তোর শহরে মেঘের আনাগোনা পর্ব -০৯

#তোর_শহরে_মেঘের_আনাগোনা (৯)
#Rawnaf_Anan_Tahiyat

‘সরি,সরি আপুই প্লিজ তুমি কিছু মনে করো না। আসলে আমি বুঝতে পারি নি তাই কি বলতে কি বলে ফেলেছি,প্লি তুমি রাগ করো না?’

মোহনা অতি কষ্টে একটু হাসি ফুটালো মুখ খানি তে, এরপর মাথা নাড়িয়ে বললো আমি ঠিক আছি।রাত অভয় পেয়ে মোহনা কে দুহাতে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করলো,দম বন্ধ হয়ে আসছে কান্নার তোড়ে।

এদিকে কেউ একজন যে ওদের আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনছিল সেটা ওদের দুজনের কেউই খেয়াল করেনি, নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত ওরা,তাই পিছনে তাকায়নি কেউই। একজন নিঃশ্বাস বন্ধ করে সবকিছু শুনলো, শুনে দু হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল তার।রাগে কাঁপতে কাঁপতে ছাদ থেকে ছায়া মুর্তিটির মতো চুপ করে নেমে গেলো ছাদ থেকে।

________________________

রাত প্রায় নয়টার মতো হবে, বিয়ের কনের বাসায় সবাই উপস্থিত থাকলেও কনে উপস্থিত নেই তাদের মাঝে। বিয়ে বাড়িটা যেন শব বাড়িতে পরিণত হয়েছে, সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ও মহোৎসাহে মুখরিত ছিল বাড়িটা কিন্তু হঠাৎ এক উড়ো খবরে আনন্দের উৎসব মুহুর্তের মধ্যেই নিরানন্দে পরিণত হলো।

চোখ মুখ শক্ত করে বসে আছে সাকিব,দু চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছে তার। আশপাশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেই কারোর,হইচই চেঁচামেচি করছে সবাই। বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন নাসিমা রহমান,গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছেন রাজিয়ার উপর। এমন ব্যবহার করছেন যেন সব দোষ রাজিয়ার, মেয়ের বাসা থেকে পালিয়ে যাওয়ায় রাজিয়ারই হাত আছে। রাত চুপটি করে এক কোণে বসে রইল, আশপাশে কি হচ্ছে না কি হচ্ছে না এইদিকে ওর কোনো ধ্যান ধারণা নেই।ও ওর মনের কষ্ট গুলো গুনতে গুনতে ই ব্যস্ত।বেশ কয়েক মুহূর্ত শান্ত হয়ে বসে থাকার পর সাকিব উঠে দাঁড়ালো, এরপর খুব স্বাভাবিক ভাবেই নাসিমা রহমান কে বললো,,,

‘ অনেক রাত হয়ে গেছে মা, বাসায় চলো। আমার ঘুম পাচ্ছে খুব, ক্লান্ত ও বেশ আমি।’

‘ সাকিব, সাকিব বাবা আমার তুই এসব কি বলছিস? আমি জানি বাবা তুই এই ঘটনায় সত্যি খুব আঘাত পেয়েছিস যার জন্য তুই এই অপ্রাসঙ্গিক কথা বলছিস। তুই তো সিমরান কে খুব ভালো বাসিস সেটা আমি জানি রে বাবা, তুই কোন চিন্তা করিস না।তোর বিয়ে সিমরানের সাথেই হবে আর আজকেই হবে,ও কার সাথে কোথায় পালিয়েছে জানি না? রাজিয়া যেভাবেই হোক,যেখান থেকেই হোক ওর মেয়ে কে খুঁজে নিয়ে আসবে, আমি তোকে কথা দিচ্ছি সাকিব।’

‘ তোমার কি মাথা টা খারাপ হয়ে গেছে মা, কি আজে বাজে কথা বলছো তুমি? চুপচাপ বাসায় চলো, বিয়ে বিষয়ে আমি আর একটা কথাও শুনতে চাই না ব্যস।’

‘সাকিব?’

মা’কে চোখ রাঙানি দিলো সাকিব,ঐ চোখ দেখে নাসিমা রহমান একেবারে চুপটি হয়ে গেলেন। একবার আশপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আরেক বার রাতের দিকে তাকালো সাকিব, উপস্থিত সবাই হা করে তাকিয়ে দেখছে তাকে কিন্তু তাতে ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুক্ষণ রাতের দিকে তাকিয়ে থেকে হনহন করে সে জায়গা থেকে প্রস্থান করলো সাকিব।ও চলে যাওয়ার পর একে একে সবাই চলে যেতে লাগলো, সিমরান আর সাকিবের কথা সবার মুখে মুখে উঠেছে। মিনিট দশেকের মধ্যেই পুরো বাসা টা ফাকা হয়ে গেল, নাসিমা রহমানের সাথে যারা যারা এসেছিলো তারা সবাই চলে গেছে শুধু রয়ে গেল আসমা আর তার মেয়ে আওরাত। কপাল চাপড়ে হাহুতাশ করছেন রাজিয়া, সেই কখন থেকে কেঁদে চলেছেন থামার কোন লক্ষন নেই উনার মধ্যে। নিজের ভাগ্য কে দোষারোপ করছেন এখন। মেয়ের জন্য সবসময় সবার সামনে উনাকে মাথা নিচু করে থাকতে হয়েছে, এর আগে কত কান্ড ঘটিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ভেবেছিলেন সাকিবের সাথে বিয়ে হওয়ার পর বুঝি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু নাহ,এ মেয়ে সবার সামনে তার মুখ পুড়িয়ে দিয়েছে। বিয়ের আগ মুহূর্তে কোন একটা ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে সে, একটা বারও ভাবলো না তার মায়ের মানসম্মানের কথা টা?
কাঁদতে কাঁদতেই আসমা কে এসব বলছেন রাজিয়া, না পারছেন সইতে না পারছেন কিছু করতে। আসমা কিছু না বলে শুধু বোন কে শান্তনা দিতে লাগলেন,কিই বা বলবেন আর তাকে? সিমরান যা করলো এতে উনার ও খারাপ লাগছে খুব। বেচারা সাকিব, এই আঘাত টা কি করে সহ্য করবে কে জানে। খুব বেশি ভালো বাসতো মেয়ে টা কে, সেই মেয়ে টা এইভাবে ওকে ঠকাবে ও হয়তো স্বপ্নেও ভাবেনি।

________________________________________________

‘ কেমন আছো সোনা? সমজাতীয় দের সাথে থাকতে এইখানে কেমন লাগছে তোমার?’

আধো অন্ধকার একটা রুমে চেয়ারে হাত পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে সিমরান।মুখেও কাপড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধন দেওয়া যেন কোনো রকম চেঁচামেচি করতে না পারে।

সামনের চেয়ার টাকে একবার উল্টো করে ঘুরিয়ে দিলো, এরপর বেশ আয়েশ করে চেয়ারে বসে সিমরান কে উক্ত প্রশ্ন টা করলো সাকিব।

* কিছুক্ষণ আগে‌ *

কাজী সাহেব যখন ওদের বিয়ে পড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন সাকিব ওর এক বন্ধুকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললো, সিমরান কে যেভাবেই হোক ভুলিয়ে ভালিয়ে যেন বিয়ের আগেই বাসা থেকে বের করে নিয়ে যায়।আর এটাও বলে দিলো ওকে ঠিক কোথায় নিয়ে যেতে হবে। ওর বন্ধু গুলো ওর কথা মতো সব কাজ শেষ করার পর সাকিব চুপটি করে বিয়ের আসরে গিয়ে বসলো।তার কিছুক্ষণ পরেই রব উঠলো সিমরান কোনো ছেলের সাথে বাসা থেকে পালিয়ে গেছে।যদিও সে সবকিছু জানে তারপরও এমন ভাব করলো যেন সে গভীর আঘাত পেয়েছে এই খবরে, বাইরে শোকাবহ অবস্থা আর মনে মনে মুচকি হাসি তার। প্রফেশনাল অভিনেতার মতো অভিনয় করে কোনো রকমে সিমরান দের বাসা থেকে বেরিয়ে এলো সাকিব , অনেক বড় একটা কাজ আছে তার।

* বর্তমান *

‘ ও ওফ্ সোনা, তুমি তো কথাই বলতে পারবে না কারণ তোমার মুখে তো কাপড় বাঁধা আছে। বাঁধন টা খুলে দেবো কি?’

সিমরান পাগলের মত মাথা নাড়লো, কাঁদতেও পারছে না সাকিবের নি’ষ্ঠু’র’তা’র পরিচয় পেয়ে। এই ছেলে নাকি তাকে ভালোবাসে, বিয়ের রাতে যে ছেলে তার বন্ধুদের দিয়ে হবু বউ কে কিডন্যাপ করায় সেই ছেলে তাকে ভালোবাসে কিভাবে?

মাথা নাড়ানো দেখে সাকিব উঠে গিয়ে ওর মুখ থেকে কাপড় টা সরিয়ে দিল। কান্নারত অবস্থায় সিমরান কে দেখতে বড় ভালো লাগছে সাকিবের,যেদিন থেকে জানতে পেরেছে সিমরান ওকে ধোঁকা দিচ্ছে সেদিন থেকেই ভেবে রেখেছে সবচেয়ে জ’ঘ’ন্য তম শা’স্তি দেবে এই ধোঁকা বাজ টাকে। এরপর ধীরে ধীরে ঠান্ডা মাথায় প্লান করেছে ঠিক কি করে ওকে ওর উপযুক্ত পুরষ্কার দেওয়া যায়। সবশেষে এই একটাই উপায় মাথায় খেলেছে আর তা হলো এটা। ইচ্ছে করছে খুব বাজে কিছু একটা করতে কিন্তু নিজের মনকে সামলে রেখে আবার চেয়ারে এসে বসে পড়ল। অনেক অনেক হিসেব নিকেশ করার আছে সিমরানের সাথে,এর আগে ওর কোনো ক্ষ’তি করা যাবে না।

‘ তুমি এমন কেন করলে সাকিব? তুমি তো আমাকে ভালোবাসো তাই না, তাহলে তুমি আমাকে বিয়ে করার পরিবর্তে এইভাবে কিডন্যাপ করিয়ে আনলে কেন?’

‘ হুশশশ্ , ভালোবাসা শব্দটা তোমার মুখে মানায় না সোনা। ভালোবাসা মানে কি বুঝো তুমি,জানো এটার মানে কি? তুমি তো শুধু নাটকের মানে বুঝতে পারো,আর কিছু নয়।’

‘ ম মানে কি বলতে চাইছো তুমি?’

‘ কি বলতে চাইছি তা একটু পরেই বুঝতে পারবে। তোমার সব সিক্রেট আমার সামনে ফাঁস হয়ে গেছে সোনা,আর অবুঝ সাজার নাটক করো না।’

সিমরান ঢোক গিললো একটা, এসব কি বলছে সাকিব?ওর সব সিক্রেট ফাস হয়ে গেছে মানে, সাকিব কি তাহলে ওদের প্লানিং এর ব্যাপারে সবকিছু জেনে গেছে?

চলবে………………………..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here