এক মুঠো গোলাপ পর্ব ২৪+২৫

এক মুঠো গোলাপ
sinin tasnim sara
২৪-২৫
২৪
___
রবীন্দ্র সরোবরের পাশে একলা বসে বাদাম চিবুচ্ছে নিদ্র। বন্ধু তাওসিফের জন্য অপেক্ষা করছে মূলত। একমাস হলো ঢাকায় ফিরেছে সে। সুপ্তর সাথে যোগাযোগ টোটালি বন্ধ। খোঁজ খবর যে রাখছে না তা নয়। আভার দ্বারা সব খবরই পায় সে। সুপ্ত নাকি আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করেছে, সে অনুভূতিহীন শক্ত মানুষে পরিণত হয়েছে। পড়ালেখা ব্যতিরেকে বন্ধুদের সাথেও কথা বলে না। নিদ্রর মনে হচ্ছে সুপ্ত অতিরিক্ত প্রেশারে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে। খুব রাগ লাগছে সুপ্তর বাবা-র ওপর, নিজের ওপর। মনে একটা আকাঙ্ক্ষা ছিলো সুপ্ত তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করবে কিন্তু ও যদি নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে তাহলে সম্পর্কটাই তো বোধহয় ভেঙে যাবে!
সব চিন্তাভাবনা গুলিয়ে যাচ্ছে নিদ্রর।
— কখন এসেছিস নিদ?
তাওসিফের ডাকে পেছন ফিরে তাকালো নিদ্র।
— আধঘন্টা।
— আহারে লেইট হয়ে গেলো। নুহার সাথে মিট করতে গিয়েছিলাম বুঝলি!
— সমস্যা নেই। বস।
ফিঁকে হাসি দিয়ে বললো নিদ্র।
তাওসিফ ল্যাপটপের ব্যাগটা সাইডে রেখে জুতো খুলে বসে পড়লো।
— আচ্ছা এখন বল তো, মেইনলি কি হয়েছে সেদিন?
— আমি বাসায় একটা কাজে ব্যস্ত ছিলাম, হুট করে সুপ্তর কল,
সে অনেকটা ভয় মিশ্রিত গলায় জানালো আগামী দিন তার বাবা আমার সাথে মিট করতে চায়৷ আমি ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলাম কারণ এমন দিন আসতই। আমাদের দেখাসাক্ষাৎ ভীষণভাবে বেড়ে গিয়েছিল । অর্পিতার ম্যাটারটা ক্লোজ হয়ে যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে আমি ফিরে যাবো। বলতে পারিস সব আড়ষ্টতা ঝেড়ে ফেলে পুরানো নিদ্র হয়ে গিয়েছিলাম আমি।
যাহোক আমাদের যখন তখন এই দেখাসাক্ষাৎ টা যে কেউ খুব চতুরতার সাথে লক্ষ্য করতো বুঝতে পারিনি। ফলস্বরূপ সুপ্তর বাবা-র কাছে নালিশ গেলো।
ওর বাবা যে আমায় ওর পথ থেকে সরে দাঁড়ানোর আদেশ দেবার জন্য ডেকেছিলেন, আমি বুঝতেই পারিনি।
— পথ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে কেন? তুই দেখতে শুনতে ভালো, তোর ভালো একটা জব আছে- তুই ওনার মেয়েকে ভালোবাসিস তাহলে সম্বন্ধ জুড়ে দিলেই হয়।
— এতটাও সহজ নয় রে। উনি তো রাজি নয় আমাদের সাথে সম্পর্ক জুড়তে।
— কেন। কমতি কিসের?
— ওনাদের একটা সুখী জয়েন অর একক ফ্যামিলি চাই, যেটা আমার নেই।
— হোয়াট! লাইক রিআ্যালি? ব্রোকেন ফ্যামিলি জন্যই সে মেয়ে দিতে রাজি নয়?
— ইয়েস। সেদিন আমাদের বেশ তর্ক বিতর্ক হয়। ওনাকে আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি, আমি পায়ে অবধি ধরতে রাজি ছিলাম। পরবর্তী তে উনি আমায় মায়ের সম্পর্কে অনেক আজেবাজে কথা বলেন। আমি আ্যাকচুয়ালি স্টাক হয়ে গিয়েছিলাম এসব শুনে । আমি বিলিভই করতে পারছিলাম না ওনার মত একজন শিক্ষিত মানুষের মুখে এসব শুনতে হবে!
— ফ্যামিলির কাউকে নিয়ে যেতে হতো তোকে। সমঝোতার চেষ্টা করতে হতো।
— সমঝোতায় রাজিই ছিলেন না উনি। সেদিন না আমি ওনাকে চিনতেই পারছিলাম না। এর পূর্বেও তাদের বাসায় আমার যাতায়াত ছিলো, আমার ফ্যামিলিকে খুব ভালো করেই চেনেন উনি।
যখনই শুনলেন আমি মায়ের সাথে থাকি এবং বিয়ের পর আমার ওয়াইফ এবং মায়ের সাথে এক বাসাতেই থাকবো তখন দ্বিমত করলেন।
আমাকে বরং ঘর জামাতা হবার প্রস্তাব দিলেন।
— তোর যে আঙ্কেলের সাথে যোগাযোগ বিশেষ ভালো না এটাও ওনাকে বলেছিস?
— হ্যাঁ। সবটা শুনেই সে অসন্তুষ্ট।
— বাট ব্রো তোর মায়ের সাথে কি সমস্যা?
— আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। আমার মা কে তাদের চেনার কথা নয়। আর আমি বোনলেস পুরুষ নই, ওয়াইফের জন্য মা কে ছেড়ে দিবো।
এই মা আমায় নিয়ে কতই না সংগ্রাম করেছে!
আমার সবকিছু খুব ঘোলাটে আর বিরক্তিকর লাগছে।
— আচ্ছা পাস্টে কোনো লিংক আছে কি?
— আমি তা-ই ভাবছি। একইসাথে আমার মনে হচ্ছে পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে গেলে ভয়ানক কিছু বেরিয়ে যাবে।
আমি মূলত সেই অতীতের ভাঙনের গল্পগুলোকে ভয় পাচ্ছি রে।
উদাস কণ্ঠে বললো নিদ্র।
সব শুনে ভ্রু যুগল কুঞ্চিত হয়ে এসেছে তাওসিফের। সে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন; যেন অতীত আর বর্তমানের কোনো সংযোগ মেলানোর চেষ্টা করছে।
___
কোচিং থেকে এসে চারটে খেয়ে পড়ার টেবিলে বসেছে সুপ্ত। বিরতিহীন পড়ছে সে। ইদানীং ওর প্রতি বিশেষ নজর নিশাতের,অবশ্যই তা স্বামীর নির্দেশে। মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়া হয়েছে ওর থেকে, জানিয়ে দেয়া হয়েছে নিদ্রর সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। তারা কোনো ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলের সাথে সুপ্তকে বিয়ে দিবে না।
সুপ্ত অবশ্য প্রতিবাদ করেছিল, ভিত্তিহীন যুক্তি সে মানবে না। হয়তোবা উচ্চস্বরে কথাও বলে ফেলেছিল বাপির সাথে। এর পূর্বে কখনোই সে বাপি-মায়ের সাথে বেয়াদবী করেনি। প্রথমবার এমন চূড়ান্ত বেয়াদবী করাটা বাপি মেনে নিতে পারেননি। শাস্তিস্বরূপ চপেটাঘাত পড়েছিল তার কোমল বদনে।
লজ্জায় সে চোখ তুলে তাকাতে পারেনি। বাপির কঠোরতা তাকে বারংবার বিস্মিত করছিল।
সেদিন থেকে আজ অবধি বাপির সাথে কোনোপ্রকার কথাবার্তা নেই সুপ্তর। অভিমানে মৌন হয়ে গিয়েছে সে।
মনটা ভয়ানক ভাবে ভেঙে গিয়েছে । মা মাঝেমধ্যে ভাঙা মনে প্রলেপ লাগাতে কিছু মিথ্যে প্রলোভন নিয়ে আসেন যেমন, পাবলিকে চান্স পেলে বাবার সাথে কথা বলবেন সে যেন নিদ্রর ব্যাপারে চিন্তা করেন।
সুপ্তর হাসি পায়। সে কি চার বছরের শিশু? মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে কার্যসিদ্ধি করতে পারবে।
পড়ার ফাঁকে এসব চিন্তা করে সুপ্ত।
এমন সময় দরজার নক পড়ে। বই থেকে মুখ তুলে দেখে নাশতার ট্রে হাতে মা দাঁড়িয়ে। স্বাভাবিক ভাবেই তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে।
নিশাত মেয়ের স্বাভাবিক দৃষ্টিতেও তীব্র অভিমান খুঁজে পান।
দীর্ঘশ্বাস গোপন করে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে ঘরের ভেতরে আসেন। টেবিলের এক কোণে খাবারের ট্রে টা রেখে সুপ্তকে জিজ্ঞেস করেন_

— এখনো পড়া শেষ হয়নি?
— নাহ্ আরেকটু বাকি।
— অনেক পড়েছিস। এখন বরং নাশতা টা খেয়ে নে।
— আচ্ছা ঠিকাছে।
যান্ত্রিকভাবে জবাব দিয়ে বই বন্ধ করে সেমাইয়ের বাটি টেনে নেয় সুপ্ত। ওর এমন আচরণ দেখেও বেশ কষ্ট পান নিশাত, তবে তা প্রকাশ করেন না। মৃদু হেসে সুপ্তর মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যান।
সন্তান দু চার দিন অভিমান করে থাক তবুও নিজের কাছে থাক, যেচেপড়ে যমের দুয়ারে ফেলে আসার দরকার নেই। অভিমান একদিন ঠিকই কমে যাবে কিন্তু সন্তান হারালে তাকে আর ফেরত পাওয়া সম্ভব না।
,
মা বেরিয়ে যাবার পর মাথা নিচু করে কেঁদে ফেলে সুপ্ত। কান্নার তোড়ে তার হেঁচকি উঠে যায়। করতলে মুখ লুকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে,
“আমি তোমাদের দু’জনার মধ্যে থেকে একজন কে বেছে নিতে পারবো না বাপি-নিদ্র। তোমরা দু’জনই আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। এক জনকে ছাড়া মানে নিজ সত্বার মৃত্যু ঘটানো।
সত্বার মৃত্যু ঘটানোর চাইতে সম্পূর্ণ মরে যাওয়াটাই কি সহজ নয়?”
এক মুঠো গোলাপ
২৫
_____
বিরহেই কেটে গেলো আরো কয়েক মাস। সুপ্ত চোখের আড়াল হলেও তাকে মনের আড়াল করতে পারেনি নিদ্র। ইদানিং ওকে এক পলক দেখবার; ওর কন্ঠস্বর শোনবার তৃষ্ণা জাগে। কিছুদিন পূর্বেও সুপ্তর সব খোঁজ পেয়ে যেত আভার মাধ্যমে৷ এখন তো উপায় নেই। সুপ্ত অন্য শহরে, আভা অন্য শহরে। নিদ্র সঠিক জানেনা তবে ওর ধারণা সুপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর হলে উঠে গিয়েছে। রাফনিদের বাসার ঠিকানা নিদ্র জানতো না বলে খোঁজ নিতে পারেনি এতটাদিন। হঠাৎ এক সপ্তাহ আগে শিউলির আপলোড করা কিছু ছবি সামনে আসলো। সম্ভবত শিউলি তার হাজবেন্ডসহ ঢাকায় এসেছিলো। রাফনিদদের বাসাতেই উঠেছিল তারা। দু’টো দিন বেশ ঘোরাফেরাও করেছে। সেসব স্মৃতিই শেয়ার করেছিল প্রোফাইলে। কই একটা ছবিতেও তো সুপ্তকে দেখতে পায়নি।
বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো নিদ্রর।
ভীষণ অবাক হয়ে যায় এই ভেবে, সুপ্ত আসলেই তার সাথে কোনো যোগাযোগ করলো না।
তাহলে তাদের সম্পর্কটা আসলেই মোহ ছিলো?
— নিদ্র, বাবা খাবি না?
মায়ের ডাকে চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে নিদ্র। জুতোর লেস বাঁধতে বাঁধতে না বোধক উত্তর দেয়।
অনিমা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন নিদ্রর জীবনাচরণের আকস্মিক পরিবর্তনে। কয়েকবার জানবার চেষ্টা করেছেন কারণটা, কিন্তু বিশেষ কিছু বলেনি নিদ্র।
অফিসের জন্য বেরিয়ে যেতে যেতে মা’কে উদ্দেশ্য করে নিদ্র বলে_
— ফিরতে লেইট হবে। জেগে থেকোনা মা।
অনিমাকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
মায়ের সাথে ওসব ব্যাপারে কথা বলেনি নিদ্র। বিষয়টা তার কাছে ঘেঁটে যাওয়া জঘন্য কিছু মনে হয়েছে। নতুন কোনো সত্যির মুখোমুখি হতে সে ভয় পাচ্ছে, এমনিতেই তো কম সত্যি হজম করতে হয়নি।
পাছে মায়ের ওপর থেকে শ্রদ্ধাবোধটাই না উঠে যায়!
একই সাথে ভালোবাসা এবং ঘৃণার অনুভূতিকে মনে ঠাঁই দিতে নেই। সর্বদা নেগেটিভ জিনিস আকর্ষিত করে বেশি। “মা” সম্মানের একজন মানুষ। জন্মদাত্রী, সে ভালো হোক খারাপ হোক অসম্মান করা যাবে না।
অনেক কষ্ট সহ্য করে জন্ম দিয়েছে যে,
ধরণীতে ভূমিষ্ট হবার পর পরই ঋণী হয়ে গিয়েছে তার কাছে। এ ঋণ শরীরের চামড়া খুলে জুতো বানালেও শোধ করা সম্ভব নয়।
জীবনে কম সংগ্রাম করতে হয়না একজন সিঙ্গেল মাদার কে। ধাপে ধাপে সকল কষ্ট,যন্ত্রণা নিজ চোখে দেখেছে নিদ্র। তাকে কত যত্নেই না বুকে আগলে রেখেছে মা। এখন সময় মায়ের দায়িত্ব নেবার। একমাত্র শেষ বয়সে তার ভরসা হতে পেরেই এই ঋণ কিছুটা শোধ সম্ভব।
নিজের সমস্যা নিজেই সমাধান করবে ভেবেছে নিদ্র৷ মা কে এসব জানতে দিবে না।
___
রাজধানীতে একসঙ্গে অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। শহরের বিশাল অংশ জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তাঘাট খুঁড়ে ফেলা হয়েছে। অনেক সড়কই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সড়ক বন্ধ হওয়ায় জনগনকে বেশ ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। অতিরিক্ত জ্যামের কারণে সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছুতে পারছে না অনেকেই। যদিওবা ট্রাফিক জ্যাম ঢাকা শহরের বাসিন্দাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। কিন্তু ইদানিং কালে এর পরিমাণটা খানিক বেড়ে গিয়েছে। প্রতিদিনের মত আজও এই ভয়ানক জ্যামে আটকা পড়তে হলো নিদ্রকে।
খুব জরুরি কাজে নীলক্ষেতে যেতে হতো তাকে, কিন্তু মতিঝিলের কাছে এসেই চিরচেনা জ্যাম।
যতদূর দৃষ্টি যায় ততদূরেই তো গাড়ি আর গাড়ি। কে জানে আজ জ্যাম খুলবে কি না!
বিরক্ততে বাইকে একটা পাঞ্চ মেরে দিলো নিদ্র। হেলমেট খুলে ফোস করে চেপে রাখা নিঃশ্বাস ছেড়ে অসন্তোষ দৃষ্টিতে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে যেতে শুরু করলো সে। বিরস বদনে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে অদূরে দাঁড়ানো হুড তোলা এক রিকশায় চোখ আটকে যায় নিদ্রর।
ভ্রু কুঁচকে চোখ সরু করে এক নিবেশে তাকিয়ে থাকে ওদিকটায়। সম্ভবত কোনো তরুণী বসে রয়েছে, হুডের আড়ালে ঢাকা পড়েছে তার মুখ। কেবল এক হাতের কনুই আর এক পা দৃশ্যমান। ফর্সা হাতে থাকা গোল্ডেন ব্রেসলেটটা খুব পরিচিত মনে হয় নিদ্রর কাছে। মনটা অস্থির হয়ে ওঠে এক নিমেষে। মাথা কাত করে দেখার চেষ্টা করে রিকশায় বসে থাকা তরুণীর মুখ, কিন্তু পারেনা। তরুণী যেন পণ করেছে মুখ বের করবে না বাইরে। অন্যান্য গাড়ি ডিঙিয়ে যে যাবে তারও উপায় নেই। এখন একটামাত্র উপায় জ্যাম খুললে রিকশার পিছু নিতে হবে। সব কাজ ফেলে তরুণীর চিন্তায় মশগুল হয়ে যায় নিদ্র। এক মনে প্রার্থনা করে জ্যামটা খুলে যাক। প্রভু এতটাও নির্দয় নন। তিনি অতি দ্রুতই নিদ্রর ডাক শোনেন। জ্যাম খুলতে শুরু করে।
নিদ্র বাইক স্টার্ট দিয়ে রিকশাটার দিকেই নজর রাখে। রাস্তা ক্লিয়ার হলে মন্থর গতিতে এগোতে থাকে রিকশার পিছু পিছু।
কতটা সময় পর রিকশা দাঁড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। দূরে দাঁড়িয়ে আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করে নিদ্র, তরুণীর মুখখানা দেখবার জন্য।
ফাইনালি সে নামে রিকশা থেকে। দৃশ্যমান হয় অনাকাঙ্ক্ষিত এক মুখমণ্ডল। চমকে ওঠে নিদ্র, তার সন্দেহ তাহলে ঠিক! এ যে তারই প্রেয়সী।
দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর সশরীরে প্রেয়সীকে সামনে পেয়ে অজানা শিহরণে শিরা উপশিরা আন্দোলিত হয়ে ওঠে নিদ্রর।
অজান্তেই চোখের কোল ভিজে উঠতে শুরু করে। প্রতিনিয়তই ভাবে তার কথা, আজ ক্ষণ কিছুক পূর্বেও তো চোখভরে দেখবার সাধ জেগেছিল। স্বপ্নেও কল্পনা করেনি এত জলদি দেখা পেয়ে যাবে। ভীষণ অদ্ভুত লাগছে নিদ্রর ।
বাইক স্ট্যান্ডে রেখে এগিয়ে যেতে নেয় দেখা করবে বলে, ঐ মুহুর্তে সশব্দে সেলফোনটা বেজে ওঠে পকেটে৷
দৃষ্টি সরে যায় সুপ্তর থেকে। দাঁড়িয়ে পড়ে ফোনটা বের করে সে। রিসিভ করতে গিয়ে এপাশে সুপ্তকে হারিয়ে ফেলে।
বুঝতে পেরে ক্রোধে ফেটে পড়ে একদম। রিসিভ না করে হাতে থাকা ফোনটা গায়ের জোরে আছড়ে ফেলে মাটিতে। এখন কোথায় পাবে সুপ্তর খোঁজ?
কিছুই মাথায় আসেনা। রাগে চুল খামচে ধরে পায়চারি করতে থাকে অনবরত। আশেপাশের মানুষ তার অদ্ভুত আচরণে ভড়কে যায়। সম্ভবত পাগল মনে করে তাকে। যাকগে যা মনে করে করুক। তাদের কথায় কি এসে যায়!
তার শুধু সুপ্তর খোঁজ চাই, আর কোনো দিকে তাকানোর সুযোগ নেই।
_____
ক্লাস শেষে তাড়াহুড়ো করে হলে ফিরছে সুপ্ত। আজ আপুর বাসায় যেতে হবে একটু। ও নাকি ভীষণ অসুস্থ, সন্ধ্যায় ডাক্তারের কাছে আ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। তৌহিদ বাসায় নেই, সুপ্তকেই যেতে হবে রাফনিদের সাথে। কদম তলা পেরিয়ে পুরানো হলের দিকটায় আসামাত্র থমকে দাঁড়ালো সুপ্ত। কিছুটা সামনে কেউ পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। নত মস্তকেই বুঝতে পারছে মানুষটা কে। তার শরীর থেকে চিরচেনা পারফিউমের সুবাস এসে ধাক্কা দিচ্ছে নাকে। অকস্মাৎ দর্শন হয়তোবা কল্পনা করেনি সুপ্ত।
এতটা মাস বিচ্ছেদের কারণে আড়ষ্টভাব এসে গিয়েছে তার মধ্যে। মাথা তুলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না একদম। নিদ্র প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রেয়সীর পানে।
অপেক্ষা করছে কখন সে মুখ তুলে চাইবে, কখন তাদের দৃষ্টিজোড়া মিলিত হবে পূর্বের ন্যায়। কিন্তু অপেক্ষার অবসান যেন ঘটবার নয়।
সুপ্তর আড়ষ্টতা সম্ভবত বুঝতে পারলো নিদ্র। প্যান্টের পকেটে হাত রেখেই ধীরপায়ে এগিয়ে এলো তার দিকে। মায়াভরা কণ্ঠে শুধালো_
— সুপ্ত। ভালো আছো?
এতটা দিন পর প্রিয় মানুষটার কন্ঠে নিজের নাম শুনে সারা শরীর কেঁপে উঠলো সুপ্তর। গলা শুকিয়ে আসতে লাগল। দু তিনবার ঢোক গিলে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে কান্না সংবরণ করার চেষ্টা করলো। কিন্তু এ সাক্ষাৎ যে বহু আকাঙ্ক্ষিত। আবেগি না করে যায় কোথায়! শ্রাবণের বারিধারার মত অশ্রুকণিকা গুলো আঁখি সীমানা পেরিয়ে উপচে পড়তে শুরু করলো কপল বেয়ে।
আনন্দ-বেদনা মিশ্রিত অশ্রুধারা চিবুক ছাড়িয়ে আলগোছে নেমে মিশে যেতে থাকলো গলায় জড়িয়ে থাকা ওড়নায়।
নিদ্র চুপচাপ শীতল দৃষ্টি মেলে তা দেখলো । নিস্তব্ধতায় কেটে গেলো আরো কিছুটা সময়। ভেতরে ভেতরে অস্থির নিদ্রর একটা ভয়ানক কাজ করতে ইচ্ছে হচ্ছে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সে নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করলো, তারপর কি ভেবে আত্মসংবরণের চিন্তা বাদ দিয়ে তড়িৎ গতিতে নিকটে এসে পৌঁছুলো সুপ্তর।
কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই ওর কোমর জড়িয়ে নিলো নিজের পেশিবহুল দু হাতে।
নিদ্রর এহেন আচরণে সুপ্তর ভ্রু যুগলে কুঞ্চন আসে। ও চোখ ছোটো ছোটো করে মাথা তুলে তাকায় নিদ্রর পানে। এক সেকেন্ডের মাথায় নিদ্রর পুরু ওষ্ঠাধর দ্বারা বেদখল হয়ে যায় তার পেলব অধর।
খুব দ্রুত ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ায় বেকায়দায় নিদ্রর বন্ধনে আটকা পড়ে যায় সুপ্ত। ছাড়া পাবার ব্যর্থ চেষ্টা না করে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে থাকে ওর বুকে হেলান দিয়ে।
কয়েক মুহুর্ত বাদে কোমর ছেড়ে ওর গ্রীবাদেশ জড়িয়ে ধরে নিদ্র। কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে আর্দ্র কণ্ঠে অনুযোগের স্বরে বলে_
— আমার কথা একবারও মনে পড়েনি তোমার?
সুপ্ত তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর করেনা।
নিদ্র পুনরায় বলে_
— তুমি তো এরকম ছিলে না। আমার সাথে এক মুহুর্ত কথা না হলে পাগল হয়ে যেতে। আজ এতটা মাস হয়ে গিয়েছে তোমার কোনো খোঁজ নেই। একবার জানতেও ইচ্ছে হয়নি, সেদিন কিছু না বলে কেন ফিরে এসেছিলাম?
সুপ্ত বুঝতে পারলো না কি উত্তর দিবে। ওর উত্তরের অপেক্ষা অবশ্য নিদ্র করলো না। এক নাগাড়ে বলতে থাকলো_
— তুমি এত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছো সুপ্ত!
“পরিবর্তন” শব্দটা কর্ণকুহরে ভয়ানক ভাবে প্রতিধ্বনিত হলো সুপ্তর। পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে চাইলো, সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে প্রতুত্তরে ফিসফিসিয়েই বললো_
— অহর্নিশ ভাঙা-গড়া রূপ-প্রতিরূপের খেলায় নিমগ্ন আমি ভুলেই গিয়েছি জীবন কি! পরিবর্তন তাতে খুব অস্বাভাবিক?
সুপ্তর উত্তরে খানিক বিস্মিত হলো নিদ্র। বিস্ময়ভাব বজায় রেখেই বললো_
— তুমি আজ বড্ড অপরিচিত আমার কাছে।
— এই সুপ্তই যে আসল সুপ্ত। ছ মাস আগে যাকে পেয়েছিলে সে ছিলো বাস্তবতা বিবর্জিত আবেগি এক মানুষ। নিজের স্থান ভুলে যে সুখস্বপ্ন নামক চন্দ্রের পানে হাত বাড়াতে গিয়েছিল। আমার চরিত্র যে প্রবাদ বাক্যের সেই বামনের জায়গায়, তা সম্পর্কে আমি জ্ঞাত ছিলাম না।
সুপ্তর কথার অর্থ বুঝতে বেশ বেগ পেতে হলো নিদ্রর। ওর মুখমন্ডলের অমসৃণতা দেখে মৃদু হাসলো সুপ্ত, যাকে অন্য ভাষায় তাচ্ছিল্যের হাসি বলা চলে।
নিদ্রর চোখে চোখ মিলিয়ে বললো_
— সুখস্বপ্ন আমার জীবনে চন্দ্রের মত। দূরে থাকবে, আকর্ষণীয় লাগবে। এক পলক দেখে, প্রাপ্তির কল্পনা করেই তুষ্ট থাকতে হবে। হাত বাড়ালে চলবে না। দুর্লভ জিনিসে কখনোই হাত বাড়াতে নেই।
— কে বলেছে সুখ দুর্লভ! চাইলেই তা প্রাপ্তি সম্ভব।
— এতই সহজ!
অবশ্য দুর্লভ নাকি সুলভ তোমাদের বোঝার কথা নয়। তোমাদের জীবন চলার পথ তো আমাদের মত কণ্টকাকীর্ণ নয়।
— তোমাদের মত মানে!
— মানে?
নিদ্রর দিকে তাকিয়ে পুনরায় একটা ফিঁকে হাসি হাসলো সুপ্ত। পূর্বের মত কিছুই বুঝতে পারলো না নিদ্র, এক পৃথিবী প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে রইলো সুপ্তর মুখ পানে।

চলবে,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here