কৃষ্ণগোলাপ পর্ব -১৫

#কৃষ্ণগোলাপ
লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

১৫.
‘এত লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, ঐচ্ছি। বি কম্পফোরটেবল।’

কথাটুকু বলে চামচ দিয়ে একটু চাউমিন মুখে দিল রাফসান। ঐচ্ছি এখনো নিচের দিকে তাকিয়ে চামচ দিয়ে চাউমিনের বাটিটা নেড়ে যাচ্ছে। তার পাশে বসেই গোগ্রাসে গিলে যাচ্ছে সায়মা। ঐচ্ছি আড়চোখে একবার সায়মার দিকে তাকায়। ঐচ্ছির তো ইচ্ছে করছে এই সামুটাকেই চাউমিনের সাথে মিশিয়ে গিলে ফেলতে। কুত্তা হারামী একটা। নাক ফুলিয়ে বসে থাকে ঐচ্ছি। রাফসান খাওয়া শেষ করে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললো,

‘আপনি তো কিছুই খেলেন না ঐচ্ছি? অন্যকিছু অর্ডার দিব?’

ঐচ্ছি সংকোচ নিয়ে ডানে বামে মাথা নাড়াল। সায়মা তখন গদগদ গলায় বলে উঠল,

‘ভাইয়া ঐচ্ছির তো বার্গার পছন্দ। আপনি বরং..’

কথাটা আর শেষ করতে পারল না তার আগেই ঐচ্ছির চোখ মুখের রিয়েকশন দেখে থমকে গেল সে। দাঁত কেলিয়ে বোকা বোকা হাসল সায়মা। অতঃপর মৃদু স্বরে বললো,

‘না মানে, বার্গার বোধ হয় ঐচ্ছির পছন্দ না।’

কথাটা শেষ করেই অন্য দিকে মুখ করে তাকাল সায়মা। ঐচ্ছি যে তার উপর ভয়ানক রেগে আছে তা সে বেশ বুঝতে পারছে। কিন্তু তারই বা কি দোষ সে কি ইচ্ছে করে ঐচ্ছির সামনে এসেছে? সবটাই তো একটা কোয়েন্সিডেন্স। এই কথাটা এখন ঐচ্ছিকে কে বোঝাবে। আজ তার কপালে দুঃখ আছে। ঐচ্ছি নির্ঘাত আজ তাকে এনাগন্ডার মতো গিলে খাবে। সায়মা ভয়ে ভয়ে রাফসানের দিকে তাকায়। কাঁচুমাচু করে বলে,

‘ভাইয়া আমার না এখন বাড়ি যেতে হবে। বেশি লেইট হলে আম্মু বকা দিবে।’

রাফসান সৌজন্যমৃলক হেসে বললো,

‘আমরাও এখনই উঠবো। আপনি আমাদের সাথেই যেতে পারবেন।’

সায়মা তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠল,

‘না না। কি যে বলেন না ভাইয়া। আপনাদের সাথে যাওয়া মানে তো কাবাব মে হাড্ডি হওয়া। আমি একাই যেতে পারবো। বেশি দূর না তো ঐ সামনেই আমার বাসা।’

রাফসান তখন মৃদু হেসে বললো,

‘আচ্ছা ঠিক আছে। সাবধানে যাবেন তাহলে।’

সায়মা চট করে লাফিয়ে উঠে বললো,

‘ঠিক আছে ভাইয়া। আল্লাহ হাফেজ।’

কথাটা বলে চেয়ার থেকে উঠতে নিলেই তার ডান হাতটা চেপে ধরে ঐচ্ছি। ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে ঝমঝম কন্ঠে বলে উঠে,

‘কোথায় যাচ্ছো, বান্ধবী?’

সায়মা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে,

‘বাসায়।’

ঐচ্ছির অধর কোণে বাঁকা হাসিটা আরো খানিকটা প্রশ্বস্থ হয়। ক্ষীণ সুরে বলে উঠে,

‘হুম যাবে তো বাসায় কিন্তু তোমার না আমার। আন্টির সাথে আমি কথা বলেছি। আজ তুমি আমার সাথে আমার বাসায় থাকবে।’

সায়মা যেন বিশাল ঝটকা খেল। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে উঠল
,
‘কি?’

‘শুনিসনি কি বলেছি। তুই আজ আমাদের বাসায় থাকবি। আন্টির সাথে এই ব্যাপারে আমি আগেই কথা বলে নিয়েছি। তাই একদম কোনো অজুহাত দিতে যাবি না।’

সায়মা ব্যথিত চোখে ঐচ্ছির দিকে চেয়ে অসহায় কন্ঠে বলে উঠল,

‘দোস্ত!’

ঐচ্ছি কিছু বললো না কেবল অধর বাকিয়ে হাসল। ঐচ্ছির এই হাসির ধরনে রাফসানও বুঝে গেল, বেচারি সায়মার কপালে আজ দুঃখ আছে।

________________________

পুরো বিছানা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে একগাদা শপিং ব্যাগ। বিছানার এক কোণে বেশ আরাম করে বসে ব্যাগ গুলো একে একে খুলছে ঐচ্ছি। এত শপিং সে এর আগে কখনো করেনি। অবশ্য বিয়ের শপিং তো সবাই একবারই করে। মাথার উপর ফ্যানটা গটগট করে ঘুরে চলছে। সায়মা নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে একবার ফ্যানটা দিকে চেয়ে নরম গলায় বললো,

‘দোস্ত আর কতক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো?’

‘যতক্ষণ না আমি অনুমতি দিচ্ছি ততক্ষণ।’

শক্ত গলায় জবাব দিল ঐচ্ছি। সায়মা এবার কিছুটা রাগ দেখিয়ে বললো,

‘উফ এক ঘন্টা যাবত কান ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আমার হাত পা ব্যাথা করছে। আমি আর পারবো না।’

ঐচ্ছি ঠোঁট কামড়ে বড় বড় চোখ করে সায়মার দিকে তাকায়। রাগি গলায় বলে,

‘শুধু তো কান ধরে দাঁড় করিয়েছি। বেশি কথা বললে এবার উঠ বস করাবো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।’

সায়মা নাক ফুলিয়ে অভিমানের কন্ঠে বলে,

‘আরে আমি কি জানতাম নাকি তুই যে মিথ্যে কথা বলে রাফসান ভাইয়ের সাথে শপিং এ যাবি? আর না তুই জানতি আমিও আজ শপিং এ যাবো। দুজনের কেউই তো কিছু জানতাম না। পুরোটাই তো একটা কোয়েন্সিডেন্স ছিল দোস্ত।’

ঐচ্ছি মুখ এবার কুঁচকে এলো। ভাঙা গলায় বললো,

‘হ্যাঁ এই ফালতু কোয়েন্সিডেন্সের কারণে আমার প্রেস্টিজ সব পান্চার হয়েছে। আর রাফসান শয়তানটাও কম যায় না। মিচকা শয়তান একটা। তলে তলে বেটা যে আমাকে নিয়ে খুব মজা নিয়েছে সেটা আমি বেশ বুঝতে পেরেছি। পুরোটা সময় ঠোঁট চেপে চেপে হেসেছে। বলেছি আমি আর শপিং করবো না। কিন্তু না জোর করে আমাকে দিয়ে একগাদা শপিং করিয়েছে। বুঝি আমি, কাটে ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়েছে আরকি।’

ঠোঁট গুঁজ করে ঐচ্ছি। ফর্সা কপালটাতে বিরক্তির রেশ ফুটে উঠেছে। সায়মা তখন আপ্লুত কন্ঠে বললো,

‘কিন্তু যাই বলিস না কেন দোস্ত, তোর এই জ্বীন বরটা কিন্তু দেখতে দারুণ। আর উনার নীল চোখগুলো, উফফ! মারাত্মক।’

ঐচ্ছি দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

‘তাহলে তুইই বিয়ে করে ফেল। তাতে যদি ঐ জ্বীনের হাত থেকে আমি রেহাই পাই।’

সায়মা গাল ফুলিয়ে বললো,

‘এএ তোমার ঐ জ্বীন সাহেব আমার দিকে তাকাবেনও না। উনার নজর পড়েছে তোমার উপর। আর ঐ নজরে সারাজীবন তুমিই আটকে থাকবে। আর এইদিকে আমার মতো নিষ্পাপ নিরহ বাচ্চাটার দিকে তো কারোর নজরই পড়ে না।’

ঐচ্ছি হেসে ফেলে। সায়মা ঠোঁট উল্টে বাচ্চাদের মতো বলে,

‘হাসছিস কেন?’

ঐচ্ছি হাসি থামিয়ে রসিকতার সুরে বলে,

‘নিষ্পাপ বাচ্চা, তাও আবার তুই? হাসালি বান্ধবী। যাকগে কষ্ট পাস না। রাফসানের একটা ছোট ভাই আছে। চাইলে লাইন মারতে পারিস।’

প্রথমে খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠলেও পরক্ষণেই মুখ কালো করে ফেলে সায়মা। দুঃখি দুঃখি কন্ঠে বলে উঠে,

‘না বাবা। এসব জ্বীনদের ভয় করে। রাফসান ভাইয়া তোকে ভালোবাসে বলে তোর সাথে কোনো ব্যাপারে রাগ দেখায় না। কিন্তু আমাকে তো আর ঐ জ্বীন ভালোবাসে না। পরে যদি আমার কোনো কাজে সে বিরক্ত হয় তাহলে দেখা যাবে আমাকে ধরে নিয়ে ঘাড় মটকে দিবে। থাক বাবা। যেমন আছি তেমনই ভালো। অতি লোভে তাতি নষ্ট করার কোনো দরকার নেই।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলল সায়মা। আহা, কি কষ্ট তার। ঐচ্ছি ঠোঁট চেপে হাসে। সায়মার এই দুঃখি দুঃখি মুখটা দেখলে বরাবরই তার হাসি পায়। আর এখন তো একটু বেশিই হাসি পাচ্ছে। কান ধরে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে সামনের দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে গোল করে রেখেছে। চোখ দুটির দৃষ্টি ভাসা ভাসা। ছোট্ট নাকটা একটু পরপর ফুলাচ্ছে। গায়ে কালো রঙের একটা টিশার্ট। চুল একপাশে বেণি করা। ডান গালের উপর ছোট্ট একটা তিল। এই তিলটাই মেয়েটাকে আরো বেশি মোহনীয় করে তুলেছে। ঐচ্ছি মৃদু হাসে। মনে মনে দোয়া করে, যেন কোনো ভালো মানুষের ভাগ্যেই সায়মার প্রণয়ের সমাপ্তি লিখা থাকে। যেই মানুষটা ভীষণ ভাবে তাকে ভালোবাসবে। সারাজীবন মেয়েটাকে বুকে আগলে রাখতে পারবে..
.
.
ঘুমের মাঝেই ঠোঁটের উপর উষ্ণ কিছুর ছোঁয়া পেয়ে ধরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসে ঐচ্ছি। ড্রিম লাইটের নিভু নিভু আলোতে পুরো রুমটা নীলাভ হয়ে আছে। কপালে গলায় হাত দিয়ে ঐচ্ছি দেখে, ঘেমে সে একাকার। ডানহাতটা ঠোঁটের উপর রাখতেই অন্যরকম কিছু অনুভব হয় তার। ঠিক এই জায়গাটাতেই গভীর ভাবে কিছু একটা ছুঁয়েছে। যার উষ্ণতা এখনো ঐচ্ছি ফিল করতে পারছে। বুকের ভেতরের ধুকধুকানিটাও বেড়ে গিয়েছে। পাশ ফেরে তাকিয়ে দেখে সায়মা হাত পা ছড়িয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঐচ্ছি ছোট্ট একটা ঢোক গিলে বিছানার পাশে লাগানো ছোট্ট টেবিলটা থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে পুরো পানি সাবার করে। গ্লাসটা আগের জায়গায় রেখে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে আবারো জোরে শ্বাস টানে। নাসিকারন্ধ্র দিয়ে অক্সিজেনের সাথে প্রবেশ করে এক মিষ্টি ঘ্রাণ। এই ঘ্রাণ ঐচ্ছির খুব চেনা। প্রায় সময়ই এই ঘ্রাণ পায় সে। চোখ বুজে আরো কিছুক্ষণ ঘ্রাণটা নিতে থাকে সে। তবে সেটা আর বেশিক্ষণ রইল না। তীব্র ঘ্রাণটা ধীরে ধীরে বিলিন হতে লাগল। ঐচ্ছি ফট করে চোখের পাতা মেললো। এটা রাফসানের শরীরের ঘ্রাণ। হ্যাঁ, সে সিউর। এইরকমই একটা সুঘ্রাণ ঐচ্ছি রাফসানের শরীর থেকে পায়। তবে কি এত রাতে রাফসান তার রুমে এসেছিল? সে তো জ্বীন। অদৃশ্য হয়ে সে যখন খুশি যেখানে খুশি যেতে পারে। ঐচ্ছি আবারো তার ঠোঁটে হাত দেয়। তবে কি রাফসান তার ঠোঁটে…

রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে ঐচ্ছির। মাথার ভেতরটা ধপধপ করে লাফাতে থাকে। দ্রুত রুমে গিয়ে রাফসানকে কল দেয়। একবার, দুবার, কল রিসিভ হচ্ছে না। রাফসান তো এত লেইট করেনা কল রিসিভ করতে। বড়জোর দুবার কল দিতে হয়। কিন্তু এখন ঐচ্ছি এই নিয়ে পাঁচবার কল দিয়ে ফেলেছে। ছয় নাম্বার কলটাও রিসিভ না করায় ঐচ্ছি রাগে ফোনটা বিছানার উপর ছুড়ে মারে। হাত দুটো কচলে নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে থাকে। ফোনটা বেজে উঠে। বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকায় ঐচ্ছি। রাফসানের নাম্বার। কলটা রিসিভ করেই তেজি কন্ঠে সে বলে উঠে,

‘আপনার সাহস কি করে হলো এত রাতে আমার রুমে আসার?’

চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here