তুমি আমার প্রেয়সী ২ পর্ব -০৫

#তুমি_আমার_প্রেয়সী
#সিজন ২
#তাসনিম_জাহান_রিয়া
#পর্ব_৫

আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে ঝুলে বাঁকা হাসি। কণা সেই হাসির দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। সে তো একসময় এই হাসিরই প্রেমে পড়েছিল। এই হাসি দেখেই যেনো সে যুগ যুগ কাটিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু এখন তো সেই হাসি দেখার অধিকার তার নাই। আদ্রিয়ান যে অন্য কারো। আদ্রিয়ানের পিছন থেকে ছোঁয়া বেরিয়ে আসে। ছোঁয়া আদ্রিয়ানের এক হাত জড়িয়ে ধরে।

কণা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ান আর ছোঁয়ার হাতের দিকে। পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। যে তার না। তার প্রতি শুধু মায়া বাড়িয়ে তো লাভ নেই। কণা আদ্রিয়ান আর ছোঁয়াকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই আদ্রিয়ান কণার হাত টেনে ধরে। কণা ক্রোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আদ্রিয়ানের দিকে। কণা হাত মুচরাতে মুচরাতে বলে,

হাত ছাড়!

আদ্রিয়ানের মাঝে কোনো হেলদুল নাই। যেনো কণার কথাটা তার কানেই যায়নি। কণার শরীর রাগে রি রি করছে। কণা বা হাতে সপাটে একটা চড় মারে আদ্রিয়ানের গালে। এক মিনিটের মাঝেই ভার্সিটি হয়ে যায় নিস্তব্ধ। থেমে যায় সবাই। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে কণার দিকে।

থমকে যায় ঐশিও। সে জানতো কণা রিয়েক্ট করবে। কিন্তু এতোটা ওভার রিয়েক্ট করবে এটা তার ধারণার বাইরে ছিল। ঐশি সবে মাত্র বোতলের ক্যাপ খুলে মুখে পানি নিয়েছিল। এমন বিস্ময়কর ঘটনা দেখে ঐশির মুখ থেকে পানি ছিটকে গিয়ে আভিয়ানের গায়ে পড়ে। আভিয়ান চোখ মুখ কুঁচকে ঐশির দিকে তাকিয়ে আছে। ঐশি মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিল আভিয়ানের কাছে বকা খাওয়ার জন্য। কিন্তু আভিয়ান ঐশির ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে ঐশিকে কিছু বলে না। হাত দিয়ে শার্ট ঝাড়তে ঝাড়তে এগিয়ে যাচ্ছে আদ্রিয়ান আর কণার দিকে। ঐশিও আভিয়ানের পিছু পিছু যাচ্ছে।

আদ্রিয়ান কণার হাত ছেড়ে দিয়ে গালে হাত দিয়ে আকাশ সমান বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে কণার দিকে। কণা যে তার গায়ে হাত তুলবে এটা তার ধারণার বাইরে ছিল। যে মেয়ে তার জন্য পাগল। ব্রেকআপ হওয়ার পরও বেশ কিছুদিন তার পিছনে আটার মতো লেগেছিল। সেই মেয়ে আজকে তাকে চড় মারলো। আদ্রিয়ান একটা ঘোরের মাঝে চলে গেছে। ছোঁয়ার চিৎকারের আদ্রিয়ানের ঘোর কাটে।

এই মেয়ে তোর সাহস হলো কী করে আমার বয়ফ্রেন্ডকে থাপ্পড় দেওয়ার?

তোর বয়ফ্রেন্ডের সাহস হয় কী করে আমার হাত টেনে ধরার। এই সব লুচ্চা ছেলেদের চড় দিয়ে নয় জুতা দিয়ে পিটিয়ে সোজা করতে হয়।

মুখ সামলে কথা বল। তুই ভুলে যাচ্ছিস তুই কার বিরুদ্ধে কথা বলছিস।

আমি আমার মুখ সামলেই কথা বলছি। তুই তোর বয়ফ্রেন্ডকে সামলা। আমি মোটেও ভুলে যাচ্ছি না আমি কার বিরুদ্ধে কথা বলছি। আমি এক লুচ্চা, লম্পট, ধোঁকাবাজ, প্রতারক লোকের বিরুদ্ধে কথা বলছি। মেয়ে দেখলেই কুকুরের মতো জিহ্বা বের হয়ে যায় আর পাগল কুকুরের মতো মেয়েদের পিছনে ঘুরে।

ছোঁয়া রেগে কণাকে থাপ্পড় দিতে যাবে তার আগেই পিছন থেকে কেউ ছোঁয়ার হাতটা ধরে ফেলে। আদ্রিয়ানের পিছনের ছেলেগুলো ভীতু চোখে তাকিয়ে আছে। কণা পিছনে ঘুরতেই কণার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। মৃদু সরে বলে,

ভাইয়া।

ছেলেটা কণার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলতে শুরু করে,

দিন দিন তোমাদের সাহস বেরেই চলেছে। সত্যিই তোমাদের সাহসের তারিফ করতে হয়। তোমাদের সাহস হয় কী করে আমার বোনের সাথে মিস বিহেইভ করার? তুমি মেয়ে না হলে এতক্ষণে থাপড়ায়া তোমার গাল লাল করে দিতাম।

ছোঁয়া সাফাতের কাছ থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে থাকে। সাফাত ছোঁয়ার হাতটা ছুঁড়ে মারে। সাফাত আদ্রিয়ানদের দিকে আঙ্গুল তুলে বলে,

নেক্সট টাইম তোমাদের আমার বোনের আশেপাশে যাতে না দেখি। আমার বোনের কাছ থেকে ১০ হাত দুরে থাকবা। আর নেক্সট টাইম আমার বোনের সাথে মিস বিহেভ করার দুঃসাহস দেখালে এর ফল খুব খারাপ হয়ে যাবে। মাইন্ড ইট।

সাফাত কণার হাত ধরে ঐ স্থান ত্যাগ করে। সাফাতের পিছু পিছু ঐশি আর আভিয়ানও যায়।

(কণার পুরো নাম মিহিকা তাহসিন কণা। কণা অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। সাফাত হচ্ছে কণার এক মাত্র ভাই। কণার পরিবার বলতে তার বাবা আর তার ভাই। কণার জন্মের সময় তার মা মারা যায়। সাফাত তিন মাস হয়েছে দেশে ফিরে এসেছে। স্কলারশিপ পেয়ে হায়ার স্টার্ডির জন্য বিদেশ গিয়েছিল। দেশে ফিরেই কণার যে ভার্সিটিতে পড়াশোনা করে সেই ভার্সিটিতে প্রফেসর হিসেবে জয়েন করে।)

সাফাত লাইব্রেরীতে এসে কণার হাত ছেড়ে দেয়। কণার দিকে না তাকিয়ে চলে যেতে নেয়। কারণ কায়া দেখলেই মায়া বাড়ে। কিন্তু সাফাতের চলে যাওয়া আর হলো না। কণার ডাকে থমকে যায় সে। কণা পিছন থেকে ডাকে,

ভাইয়া।

এমন করুণ সুরের মধুর ডাক যে সে উপেক্ষা করতে পারবে না। এই ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য যে তার নেই। তাই তো না চাইতেও সে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

তুমি কী এখনো আমার ওপর রাগ করে আছো?

সাফাতের বুকটা ধক করে ওঠে। সে তো কণার ওপর রেগে নেই। সে চাইলেও রাগ করতে পারে না তার মিষ্টি বোনটার ওপর। তবে অভিমান জমে আছে। এক পাহাড় পাহাড় সমান অভিমান। সাফাতের চোখের কোণে অভি চিক চিক করছে। সাফাত আলতো হাতে চোখের কোণের জলটা মুছে নেয়। কণার দিকে না তাকিয়েই বলে,

রাগ করাটা কী স্বাভাবিক নয়?

হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমার কাছে না। তুমি আমার ওপর রেগে থাকলে আমার ভীষণ কষ্ট হয়।

হাউ স্ট্রেইন্জ। আমার রাগ করাতে কারো কষ্ট হতে পারে সেটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। আমার জানা মতে, আমার রাগ করাতে বা না করাতে কারো কিছু আসে যায় না।

কণা সাফাতের হাত ধরে বলে,

ভাইয়া প্লিজ রাগ করে থেকো না। তোমার কথা ভেবে আব্বু রোজ রাতে চোখের জল ফেলে। সারাদিন বিষণ্ণ মন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমার একদম ভালো লাগে না। তুমি ফিরে এসো না আমাদের কাছে।

সেটা সম্ভব নয়। যারা আমাকে আপন ভাবে না। আমি তাদের কাছে ফিরে যেতে পারি না।

তুমি কেনো একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে পড়ে আছো।

সত্যিই কী ব্যাপারটা সামান্য? তোদের সাথে এতকিছু ঘটে গেলো আর তোরা আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করলি না। এসিড মেরে আমার বোনের চেহেরা নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে সেটা আমি জানতে পারলাম চার মাস পর়। তাও আবার অন্য কারো মুখে।তোরা পর ভাবিস বলেই আমাকে বলিস নাই।

ভাইয়া তুমি আমাদের ভুল ভাবছো। আমরা তোমার ভালোর জন্যই বলি নাই।

হা হা আমার ভালো। সত্যিই কী এতে আমার ভালো হয়েছে? আমার বোন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ফিরে এসেছে আমি জানতেও পারি নাই। তোর এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী তারা কোনো শাস্তি পায়নি। তাদের কোনো শাস্তি আমি দিতে পারি নাই। ইনফ্যাক্ট তাদের শাস্তির কোনো ব্যবস্থাই আমি করতে পারি নাই। তোরা প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ আমি করতে পারি নাই। তুই যখন সমাজের মানুষের কটূক্তি শুনে যখন প্রতি রাতে চোখের জল ফেলতে ব্যস্ত তখন আমি আরাম আয়াসের জীবন কাটাতে ব্যস্ত। এটা ভেবেই নিজের ওপর ঘৃণা হয়। নিজের সুখের জন্য আমি তোর বিপদের সময় তোর পাশে থাকতে পারি নাই। যখন তোর পাশে আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল তখন আমি সেটা জানতেও পারি নাই। এটা একটা ভাইয়ের জন্য কতোটা কষ্টের সেটা তুই বুঝতে পারবি না। তোর মুখ দেখলে আমার মাঝে অপরাধ বোধ কাজ করে। আমিও নিজের চোখে দেখেছিলাম এসিডে ঝলসে যাওয়া একটা মেয়েকে। শুনেছিলাম সেই মেয়ের আর্তনাদ। চোখের সামনে দেখেছিলাম সেই মেয়েটার কষ্ট। সেই একই কষ্ট যে আমার বোনও পেয়েছিল, সেই একই আর্তনাদ যে আমার বোনও করেছিল সেটা আমি জানতেও পারি নাই। আমি কখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না আর না পারবো তোদের ক্ষমা করতে।

কথাগুলো বলে সাফাত এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। দ্রুত পায়ে সেই স্থান ত্যাগ করে। হয়তো আর কিছুক্ষণ থাকলে সে নিজেকে সামলে রাখতে পারতো না। ইমোশনাল হয়ে যেতো। কণা নিষ্পলক তাকিয়ে আছে সাফাতে যাওয়ার পানে। চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ে কণার।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here