ঘাসফুল পর্ব ৩

ঘাস ফড়িং (৩য় পর্ব)
————————
মিনু জানে, প্রেমের কিছু অঘোষিত নিয়ম আছে৷ সেগুলো মানতে হয়। আজ যদি সে নীলাভের ইচ্ছে পূরণ না করে। বদ রাগি নদীর ঢেউয়ে পাড় ভাঙার মতোন নিজেই ক্ষণে ক্ষণে ভেঙে পড়বে মায়ার অতল সমুদ্রে। আপন মনে কষ্ট পাবে। বারংবার মন ঢেকুর তুলে প্রতিবাদী সুরে বলবে-
— ‘আহারে মানুষটা একবার শক্ত করে তার ঘাস ফড়িংকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল। তুই মানা করে দিলি। বড্ড পাষাণ তোর হৃদয়। বড্ড পাষাণ।’

নদীর পাড় থেকে সন্ধ্যা হবার আগেই বাসায় ফিরে আসে বৃষ্টি আর মিনু। বাসার গেইটের সামনে এসেই তাদের বুক ধ্বক করে উঠে। কারণ মিসেস সানজিদা বেগমের গলার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে।
এই ভদ্রমহিলার কোনো কিছু নিয়ে বকবকানি শুরু করলে পুরো পরিবারের সদস্য নির্যাতিত হতে হয়।
আজ কি নিয়ে বকবকানি শুরু হয়েছে কে জানে! বৃষ্টি আর মিনু গুটিগুটি পায়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকে। কোনোভাবে উপরের রুমে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করতে পারলেই বাঁচে৷ তবে সানজিদা বেগমের বকবকানি কেবল স্বামীর সঙ্গে৷ ছেলে-মেয়েদের জন্য আছে অসীম স্বাধীনতা আর প্রশ্রয়। মিনু আর বৃষ্টি যেতে পারলো না।
মোটাসোটা শরীর নিয়ে সানজিদা বেগম এগিয় এসে বললেন- ‘শুনেছিস তোর বাপের কারবার? আমি খবর পেয়েছি সে জব্বারের দোকানে গিয়ে রোজ মচমচে জিলাপি খায়। জুম্মাবারে মসজিদে জিলাপি দিলেও রাস্তায় লুকিয়ে খেয়ে আসে। বলি বুইড়া বয়সে কি আবার বাচ্চা হইছে তোর বাপ? ক আমারে ক। নিজের যে ডায়বেটিস বান্ধাইছেন তোর বাপ, সেটার খেয়াল কি তার থাকে না? আমি তো আর পারি না বাবা এই সংসার নিয়া। চোখ যেদিকে যায় বেরিয়ে যাবো।’
বৃষ্টি কোনো রকমে বলল-
—‘তাইতো মা, বাবা এসব কি শুরু করছে। নিজের ডায়বেটিস উনার তো বুঝা উচিত। উনি তো বাচ্চা না। তুমি তো খামোখা সারাক্ষণ বকাবকি করো না, কাজেই করো।’
মা’কে কথাটা বলেই মিনুকে ফিসফিস করে বলল, ‘বালের বকবকানি আজ আর থামবে না, তাড়াতাড়ি উপরে চল।’
অন্য সময় হলে মিনু ফিক করে হেঁসে ফেলত। কিন্তু এই মুহূর্তে এসবে তার মন নেই। সমস্ত চিন্তা-ভাবনা জুড়ে এখন মিশে আছে নীলাভ। নেশা লাগানো তীব্র আগ্রহী দু’টি চোখের চাহনী। সুন্দর সুন্দর কথা। প্রতিটি কথা যেন ভেতরকার সমস্ত অলিগলিতে শীতল বাতাসে শান্তির প্রলেপ মাখিয়ে দেয়। নীলাভের কথা যেন ইলেকট্রনিকস ফ্যান না থাকা গ্রামের দেউরীতে বসে ক্লান্ত শ্রমিকের অল্প সময় জিরিয়ে নেবার মতোন শান্তি। নীলাভ কি মিনুর ব্যক্তিগত কবি? প্রতিটি মেয়েই কি প্রেমিক হিসেবে এমন সুন্দর কথা বলা কবিকে চায়? তাদের একটা ব্যক্তিগত কবি থাকুক। গভীর রাতে কানের কাছে ফিসফিস করে গল্প করুক। হয়তো চায়, না হলে তারা ছেলেদের রূপ থেকে কথায় বেশি মজে কেন?
মিনু আনমনে বৃষ্টির সঙ্গে উপরের রুমে চলে যায়। এমনই অনমনা ঘোর লাগা অবস্থায় রাতের খাবার শেষ হয় মিনুর।
রুমের বাতি বন্ধ করে বৃষ্টির সঙ্গে বিছানায় যায়। কেমন একটা অনূভুতি হচ্ছে মিনুর। কি যেন চোখে, মনে, শরীরে লেগে আছে। কানে যেন বারংবার একটা মধুর সুর বাজছে- “আমি একবার তোমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে চাই ঘাস ফড়িং।”
বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টি হবে বোধহয়। পাশের দুষ্ট বৃষ্টিটাও ফোনে কথা বলছে কারও সঙ্গে। নীলাভকে কি একটা কল দেয়া যায়? না সে আগ বাড়িয়ে দেবে না কল। এ যেন এক শিশুসুলভ অভিমান মিনুর। পাশ ফিরে সে। পুরো শরীর জুড়ে কেমন একটা উষ্ণ অনূভুতি।
আবার বেজে ওঠে- “তোমাকে একবার খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে চাই ঘাস ফড়িং।’
কিছু একটা ভেবে মিনুর পুরো শরীরের লোম নাড়া দিয়ে উঠে। বৃষ্টিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
বৃষ্টি ফোন কানে রাখা অবস্থায়ই হাসতে হাসতে বলল- ‘এই কি হলো, ছাড় বাবা আমার কাতুকুতু লাগে।’
মিনু গাঢ় আবেগ মাখা গলায় বলল-
—‘না ছাড়বো না।’
কথাতে কিছু একটা ছিল। অভিজ্ঞ বৃষ্টি ওপাশের মানুষটাকে ‘রাখছি’ বলে ফোন রেখে দেয়।
মিনুর গালে হাত রেখে বলে-
– ‘কি হয়েছে মিনু। প্রেমে একেবারে মজে গেছিস মনে হচ্ছে।’
মিনু চুপচাপ জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। খানিক পর বলে- ‘খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করে তাকে।’
মিনুর মুখে এসব কথা বেমানান। স্বল্পভাষী মেয়ে সে৷ বৃষ্টি খানিক অবাকই হলো। তারপর ফিক করে হেঁসে বলল-
– ‘বিয়ে করে ফেল না।’
– ‘মেয়েরা না হয় বয়স হলেই যখন-তখন বিয়ে করতে পারে। ছেলেরা তো পারে না। এখনই নীলাভ বিয়ে করবে কীভাবে?’
বৃষ্টি খানিক ভেবে বলে, –
—‘তাহলে যা ইচ্ছা হয় চালিয়ে যা। নীলাভ কখনও ঠকাবে না তোকে এটা নিশ্চিত৷ খুবই ভালো ছেলে।’
– ‘কি চালিয়ে যাব?’
– ‘এইতো জড়াজড়ি, চুমাচুমি, সেক্স।’
বৃষ্টির পেটে একটা চিমটি কেটে মিনু বলল,- ‘ধ্যাৎ বদমাইশ। নীলাভ বা আমি বিয়ের আগে এসব করবো না। সবাইকে তোর মতো ভাবিস ক্যান?’
বৃষ্টি কিছু বলল না। মিনু খানিক পর আবার বলল- ‘তুই করেছিস এসব?’
বৃষ্টি মিনুর পেটে এক হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল-
— ‘তোর কাছে কিছু লুকাতে ইচ্ছে করে না৷ আমার প্রথম প্রেমটাই অপাত্রে ঢেলেছিলাম। দেহ আর মন সব অপাত্রে গেল৷’
দেহ শুনে মিনু আঁতকে উঠে-
—‘বলিস কিরে? তারপর কি হলো?’
বৃষ্টি এবার নিজের লাগাম যেন একটু টেনে ধরে বলে-
—‘কিছু না ঘুমা তো।’
খানিকক্ষণ দু’জন নীরব থাকে। মিনু নীরবতা ভেঙে বলে-
– ‘কাল একটু আগে কলেজে যাব, নীলাভ আসবে।’
বৃষ্টি একটু চোখ পাকিয়ে তাকায়। তারপর বলে-
– ‘আচ্ছা বাবা, সমস্যা নাই আমি আছি তো এখন ঘুমা।’
মিনু ভরসা পেয়ে বৃষ্টিকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে- ‘আচ্ছা, গুড নাইট বৃষ্টি পাখি। লাপ্পিউ।’

নীলাভ তার ঘাস ফড়িংয়ের এনে দেওয়া স্বর্গ সুখের দিনটি নিয়ে ভাবতে ভাবতে রাতে টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে যায়। শ্রেয়া যেভাবে দরজা ভেজিয়ে গিয়েছিল সেরকমই থাকে।
ভোরে শ্রেয়ার মা খাদিজা বেগম রুমে ঢুকে হুলুস্থুল কান্ড। ডেকে তুলে বললেন কি হয়েছে তোর? এভাবে টেবিলে ঘুমিয়ে আছিস ক্যান?
নীলাভ কিছু বলতে পারে না। ডায়েরিটা আলগোছে বন্ধ করে রাখে।
খাদিজা বেগম আবার বললেন-
– ‘কিছুদিন থেকে সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকিস। এসব কি হচ্ছে নীলাভ? কাল রাতে তোর বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। কোথাও বেড়াতে যা। মন-টন ভালো হবে। শ্রেয়াকে নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যা। ওর ফুফু প্রতিদিন বলেন শ্রেয়াকে পাঠানোর জন্য। দূরের রাস্তা হওয়ায় কখনও যাওয়া হয়নি। শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে চট্টগ্রামের টিকিট কাটিয়েছি একজনকে দিয়ে। তোরা গিয়ে কল দিলেই হাতে এনে দিবে।’
নীলাভ কিছু বলল না। আড়মোড়া ভাঙছে। ঘুম হয়নি। ঘাড় ব্যথাও করছে ভীষণ।
খাদিজা বেগম তাড়া দিয়ে বললেন-
— ‘গোসল করে রেডি হয়ে যা। শ্রেয়াও রেডি হচ্ছে।’
নীলাভের যেতে খুব একটা ইচ্ছা করছে না৷ কিন্তু না গেলে বাবার কল আর ফুফুর প্যানপ্যানানি শুনতে হবে। সে আস্তে করে বলল-
— ‘আচ্ছা আমি রেডি হয়ে যাচ্ছি। শ্রেয়াকে বলো তাড়াতাড়ি রেডি হতে। আর কার কাছে টিকিট ওর নাম্বার শ্রেয়ার কাছে দিয়ে দাও।’
খাদিজা বেগম বেশ খুশিই হলেন। উনার ধারণা ছিল নীলাভ ঘাড়ত্যাড়ামি করবে।
তিনি স্বাভাবিক গলায় বললেন- ‘আচ্ছা এসব কোনো সমস্যা হবে না। চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকেও তোদের রিসিভ করবে শ্রেয়ার ফুপা। ওর কাছে নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি।’
দরজার বাইরে শ্রেয়া কান পেতে দাঁড়িয়ে ছিল। খাদিজা বেগম বের হতেই পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল-
– ‘উফ মা৷ লাভ ইউ।’

শ্রেয়া খুব সময় নিয়ে সাজল। নীলাভের ডায়েরিতে লেখা সেই খয়েরী রঙের শাড়িটা পরে আঁচল কাঁধের একপাশে নিয়ে পিঠে ফেলল। খোলা চুল। চোখে গাঢ় কাজল। কপালে টিপ দিয়েছে। পুরোপুরি মাঝামাঝি হয়নি টিপ। খানিকটা বামে পাশে হয়ে গেছে। নীলাভ রেডি হয়ে ডাকে। তার পরনের শার্টের বোতাম খোলা৷ ভেতরে কালো একটা গেঞ্জি। হাত কনুই পর্যন্ত তোলা। শ্রেয়া বুঁদ হয়ে তাকিয়ে রইল। নীলাভ ওর মাথায় একটা ঘাট্টা মেরে বলল-
— ‘কি হলো, চল পেত্নী।’
শ্রেয়ার নাকে একটা স্মেল আসে। ঘোর লাগা অবস্থায় সে চুপচাপ হাঁটে। একটা সিএনজি ডাকে নীলাভ। খাদিজা বেগম তাদেরকে গাড়িতে তুলে দিয়ে বাসায় ফিরে যান। সিএনজি চলছে রেলস্টেশনের উদ্দ্যশ্যে। শ্রেয়া চুপচাপ বসে আছে। নীলাভ নীরবতা ভেঙে বলল-
— ‘যাই সাজগোজ করে পেখম ধরিস না ক্যান। কাক কখনও ময়ূর হয় না।’
শ্রেয়া কিছু বলে না। আহত চোখে একবার তাকায়। নীলাভ আরও বাড়াবাড়ি করে বলে-
— ‘আর পেট বের করে শাড়ি পরেছিস যে। এসবের মানে কি? রাস্তাঘাটে মানুষকে দেখিয়ে বেড়াতে চাস না-কি পেট? কেউ কি তাকাবে মনে করিস?’
শ্রেয়া কিছু বলল না। চোখটা কেবল ঝাপসা হয়ে এলো৷ শাড়ি টেনে-টুনে পেট ভালোভাবে ঢেকে নেয়। তারপর দুই হাতে মুখ চেপে মাথা নীচু করে ফেলে।
আকাশের অবস্থা ভালো নাই। বৃষ্টি নামার প্রবল সম্ভাবনা। একটু বাতাস বইছে। চুল উড়ছে শ্রেয়ার। বৃষ্টি আসার আগে স্টেশনে যেতে পারলেই হয়। মিনিট কয়েক পরই স্টেশনের সামনে এসে সিএনজি থামাল। তখনই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। বিদ্যুৎ চমকাল। প্রবল বাতাসে শ্রেয়ার শাড়ির আঁচল যেন উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়া শুরু হল। নীলাভ এতোক্ষণে দৌড়ে স্টেশনে ঢুকে গেছে। শ্রেয়া ভিজে একাকার। শাড়ীর কুঁচি ধরে গুটিগুটি পায়ে যেতে হচ্ছে। নীলাভ হাঁক ছাড়ে-
— ‘তাড়াতাড়ি আয়।’
এসব ব্যবহারে শ্রেয়ার ভীষণ মন খারাপ হয়। সে কি এখনও বড় হয়নি? তার সঙ্গে এমন আচরণ। কিন্তু শ্রেয়া ইতোমধ্যে ঠিক করে নিয়েছে নীলাভ যাই বলুক যতই অবহেলা করুক মন খারাপ করবে না। সে পুরোপুরি স্বাভাবিক গলায় বলল-
— ‘আসছি তো বাবা।’
শাড়ী ঝেড়ে-মুছে এসে পাশে দাঁড়াল। নীলাভ তাড়া দিয়ে বলে-
— ‘আচ্ছা লোডিং তো তুই। তাড়াতাড়ি কল দে টিকিটওয়ালাকে।’
শ্রেয়া বাধ্য মেয়ের মতোন ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কল দেয়। খানিক পরেই মধ্যবয়সী একজন এগিয়ে এসে দু’টা টিকিট দিয়ে যায়। বৃষ্টি এখনও থামেনি৷ কিছুক্ষণ পর ট্রেন ছাড়বে। ধীরে ধীরে সবাই উঠে যাচ্ছে৷ নীলাভ পায়ে পায়ে গিয়ে ট্রেনে উঠে৷ নিজের সীট বের করে বসে।
শ্রেয়ার যেতে দেরি হয়। শাড়ি পরে দ্রুত হাঁটা বোধহয় মুশকিল। জানালার দিকে মাথা বের হাঁক ছাড়ে নীলাভ। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শ্রেয়া পা চালিয়ে এগিয়ে যায়।
কাছে আসার পর নীলাভ বিরক্তির সুরে বলে-
— ‘তুই তো দেখছি লেইটের মা।’
শ্রেয়া স্বাভাবিকভাবে মুচকি হেঁসে পাশে বসে। বৃষ্টি থেমে গেছে। ট্রেন চলছে সাপের মতোন আঁকাবাকা রাস্তা দিয়ে। ঝকঝক ঝকঝক। নীলাভ পরনের শার্টটা খুলে একপাশে রাখতে রাখতে বলে-
— ‘রাতে ঘুম হয়নি। বড্ড ঘুম পাচ্ছে।’
শ্রেয়া সরে জায়গা করে দিয়ে বলল ঘুমাও। নীলাভ মাথা নেড়ে বলে-
— ‘বালিশ ছাড়া আমার ঘুম আসবে না এমন সীটে।’
চা গরম চা গরম করে যাচ্ছে চা ওয়ালা৷
— ‘চা খাবি? বৃষ্টির দিনে ভালোই লাগবে।’
শ্রেয়া তাকিয়ে বলল-
— ‘কিন্তু এখন চা খেলে তোমার ঘুম আর আসবে না।’
নীলাভ মুচকি হেঁসে বলল-
— ‘আমার চা খেলে ঘুম নষ্ট হয় না।’
চা ওয়ালাকে ডেকে দু’কাপ চা নিল তারা।
শ্রেয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক হবার চেষ্টা চালাচ্ছে৷ প্রিয় মানুষের সঙ্গে এমন একটা জার্নি সে নষ্ট হতে দিবে না। পুরোপুরি উপভোগ করতে চায়। চায়ে চুমুক দিয়ে সরাসরি নীলাভের দিকে তাকিয়ে বলল-
— ‘তোমাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে নীলাভ ভাই।’
নীলাভ চায়ে চুমুক দিতে যাবে তখনই কথাটি শুনে থেমে গেল। তারপর মুচকি হেঁসে বলল-
— ‘তোকে সুন্দর লাগছে বলার জন্য বললি মনে হচ্ছে।’
শ্রেয়া এই কথার কোনো জবাব না দিয়ে আবার বলল-
— ‘ছোটবেলার সেই কলা গাছের ভেলা থেকে পানিতে পড়ার কথা মনে আছে তোমার?’
অতীতের প্রতি সব মানুষই দূর্বল। ছোটবেলার স্মৃতি হলে তো কথাই নেই। শ্রেয়া বোধহয় সেটা ভালো করেই জানে। নীলাভ চায়ে চুমুক দিয়ে মুচকি হেঁসে বলল-
— ‘হ্যাঁ মনে পড়ে। আর মনে পড়লেই তোকে মারতে ইচ্ছা করে।’
শ্রেয়া ভাবলেশহীনভাবে বলল-
— ‘এখন মারা কি ঠিক হবে। আমি বড় হয়েছি না?’ নিজের বড় হওয়া যেন নীলাভকে জানান দিল সে।
নীলাভ মুচকি হেঁসে বলল-
— ‘হ্যাঁ বড় হয়ে গেছিস। এবার তোকে বিয়ে দিতে হবে।’
শ্রেয়া অন্যদিকে গেল না। চায়ে চুমুক দিয়ে বলল-
—‘সেবার কিন্তু তুমি আমাকে মেরেছিলে।’
নীলাভের এতোকিছু মনে নাই। আবছা আবছা মনে পড়ে। তাদের বাড়ির সামনে একটা রাস্তা। রাস্তার পাশে একটা পেট মোটা সাপের মতন আঁকাবাকা খাল এগিয়ে গেছে দূরের বিলে। খালের ওপারে সোনাই চাচার বাড়ি। তাদের একটা কলা গাছের ভেলা (নৌকা) ছিল। সেটা দিয়ে রাস্তায় আসতেন। বাঁশের যা দাম। সাঁকো দেয়া সোনাই চাচার কাছে বিলাসিতা। সেবার শ্রেয়ারা তাদের ওখানে বেড়াতে গেছে। দু’জন খেলাধূলা করছিল। তারা খুবই ছোট তখন। রাস্তায় এসে দেখে সোনাই চাচা ভেলা লাগিয়ে খালের পাড়ের দোকানে গেছেন। তারা গুটিগুটি পায়ে গিয়ে ভেলায় উঠে পড়ে। শ্রেয়ার উত্তেজনা কে দেখে। মহা খুশি সে। নীলাভ লঘি নিয়ে বড়দের মতো ভর দেয়। কেঁপে উঠে ভেলা। টুপ করে খালে পড়ে যায় শ্রেয়া। তখনও সে সাঁতার শেখেনি৷ হাত দিয়ে ঝাঁপাঝাপি করে তলিয়ে যাচ্ছিল। নীলাভ সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে পড়ে পানিতে। হাত ধরে টেনে আনতে চায় কিনারায়৷ ঝামেলাটা বাঁধাল শ্রেয়া। ভয়ে নীলাভের হাত সহ আঁকড়ে ধরল শক্ত করে। অসম্ভব হয়ে গেল তার জন্য সাঁতার কাটা। দু’জনই তলিয়ে যাচ্ছিল। লাফালাফি আর ধস্তাধস্তির আওয়াজ শুনে দৌড়ে এসে উদ্ধার করেন সোনাই চাচা আর দোকানী। কিনারায় এসেই নীলাভ রাগে সাপের মতন ফুঁসতে ফুঁসতে ঝাপিয়ে পড়ল শ্রেয়ার উপর। ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে কিল-ঘুষি। রাগটা হল তাকে আঁকড়ে ধরার জন্য। কেউ উদ্ধার কর‍তে গেলে তার হাত সহ আঁকড়ে ধরাটা মারাত্মক ভুল। এতে দু’জনই তলিয়ে গিয়ে মরার সম্ভাবনা শতভাগ। দোকানীর কাছ থেকে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। কানে গেল নীলাভের বাবারও। বেধড়ক মার খেল সেদিন নীলাভ। সেই রাগ সে কয়েকদিন মেটাল শ্রেয়ার উপরে৷ দেখলেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত মাটিতে৷

নীলাভের ভীষণ ঘুম পাচ্ছে৷ সীটে পা লম্বা করে শুয়ে যায়। মাথার পাশে দুই হাত কোলে ভাজ করে চুপচাপ বসে আছে শ্রেয়া। বারংবার এপাশ-ওপাশ করতে থাকে নীলাভ। ট্রেনের ঝকঝক ঝকঝক শব্দের সঙ্গে হালকা ঝাঁকুনিতে তার মাথা নড়ছে। ঘুমানোর জন্য এই ঝাঁকুনিটা অসহ্যকর। শ্রেয়ার বড় মায়া লাগে। একবার ইচ্ছে হল বলতে ‘আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে পারো।’
কিন্তু নীলাভ ভাই যা খাটাশ কি থেকে কি বলবে সেটাই ভয়। এতোকিছু ভেবে দুনিয়া চলে না। অন্তত এই জার্নিতে শ্রেয়া স্বাভাবিক থাকতে চায়। কোনোভাবে প্রভাবিত হতে চায় না। আস্তে করে বলল-
— ‘নীলাভ ভাই তুমি আমার কোলে মাথা রাখতে পারো।’
নীলাভ যেন বেশ খুশিই হলো। গত রাতে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ায় ঘাড় ব্যথা করছে। ভালো ঘুমও হয়নি। সে খুশি হয়ে বলল-
— ‘তুই আসলে মানুষ এতোটাও খারাপ না।’
রসিকতায় মুচকি হাসল দু’জন। নীলাভ আস্তে করে মাথা রাখল শ্রেয়ার কোলে। পুরো শরীরের লোম নাড়া দিয়ে উঠলো শ্রেয়ার। নীলাভ চোখবুঁজে বলল-
— ‘মাথায় একটু বিলি করে দে না প্লিজ।’
শ্রেয়া বাইরে তাকায়। আবার বৃষ্টি হচ্ছে। আজ বোধহয় সারারাত থেমে থেমে বৃষ্টি হবে। ঝড়ে রেললাইনের আশপাশের বন্য গাছগুলো কাঁপছে। শ্রেয়ার ভেতরেও কি সেরকম ঝড় বয়ে যাচ্ছে? বন্য গাছের মতোন তারও হাত-পা মৃদু কাঁপছে কেন? বুক কাঁপছে কেন? এ কেমন অদ্ভুত অন্যরকম ভয়ংকর অনূভুতি।
শ্রেয়া কাঁপা কাঁপা হাতে ঘন কালো চুলে আঙুল ডোবাল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। খানিক পর শিশুদের মতোন ঘুমিয়ে যায় নীলাভ। একমনে চেয়ে থাকে শ্রেয়া। তারপর বাইরে চোখ রাখে। বাড়ি-ঘর গাছপালা যেন পেছন দিকে সরে যাচ্ছে। মিনিট দশেক যায়। আচমকা পাশ ফিরে নীলাভ। ঘুমের ঘোরে শক্ত করে কোমর জড়িয়ে ধরে। কেঁপে উঠে শ্রেয়া। এখন কি করব? আশ্চর্য অপরিচিত এক ভয়ংকর অনূভুতির মুখোমুখি সে। ঘুমন্ত নীলাভের প্রতিটি গরম শ্বাস নিঃশ্বাস শ্রেয়ার পেটে আছড়ে পড়ছে। শরীরে যেন কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে শ্রেয়ার। অচেনা অজানা এক অসহ্য সুখের ব্যথা। সে ব্যথার অনূভুতি সহ্য করতে না পেরে নিচের ঠোঁট কামড়ে নীলাভের চুল খামচে ধরে চোখবুঁজে।
———-চলবে—
– সবাই গ্রুপে জয়েন করে নিবেন। কমেন্ট লিংক দেয়া থাকবে।
– লেখা: MD Jobrul Islam

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here