দুরে নয় কাছেই আছি পর্ব -০৫

#দূরে নয় কাছেই আছি!
#লেখিকাঃতামান্না
#পর্বঃপঞ্চম

আপনি যখন এত করে বলছেন, আপনার কথাতো আর ফেলতে পারিনা, দিন এখানে।”
শায়োরী আরাফের সামনে নিয়ে প্লেটটা ধরিয়ে দিল।
উপর থেকে ঢাকনা খুলেই আরাফ দেখল,
ছোট ছোট কুচে চিংড়ি আর চিকন চিকন কচুর লতি,
আর কুমড়ো ফুলের বড়াটা নেড়েচেড়ে বলে উঠলো –

–” এটা কি?”

–” কুমড়ো ফুলের বড়া,”

–” স্ট্রেঞ্জ, ফুলের বড়া!”

–” হুম”

–” আপনি খেয়েছেন তো?”

–” হুম,

–” না বসুন আমি খাবো, আপনি ও খেয়ে নিন!”

–” না আপনি খান!”

–” নিন,” বলেই আরাফ শায়োরীকে জোর করে তার মুখে এক মুঠো ভাত মেখে মুখে দিয়েদিল।
শায়োরী আরাফের মুখের দিকে চেয়ে আছে।
আরাফ যে হুট করে তার মুখে মুঠোয় ভর্তি ভাত দিয়ে দিবে সে কল্পনায় করেনি।

–” এভাবে না দেখে খেতে থাকুন, ”
শায়োরী খেতে লাগল, আর আরাফের দিকে চেয়ে আছে। আরাফ শায়োরীকে খাইয়ে দিয়ে নিজে খেতে লাগল,তার মুখে মুচকি মুচকি হাসি। আরেক মুঠো ভাত শায়োরীর মুখের কাছে ধরতে সে খাবে না বলছে। তবুও আরাফ জোর করে তার মুখে দিয়ে দিল।
খুব ভালো লাগছে তার শায়োরীকে খেয়ে দিতে।

–” শুনেছি স্বামী স্ত্রী যখন একে অপরের দিকে চেয়ে থাকে, স্বামী তার স্ত্রীকে খাইয়ে দেয়, তাকে আপন করে নেয়, তার ভুল গুলোকে শুধরে দেয় সেই সম্পর্ক নাকি আরও গভীর হয়, কি ভুল বললাম?”

–” না,”

–” তাহলে তো আমরা ও নিজেদের মধ‍্যে সব ঠিক করে নিতে পারি। আর পাচঁটা স্বাভাবিক সম্পর্কের মত আমরাও নিজেদের মধ‍্যে সব ঠিক করতে পারি। বলতে বলতে আরাফ আবার শায়োরীর মুখে আবার খাবার তুলে দিল। শায়োরী খাবার খাচ্ছে তো ঠিক আছে তবে লজ্জায় কেমন মিয়ে মিয়ে যাচ্ছে। এতটা গভীর মায়ায় এত ভালোবাসাময় হাতে কেউ কখনো তাকে খাইয়ে দেয়নি। কেউ কখনো তাকে প্রশ্ন করেনি খেয়েছিস? বাবা যদিও প্রশ্ন করতো খেয়েছে কিনা কিন্তু কখনোই সময় করে জোর করে কখনো বলেনি আয় খাইয়ে দি।
শায়োরীর চোখ জোড়া ছলছল করছে। চোখ জোড়া মুছে নিল। আরাফ মুহূর্তটাকে ভুলিয়ে তুলতে বলে উঠলো –

.–” কুমড়োর বড়াটা খুব ভালো হয়েছে, কে বানিয়েছে?”

—” আমি,”

–” কুচো চিংড়ি দিয়ে কচুর লতিটা খুব ভালো লেগেছে, এগুলো সব আপনি কখন করলেন?”

–” দুপুরে যখন আপনি খেতে পারছিলেন না তখন আমি বাড়ির পিছন থেকে কচুর লতি গুলো উঠিয়ে নিয়ে এসেছিলাম, আমার চাচাতো ভাই সজিবকে বলেছিলাম পুকুর থেকে কুচো চিংড়ি ধরে নিয়ে আসতে। ঘাটের পাশেই চিংড়িগুলো পানিতে ভেসে বেড়ায়, আমরাতো মাঝে মাঝে ওড়নায় চিংড়ি গুলোকে ধরে ফেলি।”

–” ওড়না দিয়ে চিংড়ি ধরা যায়?”

–” হুম, মাছ বেশি হলে ওড়না দিয়ে ও ধরা যায়।

–” তাহলে তো বুঝাচ্ছে আপনি মাছ ধরেছেন,”

–” অবশ‍্যই এতে অবাক হওয়ার কি আছে? ”

–” বাহ, আমার বউ মাছ ধরতে জানে, আর আমি কিনা মাছ ধরা দূরে থাকুক পুকুরে ও নামিনি।”

–” পুকুরে নামেননি?”

–” না, তবে সাতার শিখার জন‍্য সুইমিংপুলে গিয়ে প্রায় দু সপ্তাহে শিখেছি।”

–” ওহ, আচ্ছা আমাকে ভাতের প্লেট টা দিনতো, ”

–” কেন?”

–” কেন আবার আরও নিয়ে আসবো!”

–” লাগবে না বসুন,”আরাফ জোর করে শায়োরীর হাত ধরে বসিয়ে দিল। খাওয়া শেষ করে দুজনে হাটতে বেড়িয়ে পরল। চারদিকে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পরেছে।
পরিবেশটা যেন আরও বেশি রোমাঞ্চকর লাগছে।
চাদেঁর আলোয় দুজন পাশাপাশি হাটতে লাগল।
দুজন একসঙ্গে হাটলেও কারো মুখে কোন কথা নেই।
শায়োরী খোলা আকাশের দিকে চেয়ে রইল। আকাশ টা আজ কত পরিষ্কার । চাঁদ টা ও আজ খুব বড় দেখা যাচ্ছে।

আরাফের হঠাৎ চোখ পরল পাশে দাড়ানো শায়োরীর দিকে। চাঁদের আলোয় শায়োরীর মুখটা খুব সুন্দর লাগছে। চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ গুলো ও যেন তাকে আরও ফুটিয়ে তুলেছে। আরাফের হঠাৎ কি হলো কে জানে সে শায়োরীর হাতের ভাজে নিজের হাতটা ঢুকিয়ে দিল। হঠাৎ হাতের মাঝে আরাফের হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠলো শায়োরী। আরাফের মাঝে কোন ভাবান্তর নেই সে দিব্বি হেটে চলেছে। শায়োরী হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলেও ছাড়লো না যাক না সময় এভাবে। দুজনে কিছু পথ হাটার পর। আরাফ বলে উঠলো –

–” আপনার সৎ মা আপনাকে বেশ কষ্ট দেয় না?”

–” সৎমা বা আপন হোক সে আমার মা, হ‍্যা হয়তো তার শাসন করার স্টাইলটা খুবই ভিন্ন। আর পাচঁটা মা হয়তো উঠতে বসতে যতটা খোঁচা দিয়ে কথা বলতো না আমার এই মা সেখানে অনেক বেশি বলে ফেলেন।”

–” হয়তো, বাদ দিন তো, অনেক হেটেছি এখন বাড়িতে গিয়ে জিরিয়ে নিব। আরাফের কথায় শায়োরী হেসে দিল। রুমের এসে দুজনে ঢুকে পরল। শায়োরী বিছানা ঠিক করে আবার বসে পরল। শুতে তার কেমন লজ্জা লাগছে। এত দিন হলেও দুজন কখনো একই বিছানায় ছিল না। আরাফ অন‍্যরুমে গিয়ে থাকতো আজ দুজন এই বাড়িতে এসে অন‍্যরুমেও থাকতে পারবে না।

আরাফ বুঝতে পেরে বলে উঠলো –

–“সমস‍্যা নেই, আপনি নির্দ্ধধায় ওপাশে শুয়ে পরুন।
আমি এই পাশ শুয়ে পরবো। আর যদি সমস‍্যা হয় আমি,….

–” না, না কোথাও যেতে হবে না,আপনি এখানেই আসুন।” আরাফ শায়োরীর কথায় হাসলো। শায়োরী খাটের একপাশে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পরল।
সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি শায়োরী।
প্রত‍্যেকটা মুহুর্ত তার কাছে অন‍্য রকম একটা অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।
____________________________________

সকাল সকাল ঘর থেকে বের হয়ে আরাফ দেখল।
শায়োরী রান্নাঘরের উনুনে বসে পিঠা বানাচ্ছে। সামনে গিয়ে দাড়াতেই শায়োরী তার সামনে একটা পিড়ি এগিয়ে দিয়ে বলল বসুন।

আরাফ পিড়িতে বসতেই শায়োরী তার সামনে পিঠা তুলে দিল। চিতুই পিঠা সঙ্গে মাংসের ঝোল, আরাফ পিঠাটা ধরে বলল –

–” বাহ! চিতুই পিঠা, আমার খুব ভালো লাগে। ”

–” ভর্তা দিয়ে খাবেন?”

–” না লাগবেনা,” শায়োরী আর আরাফের কথার মধ‍্যেই প্রবেশ করল শায়োরীর মা। আরাফ উনাকে দেখে বসা থেকে উঠেগেল।

–” আরে বসো বসো, উঠতাছো কিসের জন‍্য, বসো!
পিঠা শুধু এগুলাই বানাবি? আরও কিছু বানা,
গ্রামের পিঠা কি শহরের মানুষ দেখে!
আরাফ কিছু না বলে খেয়ে উঠেগেল। সে আবার একটু লাজুক প্রকৃতির বড়দের সামনে থেকে সরে থাকতেই পছন্দ করে। শায়োরী পিঠা বানিয়ে ঘরে আসলো।
আজ আবার আরাফির জন‍্য রান্না করতে হবে। মায়ের রান্না করা খাবার খেয়ে বেচারার কি বেহাল দোশাই না হলো। আজ আর সে মাকে রান্না করতে দিবে না।

রান্নাবান্নার কাজ সেরে শায়োরী ঘরে এসে বসলো। ক্লান্ত লাগছে খুব, চোখ বন্ধ করে একটু বসতেই। কিছুর শব্দ হলো চোখ খুলে দেখল। তার ছোটবোন সিমা দাড়িয়ে আছে,

–” কিরে কিছু বলবি?”

–” নেও এটা,”

–” কি?”

–” শরবত,”

–” ওরে বাবারে, তা হঠাৎ কি মনে করে? সব সময়ই তো পালিয়ে পালিয়ে বেড়াস!”

–” তুমি জানোনা আমি নতুন কারোর সঙ্গে মিশতে পারিনা। আমার অভ‍্যেস নেই কারোর সঙ্গে মিশার। নেও এখন এই শরবত টা খাও।”

–” দে খাচ্ছি,”

–” আপু, একটা কথা আছে!”
শায়োরী শরবত খেয়ে বলল–” কি?”

–” আজ আমরা পুকুর পাড়ে যাবো, বরশি দিয়ে মাছ ধরবো, তুই যাবি?”

–” লোক বেশি না থাকলে যাবো, কিন্তু তোর ভাইয়া যদি না দেয়!”

–“কেন দিবে না?”

–” হয়তো তার পছন্দ না ও হতে পারে।”

–” আ‍্যাহহ, বললেই হলো! তুই আমার সাথে যাবি। আমি আর তুই মিলে বরশি দিয়ে মাছ ধরবো। ওতে তোর জামাইয়ের কি?”
শায়োরী কোনভাবেই বুঝাতে পারছেনা সেখানে আবির থাকবে। রাস্তার পাশে বলে আবির প্রায় সময় ওখানে বসে থাকে। দেখা হলেই তো তাকে আবার জ্বালাতে শুরু করবে। আর এখন তো আরাফ ও আছে তাকে কিভাবে বুঝাবে?” আরাফ এমনিতেই রেগে আছে ওকে দেখলে তো আরও রেগে যাবে।

চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here