তুমি আছো মনের গহীনে পর্ব ২০

#তুমি_আছো_মনের_গহীনে 💖
#পর্ব- ২০
#Jannatul_ferdosi_rimi (লেখিকা)
নিজের প্রাক্তন স্ত্রীকে অন্য কারো বুকে দেখে অভ্রের নিজের রাগকে সংযত করা বড্ড কঠিন লাগছে। যতই হোক মেহেভীন তার স্ত্রী ছিলো,একদিন মেহেভীনও ত এইভাবে ভয় পেলে জড়িয়ে তাকে ধরতো,কিন্তু আজ মেহেভীন অন্য কাউকে জড়িয়ে ধরেছে, তা মেনে নিতে পারছে না অভ্র। মেহেভীন ঠিক কাকে জড়িয়ে ধরে আছে তা বুঝতে পারছে না অভ্র। কেননা আরহামের মুখটা অন্যদিকে ঘুড়ানো বলে, অভ্র আরহামের মুখ দেখতে ব্যর্থ। অভ্র গাড়ি থেকে বেড়োতে নিলে,তার ফোন হঠাৎ বেজে উঠে। অভ্র ফোনে তাকিয়ে দেখে তার মায়ের ফোন। সে ফোনটা কাটতে নিলে, অভ্রের মা পুনরায় ফোন করে তার ছেলেকে। বাধ্য হয়ে অভ্র তার মায়ের ফোন ধরার সাথে সাথেই, অভ্রের মা নিজের কন্ঠে কাঠিন্য নিয়ে এসে বলে, ‘অভ্র তুমি কোথায়? ‘
অভ্র মেহেভীনের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘একটা জরুরী কাজে এসেছি। ‘

‘যেখানেই থেকে থাকো না। এখুনি ফিরে এসো বাড়িতে। ‘

‘কিন্তু মা। ‘

‘আমি আর কিচ্ছু শুনতে চাইনা অভ্র। বাড়িতে অনেক কান্ড ঘটে গেছে। এখুনি তুমি আসবে বাড়িতে। ‘

কথাটি বলার সাথে সাথেই ইশরা বেগম কলটা কেটে দিলেন। অভ্র বুঝতে পারছে না তার মা হঠাৎ এইভাবে তাকে ফোন করলো কেন? বাড়িতে হঠাৎ কি এমন হলো? অভ্রের মেহেভীনের কাছে যেতে ইচ্ছে হলেও, সে তা পারলো না। সে গাড়ি ঘুড়িয়ে নিলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। অভ্র চলে যেতেই, মেহেভীন তৎক্ষনাক আরহামকে ছেড়ে দিলো। বাইরের দিকে একপলক তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলো। আরহাম এই রহস্য হাসির মানে বুঝতে না পেরে বললো,

‘ হে আর ইউ ওকে নাও?’

‘ইয়াহ। ‘

আরহাম খেয়াল করে দেখলো তার ঘড়িটা মেহেভীনের ওড়নার সাথে বেজে গেছে। আরহাম মেহেভীনের দিকে এগিয়ে, নিজের ঘড়ি খুলতে লাগলো। মেহেভীন আরহামের দিকে তাকিয়ে আছে।আরহাম কাছে আসলেই,মেহেভীনের বুকের ভিতরটা জোড়ে জোড়ে কেঁপে উঠে। আচ্ছা সে যখন আরহামকে জড়িয়ে ধরেছিলো, তখন আরহামের অনুভুতি কেমন ছিলো? অবশ্যই খুবই নরমালভাবে ব্যাপারটা নিয়েছে আরহাম,কিন্তু মেহেভীনের হঠাৎ এইরকম অদ্ভুদ অনুভুতি কেন হয়?

‘ কি এতো ভাবছো? ‘

শান্ত কন্ঠে প্রশ্নে করে বসে আরহাম।

‘অনুভুতি অদ্ভুদ এক জিনিস আরহাম সাহেব। হুটহাট চলে আসে। কিন্তু এই অনুভুতিগুলো যে বড্ড ভয়ংকর।আস্তে আস্তে আমাদের সর্বনাশের দিকে ধাবিত করে।’

আরহাম মুচকি হেসে মেহেভীনের দিকে আরেকটু এগিয়ে মেহেভীনের সিট বেলটা ভালো করে লাগিয়ে দিয়ে বললো,

‘অনুভুতিগুলো সর্বদা সুন্দর হয়। ভূল মানুষের প্রতি অনুভুতি আসলে, তা ভয়ংকরে পরিনত হয় কিন্তু সঠিক মানুষের জন্যে মনের কুঠিরে অনুভুতি জমা হলে, তা আমাদের সুখের রাজ্যে নিয়ে যায়।’

আরহাম কথাটি বলেই গাড়ি চালানোতে মনোযোগ দেয়। মেহেভীন কথাগুলো আপনমনে বিরবির করতে থাকে। এই লোকটার প্রতিটা কথাই অত্যন্ত যুক্তিগত।লোকটা এতো কথা পায় কোথায়? লোকটাকী কারো প্রতি মন হারিয়েছে? কার প্রতি? কে সেই সৌভাগ্যবতী? যে নিজের দায়িত্বপালনের জন্যে, অচেনা মেয়েটাকে এতোটা আগলে রাখে,সে তার প্রেয়সীকে ঠিক কতটা আগলে রাখবে কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই, মেহেভীন ভার্সিটি পৌঁছে যায়।

________

অভ্র বাড়িতে ঢুকতেই দেখে বাড়ির পরিবেশ কেমন নিষ্চুপ রয়েছে। অভ্রের মা সোফার এক কোনে বসে আছে। মায়রা মাঝখানে বসে আছে। হাতে তার রিপোর্ট। অভ্র বুঝলো মায়রা ডক্টরের চেম্বার থেকে এসেছে নিজের রিপোর্ট নিয়ে। ছেলেকে দেখেই, অভ্রের মা উঠে দাড়িয়ে বললেন,

‘অভ্র এসেছিস? ‘

‘কি হয়েছে মা? তোমরা এতো নিষ্চুপ যে। আমাকেই বা এতো তাড়াহুড়ো কর ডাকলে কেন? ‘

অভ্রের মা মায়রার দিকে তাকিয়ে বললেন,’ আমি বলবো নাকি তুমি বলবে? ‘

মায়রার নামক রমনীর মুখশ্রীতে একরাশ লজ্জামিশ্রিত এসে ধরা দিয়েছে। অভ্রের মা মুচকি হেসে বলে, ‘বেশ আমি এখন উপরে যাই। তুমিই বরং অভ্রকে বলে দাও।’

অভ্রের মা উপরে চলে গেলেন। অভ্র মায়রার দিকে এগিয়ে এসে বলে, ‘কি হয়েছে মায়রা? মা কি বলে গেলো? রিপোর্টেই বা কি এসেছে?’

মায়রা কিছু বললো না। অভ্রের বুকে নিজের মাথা রেখে,একপ্রকার ঝাপটে ধরলো অভ্রকে। তারপর লজ্জামাখা কন্ঠে বললো,

‘আমরা বাবা-মা হতে চলেছি অভ্র। আমার গর্ভে আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন বেড়ে উঠছে। যদিও প্রথমে খবরটি পেয়ে, আমার খারাপ লেগেছিলো। এখনি মা হতে চাইনি আমি।তবুও আমি যে মা হওয়ার স্বাদ গ্রহণ করতে চলেছি এইটাই অনেক আমার জন্যে। ‘

[লেখিকাঃ জান্নাতুল ফেরদৌসি রিমি]
অভ্র কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার কানে শুধু বেজে চলেছে সে বাবা হতে চলেছে। অভ্রের জায়গায় অন্য কেউ হলে, খুশিতে পাগল হয়ে যেত হয়তো মায়রাকে কোলে তুলে ঘুড়ত, কিন্তু কেন যেন অভ্র বাকিদের মতো বাবা হওয়ার সংবাদ পেয়ে, খুশি হতে পারলো না। অভ্র কোনরুপ পতিক্রিয়া না করে নিজের ঘরে চলে গেলো। অভ্রের থেকে এইরকম অস্বাভাবিক আচরন একদমই আশা করেনি মায়রা।
সে তো ভেবেছিলো, বাবা হওয়ার খবর শুনে, অভ্র ঠিক তাকে আগের মতো ভালোবাসবে। তাহলে মায়রার অনাগত সন্তান ও কি মায়রা ও অভ্রের মাঝের দূরত্বের অবসান ঘটাতে ব্যর্থ?

______

আরহাম অফিসে এখনো। মেহেভীন জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ অভ্রকে সে দেখেছিলো, সে বুঝতে পারছিলো অভ্র তার উপর নজর রাখছে। তাই সে ইচ্ছে করেই আরহামকে জড়িয়ে ধরিয়ে রেখেছিলো, যেন অভ্র ভূল বুঝে মেহেভীনের সাথে আর যেন যোগযোগ করার চেস্টা না করে। মেহেভীন চাইনা অভ্রের আর কোন ছায়া তার এবং তার সন্তানের জীবনে পড়ুক,কিন্তু মেহেভীন অভ্রের চোখে একপ্রকার রাগ ক্ষোভ দেখতে পেয়েছে। মেহেভীনকে অন্য কারো বুকে দেখতে পেয়ে অভ্রেরও কেন যেন বড্ড খারাপ লাগছিলো। মেহেভীন তা বুঝতে পেরে,আপনমনেই বড্ড আনন্দ পেয়েছিলো। কেননা মেহেভীনও একসময় এই পরিস্হিতিটাকে সহ্য করেছিলো, যখন অভ্রের বুকে মায়রা ছিলো। ঘরে আরিয়ানের উপস্হিতি টের পেয়ে, মেহেভীন পিছনে ঘুড়ে বলে, ‘ আরিয়ান তুই? ‘

আরিয়ান একটা ব্যাগ মেহেভীনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘ দেখ তো কেমন হয়েছে? ‘

মেহেভীন প্যাকেটটা খুলে দেখে তাতে তাঁতের সাদা রংয়ের একটি সাদা শাড়ি। শাড়িটা বেশ সুন্দর সিম্পলের মধ্যে অন্যরকম সৌন্দর্য রয়েছে, তা হলো শাড়িটা একেবারে ধপধপে সাদা তার মধ্যে হাল্কা নীল রং। মেহেভীন আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ শাড়িটা হঠাৎ কিসের জন্যে? ‘

‘কালকে তোর ভার্সিটির একটা ফাংশন আছে না? রংয়ের উৎসব। রং নিয়ে সবাই নিজেদের রঙ্গিন করে তুলবে। তোর তো কোন শাড়ি নেই তাই ভাবলাম এই শাড়িটা তোকে কিনে দেই।’

‘ এইসবের কি দরকার ছিলো? শাড়িটাও অনেক সুন্দর। তোর চুজ কবে থেকে সুন্দর হলো এতো? ‘

‘আমি না ভাইয়া করেছে চুজ। আমি তো অন্যটা চুজ করেছিলাম। কিন্তু ভাইয়া বললো এইটাতেও তোকে মানাবে। ‘

মেহেভীন অবাক হয়ে বললো, ‘উনি করেছেন মানে?’

আরিয়ান তোতলিয়ে বলে, ‘না মানে তুই তো জানিস আমি একদম কিছু চুজ করতে পারি না। তাই ভাইয়াকে নিয়ে চুজ করতে নিয়ে গিয়েছিলাম। ‘

মেহেভীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘তু্ই যখন নিয়ে আছিস আমি অবশ্যই পড়বো কিন্তু অইসব রং খেলতে পারবো না। ‘

আরিয়ান উঠে বলে, ‘কেন? তুই তো আগে রং খেলতে ভালোবাসতি। ‘

মেহেভীন শুকনো হাসি দিয়ে বললো, ‘আগে আর এখনের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। যার জীবনটাই রংহীন হয়ে গিয়েছে। যার জীবনকে অতীতের কালো রং গ্রাস করে ফেলেছে,তাকে রং খেলায় মানায় না। ‘

আরিয়ান চুপ হয়ে যায়।

সকালে মেহেভীনকে আরিয়ান ভার্সিটির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। আজকে মেহেভীনের সাথে আরহাম আসেনি। আরহামের নাকি অফিসে আজকে অনেক কাজের চাপ। মেহেভীনকে আজকে আরহামের পছন্দ করে দেওয়া শাড়িতে বড্ড মোহনীয় লাগছে। মেহেভীনের হলুদ ফর্সা গায়ের রংয়ে শাড়িটা বড্ড মানিয়েছে। মেহেভীন শাড়ির সাথে মেচিং করে মাথায় হিজাব পড়েছে। আরহামের মা মেহেভীনকে দেখেই কাজল দিয়ে দিয়েছেন, যেন মেহেভীনের নজর লেগে না যায়। আরিয়ানও মেহেভীনের প্রশংসা করেছিলো,কিন্তুআরহাম কোনরুপ পতিক্রিয়া করেনি। সে শুধু নিজের ব্রেকফাস্ট খাওয়াতে মনোযোগ দিয়ে রেখেছিলো, এতে যেন মনটা ক্ষুন্ন হয়েছিলো মেহেভীনের, কিন্তু কেন কে জানে?

মেহেভীন ভার্সিটি ঢুকেই দেখে ইতিমধ্যে রংখেলা শুরু হয়ে গেছে। মেহেভীন একটা কোনায় গিয়ে শুধু দাড়িয়ে থাকে। তখনি একজন ছোট্ট বাচ্ছা কাদতে কাদতে মেহেভীনের কাছে এসে বলে,

‘আন্টি আন্টি। আমার বলটা না পড়ে গেছে। ‘

‘কোথায় পড়ে গেছে সোনা? ‘

ছেলেটি স্টোর রুমের দিকে ইশারা করে বলে,

‘অইযে ওই রুমটায়। ‘

‘আচ্ছা তুমি বসো। আমি আসছি। ‘

মেহেভীন স্টোর রুমের সামনে গিয়ে দেখে বলটা দরজায় পড়ে আছে। মেহেভীন ঝুঁকতেই, কেউ মেহেভীনকে টেনে ধরে স্টোর রুমে নিয়ে যায়। মেহেভীন কিছু বুঝে উঠার আগেই, অচেনা যুবকটি দরজাটা আটকিয়ে দিয়ে, মেহেভীনের চোখ বেঁধে দেয়। মেহেভীন চিল্লিয়ে বলে উঠে,

‘কে কে আপনি? ‘

সঙ্গে সঙ্গে অচেনা যুবকটি মেহেভীনের ঠোটে আঙ্গুল দিয়ে নেশাক্ত কন্ঠে বলে,

‘কোন কথা নয়। একদম চুপ করে থাকবে। ‘

যুবকটির কন্ঠের নেশাক্তের প্রখরতা এতোটাই ছিলো যে, মেহেভীন জমে বরফ হয়ে গেলো। কন্ঠটা সে চিনতে গিয়েও ঠিক কার কন্ঠ বুঝে উঠতে পারছে না।
যুবকটা মেহেভীনের কোমর আলতো করে চেপে ধরে। কেপে উঠে মেহেভীন। ছুটাছুটির চেস্টা করতে গেলে,তাতে বাঁধ সাঁধে যুবক। পুনরায় গলাতে নেশাক্ত সুর এনে বলে,

‘বড্স ছটফটে তুমি। এতো ছটফট করলে, আমি যা করতে এসেছিলাম। তা করতে পারবো না। আজ তুমি চাইলেও পালাতে পারবে না তুমি প্রেয়সী। তোমার রংহীন জীবনকে আমার এক মুঠো ভালোবাসার রং দিয়ে রাঙ্গিয়ে দিতে চলে এসেছি আমি। ‘

মেহেভীন……….

চলবে ইনশা-আল্লাহ 💖

নোটঃ আগের পর্বে একটা ভূল হয়েছিলো রুশার জায়গায় রিনা লিখে ফেলেছিলাম 🙂সরি। ]
[এতোটা অস্হীর হয়ে পড়িয়েন না জনগন 🐸। আস্তে আস্তে দেখুন কি হয় সামনে। কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন। 🌹 এখন থেকে নিয়মিত দিবো ইনশা-আল্লাহ।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here