তোমারই আমি আছি পর্ব ২২

তোমারই আছি আমি
পর্ব-২২
Sara Mehjabin

সারাকে দূরে রাখতে আমি একটা কাজ করতে বাধ্য হলাম আর তা হলো অদ্বিতীর সঙ্গে রিলেশন। অদ্বিতীকে আমি পছন্দ করি না। ও শুধু আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ও আমার সবচেয়ে ভালো ফ্রেন্ড। ওর সাথে আমি যেকোনো বিষয়ে যেকোনো সমস্যা শেয়ার করতে পারি। অদ্বিতীকে কোন কথা না বলে আমি থাকতে পারি না। কিন্তু সারার কথাগুলো অদ্বিতীকে বলতে পারলাম না। সারাকে খুব ভালবাসি। ও কারো কাছে ছোট হয়ে যাক কেউ ওর সম্পর্কে খারাপ ভাবুক এমন কাজ আমি মরে গেলেও পারব না। তারচেয়েও বড় কথা সবকিছু জানার পর অদ্বিতী নিশ্চিত আকাশভাইয়াকে বলে দিবে। আর আকাশভাইয়া এইসব একবার জানতে পারলে সারাকে শেষ করে ফেলবে; নিজেকেও। আর আমাকেও বাঁচতে দিবে না। তাই অদ্বিতীকে এইসব কিছু না বলেই ওর সঙ্গে রিলেশনের নাটক করা শুরু করলাম যাতে সারা আমার থেকে দূরে সরতে বাধ্য হয়।

আমাদের স্কুলের পিছনের পুরাতন বিল্ডিংটায় অদ্বিতীকে প্রপোজ করি। কারণ এই জায়গাটা সবাই ভয় পাই। তাই ঐখানে যা খুশি তাই করলেও ধরা পড়ব না।

অদ্বিতী আর আমি প্রতিদিন একসাথে স্কুলে যাই। সেইদিন আমি বললাম যাব না। অদ্বিতী একাই চলে গেল। যাওয়ার আগে আমি খালি পড়াশোনায় ফাঁকি দেই এইভাবে ক্লাস মিস করলে পরীক্ষায় ফেল করব ও আকাশভাইয়াকে সব বলে দিবে আমার বন্ধুদের সবাইকে পিটাবে কারণ ওদের সঙ্গে মিশে মিশে আমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছি এইসব বকাবকি করে গেল। এই মেয়েটা আমাকে নিয়ে অনেক ভাবে! যেন আমার খুব আপন কেউ!

আমি আমার প্ল‍্যানমতো অদ্বিতী বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আমার সব বন্ধুরাও যার উপর যে দায়িত্ব ছিল সেই সেই জিনিস নিয়ে চলে আসল। সবাই মিলে স্কুলের পিছনের ওয়াল ডিঙিয়ে পুরাতন বিল্ডিংয়ে ঢুকলাম। তিন পিরিয়ড ধরে রুমটা ঝাড়ামোছা করে অদ্বিতীর পছন্দমতো গোলাপ ফুল দিয়ে সাজালাম। ফ্লোরের মধ‍্যে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে আই লাভ ইউ বানালাম। অদ্বিতীর নাম লিখলাম। অদ্বিতীর সবচেয়ে পছন্দের জিনিস হচ্ছে ফুচকা। ওর জন্য সামনের ভ‍্যানের সব ফুচকা কিনে আনলাম। এত বড় ফুচকার বস্তা নিয়ে ওয়াল ডিঙাতে গিয়ে আরেকটু হলেই আমি পড়ে গিয়ে মরতে নিয়েছিলাম। একটুর জন্য বেঁচে যাই।

টিফিন পিরিয়ডে ফ্রেন্ডকে পাঠালাম অদ্বিতীকে কাগজ দেওয়ার জন্য। কিছুক্ষন পরেই অদ্বিতী চলে আসল। তখন পুরাতন বিল্ডিংয়ে শুধু অদ্বিতী আর আমি। অদ্বিতীকে ফুচকা দিয়ে প্রপোজ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে অদ্বিতী কাঁদতে শুরু করল‍। বলল ও বিশ্বাস-ই করতে পারছে না আমি যে ওকে প্রপোজ করেছি। আমাকে ও অনেক আগে থেকেই পছন্দ করে কিন্ত বলতে ভয় পেয়েছিল। ভেবেছিল কোনদিন আমাকে বলবে না। যদি আমি ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব টাও নষ্ট করে দিই তাই।

এভাবেই অদ্বিতীর সঙ্গে আমার মিথ্যে রিলেশনের নাটক শুরু হলো। আমি জানতাম সারাকে কোন কথা না বলে অদ্বিতী থাকতেই পারবে না। আর সারা সবকিছু শুনে নিজেকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিবে। কিন্তু ঘটল তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সারা আমার ওপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি করা শুরু করল। সারাক্ষণ আমাকে হুমকি দিতে লাগল অদ্বিতীর সাথে ব্রেকাপ করে ফেলি নাহলে ও আকাশভাইয়াকে সব বলে দিবে। সারার এই কথা শুনে খুব ভয় পেলাম আমি। কারণ আমি জানি আকাশভাইয়া সারার কথা অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করবে। ভয় পেলেও সেটা সারাকে বুঝতে দিতাম না। সারার সামনে সবসময় এমন একটা ভাব দেখালাম যেন অদ্বিতীই আমার সব। অদ্বিতীর জন্য আমি কাউকে ভয় পাই না।

এইসব দেখে সারার পাগলামি কমার বদলে অনেক বেড়ে গেল। একদিন ওর পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে বললাম, তোর সাহস কিভাবে হয় আমাকে এসব বলার? চিন্তা করলি কিভাবে তোর মতো মেয়ের জন্য অদ্বিতীর মতো মেয়েকে আমি কষ্ট দেব? তুই অদ্বিতীর পায়ের যোগ‍্য-ও না। পায়ের যোগ্য দূর থাক তোর মতো নষ্ট মেয়ের ওর সঙ্গে তুলনা করারও যোগ্যতা নেই। আকাশভাইয়া তোর জন্য কি না করে রে, এইভাবে জান-প্রান দিয়ে কে তোকে ভালবাসে? আকশভাইয়া তোর জন্য যা যা করেছে তোর নিজের বাপ-মাও তো তা করে নি। আর তুই তাকেই ভালবাসতে পারিস নি? তুই আমাকে কি ভারবাসবি? আসল কথা তুই লোভী। তুই আকাশভাইয়ার থেকে সুবিধা নিবি, আমার থেকে নিবি। গরিবের মেয়েদের তো কাজ-ই এগুলো। অদ্বিতীর কাছে থেকে কিছু শিখিস। অদ্বিতী যেমন বড়লোকের মেয়ে ওর মনটাও বড়। আর তুই,, যেইরকম ছোটলোকের মেয়ে তোর মনটাও নর্দমার মতো নোংরা, জঘন্য। তোকে ভালবাসা দূরে থাক,,,ঘিন্না করতেও লজ্জা লাগে। এখনো সময় আছে সারা,,ভালো হয়ে যা। তোর মতো মেয়ের অনেক ভাগ্য আকাশভাইয়ার মতো মানুষ আছে তোর জীবনে।

আমার কথাগুলো শুনে সারা একদম চুপ হয়ে গেল। শক্ত পাথরের মতোন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মাথা নিচু দিকে দিয়ে চোখের পানি পড়তে লাগল।

“ওহ তারমানে আমাকে তুমি ভালবাসবে না,,তাই না? তুমি অদ্বিতীকেই ভালবাসো? আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তো তোমাকে ভালবাসি। তাই তুমি যেটা করলে খুশি থাকবে সেটাই করব। আর কখনো আসব না,,কখনো মুখ দেখাব না,,,তুমি খুশি হবে তো?”

সারা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে চলে গেল।

আমি তখনো সারার কথার মানেটা বুঝি নি।

রাত তিনটার সময় সারাদের বাসা থেকে সায়ানভাই কাঁদতে কাঁদতে ফোন করল, সারা ব্লেড দিয়ে হাতের রগ কেটেছে। অবস্থা প্রচুর খারাপ।

আকাশভাইয়া পুরো পাগলের মতোন হয়ে গেল। সেইদিন আমার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়ায় সারা আকাশভাইয়ার সঙ্গে অনেক ঝগড়া করেছিল। আকাশভাইয়া ভেবেছে সারা ওর ওপরে রাগ করে কাজটা করেছে।

সাতদিন সারা সেন্সলেস ছিল। ওকে ইমার্জেন্সি কেবিনে
রাখা হয়। আকাশভাইয়ার এই কয়দিনে কোন হুশ ছিল না। সবসময় সারার কেবিনের বাইরে থাকতো। একটা রাত-ও ঘুমায় নি। সারার অচেতন মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিটা রাত পাড় করেছে। আমাকে খালি প্রশ্ন করত, নিবিড় পুতুলেরর অনেক কষ্ট হয় তাই না রে? আকাশভাইয়াকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য, না ভাইয়া সারা ঠিক হয়ে যাবে। তুমি এত টেনশন নিও না। ও ভালো হয়ে গেলে ওকে তোমাকেই দেখতে হবে। তুমি ভেঙে পড়লে ওকে কে দেখবে?
: চুপ কর্। একদম চুপ কর্ তুই। সব আমার জন্য হয়েছে। আমি পুতুলকে বকা দিয়েছি। ও আমার বকা সহ‍্য করতে পারে না। আমার ওপর রাগ করে এইরকম পাগলামি করল। আমার নিজের দোষে ওর এই অবস্থা দেখতে হয়েছে। কত কষ্ট দিয়ে ফেলেছি ওকে। কি করে পারলাম আমি! কি করে পারলাম!!

আকাশভাইয়া হাত মুঠো করে জোরে জোরে দেয়ালে আঘাত করতে লাগল। হাত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। আমি বাধা দিতে গেলে আকাশভাইয়া আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এরপর পকেট থেকে একটা ছুরি বের করে নিজের হাতে একটার পর একটা টান দিয়ে যাচ্ছে। কেটে ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে ওর হাত। সেদিকে ওর কোন হুশ নেই।। হিংস্রভাবে নিজের হাতে একের পর এক আচড় কেটে যাচ্ছে। আমি তাড়াতাড়ি আকাশভাইয়াকে আটকালাম। ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে বসিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলাম।
ভাইয়ার হাত থেকে ছুরিটা কাড়ার চেষ্টা করতেই ভাইয়া চিৎকার শুরু করল, ছাড় আমাকে ছাড়‌। ছেড়ে দে। আমার পুতুল যার কারণে কষ্ট পাবে তাকে কষ্ট পেতেই হবে। সেটা আমি নিজে হলেও নিজেকে শাস্তি দেব।

আকাশভাইয়ার কথাগুলো শুনে এত কষ্ট লাগছিল যা ভাষায় আমি প্রকাশ করতে পারব না। কাউকে কতখানি ভালবাসলে এরকম ভাবা যায়।

সারার জ্ঞান ফিরলেও অনেক অসুস্থ ছিল। আকাশভাইয়া ছায়ায় মতো থাকতো ওর সঙ্গে চব্বিশ ঘন্টা। ওর সব কাজ ভাইয়া করিয়ে দিত।

একদিন অনেক রাতে আননোন নাম্বার থেকে আমার কাছে কল আসে‌‌। ফোন ধরতেই ওইপাশ থেকে সারার গলা, নিবিড়ভাইয়া সরি। খুশি করতে পারলাম না তোমায়। মরতে পারলাম না।

সারা, পাগলামির একটা লিমিট থাকা দরকার। তুই এতোরাতে ফোন কোথায় পেলি? আর আকাশভাইয়া?

“হসপিটালের একটা নার্স আন্টির কাছ থেকে ফোন নিয়েছি। আর তোমার ভাইয়া সারারাত জেগেছিল আমার ওষুধের জন্য। এখন ঘুমিয়ে গেছে।”

“ছিঃ সারা তোর লজ্জা করে না? আকশভাইয়া সারারাত জেগে তোকে দেখছে আর সে ঘুমিয়ে যাওয়ার পর তুই আমাকে ফোন দিচ্ছিস?”

“চুপ করো। তুমি ঐ ডায়লগটা জানো না, এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এ্যান্ড ওয়ার। আমি তোমাকে ভালবাসি। আর ভালবাসায় কোনকিছু অন‍্যায় নয়।”

“সারা তুই যদি আর একবার আমাকে ডিস্টার্ব করিস আকাশভাইয়া সহ ফুপি-ফুপা সায়ানভাই সবাইকে সবকিছু বলে দেব।”

“আচ্ছা বলে দাও। আমি তো তাই চাই। আমি তো চাই সবাই জানুক আমি শুধু তোমাকে ভালবাসি, তোমাকে ভালবাসি, তোমাকেই ভালবাসি।”

“কিন্তু আমি তোমাকে ভালবাসি না।”

“সত্যি বলো। ভালবাসো না আমায়?”

“না।”

“আচ্ছা ঠিক আছে। মনে রেখো নিবিড়ভাইয়া যার জন্য আমি একবার মরতে পেরেছি তার জন্য বারবার মরা আমার কাছে কিছুই না ”

সারার কথাতে আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কি করব আমি? আমি সারাকে ভালবাসি। চাই না ওর কোন ক্ষতি হোক। শুধু আকাশভাইয়ার কারণে দূরে সরে আছি ওর থেকে। এইবার কি করব আমি? সারা যদি সত্যিই আবারও কোন দুর্ঘটনা ঘটায়।

ধীরে ধীরে আমি সারার মায়ায় পড়ে গেলাম। মেয়েটার চাওয়া শেষ পর্যন্ত আমাকে বাধ্য করল ওর হতে। এদিকে অদ্বিতীর সঙ্গে মিথ্যে রিলেশন আমার তখনও চলছে। কারণ সম্পর্কটা আমার কাছে মিথ্যা হলেও অদ্বিতীর কাছে সত্যি ছিল। চিরন্তন সত‍্যির মতো। ওকে কিভাবে বোঝাব আমি সারার সঙ্গে রিলেশনে জড়িয়েছি। আমি অদ্বিতী ও সারা দুজনের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে লাগলাম।

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here