এখানে কোন বৃষ্টি নেই পর্ব ১২

এখানে কোনো বৃষ্টি নেই
পর্ব ১২
লেখিকা: তৃধা আনিকা
হাসপাতালে গিয়ে অামি খুব অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হলাম। অভির বন্ধুরা সব ঘেরাও করে ফেললো অামায়। অবস্থা জটিল হয়ে পড়লো। এদের থামানোর জন্য কেউ ছিলো না, অান্টি চূড়ান্ত বিপক্ষে অামার । অভির এই অবস্থার জন্য অামি এবং একমাত্র অামিই যে দায়ী, তা নিয়ে কেউ কেউ তো এতো রিঅ্যাক্ট করলো যে কল্পনার বাইরে। অভিকে দেখার কোনো সুযোগ অামার হলোনা, উল্টো পুলিশ ডেকে এরা অভিযোগ দিয়ে দিল। পুলিশ এলো, অামায় জেরা করলো,
এদিকে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে, অভির শরীরে, রক্তে উচ্চমাত্রার নেশাজাতীয় দ্রব্যের উপস্থিতি পাওয়া গেলো। অান্টি কাঁদতে কাঁদতে পুলিশকে বললেন, অভি গতরাতে অামার সাথেই ছিলো, অবস্থা অারো পেঁচিয়ে গেলো। একসময় পুরো ব্যাপার দাঁড়িয়ে গেলো এমন, অামি অভিকে ইনজেক্ট করে ড্রাগ দিয়েছি।
পুলিশ এত ঝামেলা শুরু করলো যে,
অামি নিরুপায় হয়ে বাবাকে ফোন করলাম। বাবা কয়েকজনের সাহায্যে অামাকে সেখান থেকে বের করে অানেন। তাও অামি একধরনের হাউজ এরেস্ট হয়ে গেলাম। অভির জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত অামার বেরোনো নিষেধ।
অামার ডিপার্টমেন্টের কিছু ভাইয়া দৌড়াদৌড়ি করে অামার অন্তত বাকি এক্সামগুলো দেওয়ার অনুমতিটা নিলেন,
অভির জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা।
অভির কোনো খবর জানার সুযোগ অামার ছিলোনা। অামি সেই সময়টায় কি শোকাহত ছিলাম?? নাকি পাথর??? এর কিছুই অামার বুঝতে পারার ক্ষমতা ছিলোনা।
শুধু চাইছিলাম পুলিশ মুক্তি দিক অামায়।
অামার
ভালোবাসা তখন ব্যক্তিগত থেকে সবার হয়ে গেছে।
এইরকম একজন, সদ্য বিসিএস ক্যাডার, অাবার ডিএমসির ছাত্রীর প্রেমের রমরমা এমন ঘটনা, কিছু ডেইলিজ সেটা সাঁজিয়ে গুছিয়ে ছোট্ট করে ছেপেও দিলো।অামাকে বর্ণনা করা হলো, সন্ত্রাসী প্রেমিকা হিসেবে।
অামার ফ্যামিলিকে এতে যে কি পরিমাণ ফেইস লসে পড়তে হলো, তাঁ বর্ণনার ভাষা অামার নেই।
অামার মা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন অামি যাতে অার কোনোদিন বাসায় না যাই। ওই বাসার দরজা অামার জন্য চিরতরে বন্ধ।
অভি সেন্সে অাসার পর, সে পুলিশের সাথে কথা বললো, অামার অপবাদ ঘুচলো, অভিযোগ মাফ হলো, কিন্তু কলঙ্ক ঘুচলোনা। সবার কাছে, ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলি সার্কেলে অামি পরিচিত হয়ে গেলাম বাজে মেয়ে হিসেবে।
এই এত কিছুর মাঝে অভির সাথে অামার কোনো যোগাযোগ হলোনা। কারণ
অামার উদাসীনতা, অামি চাইলে ও’র ট্রেনিংয়ের ওখানে যেতে পারতাম। ক্লিয়ার করতে পারতাম, অনেক কিছু। দরকার ও ছিলো, কিন্তু অামি তাঁর একটুও চেষ্টা করলাম না।
পরীক্ষা কোনো মতে শেষ করলাম। অনেক সাহস করে বাসায় গেলামও, অামাকে ঢুকতে দেওয়া হলোনা।
মা দারোয়ানকে বলে রেখেছেন, অামি এলে যাতে ঢুকতে দেওয়া না হয়।
মায়ের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম , লাভ হলোনা।
বাবা শুধু সাহায্য করতে লাগলেন, তাও লুকিয়ে। সেটা বেশিরভাগই অার্থিক সাহায্য, মানসিক নয়। হয়তো অঢেল টাকা খরচ করার অার জায়গা ছিলোনা বলে।
এই এত স্ট্রেসের মধ্যে ও অামি বেঁচে ছিলাম, অার বেশ ভালোভাবেই বেঁচে ছিলাম।
এত জীবনীশক্তি নিয়ে কেনো বেঁচে ছিলাম কে জানে???
অভির তখন দ্বিতীয় পর্বের প্রশিক্ষণে চলছে।
বাবা ঢাকায়ই অামায় একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
ইন্টার্নশিপের সময়টা অামি সেখানেই থাকবো ঠিক করলাম। মা ব্যাপারটা জেনে গেলেন, বাবা অামার সাথে কানেক্টেড অাছেন, তিনি অারও ক্ষেপে গেলেন , লোকজন দিয়ে হুমকি ধামকি দেওয়াতে শুরু করলেন ।
পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপ হতে লাগলো।
বাবা কথা বলা বন্ধ করে দিলেন, শুধু টাকা পাঠাতেন।
এর মাঝে অারো একটা খারাপ ব্যাপার ঘটলো।
অভির সাথে অামার কথা বলার সুযোগ হলো। ঠিক পারসোনাল কথা না, অানুষ্ঠানিক বিচার বৈঠক।
অঞ্জন ভাই সব ব্যবস্থা করলেন।
অভির বাবা-মা, অামার মা-বাবা (মা অাসেননি অামার) , অভির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু, অামার দুজন টিচার, অামার ডিপার্টমেন্টের দুজন সিনিয়র ডাক্তার অাপু, অভির ডাক্তার (যিনি অভির অসুস্থতার সময় দেখেছেন) সবাইকে একত্রিত করা হলো।
অভির প্রতি অামার মিষ্টি ভালোবাসা, হয়ে গেলো বিচারের অনুষ্ঠান!
অাসলেই
জীবন কখন যে কোথা থেকে কোথায় চলে যায়, সেই হিসেব তখন মেলানো সত্যিই অসম্ভব ছিলো।
অানুষ্ঠানিক
সেই বৈঠকে, ডক্টর প্রথমেই অভির শারীরিক অবস্থা ব্রিফ করেন, পরবর্তীতে অভি অার অামার কথা শুরু হয়,
একজন উকিল সেই কথাগুলো নোট করছিলেন,
———ভালো অাছো পরী??
অামি তখনি অভির দিকে তাঁকালাম, রোগা অার খটখটে চেহারা, মাথার চুল ছোট করে ছাটা, চোখ দেবে যাওয়া, চোখের নিচে কালসিটে পড়া….
এ কোন অভি??অামি মনে মনে বললাম, অনেক শুকিয়ে গেছেন অাপনি!
অভি অাবার প্রশ্নটা করলো,
———পরী, ভালো অাছো??
———জি।
———-সেদিন রাতে অামি কি তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিলাম??
———না।
———–কি কথা হয়েছিলো অামাদের মাঝে???
————এমনি সাধারণ কথা।
———অামি নেশাগ্রস্ত ছিলাম,,তুমি কি সেটা বুঝতে পেরেছিলে??
———হুঁ!
———-অামি কিছুই মনে করতে পারছিনা পরী।অাবছা অাবছা কিছু মনে পড়ছে, অাবার মনে পড়ছে না, মা বলছিলো, তুমি সেদিন রাতে এসেছিলে, অামায় নিয়ে, আমার ঘরে??? অামরা কি কোনো শারীরিক সম্পর্কের মাঝে গিয়েছিলাম??
অামি প্রশ্নটা শুনে কিন্তু একটুও অবাক হইনি, জীবন অামার পুরোটাই ঘেটে-ঘুটে একাকার
হয়ে গিয়েছিল ততদিনে।নোংরামো, অপবাদ, খারাপ কথা, অপমান সবকিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
অভি অাবারও বললো,
———সেই রাতে, এমনকি সেই দিনের কোনো ব্যাপারই অামি ঠিকঠাক মনে করতে পারছিনা পরী, প্লিজ হেল্প মি! প্লিজ ….
অামার সেন্স ফেরার পর, প্রথম এক সেকেন্ডের জন্য অামার মনে হয়েছে, অামরা একান্তে কিছু সময় কাটিয়েছি, কিন্তু এরপর মনে হচ্ছে এটা কি স্বপ্ন ছিলো??
তুমি তো জানো কি ঘটেছিলো??
প্রথমে অামি বাবার দিকে তাঁকালাম, বাবা অসহায় চোখে অামার দিকে তাঁকিয়ে অাছেন। অামি জানি, এই একটা প্রশ্নের উত্তরের উপর সব নির্ভর করছে,
অামি কঠিন গলায় বললাম,
———সেদিন রাতে অাপনি একটু অসুস্থ বোধ করায় অামি অাপনাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাই। অামরা একান্তে কোনো সময় কাটাইনি। অামাদের মাঝে এরকম কিচ্ছু ছিলোনা। ব্যস……
———কি কথা হয়েছিল অামাদের মাঝে??ইন ডিটেলে বলো।
———-ডিটেলে বলার মত কিছু নয়। অামাদের মাঝে বিশেষ কথা বলতেই এটুকুই হয়েছিলো , অাপনি অামায় বিয়ে করতে চেয়েছেন, অামি না করে দিই। এর কারণ হলো, অামি সন্তান ধারণের ক্ষমতা রাখিনা। এই অাপু, (অাপুকে দেখিয়ে) অামার সব জানেন। ফার্স্ট ইয়ারে উঠে অামার জরায়ুর অপারেশন হয়। তিনি অপারেশনের ব্যাপারটা জানেন,….. তিনিই প্রথম এই ব্যাপারে অামাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।
———-এই একটিমাত্র কারণই কি তোমার কাছে সব???অামাদের সব অনুভূতি কি কিছুই না???
———–অনুভূতি অার বিবাহিত জীবন সম্পূর্ণ অালাদা।
এতটুকু বলার পর,
অভি নিজের চেয়ার ছেড়ে, অামার সামনে এসে হাটুগেড়ে বসে পড়লো, সবার সামনেই।
বাচ্চাদের মত করে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
———-তুমি অামাকে ঠকাচ্ছ পরী, কিছু হয়ে গিয়েছিল অামাদের মাঝে… সেখানে অন্য কিছুর মানে নেই। অন্য কোনো কারণ অালাদা করতে পারেনা অামাদের।
অামি কিচ্ছু মনে করতে পারছি না পরী, কিচ্ছু না। কিন্তু অামি এই বিষয়ে কনফার্ম যে, তুমি মিথ্যে বলছো, তুমি মিথ্যে বলছো…….ইউ অার লায়িং মি…..
অান্টি অভিকে তুলে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসালেন।
অভি অার কোনো কথা বললোনা,
অান্টি বললেন,
———-দিস ইজ দ্য লাস্ট টাইম…….
দেখো পরী, অামার ছেলে মৃত্যু মুখ থেকে ফিরে এসেছে, অামরা চাইনা এই ঘটনার রিপিট হোক। তাঁর ধারণা তুমি তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসো, কিন্তু তোমার বন্ধ্যাত্বের জন্য , সরি এভাবে বলতে হচ্ছে, অামাদের ভয়ে বিয়ে করার সাহস পাচ্ছো না।
তাই এখন সবার সামনেই তুমি উত্তরটা বলো,
তুমি কি অভিকে ভালোবাসো?? বিয়ে করতে রাজি???
অামি মনে মনে হাসলাম, অার বিয়ে? পরিস্থিতি কোথা থেকে কোথায় চলে গিয়ে কখন যে অভি অার অামার হাতের বাইরে চলে গেছে……..
এখন অার বিয়ের কথা , হতেই পারেনা।।
অামার হয়ে বাবা বললেন,
———পরী তো নিজের সমস্যা বললোই, এখন অাপনারাই ডিসিশান নিন। অামি বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,
———-না অামি অভিকে বিয়ে করতে চাই না। অভির জীবন অন্য রকম হোক। অামি উনাকে ভালোবাসি না।
কারন অামি জানতাম, অভির জন্য, অভির পরিবারের সুখের জন্য, অামার না” উত্তরটা কতটা দরকারি ছিলো সেই মুহূর্তে !!
অভির সাথে সেই অামার শেষ কথা। অামি অাজও জানি না, অভির অামাকে অার কিছু বলার ছিলো কিনা??
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here