তিক্ততার সম্পর্ক পর্ব -০৬-১০

#তিক্ততার_সম্পর্ক
Writer: #Tahmina_Toma
Part: 06

ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে বললো, কী হলো ভাইয়া কিছু বলছো না কেনো তুমি ?

ইয়াদ নিজেকে সামলে গম্ভীর গলায় বললো, আমি কী করবো, কিছুই করিনি শুধু বুঝিয়েছি তোকে যেনো আর বিরক্ত না করে।

ইয়ানা বললো, ওহ্ তাই বলো।

ইয়াদ বললো, রাত হয়েছে অনেক ঘুমিয়ে পড় গিয়ে।

ইয়ানাও গুড নাইট বলে চলে গেলো। সকালে অফিস যেতে হবে তাই ইয়াদও ওয়াশরুম গেলো ফ্রেশ হতে। মুখে পানির ছিটা দিয়ে আয়নার দিকে তাকালো। ইয়াদের মা মিসেস রুবিনা মারাত্মক সুন্দরী মহিলা। ইয়াদ, ইয়ানা আর ইশান তিনজনই তার মতো অত্যাধিক সুন্দর হয়েছে। ইয়াদের মুখ থেকে পানিগুলো টপটপ করে পরছে তাতে তার সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেছে। ইয়াদ নিজের এই সৌন্দর্যকেও ঘৃণা করে কারণ সে এটা তার মা নামক একজন প্রতারক মহিলার থেকে পেয়েছে। ছেলেরা মেয়েদের সম্মান করতে শেখে তার মায়ের থেকে আর ইয়াদের কাছে তার মাই পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণিত মহিলা তাহলে কীভাবে সে অন্য মেয়েদের সম্মান করতে শিখবে ?

ইয়াদ আয়নায় নিজের মুখের ওপর হাত রেখে বললো, মিস্টার আবরার হামিদ ইয়াদ সবাইকে বলে বেড়াও মুখোশধারী। তুমি নিজেও কী কম মুখোশধারী ? তোমার মুখোশের আড়ালে যে ভয়ংকর রুপ লুকিয়ে আছে সেটা তোমার বোন জানতে পারলে ? ঘৃণা করবে হ্যাঁ ঘৃণা। তুমি যেমন তোমার মুখোশধারী মা-বাবাকে ঘৃণা করো তোমার বোনও তোমাকে ঘৃণা করবে। কিন্তু আমি তো আমার বোনকে কখনো আমার ভয়ংকর রুপ জানতে দিবো না। এই গম্ভীর খোলসের আড়ালে ভয়ংকর রুপটা লুকিয়ে রাখবো যতদিন না তাদের খোঁজে পাচ্ছি। আজ বারোটা বছর ধরে সারাদেশে তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছি তাদের। খুব তাড়াতাড়ি পেয়েও যাবো ইনশাআল্লাহ। তোমাদের দিন ফুরিয়ে এসেছে মুখোশধারী মিস্টার এন্ড মিসেস হামিদ।

কথাগুলো বলে পাগলের মতো হাসতে লাগলো ইয়াদ। সেটা কোনো মুগ্ধ করা হাসি নয় বরং ভয়ংকর হাসি। এই হাসিতে লুকিয়ে আছে হাজারো কষ্ট, অভিমান, রাগ আর প্রতিশোধের নেশা। ইয়াদ নিজের প্রতিশোধের কথা মনে হতেই রেগে লাল হয়ে গেলো। ভুলে গেলো সারা বিকেল তাকে তাড়া করে বেড়ানো সেই মায়াবী চোখ। তার জীবনে নারী প্রবেশ নিষিদ্ধ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ইয়াদ রুমে এসে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো। একসময় ঘুমিয়েও গেলো ইয়াদ।

তৃষ্ণায় ক্লান্তিতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে ইয়াদের কিন্তু এক ফোঁটা পানির দেখা মিলছে না। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ঢোক গিলতে গেলেও ব্যাথা করছে। যেদিকে তাকাচ্ছে শুধু ধূ-ধূ মরুভূমি। বালি আর বালি কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই সেখানে। ইয়াদের মনে হচ্ছে সে এক ফোটা পানি না পেলে এখনই ছটপট করে মারা যাবে।

ইয়াদ অনেক কষ্টে বললো, কেউ আছেন একটু পানি খাওয়ান নাহলে মরে যাবো আমি।

ইয়াদের কথার উত্তর দেওয়ার মতোও কেউ নেই তার কাছে। ধূ-ধূ প্রান্তরে সে একা দাঁড়িয়ে আছে। টলমলে পায়ের সামনের দিকে আগাতে লাগলো ইয়াদ একটু পানির আশায়। অনেক পথ সামনে গিয়ে মরুভূমির মাঝে এক টুকরো সবুজ দেখতে পেলো। পানির আশায় পাগলের মতো ছুটতে লাগলো সেদিকে। ভয় হচ্ছে যদি মরিচীকা হয়ে ধোঁকা দেয় তাকে। ধোঁকা খাওয়ার ভয় নিয়ে তবু আগাচ্ছে ইয়াদ মনের কোণে এক টুকরো বিশ্বাস নিয়ে যদি মরীচিকা না হয় তাহলে একটু পানি পেয়ে যাবে সে আর তাতে জীবন বাঁচবে তার। বারবার হোঁচট খেয়ে পরছে ইয়াদ কিন্তু ভেঙে পরছে না আবার উঠে দাঁড়িয়ে সেদিকে ছুটছে সে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারলো না সে কোনো মরীচিকার পেছনে ছুটেনি। তার সামনে মরুভূমির মাঝে এক টুকরো সবুজ বাগান। নানা ফুলে ভড়ে আছে সেই বাগান যেনো চোখ জুড়িয়ে যায় বাগানের দিকে তাকালে। এক একটা ফুল যেনো তাকে হাত ছানি দিয়ে ডাকছে।

ইয়াদ একটা সাদা গোলাপ ছেঁড়ার জন্য হাত বাড়াতেই পেছন থেকে মোহনীয় এক নারী কণ্ঠে বলে উঠলো, অনেক যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে এই মরুভূমির মাঝে ফুল ফুটিয়েছি। এতো সহজে কীভাবে ছিঁড়ে নিতে দিবো জনাব ? ফুল নিতে হলে যে তার মূল্য চুকাতে হবে।

এই ফুল না নিতে পারলে ইয়াদের মনে হচ্ছে এ জীবন বৃথা তাই পাশে তাকালো কে কথাটা বলেছে দেখার জন্য। উল্টো দিকে ফিরে গাছে পানি দিচ্ছে সাদা ধবধবে বোরখা পড়া এক রমণী। পানি দেখে ইয়াদের তৃষ্ণার কথা মনে হলো। এই বাগান আর ফুল দেখে ইয়াদ তৃষ্ণার কথা ভুলে গিয়েছিলো সম্পূর্ণ।

ইয়াদ ব্যস্ত স্বরে বললো, মূল্য যা দিতে হবে দেবো তবু একটু পানি পান করিয়ে আমার তৃষ্ণা মেটাও দয়া করে।

নারী কণ্ঠস্বর হেঁসে বললো, নারী বিমুখ পুরুষ আজ এক নারীর কাছে দয়া চাইছে ?

ইয়াদ কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। যে করেই হোক একটু পানি তার চাই জীবন বাঁচাতে।

সে আবার বলে উঠলো, শুধু পানি নয় আপনার সামনে যা দেখতে পাচ্ছেন সবই আপনাকে দিয়ে দেওয়া হবে শুধু তার মূল্য দিতে হবে বিনিময়ে।

ইয়াদ ব্যস্ত হয়ে বললো, কী সেই মূল্য ?

মেয়েটা এবার ইয়াদের দিকে তাকিয়ে বললো, একটু ভালোবাসা, আপনার বুকের বা পাশে একটু জায়গা দিন। এই সম্পূর্ণ বাগানের সাথে নিজেকেও বিলিয়ে দিবো আপনার পায়ে।

মেয়েটাকে দেখে চমকে উঠলো ইয়াদ। সেই ভেজা মায়াবী চোখ জোড়া তাকিয়ে আছে ইয়াদের দিকে। তার চোখে ইয়াদের একটু ভালোবাসা পাওয়ার তীব্র আকুতি দেখা যাচ্ছে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো ইয়াদ। সত্যি সত্যি তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে গলা। তাড়াতাড়ি সাইড টেবিল থেকে পানির জগ নিয়ে ঢকঢক করে সবটা খেয়ে নিলো। হাঁপাচ্ছে ইয়াদ যেনো স্বপ্ন নই সত্যি ছিলো সব। এতোক্ষণে টনক নড়লো ইয়াদের রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। টেবিল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত তিনটা বাজে কেবল। আজ ২৪ বছর ধরে ইয়াদের ঘুম ভাঙছে সেই স্বপ্ন দেখে। কাউকে গলায় দড়ি চেপে খুন করা হচ্ছে আর বাচ্চা ছেলেটা ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে তবে আজ কেনো অন্য স্বপ্ন দেখলো সে। তাও আবার সেই মেয়েটার।

ইয়াদ বিড়বিড় করে বললে, আমার সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে ঐ মেয়েটাকে হেল্প করা। কী করে ঐ মেয়ে আমার লাইফে এতটা প্রভাব ফেলতে পারে ?

ইয়াদ বড়বড় পা ফেলে ওয়াশরুমে গেলো আর চোখেমুখে পানির ছিটা দিলো। সে কিছুতেই ভাবতে পারছে না সে আজ সেই স্বপ্নটা দেখেনি। ছোটবেলায় পুরো একবছর অসুস্থ ছিলো ইয়াদ। মাথায় আঘাত লাগার কারণে সারা কোমায় চলে গিয়েছিলো। সবকিছু ভুলে গিয়েছিলো আগে তার সাথে কী হয়েছিলো। দীর্ঘ এক বছর বেডে পরে থাকার পর ঐ স্বপ্ন দেখে একদিন চিৎকার করে উঠে বসে ইয়াদ। সেদিন বুঝতে পারেনি সেই স্বপ্নের মানে। ইয়াদ যখন চিৎকার করে উঠে বসে তখন রুবিনা তার পাশেই ছিলো। ছেলেকে সুস্থ হতে দেখে সে কী খুশি। ইয়াদকে বলা হয়েছিলো খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলো সে আর মাথায় আঘাত লাগার কারণে কোমায় চলে যায়। এরপর থেকে প্রতিদিন ইয়াদের ঘুম ভাঙতো সেই একই স্বপ্ন দেখে। মানে বুঝতে পারতো না সেই স্বপ্নের মাকে জিজ্ঞেস করতো ছোট ইয়াদ। উত্তর পেতো সে দুঃস্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু যেদিন ইয়াদের আঠারো বছর পূরণ হয় সেদিন জানতে পারে ইয়াদ সেই স্বপ্নের মানে। তারপর থেকে আজ বারোটা বছর ধরে তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে ইয়াদ। যে স্বপ্নটা থেকে মুক্তি পেতে সে ছটফট করেছে সেই স্বপ্নটা একসময় তাকে এমন ভয়ংকর তৈরি করেছে তাহলে আজ কীভাবে পাল্টে যেতে পারে সেই স্বপ্ন? ইয়াদের মাথা কাজ করছে না। রুমের পাশের মিনি ছাঁদটাতে গিয়ে পাঞ্চিং ব্যাগটাতে পাগলের মতো পাঞ্চ করতে লাগলো। কী হচ্ছে এসব তার সাথে কিছুই বুঝতে পারছে না। গতকালের বিকেলটা তার কাছে অভিশপ্ত মনে হচ্ছে কেনো দেখা হলো ঐ মেয়ের সাথে কেনো ? অনেকটা সময় পর আযানের ধ্বনি ভেসে আসলো কানে। ইয়াদ একটু শান্ত হলো ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নামাজটা পরে নিলো। ইয়াদ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার চেষ্টা করে সবসময় তবে সেটা সবার আড়ালে। আল্লাহর কাছে একটু শান্তি চায় সে কিন্তু তার জন্য হয়তো আল্লাহ সেটা সৃষ্টিই করেনি আর একজনের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাতে।

১০.
কেটে গেলো বেশ কিছুদিন ইয়াদ সেই চোখ দুটো যত ভুলার চেষ্টা করেছে তত বেশি বিরক্ত করেছে সেই মায়াবী চোখ। তবে সেদিনের মতো আর কোনো স্বপ্ন দেখেনি আগের মতো আবার সেই একই স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙে ইয়াদের। মেয়েটাকে নিয়ে আর মাথা ঘামায় না মনে পড়লে পড়ে তাতে তার কিছু যায় আসে না। এদিকে ইশান বিনা কারণে সেই অদ্ভুত মেয়েটাকে খুঁজছে কেনো খুঁজছে হয়তো সে নিজেও জানে না। ইমার হাতটা ঠিক হয়ে গেছে তাই আজ ভার্সিটি যাবে আরমানকে বলেছে আর আরমানও অনুমতি দিয়েছে যাওয়ার জন্য। সকাল সকাল উঠে নামাজ পড়ে বাসার সব কাজ সেড়ে নিলো ইমা৷ নাহলে মণি একটুও ছাড় দিবে না তাকে।

ব্রেকফাস্ট করতে এসে চেয়ার টেনে বসে কথা বললো, আপু আজ ভার্সিটি যাবে ?

ইমা মুচকি হেঁসে বললো, হ্যাঁ যাবো তো।

কথা খুশি হয়ে বললো, তাহলে একসাথে যাবো আমরা ওকে ? আমার কলেজ ক্রস করেই তোমাকে ভার্সিটি যেতে হবে।

ইমা কথার দিকে তাকালো। হাসলে মেয়েটাকে কতো সুন্দর দেখায় তবু হাসে না সহজে। কী করে হাঁসবে এই বাড়িতে যে হাসাও বারণ।

ইমা এক দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে তারপর মুচকি হেঁসে বললো, ঠিক আছে একসাথে যাবো।

কথা আর ইমার কথার মাঝেই আরমান, ইমার মণি আর নানু এসে যার যার চেয়ারে বসে পড়লো। তা দেখে ইমা আর কথা চুপ হয়ে গেলো।

এক টুকরো সাদা রুটি আর গরুর কলিজা ভূনা দিয়ে মুখে পুরলো আরমান। মুখে হয়তো কোনোদিন বলবে না তবে সে মনে করে ইমার হাতে জাদু আছে যেটাই রান্না করে অমৃত মনে হয়। বেশ আয়েশ করে খাচ্ছে আরমান।

মুখের খাবার শেষ করে হঠাৎ বলে উঠলো, মা বাবা কবে আসবে ?

ছাহেরা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো, আজ চলে আসবে তবে বাসায় আসতে রাত হবে। ডিনারের সময় আসতে পারে।

আরমান ছোট করে ওহ্ বলে পুনরায় নিজের খাবারে মনোযোগ দিলো। আর ইমা যার যেটা লাগছে সেটা এগিয়ে দিচ্ছে। খাওয়া শেষে আরমান বের হয়ে গেলো। এদিকে সব গুছিয়ে রেডি হয় নিলো ইমা। এতো তাড়াতাড়ি করছে তবু লেট হয়ে গেছে কথা বারবার তাড়া দিচ্ছে।

ড্রয়িংরুমে আসতেই মণি বলে উঠলো, ঠিক সময়ে বাড়ি পৌঁছে সব কাজ না করলে তোর খবর আছে বলে দিলাম ইমা। টিয়ার রান্না বাসার কেউ খেতে পারে না সেটা খুব ভালো করেই জানিস তুই।

ইমা নিচু গলায় বললো, আমি ঠিক সময়ে চলে আসবো মণি।

আর কথা না বাড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এলো। গেইটের বাইরে আসতেই কথাকে দেখতে পায় রিকশায় বসে ওয়েট করছে ইমার জন্য। এই বাড়িতে তিনটা গাড়ি আছে। একটা আরমানের, একটা তার বাবার আর একটা বাড়ির সবার জন্য। আরমান আর তার বাবা নিজেদের গাড়ি নিজেরাই ড্রাইভ করে আর বাড়িতে যেটা আছে সেটার জন্য একটা ড্রাইভার আছে। ইমার আঙ্কেল হামিদ গ্রুপ অব কোম্পানিতে চাকরি করে। ইমা ভেবে পায় না একটা কোম্পানি চাকরি করে আঙ্কেল এতো টাকা পয়সা, গাড়ি, বাড়ি কীভাবে করলো। যার উত্তর পেতে বারবারই ব্যর্থ সে। আঙ্কেলের কাজ নিয়ে বাড়ির আর কারো অবশ্য কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কথা গাড়ি নিয়ে যাওয়া পছন্দ করে না তাই প্রতিদিন রিকশা করেই যায়। পছন্দ না করারও একটা কারণ আছে অবশ্য। এই গাড়ি নিয়ে একদিন অনেক কথা শুনতে হয়েছিলো তার মায়ের কাছে। তারপর আর গাড়ি নিয়ে কলেজে যায় না সে।

ইমা আশপাশে তাকিয়ে দেখছে কথা হঠাৎ বললো, আচ্ছা ইমা আপু মা আর ভাইয়া তোমাকে এতো কষ্ট দেয় তবু তাদের কিছু বলো না কেনো ?

কথার প্রশ্নে ইমা কথার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বললো, যার পায়ের নিচে দাঁড়ানোর মতো মাটি নেই তার পক্ষে সয্য করা ছাড়া কোনো অপশন নেই কথা।

কথা ইমার দিকে তাকিয়ে বললো, একদিন তোমাকে কেউ নিজের থেকেও বেশী ভালোবাসবে দেখে নিও আপু।

কথা আর ইমা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলো হঠাৎ রিকশা ব্রেক করলে দুজনই অসাবধানতায় নিচে পরে যায়। ইমা রাস্তার পাশে মাটিতে পড়তেও কথা পিচঢালা রাস্তায় পরে, যার জন্য হাত ছিলে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। কথা উঠার চেষ্টা করলেও উঠতে পারে না। এদিকে ইমা কোনো রকমে উঠে দাঁড়ায় সেও পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। ইমা সামনে তাকিয়ে দেখে একটা কালো রঙের লেটেস্ট বিএমডব্লিউ ব্র্যান্ডের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে আর কথা উঠার চেষ্টা করেও উঠে দাড়াতে পারছে না। ইমা খুড়িয়ে খুড়িয়ে কথার দিকে যেতে লাগলো আর কথা হাত চেপে ধরে বসে আছে।

চলবে,,,,,#তিক্ততার_সম্পর্ক
Writer: #Tahmina_Toma
Part: 07

ইমা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কথার কাছে গিয়ে বসে বললো, কথা ঠিক আছিস তুই ?

কথা টলমলে চোখে ইমার দিকে তাকালো। মেয়েটা বড্ড চাপা স্বভাবের ইমা সেটা জানে। হয়তো বেশি ব্যাথা পেয়েছে তাই চোখ ভড়ে গেছে পানিতে।

ইশান সিট বেল খুলে তাড়াতাড়ি নেমে এলো গাড়ি থেকে আর এগিয়ে আসতে আসতে বললো, সরি সরি আই এম রেলি সরি। আপনারা ঠিক আছেন ?

ইশানের কথা শুনে ইমা আর কথা দুজনেই তার দিকে তাকালো। কথাকে দেখে ইশান থমকে গেলো আজ কতদিন ধরে মেয়েটাকে খুঁজছে আর এভাবে পেলো তাকে।

ইমা ছেলেটার থমকে যাওয়া দেখে ভ্রু কুঁচকালো আর কথার চোখেমুখে রাগ ফুটে উঠলো কথা অনেকটা চমকে জোরে বলে উঠলো, আপনি ?

ইশানের ঘোর কাটে কথা চেচানোতে আর ইমা ভ্রু কুঁচকে বলে, কথা তুই চিনিস উনাকে ?

কথা বললো, হ্যাঁ কয়েকদিন আগেও একবার মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলাম। এই মহাশয়ের গাড়ি ধাক্কা দিতে দিতে থেমে যায় সামনে এসে আর আজও তাই করলো।

ইশান কথা কী বলেছে শুনতে পায়নি। সে ইমার বলা নামটা বারবার আওড়াচ্ছে বিড়বিড় করে বললো, এই মেয়ের নাম কথা।

কথা ইশানের সামনে তুড়ি মেরে বলে, ও হ্যালো মিস্টার আপনি কী গাড়ি চালাতে পারেন না ?

ইশান থতমত খেয়ে বললো, গাড়ি চালাতে পারবো না কেনো ? দেখুন আজকে আমার দোষ নেই মোড় নেওয়ার সময় আমি হর্ণ দিয়েছি আপনাদের রিকশাওয়ালা সেটা উপেক্ষা করে চলে এসেছে।

রিকশাওয়ালা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো সে ভীত গলায় বললো, আপা আসলে স্যারের দোষ নাই। আমি নতুন রিকশা চালাইতেছি তাই ভয় পাইয়া কী করুম বুঝতে পারি নাই ?

কথা আর কিছু বললো না কথা হাতে রক্ত বন্ধ করার জন্য চেপে ধরে আছে দেখে ইশান নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে শক্ত করে বেঁধে দিলো। কথা বাঁধা দিচ্ছিলো কিন্তু ইশান কী আর বাঁধা শোনার পাত্র। হাত বাঁধা হয়ে গেলে ইমা কথার হাত ধরে উঠানোর চেষ্টা করে বললো, কথা এভাবে রাস্তায় বসে থাকলে লোকজন আসতে যেতে তাকিয়ে আছে একটু কষ্ট করে উঠ বোন।

কথা ইমার হাত ধরে উঠার চেষ্টা করে কিন্তু পরে যেতে নেয় আর ইশান ধরে ফেলে। কথা আর ইমা দুজনেই চমকে তাকালো ইশানের দিকে। তাতে ইশানের কোনো ভাবান্তর হলো না। কথা তাড়াতাড়ি ইশানের থেকে সরে এসে ইমার কাঁধে ভড় দিলো। ইমা নিজেই হাঁটতে গেলে ঘুরে পরার অবস্থা তার ওপর সেও পায়ে ব্যাথা পেয়েছে তাই কথার ভাড় নিতে হিমসিম খাচ্ছে। ইশান ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হুট করে কথাকে কোলে তোলে নিলো। কথা আর ইমার রিয়াকশন এমন ছিলো মনে হচ্ছিল দুজনের চোখই কোটর থেকে বের হয়ে আসবে।

কথা কাঁপতে কাঁপতে ব্যস্ত হয়ে বললো, আরে আরে করছেনটা কী ? পরে যাবো তো এক্সিডেন্ট করে আমার পায়ের বারোটা বাজিয়েছেন এখন কোল থেকে ফেলে কোমরটা ভাঙার ফন্দি আঁটছেন নাকি ?

ইমা রাগি গলায় বললো, আপনি ওকে কোলে তুলেছেন কেনো নামান বলছি এখনই।

ইশান ইমার দিকে তাকিয়ে বললো, দেখুন আপু ও অনেক ইঞ্জুরড হয়েছে হাঁটতে পারছে না আর আপনিও ব্যাথা পেয়েছেন ওর ভাড় নিতে পারবেন না তাই আমি যেটা করছি সেটাই বেটার হবে। সামনে একটা হসপিটাল আছে আমি নিয়ে যাচ্ছি চালুন আমার সাথে।

কথা বললো, আমাদের আপনার হেল্পের প্রয়োজন নেই আমরা নিজেরাই চলে যাবো।

ইশান বললো, মিস কথা অসুস্থ অবস্থায় আপনি কথা একটু কম বললেই ভালো হয়।

কথা ভ্রু কুঁচকে বললো, আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে ?

ইশান এবার হেঁসে বললো, আপনি আসলেই পিচ্চি আপনার আপু কখন থেকে আপনাকে কথা বলে ডাকছে তাহলে না জানার কী আছে ?

ইমা কথাকে থামিয়ে বললো, ঠিক আছে চলুন।

ইমা চিন্তা করে দেখলো ছেলেটার কথা সত্যি। তাই রাজি হয়ে গেলো কিন্তু কথা যেতে রাজি নয়। তবু জোর করেই ইশান ওকে গাড়ির পেছনের সীটে বসিয়ে দিয়ে ইমাকে বললো, আপু আপনি সামনে বসুন প্লিজ।

ইমা খু্ড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে গিয়ে গাড়ির সামনের সিটে বসে পড়লো। ইমা কখনো সামনের সিটে বসেনি তাই ভয় করছে৷ সামনে না বসেও উপায় নেই দুজনেই পিছনে বসলে খারাপ দেখায়। ইমা অন্য মনস্ক হয়ে এসব চিন্তা করছিলো আর কথা নিজের হাতে ফু দিচ্ছিলো খুব জ্বালা করছে। কথার হঠাৎ চোখ গেলো বাইরের দিকে ইশান রিকশাওয়ালাকে পাঁচশ টাকার কয়েকটা নোট ধরিয়ে দিলো আর তাতে রিকশাওয়ালা আবেগাপ্লুত হয়ে তাকালো ইশানের দিকে।

ইশান বললো, হয়তো খুব বেশি প্রয়োজন হয়েছে তাই ভালো করে চালাতে না জেনেই রাস্তায় বের হয়েছেন রিকশা নিয়ে কিন্তু এতে আপনার আর রিকশায় উঠা মানুষের জীবনের ঝুঁকি আছে তাই আগে ভালো করে শিখে নিন তারপর রাস্তায় বের হবেন কেমন ?

রিকশাওয়ালা ভেজা চোখে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। কৃতজ্ঞতায় কথা বলতে পারছে না সে। কথা সবটাই শুরু দেখলো ইশান কী বলেছে কথা শুনতে পায়নি গাড়ির ভেতর থেকে তবে সবটাই দেখেছে সে।

কথা বিড়বিড় করে বলে উঠলো, ভেবেছিলাম বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া ছেলে কিন্তু এতটা খারাপও না।

কথাটা চিন্তা করে মুচকি হাঁসলো কথা তখনই হঠাৎ ইমা বলে উঠলো, বেশি ব্যাথা করছে কথা ?

কথা বললো, না বেশি না।

ইমা রেগে বললো, হাত থেকে কেমন করে রক্ত বের হচ্ছে আর তুই বলছিস বেশি ব্যাথা করছে না ?

ইশান সামনের লুকিং গ্লাসে কথাকে একবার দেখে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে হসপিটালে পৌঁছে গেলো। ইশান কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে কথাকে কোলে তোলে ভেতরের দিকে যেতে লাগলো।

কথা রেগে বললো, আরে লোকে দেখলে কী বলবে নামান বলছি আমাকে ?

ইশান মুচকি হেঁসে বললো, আরে আপনি হেটে যেতে পারবেন না।

কথা বললো, আপু হেল্প করবে।

ইশান মনে হয় বেশ মজা পেলো কথার বলা কথাটা শুনে একটু শব্দ করেই হেঁসে বললো, আপনার আপু তো নিজেই হাঁটতে পারছে না।

ইশান ইমার দিকে তাকিয়ে বলে, আপু আপনি আসতে পারলে ধীরে ধীরে আসুন নাহলে ওকে রেখে আমি আসছি।

ইমা বললো, না না আমি একাই আসতে পারবো।

ইশান কথাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে কথা হাতের রুমাল খুলে দেয় আর ডক্টর ড্রসিং করবে তাই। মেডিসিন লাগাতেই কথা চোখ বুজে ইশানের হাত খামচে ধরে। ইশান সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। হাতের ড্রেসিং শেষে কথা ইশানের দিকে তাকালে দেখে সে কথার দিকে তাকিয়ে আছে। কথা চোখ সরিয়ে নেওয়ার সময় হাতের দিকে নজর যায়। কথা চোখ বড়বড় করে ফেলে সেটা দেখে আর তৎক্ষনাৎ হাত ছেড়ে দেয়। কথার হাটুর দিকে সালোয়ার ছিঁড়ে গেছে আর পা থেকেও রক্ত বের হচ্ছে। হাটুতে ব্যাথা পাওয়ার জন্যই তখন ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারছিলো না। ডক্টর কথার সালোয়ার উপরের দিকে তুলতে গেলে কথা বাঁধা দেয়। মহিলা ডক্টর ছিলো কথা তাকে ইশারায় ইশানকে দেখায় আর বাইরে যাওয়ার জন্য বুঝায়।

ডক্টর বলে, মিস্টার আপনি একটু বাইরে যান।

ইশান ডক্টরের দিকে তাকিয়ে বলে, কেনো ?

ডক্টর কিছু বলার আগেই কথা বলে উঠে, আমার আপু কোথায় ?

ইশান কথাকে নিয়ে এতোটা মগ্ন ছিলো ইমার কথা সে ভুলেই গেছে। ইশান আর কিছু না বলে বাইরে চলে এসে ইমাকে খুঁজতে লাগলো। সিঁড়ির কাছে এসে দেখে ইমা দাঁড়িয়ে ছিলো।

ইশান বললো, আপু আপনি ঠিক আছেন ?

ইমা বললো, পা ব্যাথা করছে খুব।

ইশান ইমাকে ধরে আস্তে আস্তে কথা যেখানে আছে সেখানে নিয়ে গেলো। কথার ব্যান্ডেজ করা শেষ ডক্টর এবার ইমার পা দেখে বললো, বেশী কিছু নয় একটু চোট লেগেছে মেডিসিন নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।

ডক্টর কিছু মেডিসিন দিলো দুজনকেই আর ইশানই সব কিনে দিলো। কথা আর ইমা নিতে না চাইলে ইশান বলে এটা ক্ষতিপূরণ কারণ এক্সিডেন্ট তার জন্য হয়েছে। ওরা ইশানের সাথে কথায় পারে না তাই মেনে নেয়।

ইমা বললো, কথা তুই বাসায় চলে যা আমি অনেকদিন ভার্সিটি যাই না আজ সুযোগ পেয়েও না গেলে ভালো লাগছে না।

কথা বললো, কিন্তু তোমার পা তো।

ইমা বললো, আমার প্রবলেম হবে না বোন তুই একটু কষ্ট করে বাসায় চলে যা। নাকি আমি দিয়ে আসবো তোকে ?

না না তোমার এমনই লেট হয়ে গেছে তুমি যাও আমি ঠিক চলে যাবো।

দুই বোন কথা বলেই যাচ্ছে এখানে যে আরো একজন আছে সেটা যেনো ভুলেই গেছে তারা।

ইমা হঠাৎ ইশানের দিকে তাকিয়ে বললো, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ইশান বলে, এটা আমার দ্বায়িত্ব ছিলো। আমি বরং কথাকে বাসায় পৌঁছে দিচ্ছি।

ইমা চিন্তিত হয়ে বললো, কিন্তু,,,,,

ইশান ইনোসেন্ট ফেস করে বললো, প্লিজ আপু,,,,

ইমা মনে মনে ভাবছে, ছেলেটাকে দেখে খারাপ মনে হচ্ছে না আর খারাপ হলে আমাদের জন্য এতো কিছু করতো না। তাছাড়া কথা একা বাসায় যেতেও পারবে না।

ইশান বললো, কী ভাবছেন, আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না তাই তো ? ওকে আমি আমার পরিচয় দিচ্ছি তারপর ভেবে দেখুন, আমি ইশান হামিদ। বিশিষ্ট শিল্পপতি ইয়াসির হামিদের ছেলে আর আবরার হামিদ ইয়াদের ছোট ভাই।

ইশানের পরিচয় শুনে ইমা আর কথা চোখ বড় বড় করে তাকালো। ইমা নামগুলো নিজের মনে আওড়াতে লাগলো। সাথে সাথে ইয়াদের কথা মনে পড়ে গেলো। বুঝতে পারলো সেদিন কেনো আবরার হামিদ ইয়াদের নামটা তার চেনা চেনা লাগছিলো। তার কারণ আজ বুঝতে পারছে ইমা।

ইশান বললো, নিয়ে যাবো আপু,,,?

ইমা কী করে না করবে কারণ কথার বাবা ইয়াসির হামিদের ম্যানেজার। ইমা বললো, ঠিক আছে সাবধানে পৌঁছে দিবেন প্লিজ।

ইমা অনুমতি দিয়ে দিয়েছে সেখানে কথা আর কী বলবে ? কথাকে ইশান আবার কোলে করে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিলো। ইমা খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে একটা রিকশা ডেকে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। এদিকে ক্লাসে এসে আরমান ইমাকে খুঁজে না পেয়ে রেগে গেলো। আজ আরমানের প্রথম ক্লাস তাই ভার্সিটি আসার অনুমতি দিয়েছিলো কিন্তু মহারানী কোথায় কে জানে।

১১.
ইয়াদ কপালে আঙ্গুল চেপে বসে আছে চেয়ারে তার সামনে সটানভাবে দাড়িয়ে আছে রনিত। আবারো মোটা অংকের টাকা কোম্পানির একাউন্ট থেকে গায়েব হয়ে গেছে। ইয়াদ যদিও জানে টাকা কে নিয়েছে কিন্তু তার কাছে প্রমাণ নেই আর তাই কী করবে ভেবে পাচ্ছে না।

ইয়াদ গম্ভীর গলায় বললো, রনিত ?

রনিত অন্যমনস্ক ছিলো ইয়াদের ডাকে চমকে থতমত খেয়ে বললো, জী স্যার ?

ইয়াদ কপাল থেকে আঙ্গুল সরিয়ে রনিতের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো, তোমাকে অন্যমনস্ক লাগছে কেনো ?

রনিত ইয়াদের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বললো, আপনার ভয়ে দুদিন আগে কফিশপে গার্লফ্রেন্ডকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে এসেছিলাম। আপনি যদি জানতে পারেন আমার গার্লফ্রেন্ড আছে তাহলে আমার চাকরি শেষ সেই ভয়ে। কিন্তু গার্লফ্রেন্ড রেগে ব্রেকআপ করে দিয়েছে কত কষ্ট করে পটাইছিলাম। আমার গুলুমুলু গার্লফ্রেন্ডটা।

ইয়াদ উত্তর না পেয়ে বিরক্ত হয়ে বললো, মিস্টার ডি কে দেশে আসছেন কবে ?

রনিত কপাল কুঁচকে বললো, স্যার আপনি নিজের বাবাকে মিস্টার ডি কে বলে কেনো ডাকেন ?

ইয়াদ রাগি চোখে রনিতের দিকে তাকিয়ে বললো, যেটা প্রশ্ন করছি তার উত্তর দাও পাল্টা প্রশ্ন আমার পছন্দ নয় রনিত।

রনিত মুখটা ছোট করে বললো, সরি স্যার, ইয়াসির স্যার বিকেলের মধ্যে অফিসে চলে আসবেন মনে হয়।

ইয়াদ বিরক্ত হয়ে বললো, যাও খান ইন্ডাস্ট্রির ফাইল নিয়ে এসো।

রনিত ওকে বলে চলে গেলে ইয়াদ কিছু চিন্তা করে রহস্যময় হেঁসে উঠে বলে, এই কথাটা আমার মাথায় আগে কেনো আসেনি ?

ইয়াদ নিজের গার্ড জাম্বীকে কল দিলে সে বলে, জী স্যার বলুন কী করতে হবে ?

ইয়াদ বললো, আমার একজন হ্যাকার লাগবে, ইন্টারন্যাশনাল হাইলি ট্যালেন্টড হ্যাকার।

জাম্বী চিন্তিত হয়ে বললো, তেমন হ্যাকার তো আপনি চাইলে আমি এখনই এনে দিতে পারি কিন্তু প্রবলেম হলো লেডি হ্যাকার।

ইয়াদ কপাল কুঁচকে বললো, নো নো, তুমি জানো আমি এই মেয়েদের একদমই সয্য করতে পারি না, সব ধোঁকাবাজ এরা।

জাম্বী মনে মনে বললো, স্যার বিয়ে করতে গেলে তো আপনাকে মেয়েদেরই সয্য করতে হবে ২৪ ঘন্টা আর যদি চিরকুমার থাকেন তাহলে সেটা আলাদা কথা।

ইয়াদ বিরক্ত হয়ে বললো, আমার মৃত্যু শোকে নিরবতা পালন করছো নাকি ?

জাম্বী দাঁতে জিহ্বা কেটে বললো, ছি ছি স্যার এটা কী বলেন ? আসলে স্যার বর্তমানে এরিটাই টপ ইন্টারন্যাশনাল লেডি হ্যাকার। মোটা অংকের পেমেন্ট চার্জ করে এরিটা। ওর ধারে কাছে যেতে পারে এমন কেউ আছে শুনিনি।

ইয়াদ কিছু সময় চিন্তা করে বললো, ওকে তুমি ঐ লেডি হ্যাকারের সাথে যোগাযোগ করো।

কল কেটে ইয়াদ চেয়ারে হেলান দিলো আর মনে মনে বললো, এই এরিটাই আমার ফিফটি পারসেন্ট কাজ করে দিবে। লেডি হোক তো প্রবলেম কোথায় ? কাটা দিয়েই নাহয় কাটা তুলবো।

কথাগুলো চিন্তা করে ইয়াদ রহস্যময় হাঁসতে লাগলো। অন্যদিকে একজন ভাবতে লাগলো, এবার তোমার পালা আবরার হামিদ ইয়াদ। যে নারী জাতির সাহায্যে তোমার বাবার সব দখল করেছি সেই নারী জাতির সাহায্যে তোমার থেকে সব নিজের নামে করে পুরোপুরি মালিক হয়ে যাবো এই হামিদ সাম্রাজ্যের হাহাহাহা।

চলবে,,,,,#তিক্ততার_সম্পর্ক
লেখনীতেঃ তাহমিনা তমা
পর্বঃ ০৮

ইমা ভার্সিটি গিয়ে দেখতে পেলো আরমানের ক্লাস প্রায় শেষ। ক্লাসে যাবে কী যাবে না ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না ? না গেলেও যদি আরমান বাইরে বসে থাকতে দেখে তাহলে কপালে দুঃখ আছে ইমার। অনেক চিন্তাভাবনা করে ইমা ঠিক করলো ক্লাসে যাবে।

অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে ইমা বললো, স্যার আসবো ?

আরমান ক্লাস করালেও তার মাথায় ঘুরছিলো ইমা কেনো ভার্সিটি এলো না আজ। এসব চিন্তার মাঝে ইমার গলা শুনে দরজার দিকে তাকালো আরমান। তার কথা মতো বোরখা পরেই এসেছে ইমা। শুধু চোখদুটো দেখা যাচ্ছে তার। ইমাকে দেখে কপালের ভাজে রাগ ফোটে উঠলো আরমানের। এখন ঠান্ডা মাথায় অপমান করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।

আরমান শুধু বললো, এটা আপনার বাসা নয় যখন খুশি আসবেন আর যখন খুশি যাবেন। ভার্সিটির একটা নিয়ম আছে সেটা আপনার জানা না থাকলে ভালো করে জেনে নিন গিয়ে। আপনাদের কেউ জোর করে না ভার্সিটি আসতে তবে নিজের ইচ্ছে মতো আসবেন যাবেন সেটা হবে না। ভার্সিটিতে পড়াশোনা করতে হলে ভার্সিটির নিয়মে চলতে হবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকুন নেক্সট ক্লাসের স্যার আলাও করলে করবে আমার ক্লাসে আমি আলাও করবো না।

ক্লাসের সবাই ইমার দিকে তাকিয়ে আছে। ইমা আর আরমানের কাহিনি সবাই জানে। ইমাকে দেখেই কানাঘুঁষা শুরু হয়ে গেছে আর ইমা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। ইমা সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো প্রায় দশ মিনিট পর আরমানের ক্লাস শেষ হলে সে বের হয়ে গেলো। যাওয়ার আগে ইমার দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বের হয়ে গেলো ক্লাসরুম থেকে। আরমান বের হয়ে গেলে ইমা ভেতরে এলো। অনেকে তাকে দেখে হাসি তামাশা করছে।

এর মতো একটা গ্যাইয়া ভূত মেয়েকে আরমান স্যারের মতো ড্যাসিং, হ্যান্ডস্যাম ছেলে ডেয়ার নিয়েও প্রপোজ করেছিলো কী করে ?

সত্যি ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর। এই মেয়ে আবার তাকে রিজেক্টও করেছিলো। ভাবা যায় বল ?

একটা ন্যাকা টাইপ মেয়ে বলে উঠলো, ইশ যদি আমাকে প্রপোজ করতো আমি তো খুশিতে অজ্ঞান হয়ে যেতাম।

আরেক জন বললো, আরে রাখ তোর প্রপোজ আমার সাথে একটা মুচকি হাসি দিয়ে কথা বললেই আমি হার্ট অ্যাটাক করবো।

স্যারের হাসি আমি একবার দেখেছি। হাসলে গালে টোল পরে ইশ যা লাগে না তখন পুরো আগুন।

এমন অনেক কথা ভেসে আসলো ইমার কানে সেসব না ভেবে ইমার ফ্রেন্ড রিকুর কাছে গিয়ে বসলো ইমা।

রিকু ইমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, কেমন আছিস ইমু ?

রিকুর পুরো না রোকেয়া ইসলাম কিন্তু সেটা তার কাছে ওল্ড মনে হয় তাই নিজের নাম শর্ট করে রিকু রেখেছে রোকেয়া।

ইমা মুচকি হেঁসে বললো, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ ভালো রেখেছেন। তুই কেমন আছিস ?

রিকু বললো, আমি ভালো আছি কিন্তু তুই কতটা ভালো আছিস সেটা আমার থেকে ভালো কে জানে ?

ইমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ রিকু নিজের দুঃখগুলো ভাগ করে নেওয়ার মানুষ। ইমা রিকুর সাথে কথা বলছিলো তখনই পিয়ন এসে বললো, ইমা আপু আছে ? উনাকে প্রিন্সিপাল স্যার ডেকেছেন।

ইমা পিয়নের কথা শুনে খানিকটা ভয় পেয়ে গেলো। প্রিন্সিপাল স্যার তাকে কেনো ডাকবে, রেগুলার ভার্সিটি আসে না বলে ? হতেই পারে এভাবে ক্লাস মিস করার জন্যই ডেকেছে হয়তো সামনে আবার ফাইনাল এক্সাম।

ইমা উঠে পিয়নের পিছনে পিছনে গেলে সে প্রিন্সিপালের রুমের দিকে না গিয়ে আরমানের রুমের দিকে নিয়ে যেতে থাকে ইমাকে।

ইমা বুঝতে পেরে বলে, এটা তো প্রিন্সিপাল স্যারের না আরমান স্যারের রুম।

পিয়ন বলে উঠলো, আপনাকে আরমান স্যারই ডেকেছেন প্রিন্সিপাল স্যার নয়।

এ কথা শুনে ইমার ভয়ে কলিজা শুকিয়ে গেলো। আরমান তাকে এমনই এমনই ছাড়বে না সেটা সে জানে তবে এতো তাড়াতাড়ি ডাক পরবে বুঝতে পারেনি। পিয়ন ইমাকে আরমানের রুমের সামনে দাড় করিয়ে চলে গেলো। ইমার ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। এখানে কোনো সিনক্রিয়েট হলে পুরো ভার্সিটির সামনে অপমানিত হতে হবে তাকে।

ইমা দাঁড়িয়ে এসব চিন্তা করছিলো আরমান ভেতর থেকে রাগী তবে গম্ভীর গলায় বললো, রুমের বাইরে মর্তির মতো দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে আয়।

আরমানের গম্ভীর গলায় ইমা চমকে উঠলো তবে অনেকটা সাহস নিয়ে দরজা ঢেলে ভেতরে গেলো। আরমান টেবিলের সাথে দাঁড়িয়ে হাতে পেন্সিল ঘুরাচ্ছিলো।

ইমা ভেতরে গিয়ে বেশি না এগিয়ে দরজার সামনেই দাঁড়ালো আর বললো, আমাকে কেনো ডেকেছেন স্যার ?

আরমানের কড়া নির্দেশ আছে কেউ যেনো জানতে না পারে ইমা তার খালাতো বোন। ভার্সিটি এসে যাতে ভাইয়া শব্দটা মুখ থেকে বের না করে আর ইমাও বাধ্য মেয়ের মতো আরমানের নির্দেশ পালন করে বিনা বাক্য। আরমান ইমার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝড়ের বেগে এসে ইমার গাল চেপে ধরে নিকাবের ওপর দিয়েই।

আরমান দাঁত কিটিমিটি করে বলে, বাইরে বের হয়ে তোর ডানা গজিয়ে গেছে ? ভার্সিটি রেখে কোথায় গিয়েছিলিস আর কার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলি বল ?

আরমান এতো জোরে গাল চেপে ধরেছে ইমার মনে হচ্ছে চোয়াল ভেঙে ভিতরে ঢুকে যাবে।

ইমা অনেক কষ্টে বলে, আমি কোথাও যাইনি আসার সময় এক্সিডেন্ট হয়েছিলো। কথা বেশি ব্যাথা পেয়েছে তাই বাসায় চলে গেছে আর আমার বেশি ব্যাথা লাগেনি তাই ভার্সিটি এসেছি।

আরমান আরো শক্ত করে গাল চেপে ধরে বললো, আমাকে তোর বোকা মনে হয় যা বলবি তাই বিশ্বাস করে নিবো।

ইমা আরমানের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো, আমার কথা বিশ্বাস না হলে কথাকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করুন কথা কোথায় ?

আরমান কিছু একটা চিন্তা করে ইমাকে ছেড়ে দিলো আর সাথে সাথে কথাকে কল দিয়ে জানতে পারলো ইমা যা বলেছে সব সত্যি তাই কল কেটে ইমাকে বললো ক্লাসে চলে যেতে।

ইমা আগের ন্যায় খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আরমান বলে উঠলো, তোর পায়ে কী হয়েছে ?

ইমা বললো, এক্সিডেন্টের সময় সামান্য চোট লেগেছে পায়ে।

আরমান ব্যস্ত হয়ে বললো, মেডিসিন লাগিয়েছিস, ক্লাস করতে হবে না আমি গাড়ির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি বাসায় চলে যা।

ইমা শান্ত গলায় বললো, তার দরকার হবে না আমি ক্লাস করবো আর শেষ হলে একাই চলে যেতে পারবো।

আরমানের উত্তরের অপেক্ষা না করে ইমা বের হয়ে গেলো আর আরমান সেদিকে তাকিয়ে রইলো আর ভাবলো, চোখের আড়াল হলে মনে হয় তোকে মাফ করে দেই কিন্তু যখনই তোর মুখটা দেখি সারা ভার্সিটির সামনে লজ্জিত হওয়ার সেই মুহূর্ত মনে পরে যায়। সেদিনের জন্য আজ আমার কোনো ফ্রেন্ড নেই। তুই রিজেক্ট করায় বন্ধুমহলে ক্রাশবয় খ্যাত আমি হাসির পাত্র হয়ে উঠেছিলাম। একে একে সবার থেকে দূরে সরে আসি সেই হাসি তামাশা থেকে নিজেকে বাঁচাতে। সেদিন তুই মুখের ওপর রিজেক্ট না করলে একটু পর আমার বন্ধুরাই তোকে সব বলে দিলো। কিন্তু তুই কী করলি হাসির পাত্র বানালি সবার সামনে ? সেটা আমি চাইলেও ভুলতে পারবো না।

ইমা আরমানের কেবিন থেকে বের হয়ে বললো, জুতো মেরে গরু দান করতে এসেছে আমাকে। আমার সাথে এই অন্যায় করার জন্য একদিন আফসোস করবেন আরমান ভাইয়া দেখে নিয়েন।

কথা নিজের রুমে বসে চিন্তা করছে, লোকটাকে খারাপ মনে করলেও এতটা খারাপ না।

কথা মনে করেছিলো ইশান বকবক করে তার মাথা খেয়ে ফেলবে কিন্তু সারা রাস্তা ইশান চুপ করেই ছিলো শুরু বাড়ির এড্রেস জানতে চেয়েছিলো একবার।

কথা ইশানের চিন্তা করছে ভেবে পরক্ষণে চমকে উঠলো আর বললো, না না আমি কেনো ভাবছি লোকটার কথা ? আমার কাউকে নিয়ে চিন্তা করাও অন্যায়। নিজের অস্তিত্ব ভুলে যাস না কথা। তুই ঐ ছেলেটার নখের যোগ্যও হবি না। মানবতার খাতিরে সাহায্য করেছে এই পর্যন্তই থাকতে দে। এসব ভেবে বিনিময়ে কষ্ট ছাড়া কিছু পাবি না।

কথা নিজের মনে এসব চিন্তা করে ইশানের চিন্তা মাথা থেকে বের করে দিলো।

১২.
শহরের সকাল গ্রামের সকালের মতো মিষ্টি হয় না। গ্রামের সকাল হয় পাখির কিচিরমিচির শব্দে আর শহরের সকাল হয় গাড়ি হর্ণ আর কাকের কা কা বেসুরো ডাকে। তবে ইয়াদদের বাড়ির পেছনে বিশাল এক বাগান আছে বড় বড় বিভিন্ন ফল গাছের আর সেখানে পাখিও আছে অনেক। পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে, সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না কেটে গেছে আরো কয়েকদিন প্রতিদিনের মতো ফজরের নামাজ পরে এক্সারসাইজ করছে ইয়াদ। আজ হ্যাকার মেয়েটার আসার কথা। মেয়েদের সাথে ইয়াদ কথা বলে না তাই ঠিক করেছে জাম্বীকে বুঝিয়ে দিবে কী কী করতে হবে।

ভাইয়া তোমার কফি।

ইয়াদ পিছনে ঘুরে বললো, আজও তো আগে চলে এসেছিস আমি এখনো শাওয়ার নেইনি।

ইয়ানা চেয়ারে বসতে বসতে বললো, আজ আমি ইচ্ছে করেই আগে এসেছি।

ইয়াদ ভ্রু কুঁচকে বললো, কেনো ?

ইয়ানা বললো, তোমার সাথে শান্তিতে একটু কথা বলার জন্য এর থেকে আদর্শ টাইম আর খোঁজে পেলাম না।

ইয়াদ ওয়ান হ্যান্ড পুশআপ দিতে দিতে বললো, কী কথা বলতে এসেছিস বল ?

ইয়ানা মুচকি হেঁসে বললো, মা-বাবা তোমার জন্য মেয়ে দেখেছে আর আমিও দেখেছি আমার অনেক পছন্দ হয়েছে ভাবি হিসাবে।

ইয়ানার কথা শুনে ইয়াদ হাত ফসকে পরে যেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো আর ইয়ানার দিকে তাকিয়ে বললো, কী সব বলছিস আবোলতাবোল ?

ইয়ানা মুড নিয়ে বললো, যেটা শুনেছো একদম ঠিক শুনেছো আর আমি আমার ভাবি চাই আর তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

ইয়াদ রেগে বললো, আমি কোনো বিয়ে টিয়ে করছি না সেটা জেনে রাখ তুই।

ইয়ানাও রেগে বললো, তুমি বিয়ে না করলে আমিও এই বাড়িতে পানি মুখে তুলবো না শুনে রাখো তুমি।

ইয়ানা রেগে বের হয়ে গেলো ইয়াদের রুম থেকে। এতোক্ষণ ইয়ানা যা করেছে সব তার মা শিখিয়ে দিয়েছে কারণ ইয়ানার দ্বারাই এটা সম্ভব। ইয়ানা রেগে চলে গেলে ইয়াদও রেগে পাঞ্চ করতে থাকে পাঞ্চিং ব্যাগে। রাগ ঢালার সবচেয়ে আদর্শ জায়গা এটা ইয়াদের।

আরো দুদিন কেটে গেলো ইয়ানা ইয়াদের সাথে কথা বলে না। ঠিক মতো খায়ও না তার এক কথা তাকে ভাবি এনে দিতে হবে। তাও সে যাকে পছন্দ করেছে তাকেই। এসবই মিসেস রুবিনার প্ল্যান, ইয়ানা একটা মাধ্যম মাত্র। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে সে আঙুল বাঁকাতে জানে। যে মেয়ে পছন্দ করেছে তাকে রুবিনা নিজের ইচ্ছায় পুতুলের মতো নাচাতে পারবে। তাই ইয়াদের দূর্বলতা কাজে লাগিয়ে যে করেই হোক বিয়েটা করাতে চায়। ইয়াদ ভালো করেই বুঝে গেছে রুবিনার চাল তবু কিছু প্রকাশ করছে না শুধু চুপচাপ দেখে যাচ্ছে। অনেক কিছু ভেবে চিন্তে ইয়াদ ইয়ানার কাছে গেলো।

রাতে ইয়াদ ইয়ানার রুমের দরজায় নক করে বলে, ইয়ানা আসবো ?

ইয়ানা কিছু না বলে চুপ করে আছে।

ইয়াদ দরজা ঢেলে ভেতরে গিয়ে দেখে বেডে বসে বই পড়ছে ইয়ানা৷ ইয়াদ যে তার রুমে এসেছে সেদিকে একবার তাকালোও না।

ইয়াদ বললো, কথা বলবি না আমার সাথে ?

ইয়ানা কিছুই বলছে না এখনো বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, তা দেখে ইয়াদ বললো, তোকে বলতে এসেছিলাম মাকে বলে দিস আমি বিয়েতে রাজি যা করার করতে পারে।

ইয়ানা বই রেগে খুশি হয়ে বললো, সত্যি বলছো ভাইয়া ?

ইয়াদ মুচকি হেঁসে বললো, হুম আমার বোন একটা জিনিস চেয়েছে আমি সেটা দিবো না তা কী করে হয় বল ?

ইয়ানা দৌড়ে এসে ইয়াদকে জড়িয়ে ধরে বললো, ইউ আর দা গ্রেট ভাইয়া। ভাবি আর আমি সবসময় অনেক মজা করবো একসাথে ইয়াহু,,,,।

ইয়াদ বোনের খুশি দেখে নিজেও খুশি হলো তবে পরক্ষণে রহস্যময় হেঁসে মনে মনে বললো, এবার তোমাদের জালে তোমাদের আটকাবো মুখোশধারী মিস্টার এন্ড মিসেস হামিদ তৈরী থেকো।

ইমা নিজের মণিকে দেখে একের পর এক অবাক হচ্ছে। ইমাকে দিয়ে কোনো কাজ করাচ্ছে না বরং টিয়াকে দিয়ে ইমার সেবা করাচ্ছে। ইমা এসবের মানে বুঝতে পারছে না। আরমান বাড়িতে নেই গতকাল সকালে এক সপ্তাহের জন্য ভার্সিটি থেকে ট্যুরে গেছে। এক সপ্তাহের আগে ফিরবে না আর অন্যদিকে ইমার বিয়ের কথা চলছে৷ গতকাল বিকেলে একটা মহিলা আর ইমার থেকে একটু বড় হবে বয়সে এমন একটা মেয়ে এসেছিলো তাকে দেখতে। তারা এখনো কিছু জানায়নি তবে ইমা ব্যাপারটা নর্মালি নিয়েছে। দেখতে আসতেই পারে এটা অস্বাভাবিক কিছু তো নয়। কিন্তু একটা বিষয়ে বুঝতে পারছে না এতবড় হয়ে গেছে ইমা, কখনো বিয়ের কথা তুলেনি ইমার মণি তাহলে হঠাৎ কী হলো সেটাই ভাবাচ্ছে ইমাকে।

এসব চিন্তায় মগ্ন ছিলো ইমা হঠাৎ মণির গলায় হুশ ফিরে, মা ইমা এদিকে একটু আয় দেখি।

ইমা নিজের রুমে বসে ছিলো ডাক শুনে বললো, আসছি মণি।

ইমা উঠে মণির কাছে গেলে মণি তাকে নিজের পাশে বসিয়ে দিয়ে বললো, গতকাল তোকে যারা দেখতে এসেছিলো তারা ফোনে জানিয়েছে তোকে তাদের ভিষণ পছন্দ হয়েছে আর তাই বেশি দেরি করতে চায় না। তাড়াতাড়ি বিয়েটা সেরে ফেলতে চায়। আগামী শুক্রবার তোর বিয়ে ঠিক হয়েছে।

ইমার হা করে তাকিয়ে আছে মণির দিকে। মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি উনার সেটা বুঝার চেষ্টা করছে। ছেলে সম্পর্কে ইমাকে কিছুই বলায় হয়নি আর যারা এসেছিলো তাদের সম্পর্কেও কিছুই জানে না ইমা। তাহলে এটা কেমন বিয়ে হচ্ছে আর এতো তাড়া কীসের ?

ইমার মণি মনে মনে বললো, এটাই সুযোগ আরমান ফিরে আসার আগেই তোকে বিদায় করতে হবে। আর তার বিনিময়ে আমরা পাবো মোটা অংকের টাকা আরো কতো কী ? তুই সেখানে কেমন থাকবি সেটা আমাদের দেখে কী লাভ ইমা ? তোকে যত তাড়াতাড়ি বিদায় করতে পারবো তত তাড়াতাড়ি আমার ছেলের জন্য লাল টুকটুকে একটা বউ আনতে পারবো। শুধু আরমান ফেরার আগে ভালোই ভালোই সব মিটে গেলেই হয়।

ইমা সাহস নিয়ে বললো, মণি আমি ছেলের নাম পর্যন্ত জানি না আর তুমি বলছো দুদিন পর বিয়ে।

মণি এবার নিজের রুপে ফিরে এসে ইমার গাল চেপে ধরে বললো, এতো জানতে হবে কেনো ? তোর মায়ের তো তোর খোঁজ নেওয়ার সময়ও নেই এতদিন খাইয়ে পড়িয়ে বড় করেছি মুখে মুখে তর্ক করার জন্য। যার সাথে বিয়ে দিবো মুখ বুজে বিয়ে করে নিবি। একটা টু শব্দ করলে জিহ্বা টেনে ছিড়ে ফেলবো বলে দিলাম।

ইমাকে ছেড়ে দিলে সে দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেলো। সে আর কিছু বলবে না বিয়েটা করে নিলে এই বাড়ির অত্যাচার থেকে তো রেহাই পাবে সেটাই অনেক। ছেলে যেই হোক শুধু দুবেলা ডাল ভাত আর বুক ভরা ভালোবাসা দিলে ইমার আর কিছু চাই না এ জীবনে।

ইমা হয়তো ভাবতেও পারছে না এই বিয়ে তার জীবনে আরো একটা #তিক্ততার_সম্পর্ক বয়ে আনবে ভালোবাসা নয়। আর আরমান সে কী করবে এসব জানতে পারলে ? যার অনুমতি ছাড়া ইমার বাড়ির বাইরে পা রাখা নিষেধ আর তার অনুপস্থিতিতে ইমার বিয়ে !
#তিক্ততার_সম্পর্ক
লেখনীতেঃ তাহমিনা তমা
পর্বঃ ০৯ ||বোনাস+ স্পেশাল পর্ব||

ইমার মা মেয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তবে মেয়েটা তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। ইমার মার চোখ টলমল করছে পানিতে। মনে হয় এই তো সেদিন মেয়েটার জন্ম হলো। ছোট ছোট আঙ্গুল দিয়ে তার আঙ্গুলটা আঁকড়ে ধরতো। ইমার বাবা ইমার দিকে তাকিয়ে বলতো আমার মিষ্টি মা টা একদম আমার মতো হয়েছে দেখতে। মেয়েকে আকাশের চাঁদ মনে করতো ইমার বাবা। সেই মেয়ের আজ বিয়ে ৷ মানুষটা বেঁচে থাকলে আজ কতোই না খুশি হতো। সুখের স্মৃতি হাতড়ে চোখ থেকে টপ করে পানি গড়িয়ে পড়লো ইমার মা তাহেরা বেগমের। মেয়ের ভালোর জন্য ভালোবাসার মানুষটাকে ভুলে বিয়ে করলো অন্য একজনকে আর আজ সেই মেয়ের চোখে সবচেয়ে বড় অপরাধী সে। মা মেয়ের মাঝে মায়া মমতার সম্পর্ক মুছে সেখানে তৈরি হয়েছে যন্ত্রণাদায়ক #তিক্ততার_সম্পর্ক। কিন্তু এমনটা তো চায়নি তাহেরা বেগম, সবই নিয়তির খেলা। দ্বিতীয় স্বামীর বাড়িতে সে খুব ভালো আছে এমনটা নয় তবে সেটা কাউকে বলতে পারে না তাহেরা। সে ঘরে একটা ছেলে আছে তাহেরার। তবে সে ছাড়া কেউ আসেনি ইমার বিয়েতে।

ইমার মা গিয়ে ছাহেরা বেগমকে জিজ্ঞেস করলো, ছেলে কে, কী করে ?

তাতে ছাহেরা বেগম বলে, তোর মেয়ের রাজ কপাল এতো বড় ঘরে বিয়ে হচ্ছে। রানীর মতো পায়ের ওপর পা তুলে খেতে পারবে সারাজীবন।

তাহেরা মলিন হেঁসে বললো, আমার মেয়েকে আমি মানুষ করিনি তবে এটুকু জানি তার টাকার লোভ নেই। ছোটবেলা থেকে ভালোবাসা পায়নি মেয়েটা তাই ভালোবসার বড্ড কাঙাল। ছেলে কেমন সেটা জানতে পারলে খুশি হতাম।

ছাহেরা মুখ ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে বললো, এখন মেয়ের জন্য দরদ একেবারে উতলে পরছে।

তাহেরা স্পষ্ট শুনতে পেলো বড় বোনের তাচ্ছিল্যের সুরে বলা কথা তাতে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

ছাহেরা মনে মনে বললো, ছেলে যদি ভালোই হতো তাহলে এতবড় বাড়িতে নিজের মেয়ে না দিয়ে তোর মেয়ে দিতাম নাকি। হোক বয়সে একটু বড় তাতে কী হয়েছে তবু কথাকেই দিতাম। কিন্তু ছেলে তো মেয়ে জাতিকেই সয্য করতে পারে না দুচোখে। তোর মেয়ের কপালে কী আছে আল্লাহ মালুম। তাহেরা তুই সেদিন যদি আমার ভালোবাসা কেঁড়ে না নিতি তাহলে আজ না তোর জীবন এমন হতো আর না তোর মেয়ে এমন #তিক্ততার_সম্পর্ক বয়ে বেড়াতো। তোকে বলেছিলাম আমার ভালোবাসা কেঁড়ে নিয়ে সুখে থাকতে পারবি না তুই।

ইমার বাবা ছিলো ইমার খালা ছাহেরা বেগমের প্রিয় বন্ধু। ছাহেরা বেগম ভালোবাসতেন ইমরুল আবিয়াতকে (ইমার বাবা) ছাহেরা বেগমের বাড়িতে যাতায়াত ছিলো ইমরুলের। ছাহেরা ইমরুলকে ভালোবাসতো আর ইমরুল ভালোবাসতো ইমার মা তাহেরা বেগমকে। ছাহেরা ইমরুলকে ভালোবাসার কথা জানাবে তার আগেই ইমরুল ছাহেরাকে বলে সে তার ছোটবোন তাহেরাকে ভালোবাসে। সেদিন রাগে দুঃখে বিনা কারণে ছাহেরা অনেক মেরেছিলো তাহেরাকে কিন্তু কিছু জানায়নি ইমরুলের বিষয়ে। ধীরে ধীরে তাহেরাও বুঝে যায় ইমরুল তাকে ভালোবাসে আর সেও ইমরুলকে ভালোবেসে ফেলে। এটা জানতে পেরে ছাহেরা তার বাবাকে গিয়ে বলে সে ইমরুলকে বিয়ে করতে চায় কিন্তু এতে আরো উল্টো ফল হয়৷ ছাহেরার বাবা তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয় আরমানের বাবা আমিনুল মাহমুদের কাছে। সেদিন থেকে ছাহেরা ইমরুল আর তাহেরার ওপর রাগ পুষে রেখেছিলো। তাহেরা বুঝতে পারে তার বাবা ইমরুলকে মেনে নিবে না তাই ছাহেরার বিয়ের পাঁচবছর পর তার বিয়ের কথা উঠলে সে ইমরুলের সাথে পালিয়ে যায়। বিয়ের তিন বছর পর জন্ম হয়ে ইমার। তাহেরার ছিলো সুখের সংসার বাবা মেনে না নিলেও খারাপ ছিলো না তারা। কিন্তু ইমার যখন দুই বছর বয়স এক ঝড়ো হাওয়া সব এলোমেলো করে দেয়। ইমরুলের মৃত্যু খুন ছিলো নাকি এক্সিডেন্ট তা আজও ধুয়াশায় রয়ে গেছে। ইমরুলের মৃত্যুর পর তাহেরা বাধ্য হয়ে বাবার বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু এখানে আসতেই তার ওপর আবার বিয়ের করার চাপ দেওয়া হয় আর তার মূলে ছিলো ছাহেরা বেগম।
|| লেখনীতে তাহমিনা তমা ||

তাহেরার আজও কানে বাজে ছাহেরার সেই কথা, একজনকে ভালোবেসে অন্যজনের সাথে সংসার করা কতটা যন্ত্রণাদায়ক সেটা তোকে আমি বুঝিয়ে ছাড়বো তাহেরা।

কী ভয়ংকর ছিলো সেই কথা মনে হলে তাহেরার আজও গায়ের লোম কাটা দিয়ে উঠে। তাহেরার বাবা একসময় তাহেরাকে হুমকি দেয় মেয়ের দিকে তাকিয়ে বিয়ে করতে চাইছে না তো ? মেয়েকে এমন জায়গায় পাঠাবে আর কখনো মেয়ের মুখও দেখবে না তাহেরা। ভালোবাসার শেষ চিহ্ন বাঁচিয়ে রাখতে তাহেরা সেদিন নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিলো। বেঁচে থেকেও ভেতর থেকে মরে গিয়েছিলো। সে সত্যি বুঝেছিলো একজনকে ভালোবেসে অন্যজনের সাথে সংসার করা কতটা যন্ত্রণাদায়ক। যে মেয়ের জন্য এতো কিছু করলো সেই মেয়ের কাছে আজ অপরাধী তাহেরা।

মণিমা,,,,,

কারো ডাকে অতীত বিচরণ থেকে বের হয়ে আসে তাহেরা। পাশে তাকিয়ে কথাকে দেখতে পায়। বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসে দীর্ঘ শ্বাস। নিজের মেয়ের মুখে একবার মা ডাকও আজ ভাগ্য হয় না তাহেরার।

মণিমা তাহের(ইমার সৎ ভাই) ভাইয়া আসেনি আর আঙ্কেল কোথায় ?

তাহেরা শান্ত গলায় বললো, আসেনি তারা আর আসবেও না।

কথা মন খারাপ করে বললো, ওহ্।

তাহেরা বললো, কথা আরমান কোথায় তাকে দেখছি না যে ?

কথা বললো, ভাইয়া ভার্সিটির ট্যুরে গেছে আরও দুদিন পর আসবে।

তাহেরা অবাক হয়ে বললো, বাড়িতে বিয়ে আর আরমান বাড়িতে নেই। তোর মা তো ছেলেকে বাদ দিয়ে এক কাপ চা ও খায়না তাহলে তাকে বাদ দিয়ে এতোবড় আয়োজন ?

কথা চিন্তিত হয়ে বললো, সেই হিসাবটা আমিও মেলাতে পারছি না মণিমা আর মা তো ইমা আপুকে সয্যই করতে পারে না তাহলে এতো ঘুমধাম করে তার বিয়ে দিচ্ছে। তাও মাত্র দুদিনের মধ্যে এসব আয়োজন করলো। কোথাও একটা গড়বড় আছে বুঝলে মণিমা।

কথার কাছ থেকে এসব শুনে তাহেরার বুক কেঁপে উঠলো। যাই হোক আল্লাহ যেনো তার মেয়ের নতুন জীবনটা সুখে ভড়িয়ে দেয় সেই দোয়া করতে লাগলো তাহেরা।

দূর থেকে নিজের মাকে দেখে যাচ্ছে ইমা। যতই রাগ অভিমান থাকুক মা তো মাই। ইমার ইচ্ছে করছে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে তার গায়ের মা মা গন্ধটা অনুভব করতে৷ কবে মা মা গন্ধটা নাকে এসেছিলো ইমা ভুলতে বসেছে। কিন্তু বুকের বা পাশটায় অভিমানের পরিমাণ এতোই বেশি সেগুলো একপাশে রেখে ইমা ছুটে যেতে পারছে না তার মায়ের কাছে। দূর থেকে দেখেই তৃষ্ণা মেটাতে চেষ্টা করছে ইমা।

১৩.
সকাল থেকে রুমের দরজা লক করে বসে আছে ইয়াদ তার বিশ্বাসই হচ্ছে না সে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। বাড়ি ভর্তি মেহমান গিজগিজ করছে তাদের আরো বেশী অসহ্য লাগছে ইয়াদের কাছে। সকালে ইয়ানা এসে ব্রেকফাস্ট দিয়ে গিয়েছিলো সেটা খেয়ে আর রুম থেকে বের হয়নি। জীবনের ৩০ বছর পার করে এসেছে মেয়েদের থেকে দূরে থেকে আর আজ থেকে তাকে ২৪ ঘণ্টা একটা মেয়েকে সয্য করতে হবে সেটা ভাবতেই রাগ লাগছে ইয়াদের। আরও এক উটকো ঝামেলা আজ আরো বেশী মনে পড়ছে সেই মায়াবী চোখ জোড়া। ইয়াদ নিজের হবু বউ সম্পর্কে কিছুই জানে না তার অবশ্য জানার কোনো ইচ্ছেও নেই। শুধুমাত্র বোনের আবদার পূরণ করতে রাজি হয়েছে ইয়াদ। সব মিলিয়ে একটা বিশ্রি সময় পার করছে ইয়াদ।

ইয়ানা দরজায় নক করে বললো, ভাইয়া দরজা খোল দেখ কারা এসেছে।

ইয়াদ বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলতেই এক ঝাক ছেলে ইয়াদকে জড়িয়ে ধরলো। টাল সামলাতে না পেরে সবগুলোকে নিয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলো ইয়াদ। ইয়ানার তো এদের কান্ডকারখানা দেখে হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ।

ইয়াদের বন্ধু জোহান বলে উঠলো, মামা তুমি নাকি জীবনে কোনো মেয়ের ছায়াও মাড়াবে না তাহলে আজ কী ছেলে বিয়ে করছো নাকি ?

ইয়াদ ওদের সবাইকে ঠেলে ওপর থেকে সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, তোরা কোথা থেকে এলি ?

আরেক বন্ধু সাকিব বললো, তুই বিয়ের ইনভাইট না করলে কী হবে আমাদের মিষ্টি বোন ইয়ানা আমাদের সবাইকে ইনভাইট করেছে। ইনভাইট করেছে এটা ভুল বললাম শুধু জানিয়েছে তোর বিয়ে আজ আমরাও নিজ দ্বায়িত্বে চলে এসেছি।

সাকিবের কথায় সবাই হেঁসে দিলো তবে হাঁসি নেই ইয়াদের মুখে। প্রান প্রিয় বন্ধু গুলো আজ বিরক্ত লাগছে ইয়াদের কাছে তবে সেটা প্রকাশ করলো না ইয়াদ, চুপচাপ ওদের হাসি মজা সয্য করছে।

ইয়াদের বন্ধুরা মিলে ইয়াদকে জোর করে রেডি করিয়ে দিলো আর তারপর সবাই রওনা হলো কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে। বর এসেছে শব্দ কানে আসতেই ইমার হার্টবিট বেড়ে গেলো। সিঁদুর লাল কালার একটা বেনারসি পড়েছে ইমা সাথে গোল্ডেন কালার হিজাব, ভাড়ি ভাড়ি স্বর্নের গহনা, মুখে গাড়ো মেকআপ। দুধে আলতা গায়ের রঙের সাথে টকটকে লাল বেনারসিটা যেনো একটু বেশি সুন্দরী করে তুলেছে ইমাকে। ইমা তার বরকে দেখতে কেমন হবে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করতে চাইলে ইয়াদের টমেটোর মতো লাল মুখ ভেসে উঠলো ইমার চোখের সামনে। এমনটা কেনো হলো তার উত্তর জানা নেই ইমার। ইয়াদের মুখটা ভেসে উঠতেই ইমা চোখ খোলে ফেললো পাশে রাখা পানির গ্লাসের সব পানি ঢকঢক করে সবটা খেয়ে নিলো। সবাই চলে গেলো বর দেখতে। আবরার হামিদ ইয়াদ মেয়েদের থেকে অন্তত দশ হাত দুরত্ব বজায় রাখে সেখানে আজ তার আশেপাশে মেয়েরা গিজগিজ করছে আর তাতে সে চরমভাবে বিরক্ত। কোথাও গেলে গার্ড নেয় না ইয়াদ কারণ সে নিজের আত্নরক্ষা নিজেই করতে পারে কিন্তু বিয়ে করতে এসেছে গার্ড নিয়ে। যাতে তাকে মানুষের ভিড় থেকে বাঁচাতে পারে।

ইমার ফেন্ড রিকু বললো, দোস্ত তুই বস আমি দুলাভাইয়ের একটা পিক তুলেই চলে আসবো।

ইমা কাঁপা গলায় বললো, যাবি আর আসবি একদম লেইট করবি না বলে দিলাম।

রিকু বললো, প্রমিস একদম লেট করবো না।

রিকু চলে গেলে ইমা একা বসে রইলো। কেনো জানি খুব ভয় করছে ইমার। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে ইমা সেদিকে তাকালো কে এসেছে দেখার জন্য। দরজার দিকে তাকিয়ে ইমা থমকে গেলো কারণ তার মা দাঁড়িয়ে আছে সামনে। ইমা মুখ ফিরিয়ে নিলো সেদিক থেকে। ইমার মা চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লে তাড়াতাড়ি মুছে নিলে।

ইমার পাশে বসে বললো, মাশাআল্লাহ আমার মেয়েকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে।

ইমা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো, আপনার মেয়ে?

তাহেরা চুপ করে গেলো ইমার প্রশ্নে। উত্তর দেওয়ার মুখ তার নেই। ইমার মা একটা গিফট বক্স বের করে ইমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, এটা তোর জন্য, আমার দেওয়া বলে ফিরিয়ে দিস না তোর বাবারও স্মৃতি জড়িয়ে আছে এতে।

বাবার কথা শুনে ইমা ফিরিয়ে দিতে পারলো না বক্সটা হাতে নিলো। ইমার খুব ইচ্ছে করছিলো মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কিন্তু ঐ যে অভিমান ঠিক বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। তাহেরারও ইচ্ছে করছিলো মেয়েটাকে একবার বুকে টেনে নিতে কিন্তু সেই অধিকার তার আছে কিনা বুঝতে পারলো না।

ইমার মাথায় হাত রেখে বললো, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি জীবন যতটা দুঃখ তোকে দিয়েছে তার থেকে হাজার গুন সুখ যেনো তোর ভাগ্যে জুড়ে দেয়। একটা কথা মনে রাখিস মা পৃথিবীটা বড্ড কঠিন এখানে কারো অধিকার কেউ হাতে তুলে দেয় না নিজের অধিকার নিজেকে আদায় করে নিতে হয়। জীবনে কখনো কঠিন সময়ের সম্মুখীন হলে আল্লাহ তাআ’লাকে শরণ করবি। তিনি ছাড়া আমাদের সাহায্য করার আর কেউ নেই। মন থেকে খুব বেশি দুর্বল হয়ে পরলে জায়নামাজে দাড়িয়ে যাবি আল্লাহর কাছে ধর্য্য প্রার্থনা করবি।

এটুকু বলে দম নিয়ে আবার বললো, ভালো থাকিস মা। একদিন হয়তো এই অপরাধী মাকে বুঝতে পারবি সেদিনের অপেক্ষায় থাকলাম।

কথাগুলো বলে ধীর পায়ে বের হয়ে গেলো তাহেরা আর সেদিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলো ইমা। জীবনটা এমন বিচিত্র কেনো হয় এর উত্তর কী আছে কারো কাছে ? ইমা ঝাপসা চোখে বুঝতে পারলো দরজা দিয়ে ঝড়ের গতিতে কেউ প্রবেশ করে ওর সামনে এসে বসলো।

রিকু এক্সাইটমেন্টের জন্য কথা বলতে পারছে না বর দেখে তার চোখ কপালে উঠে গেছে তাও হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, ইমা তোর বর কে জানিস ?

ইমা চোখ মুছে চিন্তিত গলায় বললো, কে ?

রিকু আরো বেশী এক্সাইটেড হয়ে বললো, আবরার হামিদ ইয়াদ নাম শুনেছিস ? হামিদ গ্রুপ অব কোম্পানির নিউ এমডি বিজনেস জগতের প্রিন্স বলা হয় যাকে আর মেয়েদের হার্টথ্রব।

ইমা চোখ বড়বড় করে বললো, কীহ্ ,,,,,,?

রিকু বললো, হ্যাঁ রে আর আজ যা লাগছে না দেখতে পুরো আগুন। মেয়েগুলো মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। কিন্তু তোর কপালে কী আছে আল্লাহ জানে কারণ উনি মে,,,,,,

আসবো ভাবি ?

রিকুর আর পুরো কথা শেষ করা হলো না। রিকু আর ইমা দুজনেই দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে কথার সাথে ইয়ানা দাঁড়িয়ে আছে। উত্তরের অপেক্ষা না করেই কথা তাকে নিয়ে রুমে ঢুকলো। ওরা মজা করছে আর ইমা চুপচাপ বসে ইয়াদের কথা ভাবছে। সেদিনের কথা মনে হতেই মুচকি হাঁসলো ইমা। তার মনে ইয়াদের জন্য পজিটিভ ধারণা তৈরি হয়েছিলো তাই মনে করছে ইয়াদকে সে যেমন দেখেছে ইয়াদ তেমনই। যখন ওর বিশ্বাসটা ভাঙবে কী হবে সেটা হয়তো এখন ভাবতেও পারছে না।

ইমার বেনারসির সাথে ম্যাচিং লাল টকটকে শেরওয়ানি, সাদা পাজামা, জেল দিয়ে সেট করা চুল, হাতে রোলেক্সের লেটেস্ট কালো রঙের ঘড়ি, পায়ে খয়েরী কালার বরের জুতা। দুজনের শপিং ইয়ানা করেছে। ইয়াদের দিক থেকে আজ চোখ ফেরানো দায় হয়ে গেছে। মাথার পাগড়ীটা শুরু থেকেই রনিতের হাতে রয়েছে।

ইয়াদ দাঁতে দাঁত চেপে রনিতকে ডেকে বললো, আমার পক্ষে বেশিক্ষণ এসব টলারেট করা সম্ভব নয় রনিত যা করার তাড়াতাড়ি করতে বলো।

রনিত দাঁত কেলিয়ে বললো, বিয়ে করার এতো তাড়া স্যার ? আগে বিয়ে তো দূর মেয়েদের নামই শুনতে পারতেন,,,,,ন,,,না।

ইয়াদের অগ্নি দৃষ্টি রনিতের দিকে পড়তেই রনিতের কথা আটকে গেলো থতমত খেয়ে বললো, স্যার আমি এখনই বলে আসছি।

ইমার রুমে সবাই ইমাকে নিয়ে মজা করছিলো একটু পরই কাজি সাহেব আরো বেশ কিছু মানুষ সেখানে গেলো। ইয়ানা তখনও সেখানেই ছিলো। বিয়ে পড়ানো শুরু হয়ে গেলো।

বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে তাই এতো গুলি স্টুডেন্ট নিয়ে স্যারটা রিস্ক নিতে চায়নি। দুদিন পরে ফেরার কথা থাকলেও আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় দুদিন আগেই ঢাকা ফিরে এলো সবাই৷ ভার্সিটিতে কিছু কাজ ছিলো সেগুলো কমপ্লিট করে আরমান একটা ট্যাক্সি ডেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো৷ না চাইতেও ইমার জন্য শামুকের বেশ কিছু জিনিস কিনে এনেছে আরমান। কথার জন্য কেনার সময় কিছু জিনিস ইমার জন্য পছন্দ হয়ে যায় তাই নিয়েই এসেছে। এই প্রথম আরমান ইমার জন্য কিছু কিনেছে ইমা ব্যাপারটা কীভাবে নেবে সেটা চিন্তা করছে আরমান। বাড়ির সামনে এসে থমকে গেলো আরমান। পুরো বাড়ি সাজানো আর মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। ভুল ঠিকানায় এসেছে মনে করে আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলো না ঠিকই তো আছে তাহলে বাড়িটা এভাবে সাজানোর মানে কী ? গেইটের সামনে চোখ যেতেই আরমানের পুরো দুনিয়া থমকে গেলো। সেখানে গোটা গোটা ইংরেজি অক্ষরে লেখা
WELCOME TO THE
Wedding
Ima and Iyad

লেখাটা পড়ে কেনো যেনো বুকের বা পাশটায় তীরের মতো আঘাত করলো। আরমানের পুরো দুনিয়া যেনো থমকে গেলো এক পলকে। ট্যাক্সি ড্রাইভার বারবার ভাড়া চাইছে সেটা যেনো আরমানের কানে আঘাত করলেও মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। পাথরের মর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সে লেখার দিকে তাকিয়ে।
#তিক্ততার_সম্পর্ক
লেখনীতেঃ তাহমিনা তমা
পর্বঃ ১০

আরমানের নিজেকে পাথর ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না। এক পা আগাতে বা পিছাতে পারছে না সে।

আরমান নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলো, আমি তো ইমাকে কখনো ভালোবাসিনি। তাহলে কেনো এতো কষ্ট হচ্ছে বুকের বা পাশটায় ? গলাও কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে কেনো হচ্ছে এমন ? ইমা তো আমার কাছে শুধু মাত্র একটা জেদ ছিলো। তবে কী এটা হেরে যাওয়ার কষ্ট নাকি প্রিয় কিছু হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট, কোনটা ?

স্যার আমার দেরি হইতাছে ভাড়াটা দেন।

ট্যাক্সি ড্রাইভারের বিরক্তি ভড়া কণ্ঠে বলা কথায় আরমানের হুশ ফেরে। কাঁপা হাতে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে গাড়ি ভাড়া দিলে সে চলে যায়। আরমান ওয়ালেটটা নিজের পকেটে রেখে হাতটা সামনে এনে ধরলে অবাক হয়ে যায়। আরমানের হাতটা বিরামহীন কাঁপছে। আরমান ধীর পায়ে গেট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো। সারা বাড়ি নানা রকম আলোয় ঝলমল করছে। আরমানের রেগে যাওয়া উচিত ছিলো, উচিত ছিলো সব ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু তার একটুও রাগ হচ্ছে না বরং মনে হচ্ছে বুকের উপর কেউ পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে ৷ সেটা দেখে সে নিজেই অবাক হয়ে গেলো। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তাকে দেখে কলিজার পানি শুকিয়ে গেলো মিস্টার আমিনুল মাহমুদ আর তার স্ত্রী ছাহেরা বেগমের। এই সময়ে ছেলেকে তারা একদমই আশা করেননি। এতো মেহমানের সামনে যদি সিনক্রিয়েট করে তাহলে তারা তাকে সামলাতে পারবে না। মিসেস ছাহেরা বেগম ভয়ে বারবার ঢোক গিলছে ছেলের সামনে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না তার। আরমান চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সবাই উপস্থিত এখানে। বরের দিকে তাকালে তাকে চিনতে একটুও কষ্ট হলো না আরমানের। দেশের বিজনেস আইকন আবরার হামিদ ইয়াদ আর তার পাশে বসে আছে আরমানের স্টুডেন্ট ইশান হামিদ। কাজি সাহেব কবুল বলতে বললে ইয়াদ গম্ভীর গলায় কবুল বলে দেয় তারপর রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করে দেয়।

সাইন করতে করতে ইয়াদ মুচকি হেঁসে মনে মনে বলে, Welcome to hell Mrs Abrar Hamid Yad.

বিয়ে পড়ানো সম্পন্ন হলে সবাই মোনাজাত ধরলে আরমান সেদিকে একবার দেখে পা বাড়ালো ইমার রুমের দিকে। দরজা ঢেলে ভেতরে ঢুকতেই রুমের সবাই মোনাজাত শেষ করে তাকালো আরমানের দিকে। আরমানকে দেখে ইমার কলিজা শুকিয়ে গেলো। অন্যদিকে আরমানকে দেখে চোখ বড়বড় করে ফেললো ইয়ানা। একবার আরমানের দিকে তাকাচ্ছে আর একবার ইমার দিকে তাকাচ্ছে।

ইয়ামা ভাবছে, আরমান স্যার এখানে আর ইমা ভাবির দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেনো ?

নামটা উচ্চারণ করে থেমে যায় ইয়ানা বড়বড় চোখ করে তাকায় ইমার দিকে। আরমানের ভয়ে ইমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।

ইয়ানা অবাক চোখে ইমার দিকে তাকিয়ে ভাবলো, তবে কী এই সেই ইমা ? আমি কী তাহলে কোনো ভুল করতাম ভাইয়ার সাথে ইমার বিয়ে দিয়ে। কিন্তু ভুল কেনো হবে আরমান স্যার বা ইমা কেউ তো কাউকে ভালোবাসে না তাহলে ভুল কেনো হবে ? তবে স্যারের দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে স্যার ইমাকে ভালোবাসে আর ইমার দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে ভয়।

ইয়ানা দুজনের দৃষ্টি দেখে দোটানায় পড়ে গেলো। তবে আরমানের চোখে ইমার জন্য ভালোবাসা দেখে ইয়ানার কেনো যেনো ভালো লাগছে না কষ্ট হচ্ছে ইয়ানার।

কথা আরমানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো, ভাইয়া তোমার তো আরো দুদিন পরে আসার কথা ছিলো আজ চলে এলে যে ?

আরমান থমথমে গলায় বললো, ভুল সময়ে চলে এসেছি মনে হয়। তাই না রে কথা ?

কথা অবাক হয়ে বললো, কী বলছো ?

আরমান আর কিছু না বলে ইমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো।

ইয়ানা বললো, ভাবি আরমান স্যার তোমাদের বাড়িতে কেনো ?

ইমা প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলো আরমানকে দেখে তাই ইয়ানার প্রশ্নে চমকে উঠলো কিন্তু উত্তর দিতে পারলো না।

তা দেখে কথা বললো, এটা আরমান ভাইয়ার বাড়ি তাই সে এখানে।

ইয়ানা অবাক হয়ে বললো, মানে ?

কথা ইয়ানার পাশে গিয়ে বসে বললো, মানে হচ্ছে আরমান ভাইয়া আমার আপন বড় ভাই আর ইমা আপু খালাতো ভাই।

কথাটা শুনে রিকু ছাড়া সবাই অবাক হয়ে গেলো। তারা বুঝতে পারছে না ইমা আরমানের খালাতো বোন সেটা ভার্সিটিতে হাইড কেনো করেছে ?

ইমা চুপচাপ বসে আছে। আরমান তাকে কোনো রকম অপমান না করে চুপচাপ চলে গেলো ব্যাপারটা ঠিক হজম হচ্ছে না ইমার। কারণটা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ইমা

হ্যালো গাইস।

ইশান রুমে ঢুকে সবাইকে হ্যালো বললে সবাই তার দিকে তাকায়। ইশান কথাকে দেখে অবাক হয়ে যায় তবে কথার তেমন রিয়াকশন নেই সে ইশানের দিকে তাকাচ্ছেও না। কারণটা ইশান বুঝতে পারলো না।

ইশান ইয়ানার দিকে তাকিয়ে বললো, ভাইয়া তোকে ডাকছে আপু।

ইয়ানা বললো, আমাকে কেনো ডাকছে ?

ইশান বললো, তুই এসে থেকে যে ভাবির কাছে বসেছিস আর উঠিসই নি। ভাইয়া কিছু বলবে হয়তো তোকে চল।

ইয়ানা কথা না বাড়িয়ে রুমের বাইরে চলে গেলো আর ইশান কথার দিকে একবার তাকিয়ে সে নিজেও চলে গেলো।

ইয়ানা ইয়াদের পাশে গিয়ে বসে বললো, ভাইয়া তুমি আমাকে ডাকছিলে ?

ইয়াদ থমথমে গলায় বললো, এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি পারিস যাওয়ার ব্যবস্থা কর আমি উঠে চলে গেলে সেটা নিশ্চয় ভালো হবে না।

ইয়ানা অবাক হয়ে বললো, ভাইয়া এটা কেমন কথা কেবল বিয়ে শেষ হলো এখনই,,,,,?

ইয়াদ রেগে বললো, দেখ ইয়ানা বিয়ে করতে বলেছিস বিয়ে করেছি। ভাবি চেয়েছিস পেয়ে গেছিস এখন আমি যেটা বলছি সেটা কর নাহলে আমি একাই চলে যাচ্ছি তোরা পরে আসিস।

ইয়ানা বললো, ওকে ওকে রাগ করো না আমি দেখছি কী করা যায়।

ইয়াদ বসে বসে রাগে ফুসফুস করছে। শুধু নিজের বোনের দিকে তাকিয়ে এসব মেনে নিচ্ছে ইয়াদ নাহলে কখন এখান থেকে উঠে চলে যেতো।

সবার থেকে বিদায় নিয়ে ইমা গাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে কথা আর ইয়ানা। গাড়িতে উঠার আগে কথাকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিরবে চোখের পানি ফেললো ইমা আড়চোখে তাকালো দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের জন্মদায়িনী মায়ের দিকে। ইমার মা আর নানু ভেজা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে আর ছাহেরা বেগমের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি। আরমান নিজের রুমের বেলকনি থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। যন্ত্রণাটা এতোক্ষণে যেনো আরো তীব্র রুপ ধারণ করলো। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর থেকে হৃদপিণ্ড যেনো কেউ টেনে ছিঁড়ে বার করে নিচ্ছে। আরমানের চোখ ঝাপসা হয়ে এলে আরমান চোখ হাত দিয়ে বুঝতে পারলো চোখ ভিজে গেছে পানিতে। আরমান হাতটা সামনে এনে হাতে লাগা পানির দিকে অবাক হয়ে তাকালো।

আরমান বিড়বিড় করে বলে উঠলো, আমি তো ইমাকে ভালোবাসি না তাহলে আমার কেনো এতো কষ্ট হচ্ছে ওকে অন্যকারো হতে দেখে। তবে কী প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ভালোবেসে ফেলেছি ওকে ? কিন্তু ও তো এখন অন্যকারো স্ত্রী এখন আর আমার বিন্দু মাত্র অধিকার নেই ওর উপর।

কথাগুলো ভাবতেই আরমানের চোখ থেকে শ্রাবণ ধারা বয়ে যেতে লাগলো। আরমান তাকিয়ে দেখলো ইমা গাড়িতে উঠে গেলো। আজ ইমাকে দেখতে পরীর মতো লাগছে একেবারে লাল টুকটুকে বউ।

আরমান আর দাঁড়াতে পারলো না বেলকনিতে নিজের রুমে এসে বেডে শুয়ে পাড়লো। এসে ফ্রেশও হয়নি সেভাবেই আছে। এখন একটা সিগারেট না হলে থাকা সম্ভব নয়। আরমান হন্তদন্ত হয়ে খোঁজে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে একের পর এক সিগারেট শেষ করতে লাগলো আর না চাইতেও চোখের নদী ঠিক বয়ে চলেছে।

১৪.
ইমা আসার সময় কান্না না করলেও এখন গাড়ি চলতে শুরু করলে তার প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। এই বাড়িতে এতোগুলো বছর কাটিয়েছে সে, কত তিক্ততার অভিজ্ঞতা এই বাড়ির আনাচে কানাচে জড়িয়ে আছে সাথে আছে গুটি কয়েক সুখের স্মৃতি। কথা আর নানু ছাড়া সুখের স্মৃতিতে আর কারো অস্তিত্ব খোঁজে পায় না ইমা।

নাক টানার আওয়াজে বিরক্ত হয়ে ইয়াদ ফোন থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখলো তার সয্য বিবাহিতা স্ত্রী কাঁদছে। লম্বা ঘোমটা টানা তাই মুখ দেখা যাচ্ছে না। ইয়াদের ইচ্ছে করছে এখানে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে কিন্তু এখন সেটা সম্ভব না আর মেয়েটার সাথে একটা কথা বলারও বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই ইয়াদের তাই কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে লাগলে সিটে হেলান দিয়ে। ইমারও হেলদোল নেই পাশের মানুষটা কী করছে তা নিয়ে। সে বাইরের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলতে ব্যস্ত। ইমা ভেবেছিলো তার বর তাকে কিছু বলে অন্তত সান্ত্বনা দিবে সে আড়চোখে পাশে তাকিয়ে দেখতে পেলো ইয়াদ সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। আজ সত্যি ইয়াদকে অনেক বেশি হান্ডসাম লাগছে দেখতে। ইমা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিলো ইয়াদের থেকে। বিশ মিনিটের মধ্যে ইয়াদদের বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামলো। ইমা অবাক চোখে তাকালো বাড়িটার দিকে। এটা তার কাছে বাড়ি নয় বরং রাজপ্রাসাদ মনে হচ্ছে। ইমা ভয়ে এক ঢোক গিলে নিলো এতবড় বাড়িতে সে মানিয়ে নেবে কেমন করে ? আর এতোবড় বাড়ির মানুষগুলো কেমন হবে সে নিয়েও ভয় পাচ্ছে। গেইট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে গাড়ি থামতেই ইয়াদ এক সেকেন্ড ওয়েট না করে গাড়ির দরজা খোলে বের হয়ে গেলো। ইমা তার দিকে অবাক চোখে তাকালো সারা রাস্তা একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি এখন আবার এমন করে চলে গেলো।

ইমা ভাবছে, উনি নিজের ইচ্ছেতে বিয়েটা করেছে তো নাকি কোনো চাপে পরে করেছে।

কথাটা ভাবতেই ইমা অজানা ভয়ে কেঁপে উঠলো। যদি ইয়াদ তাকে বাধ্য হয়ে বিয়ে করে থাকে তাহলে তার কাঁপালে যে ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না ইমা সেটা ভালোই বুঝতে পারছে।

এসব চিন্তার মাঝেই ইয়ানা এসে বললো, চলো ভাবি তোমাকে ভেতরে নিয়ে যাই।

ইমা চমকে তাকালো ইয়ানার দিকে। মেয়েটা বয়সে তার সমান হবে কিংবা বড়। সেই প্রথম থেকে তাকে ভাবি ভাবি কেনো বলছে ইমা সেটা বুঝতে পারছে না। নতুন বউ বেশি কথা বললে খারাপ বলবে তাই জিজ্ঞেসও করতে পারছে না। ইমা চিন্তা ভাবনা সাইডে রেখে ইয়ানার সাথে ভেতরে গেলো তার দৃষ্টি নিচের দিকে। রুবিনা কবির ছেলের বউকে হাসি মুখে বরণ করে ঘরে তুললো। ইমার দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি দিচ্ছে সে। ইমাকে ড্রয়িংরুমে সোফায় বসিয়ে দেওয়া হলো। সবাই নতুন বউ দেখতে ব্যস্ত। এদিকে ইয়াদ নিজের রুমে গিয়ে চেঞ্জ করে শাওয়ার নিতে চলে গেলো। শাওয়ার নিলো অনেকটা সময় নিয়ে যাতে মাথাটা একটু ঠান্ডা হয়। শাওয়ার শেষে বের হলে নিজের রুমের দিকে খেয়াল করলো ইয়াদ। তখন মাথা গরম ছিলো তাই কোনোদিকে না তাকিয়ে ওয়াশরুমে চলে গিয়েছিলো। এখন সারা রুমে একবার চোখ বুলিয়ে রহস্যময় হাসলো ইয়াদ।

আজকের রাতটা তোমার জন্য দিয়ে গেলাম মিসেস আবরার হামিদ ইয়াদ। আগামীকাল সকাল থেকে শুরু হবে তোমার নতুন জীবন। যে জীবনে না তুমি কখনো শান্তি পাবেন আর না পাবে কখনো মুক্তি।

ইয়াদ একটা কালো জিন্স প্যান্ট আর ধূসর রঙের টিশার্ট পরে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো গাড়ির চাবি নিয়ে আর সবাইকে উপেক্ষা করে বের হয়ে গেলো বাসা থেকে। ইমাকে বড্ড ক্লান্ত লাগছে দেখতে তাই ইয়ানা তাকে নিয়ে ইয়াদের রুমে চলে এলো। ওয়াশরুম দেখিয়ে দিয়ে বললো ফ্রেশ হয়ে নিতে। ইয়াদের রুমে ইয়ানা আর মিসেস রুবিনা ছাড়া এই প্রথম অন্য কোনো নারীর পা পড়লো। ইয়ানা ইমাকে রেখে চলে গেলো। ইয়ানা চলে যেতেই ইমা রুমটা দেখতে লাগলো ঘুরে ঘুরে। অনেকটা বড় এই রুম, বেডটা নানা রঙের ফুল দিয়ে সাজানো, বেডের পাশে একটা সাইড টেবিল আর তারপর বড একটা সোফা, বেডের অন্যপাশে ড্রেসিংটেবিল, একটা বড় কাবার্ড আর বুক সেলফ, অন্যদিকে দুটো দরজা একটা ওয়াশরুমের অন্যটা ইমার মনে হলো হয়তো বেলকনির হবে। সারা রুম জুড়ে ফুলের সুভাষ ম-ম করছে। সেই সুভাষ ইমার মনে অন্য এক অনুভূতির সূচনা করছে। একটু ভালোলাগা, কিছু কৌতূহল আর অনেকটা ভয়।

এ কী ভাবি তুমি এখনো ফ্রেশ হতে যাওনি ?

ইয়ানার কথায় ইমা ঘুরে তাকালো দরজার দিকে থতমত খেয়ে বললো, না মানে রুমটা,,,,

ইয়ানা বললো, এখন থেকে এখানেই থাকতে তাই রুম পরেও দেখতে পাবে এখন ফ্রেশ হয়ে আসো আর আমি খাবার নিয়ে এসেছি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিবে কেমন ?

ইমা বললো, আমার খিদে নেই।

ইয়ানা গম্ভীর গলায় বললো, দেখো ভাবি সম্পর্কে তুমি আমার থেকে বড় হলেও বয়সে আমার এক বছরের ছোট তুমি। তাই আমার কথা শুনতে হবে তোমাকে আর তাছাড়া আমি হলাম আমার ভাইয়ার প্রাণ তাই আমার কথা না শুনলে ভাইয়া তোমাকে আস্ত রাখবে না।

ইয়ানার কথা শুনে ইমা বুঝতে পারলো ইয়ানা ইয়াদের বোন তবে ইয়ানার হুমকিতে ইমা ভয়ে ঢোক গিললো। আর তা দেখে ইয়ানা হা হা করে হেঁসে উঠলো আর ইমা অবাক হয়ে তাকালো।

ইয়ানা বললো, ভাবি তুমি একটু বেশি সহজসরল কিন্তু সেটা হলে যে এই বাড়িতে মানিয়ে নেওয়া তোমার কষ্ট হয়ে পড়বে। আজ আর কিছু বলে ভয় পাইয়ে দিবো না আগামীকাল অনেক গল্প করবো এখন তুমি ফ্রেশ হয়ে এসে খেয়ে নাও ভাইয়া আসলে আমি রুমে পাঠিয়ে দিবো।

ইয়ানার শেষের কথা শুনে ইমার অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেলো সারা গায়ে। ইয়ানা চলে গেছে দেখে ইমা নিজের লাগেজ থেকে একটা নরমাল শাড়ী বের করলো মেজেন্ডা কালারের। শাওয়ার নিয়ে শাড়ীটা পড়ে নিলো ইমা। রুমে এসে দেখে ইয়াদ এখনো আসেনি তাই খাবার মুখে দিলো। খাওয়া শেষে ইমা উঠে দাঁড়ালো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত বারোটা বাজে। ইমার ভয় করতে শুরু করলো একটু পরই হয়তো ইয়াদ রুমে আসবে কী হবে তখন কে জানে। আবার কোন পরিস্থিতিতে পরবে ইমা সেটা ভাবছে। কেমন হবে ইয়াদ সেটা ভাবতে ভাবতেই সোফায় ফেলে রাখা ইয়াদের বরের পোশাক দেখতে পেলো ইমা। এগিয়ে গিয়ে হাতে নিতেই একটা মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে এসে লাগলো। ঘ্রাণটা ভালো করে নেওয়ার জন্য ইমা শেরওয়ানিটা নাকের কাছে নিলো। মুগ্ধ করা একটা সুভাষ শেরওয়ানিতে। ঘ্রাণটা ভালো করে নিতেই ইমার সারা শরীর কাটা দিয়ে উঠলো। পরক্ষণে মুচকি হেঁসে উঠলো সে। বড্ড ক্লান্ত লাগছে তাই শেরওয়ানিটা আগের জায়গায় রেখে বেডে গিয়ে বসলো। অপেক্ষা করতে লাগলো ইয়াদের কখন আসবে কে জানে। এদিকে ইমার ঘুমও পাচ্ছে খুব করে।

১৫.
আরমান এখনো রুমের দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে। সিগারেটের প্যাকেট অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে তবু সেভাবেই শুয়ে আছে। চোখের সামনে ভাসছে ইমার বধুবেশ। আরমান উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে তার কেনো এতো কষ্ট হচ্ছে। ইমাকে তো সে শুধু চেয়েছিলো বন্ধুদের সামনে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। ইমাকে নিজের করে বন্ধুদের উচিত জবাব দিতে চেয়েছিলো। সে পরিকল্পনা নষ্ট হওয়ার জন্য আরমানের রাগ করা মানায় প্রচন্ড রাগে সব ধ্বংস করে দেওয়া মানায়। কিন্তু ইমাকে হারিয়ে বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা করা একদমই মানায় না আরমানের, একদমই না।

দরজা ঢেলে রুমে এলো ছাহেরা বেগম। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে তার কী উত্তর দিবে মনে মনে আরো একবার আওড়ে নিলো। ছাহেরা বেগম রুমের লাইট অন করে দেখে ছেলে বেডে শুয়ে আছে কপালে হাত দিয়ে সটানভাবে। ফ্লোরে পড়ে আছে গুটি কয়েক সিগারেটের শেষাংশ।

ছাহেরা বেগম বললো, কখন এসেছিস এখনো ফ্রেশ না হয়ে এভাবে শুয়ে আছিস কেনো তুই ?

আরমান মায়ের গলা শুনে শান্ত গলায় বললো, এমনটা কেনো করলে মা ?

এই কথাটুকুই ছাহেরা বেগমের প্রেসার বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো।

চলবে,,,,,
চলবে,,,,
চলবে
(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here