বেঁচে থাকো সুস্থ থাকো। এতদিন এইভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম পৃথিবীর কোথাও না কোথাও তুমি আছো একদিন দেখা হবেই। তুমি আছো এটাই আমার শান্তির কারণ। কোথাও আছো কার সাথে আছো এটা ভেবে ক্ষোভ প্রকাশ করিনি। তোমার কিছু হলে আমি মা**রা যাব মায়াবিনী। ‘

তরী মৃন্ময়ের হাতটা চেপে ধরে বলল, ‘ আপনি খুব ভালো। আমি আপনার যোগ্য নই। আমাকে ক্ষমা করে দিন। অনেক ভাগ্য করে আপনার ভালোবাসা পেয়েছিলাম। এই নিষ্ঠুর পৃথিবী আমাদের এক হতে দেয়নি, আমাদের দুজনের পৃথিবী আলাদা করে দিয়েছে। কী এমন ক্ষতি হতো জীবনের শুরুটা আপনার সাথে হলে? কিন্তু হলো না।আমি আপনার ভাগ্যে নেই। আমার ভাগ্যে লেখা ছিল দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা। একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য বিষন্নতায় জর্জরিত হয়েছি বহুবার; অথচ এই পৃথিবীতে আমার জন্য এক সমুদ্র ভালোবাসা নিয়ে কেউ অপেক্ষা করছিল, আমি সেটা জানতেও পারিনি। মৃন্ময় আপনার জন্য আমার কষ্ট হয়, ভীষণ কষ্ট।আমি বেঁচে থাকব কি না জানি না, শার্টটা আপনার। আমি নিজে পছন্দ করেছি।আমার ছেলেকে দেখে রাখবেন প্লিজ। ওর বড়ো পাপ্পা আর নতুন আম্মার পাশাপাশি আপনিও খেয়াল রাখবেন প্লিজ।’

তরী করুণ সুরে কথাগুলো বলে চোখ বন্ধ করল। মৃন্ময় তখন কেমন উন্মাদের মতো আচরণ করছে। হসপিটালের মানুষ মৃন্ময়কে আটকাতে পারছে না। আই সি ইউতে রাখা হলো তরীকে। ততক্ষণে আমরাও খবর শুনে পৌঁছিয়ে গিয়েছি। মৃন্ময় কেমন পা*গ*লের মতো করছে হসপিটালে। বাইরে আমরা সবাই অপেক্ষা করছি। তরী একটা ভালোবাসা নামক প্রাণ আমার কাছে। ওর জন্য এত যু**দ্ধ করা আমার। ওর কিছু হলে আমি কী করব! হসপিটালে ছোঁয়া, তন্ময়, দ্বীপ, দাদু, শ্বশুর- শাশুড়ি। আমি খেয়াল করলাম মুখে মাস্ক লাগিয়ে হসপিটালের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ওশান।

মাস খানিক আগের কথা।
সেদিন ছিল শুক্রবার। অনেকদিন পর ও বাড়িতে ওশানের সাথে দেখা হয়েছিল।ওশান এতদিন জেল খেটেছে। ভীষণ অনুতপ্ত হওয়ায় রোশান স্যার জামিন করিয়ে এনেছেন। ওশান, রোশান স্যার এবং আমার পা জড়িয়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করেছিল। নিজের পা’পের জন্য ক্ষমা চেয়েছে। রোহানের জন্য ছটফট করছে।একটা মানুষ যতই খারাপ হোক না কেন পিতা হিসেবে খারাপ হয় না কখনো। ওশানের রোহানের প্রতি ভালোবাসার কমতি নেই তবে খারাপ জগতে প্রবেশ করে সন্তানের প্রতি যে দায়িত্বশীল হওয়া উচিত সেটা হয়ে উঠতে পারেনি। প্রতিটা মানুষই পরিবর্তনশীল। ওশানও আজ পরিবর্তন হয়েছে। সব সময় টুপি মাথায় থাকে, ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে। মাটির দিকে চোখ থাকে সারাক্ষণ। সারাক্ষণ তওবা পড়ে। সেদিন অনেকদিন পরে রোহানের সাথে দেখা হয়েছিল ওশানের। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছে। সব মানুষই নিজের ভুল বুঝতে পারে। তবে সঠিক সময়ে বোঝে না বলে জীবনে ভোগান্তির শেষ থাকে না। ওশানের অবস্থাও আজ সেইম। ওশান সকলের হাতে পায়ে ধরছে তরীকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে দেওয়ার জন্য। দীর্ঘদিন তরীকে ছাড়া উপলব্ধি করতে পেরেছে তরী তার জীবনের খাঁটি সোনা ছিল। কিন্তু সঠিক সময়ে মূল্য দিতে পারেনি। তরীকে ভোলা ওশানের পক্ষে কোনদিন সম্ভবপর নয়। ওশান তরীর সাথে অবিচার করার পরও তরীর যেমন ওশানের প্রতি ভক্তি আর ভালোবাসা ছিল, যেভাবে ওশানের সেবা-যত্ন করত তা কোনদিন কোনো মেয়ে করবে না। ওশানের প্রতিটি সেকেন্ড তরীর যন্ত্রণায় কাটে। বার বার করে চায়ছে যদি আর একটা বার সুযোগ পেত তরীর সাথে জীবন কাটানোর তাহলে তরীকে জীবনের সবটা দিয়ে ভালোবেসে বুঝিয়ে দিত যে সেও ভালোবাসতে জানে। কিন্তু সব কিছু জীবনে দু’বার পাওয়া যায় না। থাকতে মূল্য দিতে হয়, না হলে আফসোসের শেষ থাকে না। ওশান অনেক ভাবে তরীর সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েছে কিন্তু তরী করেনি। তরীর জীবনের একটা বাজে চ্যাপ্টার ছিল ওশান। তরী ভুলেও আর ওই ক্লোজ চ্যাপ্টার ওপেন করবে না, আমি জানি।

আমি ওশানের কাছে এগিয়ে গেলাম। ওশান সাহস পাচ্ছে না ভেতরে আসার। কেননা এখানে কেউ এলাউ করবে না ওশানকে।আমি ওশানের কাছে গিয়ে বললাম, ‘কেন এসেছ ওশান এখানে?’

ওশান দু’চোখ দিয়ে পানি ছেড়ে বলল, ‘প্লিজ সারাহ কাউকে বলো না। আমি একটা বার ওর মুখটা দেখতে চাই।’

‘তুমি ভুলে গিয়েছ, কীভাবে ওর হাত ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলে?’

‘জীবন থেকে কি ওই বিষাক্ত চ্যাপ্টার কোন ভাবে মোছা যাবে সারাহ? তোমার কাছে তো অনেক কিছুর সমাধান আছে সারাহ, পারবে না আমার জীবনের সমাধান করতে?’

‘ওশান তোমাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম তুমি বোঝোনি। আর যাই হোক এখান থেকে চলে যাও।’

‘সারাহ, আমি ভেতরে ভেতরে যে মানসিক শাস্তি পাচ্ছি তা মৃত্যু যন্ত্রনার থেকেও বেশি।এভাবে বেঁচে থাকা যায় না। আমার তরীকে চাই সারাহ।’

‘জানতাম একদিন তোমার এমন হবে। কিন্তু আজ আর কিছুই করার নেই। তুমি চাইলেও সেটা সম্ভব নয়। কারণ এটা শরীয়ত কর্তৃক সমর্থিত নয়।’

‘ও ভালো আছে তো, ওর কিছু হবে না তো?’

‘যে মেয়ে জীবনে এত যুদ্ধ সামলিয়েছে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ভালো রাখবেন।’

ওশানের ওখান থেকে এসে করিডরে বসলাম। রোশান স্যার রোহানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। সবাই একটাই অপেক্ষায় আছে, “তরী ভালো হবে তো।”

চলবে?…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here