তুমি আমার প্রেমবতী পর্ব -০৫+৬

#তুমি_আমার_প্রেমবতী
#পর্বঃ৫ ও ৬
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

৯.
হৃদয়ের বেদনা স্মৃতিমুখর সন্ধায় বুক ভরে বেঁচে থাকে।সমস্ত আকাশ জুড়ে এমনই কালো মেঘ যেন এক্ষুণি ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হবে!এহেন বর্ষনের দিনে অনুভবের আস্বাধ প্রাণ ভরে গ্রহণ করা যায় মনের মনিকোঠায়, স্মৃতির বাসরে স্মরণীয় করে রাখা যায়,তবে সন্ধ্যার এই ক্ষণটির স্বরূপ ভাষায় প্রকাশ করা দু:সাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।তাতে কী!এমন প্রশান্তির ক্ষণ জীবনে ২য় আসবে কি না তার তো ঠিক নেই।
আড্ডা জমে গেছে।চায়ে’ চুমুক দিয়ে সাক্ষর গিটারে সুর তোলেছে।একই সুরে ফোক গান!হৈ–হুল্লোড় সময়টা বেশ ভালোই কাটছে।সাক্ষর আর তাওহিদ ছাড়াও আরও তিন জন এসেছে মূহুর্তটা ভাগাভাগি করতে।দুজন তাদের বন্ধু। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। একজন জুনিয়র। ২য় বর্ষের ছাত্র সে।যেকোনো আড্ডায় তাকে পাওয়া যায়।বেশ ভালো বন্ধুর মতো সম্পর্ক গড়ে ওঠেছে ছেলেটার সাথে।বন্ধুত্বের এই কালজয়ী বন্ধন দেখতেও ভালো লাগে।একসাথে সবাই মিলে অতি সামান্য কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা, আবার কথার পিঠে কথা তুলে মিলে যাওয়া।ফোক গানের সুরে একসাথে হেসে ওঠা।

একদফা চা’ শেষ করে আড্ডায় ক্ষাণিকটা বিরতি।আবার কিছুক্ষণ পরেই সবাই মিলে গান ধরা।সাক্ষর গিটারের তালে গান ধরলো, ‘ব্যাচেলার আমি ব্যাচেলার।’ছেলেটার কন্ঠ বেশ ভালো।চাইলে কোনো ব্যান্ডে যোগ দিতে পারে।কিন্তু সে সবে আগ্রহ খুঁজে পায় না সাক্ষর।গান শুধুই শখের বশে গাওয়া।যখন বড্ড একা একা লাগে নিজেকে গিটার তখন একমাত্র সঙ্গী।গিটারের এক অদ্ভুত জাদু আছে নয়তো কিভাবে দ্রুতই মন ভালো করে দেয় সাক্ষরের!
এসাইনমেন্ট শেষ না করেই আড্ডায় বসেছে সাক্ষর।সারা রাত আড্ডা দিয়ে সারাদিন ঘুমানোর আইডিয়াটা মন্দ নয়।ভার্সিটিতে যাওয়ার কোনো চাপ নেই।হোস্টেল সুপার সে সম্পর্কে বড় উদাসহীন।দুই তিন দিন পর পর একটু এসে পদধুলি দিয়ে যায়।বিষয়টা মন্দ নয়।মাঝে মাঝে ফাঁকিবাজির চিন্তা করলে হোস্টেল সুপারের এই দোষটাকে গুণ বলেই মনে হয়।সারা রাত শান্তিপূর্ণ ভাবে আড্ডা দিয়ে সময় কাটানোর আনন্দ কি প্রতিদিন আসবে নাকি?

১০.
‘তুই কি সত্যি এই বিয়েটা করবি?মোজাম্মেল সাহেবের ছোট ছেলেকে না জেনে না শুনে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলি?’
দরজায় তাকিয়ে মা মমতাজ বেগমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো স্নিগ্ধা।মায়ের কথায় ইষৎ চমকালো স্নিগ্ধা।ছোটবেলা থেকে এই মানুষটা তাকে অনেক বেশি বুঝে।হাত ধরে টেনে মা’কে বিছানায় বসিয়ে বলল,’কেন তুমি এই বিয়েতে খুশি নও?’

‘তুই যদি বিয়েটা মন থেকে মেনে নিয়েই করিস তাহলে আমি কেন খুশি হবো না?কিন্তু ছেলেটা সম্পর্কে এখনো তেমন কিছুই জানিনা আমরা!তাই একটু মনটা উসখুস করছে।’

‘তুমি চিন্তা করো না আম্মু।জানিনা তো কি হয়েছে?জানতে কতক্ষণ!ছেলেটাকে দেখে কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখে তারপর না হয় বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করবে।’

‘ হ্যাঁ, তা তো করতেই হবে।কিন্তু তবুও আমার মনে কি একটা অস্বস্তি হচ্ছে।মায়ের মন তো! কিছু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়।’

‘তোমার কিসের এতো চিন্তা আম্মু?দেখো আব্বু তো মোজাম্মেল আংকেল’কে খুব ভালো করেই চিনেন।যদি ভালো না হবে তাহলে সেই বাড়িতে আমাকে নিশ্চয়ই বিয়ে দিতে চাইতেন না?তাহলে তোমার এতো দ্বিধা কিসের?’

‘এক ছেলের জন্য পাত্রী দেখতে এসে আরেক ছেলের সাথে পাত্রীর বিয়ে দিচ্ছেন।উনার বড় ছেলে যেই ব্যাবহার করলো এর পর ঐ বাড়িতে নিজের মেয়েকে দিতে আমার মন সায় দেয় না।এতো অপমান করলো তবুও তুই কেন রাজি হলি?’

স্নিগ্ধা মুখে কিছু বললো না।মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো।মেয়ের কুটিল সেই হাসির মর্ম ধরতে পারলো না মমতাজ বেগম।মনে মনে বিষণ ভাবে জ্বলে ঊঠলো স্নিগ্ধা।রক্তে রাগের পরিমান খুব কম।তবে আত্নসম্মান অনেক বেশি।আজকের এই অপমানের শোধ নিতেই যে ঐ বাড়িতে বউ হয়ে প্রবেশ করতে চায় স্নিগ্ধা।তাইতো মোজাম্মেল সাহেবের প্রস্তাবে রাজি হলো।সে নিজেও দেখতে চায় অভি কেমন মেয়ে বিয়ে করবে?তার সৌন্দর্যই যদি অভির অপছন্দের কারণ হয়।তাহলে অভি কেমন কুৎসিত মেয়েকে বিয়ে করবে সেটা দেখার ইচ্ছে জেগেছে মনে।আর আজকের এই অপমান সহজে ভুলে যাবার পাত্রী স্নিগ্ধা নয়।

১১.
রাতের মধ্যভাগে বৃষ্টি থেমে গেছে।শান্ত শীতলতায় ভরে ওঠেছে গোটা ধরণী।নিশুতিরাতে ঝিম ধরা রেলগাড়ী সর্পিল গতিতে এগিয়ে যায় কোনো এক গন্তব্যে।রেলগাড়ীর ঝকঝকানো শব্দে এপাশ থেকে ওপাশ ঘুরে ঘুমন্ত প্রেমা।বার কয়েক ‘উঁহু’ শব্দে ঘুম পাতলা হয় প্রেমার।কান খাড়া করে খোঁজার চেষ্টা করে শব্দটির উৎস।মাথার কাছে থাকা বাটন ফোনটির টর্চ লাইট জ্বালিয়ে পাশের চৌকিতে ঘুমন্ত ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে শব্দটি আদিলের থেকেই আসছে।ঘুম ছুটে যায় প্রেমার।আস্তে করে মায়ের পাশ কাটিয়ে বিছানা থেকে নামে প্রেমা।
ঘরে দুইটা চৌকি। প্রেমা আর সেলিনা পারভীন থাকে বড় চৌকিটাতে।আর অপর কোণের ছোট চৌকিটাতে থাকে আদিল।ঘরের এক কোনো একটা কাপড় রাখার আলনা।এর সর্বশেষ নিচের অংশটায় একটা রং উঠা ট্রাংক। তাছাড়া ঘরে একটা ছোট টেবিল,এর ওপর সাজানো পুরনো কিছু বই খাতা আর সেলিনা পারভীনের কিছু ওষুধ সাথে একটা ছোট ঝুড়িতে মেয়েদের নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র।এছাড়া ও কিছু টুকিটাকি জিনিস পত্র রয়েছে।খাওয়া দাওয়ার হাড়ি পাতিল সব কিছুই আদিলের ছোট চৌকির নিচে স্থান পেয়েছে।বড় চৌকির নিচে কিছু অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।ঘরে একটি মাত্র জানালা।জানালার ঠিক উর্ধ্বে ঘরের এপাশ থেকে পাশাপাশি একটা লম্বা দড়ি টানানো।দড়িতে ঝুলছে কিছু আধ ভেজা কাপড়।ঘর আলো বাতাসের দীনতায় ভরপুর।

বিদ্যুৎ এসেছে কখন তা ঠিক আন্দাজ করতে পারে না প্রেমা।লাইট জালিয়ে প্রেমা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল আদিলের চৌকির পাশে।গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠলো সে।জ্বরে গা’ পুড়ে যাচ্ছে।ঘুমন্ত আদিলের মুখ দিয়ে যন্ত্রণায় ‘উঁহ’ শব্দ বেরুচ্ছে।প্রেমার ঠান্ডা হাত আদিলের শরীরে পরতেই ইষৎ কেঁপে ওঠে আদিল।হঠাৎ করে এই চৈত্র মাসের বৃষ্টিতে ভিজার ফলশ্রুতিতে জ্বর এসেছে। সন্ধ্যার পর যখন বাড়িতে ফিরেছিল তখন ছেলেটাকে না মা*র*লে ও হতো।অনুশোচনায় পুড়ে প্রেমার অন্তর।ছেলেটার গায়ে পাতলা একটা কাঁথা।গোটানো আরেকটা কাঁথা টেনে আদিলের গায়ে দেয় প্রেমা।
টেবিলের কাছে এসে এতো ওষুধের ভীরে জ্বরের একটা ট্যাবলেট খুঁজতে থাকে প্রেমা।পেয়েও যায়। সরকারি হাসপাতালের নাপা ট্যাবলেট। ভাগ্যিস এনে রেখেছিল।একটা ট্যাবলেট সহ এক গ্লাস পানি নিয়ে ঘুমন্ত আদিলের পাশে বসে গায়ে হালকা ঝাঁকুনি দেয় প্রেমা।আদিল নড়ে ওঠে।প্রেমা আবার আহত গলায় শোধায়,’এই ভাই?তোর জ্বর হয়েছে একটু উঠে ট্যাবলেট খেয়ে তার পর ঘুমিয়ে যা।’
আদিল জেগে ওঠে।দুর্বল কন্ঠে বলে, ‘কি হয়েছে আপু ডাকছিস কেন?’
প্রেমা আদিলকে বলে,’কথা না বলে ওষুধ খেয়ে নে!বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধিয়েছিস।এখন ওষুধ খেয়ে আমাকে উদ্ধার করে তারপর ঘুমাও। ‘
মধুর হেসে আস্তে আস্তে মাথা দুলায় আদিল।বোন তাকে যতোই বকুক না কেন,তাকে খুব ভালোবাসে।ওষুধ খেয়ে পুনরায় শুয়ে পরে আদিল।সেলিনা পারভীন তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
লাইট বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে প্রেমা।নিষ্পলক দৃষ্টিতে অন্ধকারে ঘরের ওপরে চালের দিকে তাকিয়ে থাকে সে।লম্বা শ্বাস নেয়।ভাইটার জ্বর হয়েছে,মা ক্যান্সারের রোগী।কাল সকালে তাকে একাই বেরুতে হবে।রাস্তায় ফুল আর পানি বিক্রি করে যা টাকা উপার্জন করতে পারে তাই তাদের সম্বল।প্রেমা ফুল আর আদিল পানি বিক্রি করে।

প্রেমার বিশ্বাস একদিন তাদের এই দুর্দিন ঘুচবে।কত রাত জেগে বুকের ভেতর সেই আশা পূষন করেছে প্রেমা।খুব কি ক্ষতি হতো তাদের বাবা মা সহ একটা সুখের সংসার হলে?বাবা তো রোড এক্সিডেন্টে কবেই গত হয়েছে।তখন আদিলের বয়স ছিল মাত্র ছয় মাস।বাবার মৃত্যুর পরে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে তাদের বড় করছিল।কিন্তু বছর খানেক আগেই মায়ের ক্যান্সার ধরা পরে।সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের শরীরের যত্ন নিতেই ভুলে গেছিলেন সেলিনা পারভীন। ভাবতে ভাবতে চোখে তন্দ্রা লেগে যায়।জ্বালাময়ী এক আশা বুকে লালন করে ঘুমিয়ে পরে প্রেমা।

চলবে,ইনশাআল্লাহ✨

(আসসালামু আলাইকুম। আমরা যারা গল্প লিখি তারা কয়েক ঘন্টা চিন্তা করে কষ্ট করে একেকটা পর্ব লিখি।আর আপনারা মিনিট দুয়েক ব্যয় করে গল্পটা পড়েন।কিন্তু একটু সময় ব্যয় করে দু লাইনের ছোট্ট একটা কমেন্ট করতে আপনাদের কষ্ট হয়।এসব দেখলে সত্যি খারাপ লাগে😔।সবার গঠন মূলক মন্তব্য আশা করি।)

#তুমি_আমার_প্রেমবতী
#পর্বঃ৬
#সানজিদা_খানম_স্বর্ণা

১২.
রাতের অন্ধকার কাটিয়ে আগমন ঘটেছে এক নতুন সূর্যের।ঝকঝকে চকচকে সূর্যের আলো দেখে বোঝার উপায় নেই,কাল মধ্যরাত অবধি মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছিল।যদিও মাটিতে ভেজা গন্ধ।প্রকৃতি যে কী আশ্চর্য সুন্দর,কী অপরূপ রূপশোভা,কী অফুরন্ত লীলাবৈচিত্র্য, কী সুন্দর ও অনুপম।ব্যাস্ত শহরে প্রকৃতি নিয়ে এতো কিছু ভাবার লোকজন অতি নগন্য। সকাল সকাল কর্মব্যস্ত মানুষের ছুটাছুটি শুরু হয়।
ঘুম থেকে দ্রুত উঠে ফ্রেশ হয়ে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে অভি।রাতে খাবার টেবিলে সকলের সাথে সময়টা খুব ভালোই কেটেছে।মোজাম্মেল সাহেব ছিলেন না আড্ডায়।বৃষ্টির মাঝেই অফিসের কি একটা দরকারী কাজের জন্য তিনি আড্ডায় থাকতে পারেনি।বেশ রাত করেই বাড়ি ফিরেছেন।তিনি না গিয়ে অভিকে পাঠালেও হতো কিন্তু অভির কালকের ব্যাবহারের পর উনার একদম ইচ্ছে করেনি কাজের দায়িত্বটা অভিকে দেওয়ার।কালকের পর এখনো অভি আর তিনি মুখোমুখি হন নি।
সকাল সকাল ড্রয়িংরুমে বসে খবরের কাগজে চোখ বুলাচ্ছেন মোজাম্মেল সাহেব ।শাহানাজ বেগম রান্না ঘরে।রান্না ঘর থেকে চায়ের কাপের টুংটাং আওয়াজ আসছে।শাহানাজ বেগম এক কাপ চা’ সাথীকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন মোজাম্মেল সাহেবের কাছে।
হাতে ঘড়ি পরতে পরতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে অভি।ড্রয়িংরুমে বসার সময় ওর হাতে নেই।অভিকে নিচে আসতে দেখে রান্না ঘর থেকে দ্রুত পদে বেরিয়ে আসেন শাহানাজ বেগম।অভি উনার দিকে তাকিয়ে, ‘আম্মু আসছি’ বলে বেরিয়ে যেতে নিলে আটকে দেন মোজাম্মেল সাহেব।শাহানাজ বেগম অভিকে খেয়ে যেতে বলতে উদ্যত হয়েও থেমে যান মোজাম্মেল সাহেবের কান্ডে।মোজাম্মেল সাহেব খুব গম্ভীর গলায় অভিকে ডেকে বলেন,’অভি,কোথায় যাচ্ছো?’
বাবার এই প্রশ্নে বেশ অবাক সাথে বিরক্ত হয় অভি।মুখে বিরক্তির রেশ রেখেই জবাব দেয়,’এটা কেমন প্রশ্ন আব্বু?আশ্চর্য! রোজ যেখানে যাই সেখানেই যাচ্ছি, অফিসে।’

‘কালকের ঘটনার পরেও এমন স্বাভাবিক কিভাবে আছো তুমি?এতটুকু অনুশোচনা নেই তোমার মাঝে?মেয়েটার সাথে যেই অন্যায় তুমি করেছো, তার জন্য?’

অভির মুখের ভাব পরিবর্তন হলো।বাবার এই কথায় সে মহা বিরক্ত।এই ব্যাপার নিয়ে সে কোনো কথা বলতে ইচ্ছুক নয়।কথায় কথা বাড়বে!প্রশ্ন উঠবে কেন সে সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করতে চায় না।এতো প্রশ্নের উত্তর দিতে কোনো মতেই আগ্রহী নয় অভি।সোজা-সাপটা জবাব দেয়,’আমি এই বিষয় নিয়ে আপনাদের সাথে কোনো কথা বলতে চাই না,প্লিজ আব্বু আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।’
‘তুমি বললেই আমরা জিজ্ঞেস করবো না! এমনটা কিভাবে ভাবলে তুমি?কাল যেই বিষয়টা নিয়ে এতো অশান্তি করলে, আমাদের মান ডুবালে, সেই বিষয় নিয়ে কথা না বললে তো হবে না?তুমি কাল যা করেছো তার পর তো তোমাকে জবাবদিহি করতেই হবে।’

‘আমি কোনো কিছু জবাবদিহি করতে বাধ্য নই।আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আপনারা আমার বিয়ে দিতে পারেন না।তাছাড়া আমি উনাকে বিয়ে করে সুখী হতে পারতাম না।এরচেয়ে এটাই ভালো হলো আমি বিয়েটা করতে না’ করে দিয়েছি।’

‘তুমি কি জানো সাক্ষরের সাথে স্নিগ্ধার বিয়ে ঠিক করেছি আমি?অতি শীগ্রই সাক্ষরের সাথে স্নিগ্ধার বিয়ে হবে।তাছাড়া তুমি কি কারণে স্নিগ্ধাকে বিয়ে করতে রাজি ইচ্ছুক নয়,সেটা বলো।’

সাক্ষরের সাথে স্নিগ্ধার বিয়ের কথা শুনে চমকে উঠলো অভি।চোখে মুখে ফুটে ওঠেছে বিস্ময়।তার ভাইটা এখনো ছোট! অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে আইনজীবী হবার স্বপ্ন বুনছে সাক্ষর।সেই সাক্ষরকে এক্ষুনি বিয়ে করানোর চিন্তা কিভাবে এলো মোজাম্মেল সাহেবের মাথায়?অভি অবাকতার সুরেই বললো,’কি???সাক্ষরের সাথে স্নিগ্ধার বিয়ে?কিন্তু আব্বু সাক্ষর তো…’

কথা শেষ করতে পারে না অভি।তার আগেই মোজাম্মেল সাহেব বলেন,’সাক্ষরের ভালো মন্দের চিন্তা তোমার করার প্রয়োজন নেই।সেটা ভাবার জন্য আমরা আছি।তুমি তো কোনো এক অজানা কারণে বিয়ে করবে না বলে জেদ করে বসে আছো।ভালোর জন্য তোমার আম্মু কত জোরাজোরি করে পাত্রী দেখাতে নিয়ে গেল।কিন্তু সেখানে গিয়েও মেয়ে সুন্দরী বলে একটা ঝামেলা পাকিয়ে চলে এলে।বলি নিজের ভালো তো পাগলেও বুঝে, তুমি কেন বুঝো না?আর যে নিজের ভালো বুঝে না সে অন্যের ভালো কি করে বুঝবে? সাক্ষরের জন্য যা ভালো হবে সেই সিদ্ধান্তই আমরা নিয়েছি।’

বাবার কথায় আঘাত পেল অভি।সাক্ষর তো তার নিজেরও ভাই।বাবা এতো দুরত্ব বাড়িয়ে কথা কেন বললো!পরিবারের কারো কাছে কোনো গুরুত্বই নাই তার, থাকলে তো কোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগে তাকে অন্তত জানাতো।এর মাঝেই অভির মাথায় প্রশ্ন এলো,সাক্ষর নিজে জানে তো?নাকি বাবা সাক্ষরকে না জানিয়েই বিয়ে ঠিক করেছে?প্রশ্নটা মাথায় আসতেই মোজাম্মেল সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো অভি।

‘আচ্ছা আব্বু,বিয়ে তো ঠিক করলেন।তা সাক্ষর রাজি আছে এই বিয়েতে?সে জানে পুরো বিষয়টা?

‘সাক্ষর তোমার মতো এতোটা উচ্ছনে চলে যায় নি!বাবা মায়ের মুখের ওপর কথা বলবে।আমরা যা সিদ্ধান্ত নিবো সেটা তার ভালোর কথা ভেবেই নিবো সে সেটা জানে ।’

বাবার কথায় আবারো আহত হলো অভি।যদিও মোজাম্মেল সাহেব অভিকে সাক্ষরের থেকে একটু বেশিই ভালোবাসে।তবুও কালকের ঘটনার ক্ষোভ থেকে আজকে অভির সাথে এই দুর্বোধ্য ব্যবহার করেছেন তিনি। অভি কিছু না বলে শাহানাজ বেগমের দিকে তাকালো।শাহানাজ বেগম নিরব দর্শকের মতোই বাবা ছেলের কথোপকথন শুনছে।চাইলেও কিছু বলতে পারছে না।তবে অভির দৃষ্টি উনার দিকে নিক্ষেপ হওয়ার পরেই উনি সচেতন মা হয়ে উঠলেন।শান্ত সুরে মোজাম্মেল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলেন,’সকাল সকাল ছেলেটার সাথে কি শুরু করছো বলতো?ছেলেটা কাজে যাচ্ছে পথিমধ্যে বাধা না দিলে হয় না তোমার।’
অভির দিকে তাকিয়ে পুনরায় বলে, ‘অভি বাবার কথায় রাগ করিস না।জানিস তো তোর বাবা মানুষটাই এরকম। রাগ হলে কাকে কি বলে বসে তার ঠিক নেই।সে সব কথা ছেড়ে নাস্তা দিচ্ছি খেয়ে তারপর বের হবি।’

অভি মায়ের দিকে তাকিয়ে একটু প্রশান্তিতে হাসে।যতই হোক সন্তানকে সবথেকে বেশি একজন মা’ বুঝতে পারে।মোজাম্মেল সাহেব পুনরায় বসে খবরের কাগজের পাতায় চোখ রেখে বলেন,’এই তোমার আশকারা পেয়ে পেয়ে ছেলে মেয়েগুলো একদম বখে গেছে। আমি কিছু বলতে এলেই দোষ! ‘

সাথী আর স্মৃতি দুজন মিলে স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে দ্রুত খাবার টেবিলে আসে।অভিকে উদ্দেশ্য করে স্মৃতি বলে,’ভাইয়া তুমি কি অফিসে যাচ্ছো?’
অভি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।স্মৃতি সাথীর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তাহলে আমাকে আর সাথীকে একটু স্কুলে পৌঁছে দিতে পারবে?’
অভি উঠতে উঠতে বলে, ‘আচ্ছা তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে আয়। আমি গাড়িতে অপেক্ষা করছি।’

১৩.
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই ব্যাস্ত হয়ে ওঠল প্রেমা।সর্বপ্রথম আদিলের গায়ে হাত দিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করার চেষ্টা করল।না’ জ্বর একটুও কমেনি।সেলিনা পারভীন ঘুম জড়িত গলায় বললেন,’ছেলেটা এখনো শুয়ে আছে কেন?আদিলকে ডেকে উঠতে বল প্রেমা।’

প্রেমা মায়ের কথায় না’ সূচক মাথা নেড়ে বলে, ‘কাল বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর হয়েছে তোমার ছেলের।এক্ষুণি উঠার দরকার নেই।আজ ও বাড়িতেই থাকুক।আমি একা’ই যাবো।’
জ্বরের কথা শুনে আঁতকে ওঠেন সেলিনা পারভীন। ছেলেটা কোনো কথা শোনে না। কে বলেছিল এই চৈত্র মাসের বৃষ্টিতে ভিজতে!বিছনা থেকে জীর্ণশীর্ণ শরীর নিয়ে নামেন তিনি।
প্রেমা সকালের কাজ গুছিয়ে ফুল বিক্রি করতে বেরিয়ে যাবে।অন্য দিন দুই ভাই বোন মিলে যায়,আজ একাই যেতে হবে।সেলিনা পারভীন ছেলের কপালে হাত দিয়ে মনে মনে ব্যাথিত হয়।ক্ষীন কন্ঠে ডেকে বলে,’আদিল,বাবা আমার!উঠে হালকা কিছু খেয়ে তারপর ওষুধ খাও।পরে শুয়ে থাকতে পারবে।’
আদিলের কোনো হেলদোল নেই।সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।সেলিনা পারভীন ছেলেকে আর ডাকলেন না।বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রেমাকে ডাকেন।প্রেমা পানি আনতে গিয়েছে।বস্তিতে একটা মাত্র পানি সাপ্লাইয়ের লাইন।দিনে দুবেলা পানি আনা যায়।মানুষের ভীরের মাঝেই দ্রুততার সাথে কয়েক বালতি পানি ভর্তি করে প্রেমা।দ্রুতই আবার সেই পানি নিয়ে ফিরে আসে বাড়িতে।
সেলিনা পারভীন রান্নার ব্যাবস্থা করছেন।প্রেমা শত চেষ্টা করেও তাকে আটকাতে পারে না।উনি অন্য কাজ করতে না পারুক, বসে বসে রান্নাটা তো করতেই পারেন।এ যুক্তিতে রান্নাটা তিনি নিজেই করেন।
আদিলকে ডেকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয় প্রেমা।ওষুধ খাওয়াতেও ভুল হয় না তার।অত:পর সেলিনা পারভীন আর প্রেমা একসাথে খেয়ে নেয়।সেলিনা পারভীনকে আদিলের খেয়াল রাখতে বলে বেরিয়ে যায় প্রেমা।

চলবে, ইনশাআল্লাহ ✨

(আসসালামু আলাইকুম। ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।🙏 হ্যাপি রিডিং।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here