জলছবি পর্ব ১৬+১৭

#জলছবি
#পার্ট_১৬
#কাজী_সানজিদা_আফরিন_মারজিয়া
.
বড়জোড় দুইটা বাজে। ভর দুপুর বেলা। দুইটা ক্লাস করে কলেজ থেকে বেরিয়ে পড়লো নোলক। মন-মেজাজ ভীষণ রকম খারাপ।

রিকশা যখন বাড়ির গেইট থেকে অল্প কিছু দূরে তখন নোলক দেখতে পেলো বাসার সামনে কেউ একজন পায়চারী করছে। নজরটা তাদের বাসার দিকেই তাক করা। আজই প্রথম নয়, নোলক প্রায়শই এই লোকটাকে বাসার সামনে ঘুরঘুর করতে দেখে। বখাটেদের মতো দেখতে না হলেও কাজখানা বখাটেদের ন্যায়। নোলক মনেমনে ভাবে আজ তার উপরেই রাগ ঝারবে। এসব ভাবতে ভাবতেই রিকশা ঠিক ছেলেটার পাশ ঘেঁষে থামে। ছেলেটা হকচকিয়ে তাকায়।
ত্রিশ ছুঁই ছুঁই কালো বর্ণের সাধারন দেখতে একটা ছেলে। বখাটে ছেলেরা কি এমন সহজ-সরল টাইপ দেখতে হয়? নোলক ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই ছেলেটা খুব সুন্দর করে হাসে। নোলক রিকশা থেকে নেমে কোনো ভণিতা ছাড়াই জিজ্ঞেস করে,
“কি সমস্যা? এখানে কি?”
নোলকের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ছেলেটা বলল,
“তুমি নোলক?”
নোলকের কুঁচকানো ভ্রু আরো কুঁচকালো। বলল,
“হ্যাঁ। আপনি কে? ক-দিন যাবত দেখছি ঘুরঘুর করছেন। কি চাই এখানে?”
ছেলেটার সহজ-সরল শিকারক্তি,
“প্রেম চাই! তোমার আপুকে বল তো, এই ছেলেটাকে একটু প্রেম দিতে। মেয়েটা খুব নিষ্ঠুর, এত চাই, দেয় না। তুমি একটু বলবা প্লিজ?”
নোলক বিস্ময় এক নিমিষেই বেড়ে গিয়ে আকাশ সমান হয়ে গেলো। এই লোক বলে কি? এমন করেও কেউ বলতে পারে?
তবে কোনো এক অজানা কারণে এই অল্প সময়ের মাঝেই নোলকের ভালো লেগে গেলো ছেলেটাকে। তার চুপচাপ শান্ত বোনের সাথে এমন একজন পাগল প্রমিকই যুতসই বলে বোধ হলো। নোলক মৃদু হেসে বলে,
“যদি না বলি?”
ছেলেটা মাথার পেছনে হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
“তবে কি আর করার? বাড়ির সামনেই পায়চারী করি! একা একাই প্রেম প্রেম হরতাল, অনশন করি।”
নোলক হেসে দিল। বলল,
“আচ্ছা দেখি, কতদিন চলে আপনার এই প্রেম প্রেম হরতাল।”
ছেলেটা হাসে। মিশুক নোলকের সঙ্গে অতি অল্পেই সখ্যতা তৈরি হয়ে গেলো। এমন বয়সের তোয়াক্কা না করা, গুরুগম্ভীরহীন, ছন্নছাড়া ছেলে মানুষের সঙ্গে অল্প সময়ে সখ্যতা গড়ে উঠা অস্বাভাবিক কিছু নয় অবশ্য।
.
শহরের বুকে সন্ধ্যে নেমে এসেছে। অন্ধকারের রং গাঢ় হচ্ছে ক্রমশ। জানালা খোলা থাকায় মৃদু বাসাত এসে প্রবেশ করছে ঘরে, স্পর্শ করছে নোলকের শরীর, মন। সে আনমনে কি যেন ভাবছে।
এমতাবস্থায় রুমে প্রবেশ করলো নবনী। হাতে দুই মগ রং চা। নোলকের চা টা টেবিলের উপর রেখে নিজেরটা নিয়ে খাটে বসলো।
নোলককে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে টিটিকারির সহিত বলে,
“কি ব্যাপার? আজ আবহাওয়া এত চুপচাপ!”
নোলক বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি কি আবহাওয়া বলতে আমায় মিন করলা?”
নবনী গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলে,
“না, একদমই না।”
নোলক পাল্টা আক্রমণ এর মতন করে বলে,
“আল্লাহ্‌ বুঝে, বুঝছো? আমাকে সবসময় পঁচাও যে তাই একজন পাগল প্রেমিক দিয়েছে তোমায়। দিস ইজ কল্ড, রিভেঞ্জ অব ন্যাচার! হা হা হা!”
নবনী হকচকিয়ে যায়। বোনের কথার ভাব উদ্ধারের আগেই কলিংবেল বেজে উঠে। নবনী বলে,
“এ সময়ে আবার কে এলো?”
নোলক বুঝে ফেলার মতন করে বলে,
“ড্যাম শিওর, কুটলি চাচি।”
নবনী হেসে দিয়ে রুম থেকে বের হতে বের হতে বলে,
“কি একটা নাম দিয়েছিস! হা হা!”
নোলকও নবনীর পেছন পেছন যেতে যেতে বলে,
“উনার জন্য পারফেক্ট নাম। সারাক্ষণ এর-ওর বাড়ি গিয়ে কুটকাচালি করে বেড়ায়, এর থেকে ভালো নাম পাবে কি করে?”
কথা বলতে বলতে দুজনই দরজার কাছে চলে আসে। নবনী ইশারায় নোলককে থামতে বলে। নবনী দরজা খুলে দিতেই মোটা কন্ঠে বলে উঠলেন,
“কোন সময় থেইকা দরজা টোকরাইতাছি, এত দেরি কইরা খুললা যে?”
নোলকের শরীর জ্বলে যায়। মধ্যবয়স পেরোনো এই মানুষটাকে নোলক সহ্যই করতে পারে না। এলাকায় তিনি টুনি মা হিসেবে পরিচিত হলেও নোলকের কাছে কুটলি চাচি। নামের সঙ্গে যুতসই কারন অবশ্য আছে। পুরো এলাকা ঘুরেঘুরে কুটকাচালি করাই তার স্বভাব। ভাবখানা এমন যেন, এলাকার সবার চিন্তায় চিন্তায় তার ঘুম হয় না!
নোলক টুক করে জবাব দেয়,
“আলাদিনের চেরাগ থাকলে সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলতে পারতাম চাচি। আপনার দূর্ভাগ্য, আমাদের আলাদিনের চেরাগ নাই। তাই একটু দেরি হয়ে গেলো।”
নবনী চোখের ইশারায় বোনের উপর বিরক্তি প্রকাশ করলো।
টুনির মা কুটিল দৃষ্টিতে চাইলো। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করতে করতে বলল,
“মাইয়া মানুষ এইরাম ঠোঁট কাটা হইলে চলেনা বাপু। গুরুজন গো লগে কেমনে কথা কইতে হয় একটু বইনেরে শিখাইয়ো নবনী মা।”
নবনী স্মিত হেসে বলে,
“কিছু মনে কইরেন না চাচি। ও একটু এমনই।”
টুনির মা নবনীর ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে নোলকের দিকে চেয়ে বলে,
“বোনের থেকে একটু আদবকায়দা শিখতে তো পারো মাইয়া। সারাদিন এমন বেটাছেলেদের মতো ছটফট করলে চলে? বিয়া-শাদি করন লাগবো না-নি?”
নোলক ঠোঁট দুটো অস্বাভাবিক চওড়া করে বিদ্রুপের ন্যায় হেসে সায় দেয়ার মতো করে বলে,
“জ্বে, এক্কেরে ঠিক কইছে কুটলি চাচি।”
টুনির মা সরু দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে,
“কুটলি আবার কিয়া?”
নবনীর ততক্ষণে মাথায় হাত। নোলক পুনরায় আগের মতো বিস্তর হেসে বলে,
“মানে হইলো ধোঁয়া তুলশিপাতা, এক্কেরে নিষ্পাপ টাইপ মানুষ।”
টুনির মা এবার বোধহয় খুশি হলো। লাজুক হেসে বলেন,
“হ, তা অবশ্য ঠিক কইছো। আমার আবার সাদা মনে কাঁদা নাই।”
নোলক চেঁচিয়ে উঠে বলে,
“আরেহ কাঁদা কি? বলেন ধুলাবালি অব্দি নাই। এক্কেরে সাদা ফকফকা।”
নবনী মুখ টিপে হাসলো। টুনির মা অবশ্য নোলকের টিটিকারি ধরতে পারলো না। বরং খুশিতে গদগদ হয়ে গেলো। দরদ দেখানোর মতো করে বলল,
“তোমরা দুইডা মাইয়া একলা থাকো, আমার খুব চিন্তা হয় মাঝে-মধ্যে। তাই আইলাম একটু দেখতে।”
নোলক আড়ালে মুখ বাঁকায়।
নবনী বলে,
“চাচি বসেন, আমি চা নিয়ে আসি।”
বলে চলে চায় ভেতরে।
টুনির মা এবার নোলকের একটু কাছে ঝুঁকে বলে,
“তা মা? বোনের বিয়াসাদি নিয়া কিছু ভাবছ? বয়স তো বাড়তাছে। সব কিছুর একটা সময় আছে বুঝলা? সময় থাকতে বিয়া-শাদি করাই ফেলানো উচিত। গার্জিয়ান নিয়া ভাববা না। আমরা আছি না? আমি আর তোমগো চাচা তো তোমগোরে নিজেগো মাইয়ার মতই ভাবি।”
নোলক এতক্ষণে তার আসল মতলব কিছুটা আন্দাজ করতে পারলো। কিছু বলবে তার আগেই টুনির মা কিছুটা নিচু স্বরে বলল,
“আমার কাছে একটা ভালো পাত্রের সন্ধান আছে। তুমি তোমার বইনরে রাজি করাইতে পারলে, আমি বাকিডা ম্যানেজ করতে পারমু। কি কও?”
নোলক তার মতোই নিচু স্বরে বলে,
“তা এ কথা আগে বলবেন না যে, ঘটকালী করতে আসছেন?”

টুনির মা নোলকের খোঁচাটা ঠিক খোঁচা হিসেবে নিলো না। আগের মতোই নিচু স্বরে বললেন,
“ঘটকালী মনে করতাছো ক্যা? আপন মনে কইরা একটা দায়িত্ব নিলাম। পাত্র কিন্তু মেলা ভালা। এইরাম পাত্র সচরাচর পাওয়া যায় না। হাত ছাড়া কইরো না। নবনীর মতো লক্ষীমন্তর মাইয়ার লইগা এক্কেবারে যোগ্য পাত্র।”
নোলক বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করে,
“তা পাত্রর আশায়-বিষয় তো জানি আগে?”
টুনির মার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো। উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে,
“করিম হাওলাদারের একমাত্র পোলাডা। খুবই নম্রভদ্র। কি আদব-কায়দা, মাশাআল্লাহ্‌! তুমি চিন নিশ্চই।”
নোলকের মাথায় চট করেই আগুন খেলে গেলো। তার এতো ভালো বোনের জন্য এমন অসভ্য একটা ছেলের কথা ভাবার জন্যই সামনে বসা মহিলাটাকে অনেকগুলো কড়া কথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো। আগে যতটা না অপছন্দ করতো এই মূহুর্তের পর থেকে আরো দিগুন অপছন্দের মানুষ হয়ে দাঁড়াল টুনির মা। নোলক নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রেখে মুখে টিটিকারির হাসি ঝুলিয়ে বলে,
“হ্যাঁ অনেক নম্রভদ্র। প্রায় প্রতিদিনই পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে খুব আয়েশ করে বিড়ি টানতে দেখি। তবে কুটলি চাচি? তাকে আপনার মেয়ের সঙ্গে খুব মানাবে। এক্কেবারে সোনায় সোহাগা। এমন পাত্র হাত ছাড়া কইরেন না। জলদি বিয়ে দিয়ে দেন। দাওয়াত দিতে ভুলবেন না যেন! অনেক দিন বিয়ে-টিয়ে খাই না।”

টুনির মা মারাক্তক ক্ষ্যাপে গেল। নোলককে চরম বেয়াদপ বলে আখ্যায়িত করলো। নোলকের অবশ্য এতে কিছু গেলো-আসলো না। খুবই শান্ত ভাবে বলল,
“আপনি এখন আসতে পারেন। মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেন গিয়ে। আর হ্যা? দ্বিতীয়বার আমার বোনকে নিয়ে এমন জঘন্য ভাবনা চিন্তার স্পর্ধা দেখাবেন না। এবার ছেড়ে দিলেও পরেরবার ছাড়বো না। মনে থাকে যেন। যান এখন।”
নবনী চা নিয়ে এসে দেখলো টুনির মা হুংকার দিতে দিতে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিছু বুঝতে না পেরে নোলককে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে?”
নোলক অদ্ভুত সুন্দর হেসে জবাব দেয়,
“কিছু না।”
নবনী আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করে না। চা নিয়ে ভেতরে যেতে লাগলে নোলক পিছন ডাকে,
“আপু?”
নবনী পেছন ফিরে বলে,
“কী?”
“আরমান ভাইকে এতো ঘুরাচ্ছো ক্যান? আমি জানি, উনি তোমাকে যতটা পছন্দ করে, তুমিও ঠিক ততটাই পছন্দ করো। তাহলে, কিসের এতো পিছুটান? আমার কথা চিন্তা করে? তোমার কি আমাকে খুব বেশি ছোট মনে হয়, আপু?”
নবনী বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। নোলক এতসব কিছু জানলো কি করে তা ভেবেই যেন দিশেহারা। বিস্ময় ভাব আড়াল করে বলল,
“তুই যা ভাবছিস তেমন কিছুই না বোন। উনাকে আমার পছন্দ নয়।”
নোলক হেসে ফেললো। নবনীর কাছে গিয়ে বলল,
“তাহলে, আরমান ভাই যখন বাসার সামনে এসে ঘুরঘুর করে, তুমমি তখন আড়াল থেকে দেখো কেন? তাকে নিয়ে চিরকুট লিখে লিখে ড্রয়ার ভরাও কেন? শোন, এতো ঢং না করে ঝটপট বিয়ে-টিয়ে করে ফেল বুঝলে? আমার অনেক বিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে।”
নবনী তেড়ে এসে বলে,
“খুব বদমাইশ হয়েছিস, না? তুই আমার ড্রয়ার ধরেছিস কেন? দাঁড়া আজ…”
নোলক ছুটে অনেকটা দূরে চলে এসে বলে,
“ওমাহ! এখন যত দোষ নন্দ ঘোষ, থুক্কু নন্দিনী ঘোষ, না? তুমি একজনকে নিজের পেছন পেছন ঘুরাবা, তারপর আবার তাকে নিয়েই তার আড়ালে চিঠি-ফিঠি লিখবা, আর আমি দেখে ফেললেই দোষ? এখন ঝটপট দুজন মিলে যাও, নয়তো আমি কিন্তু সব গোপন কথা ফাস করে দিবো।”
নবনী হেসে ফেলে। কি চমৎকার সেই হাসি। নোলক মুগ্ধ হয়ে ভাবে, এত সুন্দর, এত স্নিগ্ধ মেয়েটার প্রেমে পড়ে আরমান ভাইয়ের মতো একটু-আধটু পাগলামি করাই তো স্বাভাবিক, বরং না করাটাই অস্বভাবিক!
.
মাঝরাতের দিকে আদ্রর ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভাঙার কারন মাথা ব্যথা করছে, চোখ ব্যথা করছে। ইদানিং তার ঘনঘন মাথা ব্যথা করছে। আপাতদৃষ্টিতে ডক্টর দেখানো প্রয়জন মনে হলেও আদ্রর কাছে তা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। যেখানে সে জীবন নিয়েই খুব বেশি চিন্তাশীল না, সেখানে সামান্য রোগবালাই নিয়ে চিন্তা আসবে কি করে? জীবনকে সে জীবনের গতিতে ছেড়ে দিয়েছে। যথেচ্ছা চলুক!
মাথা ব্যথা যখন বেশি বেড়ে গেলো তখন শোয়া থেকে উঠে বসলো। বালিশের পাশ থেকে চশমাটা নিয়ে চোখে পড়লো। তারপর দেয়াল হাতরে রুমের লাইট অন করলো।
রুমের দুইপাশে দুইটা খাট। অন্যপাশের খাটটাতে ইশান ঘুমাচ্ছে। আদ্র’র মনে হলো সে এক্ষুনি মারা যাবে। এত অসস্তি এত অশান্তি আগে কখনো লাগেনি। চোখ থেকে শুরু করে পুরো মাথা দপদপ করছে। বিছানার থেকে নেমে গ্লাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি পান করলো। গ্লাস টেবিলে রাখতে গিয়ে নিচে পড়ে গেলো। চূড়মুর আওয়াজে ইশান চমকে সজাগ হয়ে গেলো। ঘুম ঘুম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“এই আদ্র? ঠিক আছিস? কিসের আওয়াজ হলো?”
আদ্র ইশানের দিকে চাইলো। নিজের দুর্বলতা প্রকাশ না করে মৃদু স্বরে বলল,
“কিছু হয়নি, গ্লাস ভেঙে গিয়েছে। তুই ঘুমা।”

ঘুমের ঘোরে থাকা ইশান ‘ওহ’ বলে আবার শুয়ে পড়লো।
আদ্র লাইট অফ করে দিলো। দুই হাতে মাথার চুলগুলো খুব শক্ত করে মুষ্ঠিবদ্ধ করে বিছানায় বসে রইলো, নিশ্চুপ, নির্লিপ্ত ভাবে। চুলগুলো সব টেনে টেনে ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। কি অসহ্য যন্ত্রনা!…..#জলছবি
#পার্ট_১৭
#কাজী_সানজিদা_আফরিন_মারজিয়া
.
শেষ রাতে ঘুমানোর ফলে নবনীর ঘুম ভাঙলো অনেক দেরিতে। বালিশের পাশে হাতরে ফোন নিয়ে দেখলো নয়টা চল্লিশ বাজে। নবনী হুড়মুড় করে উঠে বসলো। এতো বেলা করে সে কখনই ঘুম থেকে উঠে না। পাশে তাকিয়ে দেখলো নোলক নেই। প্রথমে আফসোস করলো না খেয়ে কলেজ চলে গিয়েছে ভেবে। পরে মনে পড়লো আজ শুক্রবার।
তারপর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে নোলকে ডাক দিবে তখন শুনতে পেলো ড্রয়িংরুম থেকে একটু আড্ডাসুলভ আওয়াজ ভেসে আসছে। নবনী সাতপাঁচ না ভেবে চশমাটা পড়ে নিয়ে সেদিকে পা বাড়ালো। পর্দা সরিয়ে রুমে প্রবেশ করতেই আৎকে উঠলো যেন। এক হাতে চশমা ঠিক করে রুক্ষ স্বরে বলে উঠলো,
“আশ্চর্য! আপনি এখানে কেন এসেছেন? দিনকে-দিন আপনার সাহস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি!”
নোলক আর আরমান দুজনই এক সঙ্গে তাকালো নবনীর ধারালো কন্ঠস্বর শুনে। নোলক কাছে এসে বলল,
“আপু উঠে গিয়েছো? কখন উঠলা?”
নবনীর চোখেমুখে রাজ্যের বিতৃষ্ণা। নোলকের প্রশ্ন কানে না তুলে তেজী কন্ঠে উল্টো প্রশ্ন করলো,
“উনি এখানে কি করছে? কে আসতে দিয়েছে?”
নোলক এবং আরমান দুজনই বুঝতে পারছে নবনী প্রচন্ড রেগে গিয়েছে। নোলক বলে,
“আমি আসতে বলেছি।”
নবনী কিছু বলবে তার আগেই আরমান বলে,
“ওকে বকো না। আমিই ইচ্ছে করে এসেছি। আচ্ছা স্যরি! চলে যাচ্ছি।”
নবনী নিজেকে যথেষ্ট সংযত রাখার চেষ্টা করে বলল,
“তা আবার গর্ব করে বলছেন? আমি জাস্ট ভেবে পাই না, একটা মানুষের কমনসেন্স এত কম কি করে হতে পারে! আপনি জানেন, আমরা বাসায় দুইটা মেয়ে তবুও আপনি কোন সেন্সে ভেতরে এসেছেন? এলাকায় কি থেকে কি রটে যায়, আপনার কোনো ধারনা আছে?”
আরমান পুনরায় অপরাধ মেনে নিয়ে বলে,
“আচ্ছা তেমন কছুই হবে না। অযথা এতো রাগ করো না। আমি চলে যাচ্ছি।”
নবনী খুবই দৃঢ় ভাবে বলে,
“হ্যাঁ, আমার রাগটাকে তো আপনার কাছে অযথা মনেই হবে। শহরের অন্যতম সেরা ব্যবসায়ী, কত পাওয়ার! একটু-আকটু কথা রটে গেলে কি এমন হবে? তার উপর আবার ছেলে মানুষ, মেয়ে তো নন। অত চিন্তা কিসের? এসব কথা-টথায় কি এমন হবে? তাই মনের আনন্দের বাসার সামনে ঘুরঘুর করবেন, রাস্তাঘাটে ফলো করবেন, উদ্ভট উদ্ভট কাজকারবার করবেন, ইচ্ছে হলে বাসায় চলে আসবে, যখন যা ইচ্ছে তাই করবেন। আপনার তো আত্মসম্মান নেই যে আত্মসম্মানে লাগবে! যা হওয়া আমাদের হবে, আত্মসম্মানে আঘাত আমাদেরই আসবে। টুনির মা ঘুরেঘুরে বদনাম ছড়াবে আমাদের। আপনার তো কিছু যাবে-আসবে না। অত চিন্তার কি আছে, তাই না?”
এক দমে কথা গুলো বলে হাঁপিয়ে উঠলো নবনী। চশমার ফাঁকে টলটলে চোখ দুটো খুব টানলো আরমানকে। বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো। আসলে সে এতসব ভেবে তো কিছু করেনি। এতোটা নেগেটিভ এফেক্ট পড়বে তাও ভাবেনি সে!
আরমান নবনীর সামনে এসে খুব দরদমাখা কন্ঠে সুধালো,
“শুধু একবার বলো, বিয়ে করবে আমায়? বিশ্বাস করো, তোমার আত্মসম্মানে বিন্দুমাত্র টোকাও লাগতে দিবো না। করবে বিয়ে?”
নবনী চমকে তাকালো। এতো কঠিন কঠিন কথার শেষে এমন করে কেউ বলতে পারে, তা যেন ধারনাতেই ছিলো না। এই দুই বছরে কম কথা তো শোনায়নি! তবুও যেন কোনো কথাই লোকটার গায়ে লাগে না!
নোলক বোনের এমন কঠিন কঠিন কথায় খুব আহত হলেও তার জবাবে আরমানের এমন মায়াময় আবদারে খুব বেশি সন্তুষ্ট হয়। বোনের জন্য এর থেকে পারফেক্ট কাউকে ভাবতেই পারছে না এই মূহুর্তে। কিন্তু তার খুশি ভাবটা উড়ে গেলো যখন নবনী উত্তরে বলল,
“না। আমার প্রতি, আমার বোনের প্রতি কেউ করুনা দেখাক তা আমি চাই না। আপনি আপনার পথ দেখুন। দয়া করে আমায় জ্বালানো বন্ধ করুন। আমি আমার জন্য খুব সাধারন কাউকেই চাই। তার অনেক টাকাপয়সা থাকবে না। যার অনেক ক্ষমতাও থাকবে না। আমি খুব ভালো করেই জানি, দুদিন পর আপনার এসব প্রেম ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালাবে।”
আরমান করুন স্বরে বলে,
“হায়রে! এ আমি কার প্রেমে পড়লাম! সারা জীবন শুনলাম টাকাপয়সা না থাকলে নাকি প্রেম ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়, এখন শুনি টাকা পয়সা বেশি হলে নাকি…..!”
এতো সিরিয়াস মূহুর্তেও আরমানের বলার ভঙ্গিতে নোলক ফিক করে হেসে দিলো।
কপট রাগ নিয়ে নবনী একবার বোনের দিকে চাইলো, একবার আরমানের দিকে। নোলক কিছুটা দূরে গিয়ে বলল,
“ভাইয়া, আপু মিথ্যে বলছে। আপুও আপনাকে পছন্দ করে। এমনকি চিঠি-ফিঠিও লিখে! কিন্তু মুখে স্বীকার করে না। প্লিজ জলদি জলদি বিয়ে-টিয়ে করে ফেলুন তো।”
নবনী বোনের এহেন কান্ডে হতভম্ব। আড়াল করার জন্য বলল,
“এই না। মিথ্যে কথা। প্লিজ আপনি যান। টুনির মা নিশ্চিত একটা তুরকালাম বাঁধাবে। এমনিতেই তিনি আমাদের উপর ক্ষ্যাপে আছে।”
“আচ্ছা টুনির মার চিন্তা বাদ, তুমি শুধু বলো, নোলক যা বলল, তা কি সত্যি?”
“না।”
নোলক বেগরা দিয়ে আরমানকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“আরেহ আজব! মেয়েদের ‘না’ মানে ‘হ্যা’ বোঝেন না ক্যান? ঐ যে, ঐ গানটা শোনেননি? ‘সব কথা বলে না হৃদয়, কিছু কথা বুঝে নিতে হয়!'”
আরমান একগাল হেসে বলে,
“ওকে দ্যান, টুনির মা তুরকালাম বাধানোর আগে নাহয় আমি-ই বাধিয়ে ফেলি?”
নবনী বিস্ময় নিয়ে তাকায়। এই ছেলের বিশ্বাস নেই। যা কিছু করতে পারে। নোলক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে কি করবে তা দেখার। দুজনকেই অবাক করে দিয়ে কাউকে ফোন লাগায় আরমান। ওপাশ থেকে কল ধরতেই বলে,
“এই ইশু তোকে আমি একটা এড্রেস দিচ্ছি। বিশ মিনিটের মাঝে সেখানে কাজি নিয়ে আসবি। আর হ্যা, আমাদের লেখক সাহেবকেও সাথে আনিস।”
বলেই ফোন কেটে দেয়। নবনী জিজ্ঞেস করে,
“কি হচ্ছে কি? আপনি যাচ্ছেন না কেন?”
নবনীর কথা কোনো রকম পাত্তা না দিয়ে আরমান আবার কাউকে কল দিলো। ওপাশ থেকে ফোন তুলতেই বড় আহ্লাদ মেশানো কন্ঠে বলল,
“আম্মা? তোমাকে আর আব্বাকে ছাড়া বিয়ে করে তোমাদের বউমাকে নিয়ে যদি বাড়ি ফিরি, তুমি কি খুব রাগ হবা?”
ওপাশ থেকে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে,
“কি কস আব্বা? কারে বিয়া করসছ? নবনী মার কি হইবো?”
আরমান হো হো করে হেসে বলে,
“তোমার ছেলের তারে ছাড়া আর কাউরে বিয়ে-ফিয়ে করা সম্ভব নয়। তবে বিয়ে এখনও করিনি, করবো। তোমাকে পরে সব বিস্তারিত বলবো আম্মা। এখন খালি অনুমতিটা দিয়ে দেও তো।”
“তোর সব কাজে আমার অনুমতি আছে বাপজান। কিন্তু তোর আব্বা? তারে কি কমু?”
“তুমি ম্যানেজ করো আম্মা। এখন রাখছি।
দোয়া করো।”
আরমানের মা এক গাল হেসে বলল,
“অনেক দোয়া বাপ। বউমারে নিয়া শিঘ্রই গ্রামে ফির।”
“ইনশাআল্লাহ। আসবো আম্মা। রাখছি।”
বলে ফোন রেখে রহস্যময় হাসে।
নবনীর চোখেমুখে দারুন বিস্ময়। কি থেকে কি হতে যাচ্ছে কিছু ঠাওর করতে পারছে না। ছেলেটা কি পুরোপুরি পাগল-টাগল হয়ে গেলো নাকি?
নোলক খুব আগ্রহ নিয়ে সবটা দেখছে। আরমানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে সুধায়,
“এই ভাইয়া? সত্যি সত্যি আমার আপুকে বিয়ে করে ফেলবা নাকি আজ?”
আরমান নোলকের মতোই ফিসফিয়ে বলে,

“মনেহয়! তুমি তোমার বন্ধুদের ডেকে ফেলো তো। ঝটপট।”
নোলক সুবোধ বালিকার মতো তাই করে।
নবনী ফিকে রাগ দেখিয়ে বলে,
“আজব তো! উনাকে যেতে বলছিস না কেন?”
নোলক বলে,
“তুমি বউ মানুষ, এত কথা বল কেন? বউদের চুপচাপ থাকতে হয়। রাগ দেখিও না তো। বউদের রাগ দেখানোর নিয়ম নেই।”
নবনী বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়!

প্রায় আধা ঘন্টা পর ইশান আর আদ্র এড্রেস অনুযায়ী চলে আসে। দরজা খুলে ওদের দুজনকে দেখে নোলকের চোখ ছানাবড়া! চাপা উৎকন্ঠা নিয়ে বলে,
“আপনারা?”
আদ্র এক পলক নোলককে দেখে ইশানকে জিজ্ঞেস করে,
“কই নিয়ে এলি?”
ইশান নিজেও অবাক। বৃদ্ধ কাজি বলে,
“আমরা কি ভুল বাড়ি চইলা আসছি? এইডা তো বিয়া বাড়ি বিয়া বাড়ি মনে হইতাছে না।”
ইশান সবার দিকে ঘুরেফিরে তাকিয়ে বলতে লাগে,
“আমি তো…!”
পুরো কথা শেষ করার আগে আরমান এগিয়ে এসে বলে,
“চলে আসছিস? আয়, ভেতরে আয়। পাত্রী কিন্তু যখন তখন বেঁকে বসতে পারে। আতংকে আছি ভাই।”
ইশান এবং আদ্রর দুজনেরই প্রথমে বুঝতে বেগ পেতে হয়, বিয়েটা আসলে কার? পরে সংক্ষেপে সবটা শুনে আসল বিষয়টা বুঝলো।
ততক্ষণে ফয়সাল, লুবনা, নিষাদ সহ সকলে চলে এলো। বাসা তখন ভরপুর।
আদ্র তার স্বভাবসুলভ চুপ রইলেও ইশান মজার মজার কথা বলতে আরম্ভ করলো।

নবনীর ভাবনা চিন্তা সব তালগোল পাঁকিয়ে যেতে লাগল। নিজের রুমে এসে কিছুক্ষণ বসে ছিলো। কিন্তু যখন দেখলো ব্যাপরটা বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে তখন আচমকাই আবার রেগে গেলো। রুমে যখন শ্রেয়া লুবনা নোলক এলো তখন সে একপ্রকার চেঁচিয়ে বলল,
“আশ্চর্য! এখানে কি সার্কাস হচ্ছে? মানে হচ্ছেটা কি? একটা এলাকাতে থাকি তো নাকি? তারা কি আমাদের এলাকা ছাড়া করতে চাচ্ছে?”
নবনী যখন খুব রেগে গেলো তখন পরিবেশে কিছুটা থমথমে ভাব বিরাজ করলো। কিছুসময় পর নোকল এক প্রকার ইমোশনাল ব্লাকমেইল করলো। এর পেছনে অবশ্য কারন আছে। কারণ ও জানে বোনটা ওর কথা ভেবেই নিজের অনুভূতি চেপে রাখতে চাচ্ছে। কিন্তু সে এমনটা আর হতেই দিবে না। বোনের অনুভূতি টের পাওয়ার পরপরই ফয়সাল, সৃজন, নিষাদকে দিয়ে খোঁজ লাগিয়েছিল। এবং খুব ভালো ফিডব্যাক পেয়েছে। তার নিজেরও আরমানকে বেশ ভালো লেগেছে। নিজ থেকে এই মেয়ে নিজের অনুভূতি স্বীকার করবে না বুঝতে পেরেই এই পন্থা অবলম্বন করলো। এবং সব শেষে সফলও হলো।
জুমার নামাজের আগে আগেই কাবিন হয়ে গেলো নোলক আর আরমানের। সেই ছোট্ট বয়স থেকে এত এত টানাপোড়ন শেষে বোনের জীবনের কিছুটা পূর্ণতা দেখতে পেয়ে নোলকের অদ্ভুত অনুভূতি হলো। ভালো লাগলো, শান্তি লাগলো।

সকল আনুষ্ঠানিকতা যখন শেষ দিকে ঠিক তখন নোলকদের দরজায় কলিংবেল বেজে উঠলো। নোলক গিয়ে দরজা খুলতেই এলাকার কিছু মানুষ নিয়ে হুড়মুড় করে রুমে ঢুকলো টুনির মা।…(চলবে)

(এই পার্টটা শুধুই আরমান আর নবনীকে নিয়ে। গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ।)(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here