দ্বিতীয় বাসর পর্ব ৬+৭

দ্বিতীয় বাসর (গল্প)পর্ব-৬
হাসিনা সাঈদ মুক্তা

অবশেষে বেলা প্রায় দুটার দিকে ফোন আসল মিতুর মোবাইলে
“হ্যালো মিতু।’
“জ্বী বলেন।’
“আমার লাগেজটা আজ গুছিয়ে দিতে পারবে?’
মিতু একটু অবাক হয় শুনে।বন্ধন সাহেব তিনমাসে এই প্রথম তাকে তুমি করে বল্লেন।মিতুর চেয়ে প্রায় ১৪/১৫ বছর বয়সের বড়।কিন্তু এতদিনই বা আপনি করে কেন ডেকেছে মিতুকে?
“তিনিই ভালো জানেন?’
মিতুর সরব জবাব,
“জ্বী আচ্ছা।কি কি গুছিয়ে দিতে হবে আমাকে বলে দেন।আমি গুছিয়ে দিচ্ছি।’
বন্ধন সাহেব ফোনের ওপাশ থেকে মিতুকে বুঝিয়ে দিলেন কি কি লাগবে,কখন লাগবে।সৈনিক এসে লাগেজ নিয়ে যাবে ইত্যাদি ।
নিশা এতক্ষণ খেয়াল করছিল মিতুকে।মিতুর কথা শেষ হতেই জিজ্ঞেস করল,”কি রে দুলাভাই কি কোথাও যাচ্ছেন?’
মিতু বল্ল হ্যা মনে হয় আজ উনার ট্যুর আছে।
নিশা যেন তাজ্জব বনে যায়।”মনে হয় মানে?উনি কোথায় যাচ্ছেন জিজ্ঞেস করিস নি?’
খাবার টেবিলে মিতু খাবার বেড়ে দিচ্ছিল তার বান্ধবীকে।টেবিলে নানু ও বাবাই ও বসে খাচ্ছিল।নিশার আচমকা প্রশ্নে নানু,বাবাই দুজনেই তখন তাকিয়ে দেখছে মিতুকে।মিতু খুব স্বাভাবিকভাবে হেসে বল্ল।
“আচ্ছা এত কি মনে থাকে?যখন জানার এমনিই জেনে যাব। এখন খা তো?’
নিশার কাছে মোটেও সুবিধার ঠেকছে না।সাথে নানুর তদারকি তো আছেই।
নিশাকে দেখে মনে হল,বান্ধবীর কাছ থেকে মনের মতো জবাব পায়নি।তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করে ন্যান্সিকে খাইয়ে দিতে লাগল।মিতুও বসে পড়ে ওদের সাথে।প্লেটে অল্পকটা খাবার নেয়।নানু মাঝে মাঝে খুব রাগ করে।”ভাত খাবি খাওয়ার মতো কইরা খা।এখনো কি ছেড়ী আছোস বাচ্চা কাচ্চা হইলে বেটি হইয়া যাবি।’বলে নানু জোর করেই মিতুর প্লেটে আরও খাবার তুলে দেয়।নিশা ভালো করে খেয়াল করে মিতুকে।মিতুকে কেমন উদাস লাগছে।ছোটবেলা থেকেই মিতু একটু চুপচাপ,সরল প্রকৃতির।আন্টি মারা যাবার সময় তার বয়সও অনেক কম।মাত্র ক্লাস ফাইভে না সিক্সে পড়তো মিতু।নিশার বাসায় যখন যেত মিতুকে সবাই খুব মায়া করতো।মিতু সাথে করে ওর ছোট ভাই মুহিনকেও নিয়ে যেত।কিন্তু তবুও মিতুর মুখের কোণে হাসি লেগে থাকতো।মিতুর তাকানো ও হাসি অদ্ভুত সুন্দর।”গজদাঁতের ফাঁক দিয়ে যখন এক গাল হাসে।’সেটা কি জানে তার বান্ধবী?”সেই হাসি এখন কোথায় গেল?’নিশা মনে মনে বিড়বিড় করছে।আজ শনিবার তাই বাবাই এর স্কুলও বন্ধ।ন্যান্সি আর বাবাই খাবার শেষ করে গল্প করছে।কার্টুন ছেড়ে দেয় মিতু।বাসায় কেউ আসলে বাবাই খুব খুশী।ন্যান্সি যদিও অনেক ছোট মাত্র চার বছর তবুও ভাব জমানোর চেষ্টা।বাবাই ওর ঘর থেকে নানা রকম খেলনা এনে দেয় ন্যান্সিকে।
মিতু ওদের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবে।
হঠাৎ নিশা বলে ওঠে,”কি রে দুলাভাই এর লাগেজ গুছাবিনা?’
“হুম গোছাবো।এখনো দেরী আছে।’
“আচ্ছা মিতু বাচ্চা কাচ্চা নিবি কবে?যত তাড়াতাড়ি পারিস নিয়ে নে।’
মিতু যেন একেবারেই চুপ হয়ে যায় নিশার কথায়।
নিশা মিতুকে নিয়ে তার ঘরে যায়।এবার যেন মুরব্বী হয়ে যায় নিশা।
“তোর কি হয়েছে মিতু বলতো?তুই চুপচাপ ছিলিস তাই বলে এত উদাস এত চুপচাপ তো, আগে কখনো দেখিনি তোকে?’
মিতু কিছুটা ভড়কে যায়।আবার সেই শান্ত স্বভাবের মৃদু হাসি হাসে মিতু। নিশা ওর চোখের দিকে তাকায়।
নিশা এবার রেগে যায়।”হাসলে ভালো করে মুখ খুলে হাসবি এভাবে গাল টিপে হাসবি না।’
মিতুর কৌতুহল”গাল টিপে হাসলে কি হবে?’
“তাহলে আর জামাইকে পাগল বানাতে পারবি না?’
একটু চুপ করে আবার বলে,”তুই জানিস তোর হাসি কত সুন্দর?যখন তুই শব্দ করে খিলখিল হাসিস।ঐ হাসিটা ভাইয়ার সামনে বেশী হাসবি।’
“আর তোর গালের দুপাশ,পিঠ ও পায়ের নীচ দিকটা ভাইয়াকে বেশী দেখাবি।’
মিতু এবার ফিক করে হেসে ওঠে।নিশার মনে হলো অনেকক্ষণ পর তার আগের বান্ধবীকে ফিরে পেয়েছে।নিশা মিতুর চোখেমুখে লজ্জার আভা দেখতে পায়।কিন্তু আবার কোথায় যেন হারিয়ে যায় মিতুু।
“কখনো মাথা নীচু,কখনো দাঁত দিয়ে নখ কাটা,আঙুল কচঁকানো এই স্বভাবগুলি এখনো আছে দেখছি।’
চতুর নিশা,তার স্বামীর সাথে রোমান্সের অনেক কিছু শেয়ার করে বান্ধবীর মুখ থেকে কথা আদায় করতে চায়।মিতু লাজুক হাসে,আবার সেই উদাস দৃষ্টি মিতুর।
অগত্যা নিশা সরাসরিই জিজ্ঞেস করে মিতুকে।”ঐ এতক্ষণ ধরে শুধু আমারটাই বলে যাচ্ছি।তোরটা যে কিছু বলছিস না?’
“কি বলবো?’স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা মিতুর।
“কি আবার ঐ একটাই তো গল্প। বিয়ের পর স্বামীর আদর সোহাগের গল্প।একটু শোনা।দুলাভাই কি করে না করে,শুনে একটু দিলটা ঠান্ডা করি।’
আসলে মেয়েরা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে খুব পছন্দ করে।পাঁচ বছর হয়েছে নিশার বিয়ে হয়েছে তবু যেন কৌতুহলের শেষ নেই।
“কি শুনবি?তোর দুলাভাই তো বুড়া।ইমনের মতো তো এত ইয়াং না।বুড়া জামাই বউকে আর কতটুকু ভালোবাসতে পারবে তুই বল?’
“তার মানে কি দুলাভাই তোকে ভালোবাসেনা?’
মিতু যেন ফের চুপ হয়ে যায় নিশার কথায়।
নিশা ওর শোবার ঘরে দেয়ালে তাকিয়ে দেখে বন্ধন আহমেদের আর্মি স্যুট, মাথায় আর্মি টুপি ও চোখে সুন্দর হালকা নীল ফ্রেমের চশমা পড়া ছবি।
মিতুর শোবার বিছানার পাশে ছোট টেবিলে মিতু ও বন্ধনের বিয়ের ছবি।ছোট বাহারী ডিজাইনের ফ্রেমটায় যদিও বিয়ের এই ছবিটা ঢুকিয়ে দিয়েছে মিতুর ছোট দেবর নীবিড়।
মিতু অবশ্য মনে মনে অনুযোগ করেছিল,”যে লোক বিয়ের আগেই জানিয়েছে তার মৃত স্ত্রীকে কখনো ভুলবে না তার সাথে বিয়ের ছবি রেখে কি লাভ?’
নিশা ছবিগুলির দিকে তাকিয়ে বল্ল, “হুম তোর জামাই বুড়ো কিন্তু দেখে ওতো বুঝা যায় না,আর তাছাড়া উনি দেখতেও তো খারাপ নন।’
ফের মিতুকে উপদেশ দিতে থাকে তার ছোটবেলার বান্ধবী।মিতুর গালের একপাশটা ধরে অনেকগুলি কথা বলে সে,
“শোন মিতু ভাইয়ার সামনে বেশী করে হাসবি শব্দ করে,আর যা যা করতে বল্লাম করবি।ছেলেরা মেয়েদের কিছু জিনিস অনেক পছন্দ করে।ফর্সা পা,পিঠ, গালের দুপাশ বেশী দেখাবি।দুলাভাই আসার আগে একটু সাজগোজ করে নিবি।আর যা খেতে ভালোবাসে,নিজের হাতে বানিয়ে খাওয়াবি।শ্বশুর,শ্বাশুড়ি নেই যেহেতু বাড়তি দায়িত্ব নেই।মনের মতো পেট পুজো করাতে পারলেও ছেলেরা খুশী।বুড়ো জামাই তাতে কি?বুড়ো জামাই বলেই তোকে আদর-সোহাগ বেশী করবে।তুইও করবি।বউ এর আদর-সোহাগ পেলে ভাইয়ার বয়সও দশ বছর কমে যাবে।’
নিশা বিকেলে রকমারি নাস্তা খেয়ে চলে যায়।খানসামকে আজ খবর দেয়া হয়েছিল।চিকেন ফ্রাই নুডুলস,লাসসি বানিয়ে দিয়ে যায়।
নিশা চলে যাবার পর মিতু ছোট একটা লাগেজ সৈনিককে দিয়ে বের করিয়ে নেয়।বন্ধন সাহেব দুদিনের সফরে সিংগাপুর যাবেন।মিতুকে টেক্সট পাঠিয়ে তা জানান।মিতু নিজের হাতে বন্ধনের কথা অনুযায়ী অল্প কিছু জামা কাপড় দিয়ে দেয়। বাইরে সাধারণত টুথব্রাশ,ক্রীম এসব লাগেনা।তবু মিতু দিয়ে দেয়।মিতু বিয়েতে দামী খুব সুন্দর দুটা টাওয়াল পেয়েছিল।সম্ভবত বন্ধনের খালা বিয়ের সরঞ্জামের সাথে দিয়েছিল।তার ভেতর একটা দিয়ে দেয় তার স্বামীর লাগেজে।
বন্ধনের ফ্লাইট রাত এগারোটায়।আটটা বাজে সৈনিক এসে নিয়ে যায় গোছানো লাগেজ।মিতু ফের টেক্সট পাঠায় বন্ধনকে, রাতে ডিনার বাসায় করবে কিনা।সাবধানে যেতে।উনি জানান আজ আর দেখা হচ্ছে না।
রাতে মিতু আর কিছু খায় না।বাবাইকে একটু পড়া দেখিয়ে দেয়।বুয়াকে ফোন করে রাতে তার সাথে থাকতে বলে।একা ঘুমানোর অভ্যেস নেই মিতুর।বাবার বাড়ীতেও তার সাথে কখনো রহিমা খালা অথবা বুয়া কখনো ছোট ফুপি,মামাতো,ফুপাতো বোন এসে ঘুমিয়েছে।আর নিজের ঘর আর নিজের বিছানা ছাড়াও ঘুমাতে পারেনা।তিনমাস দশদিনের ভিতর এই প্রথম দেশের বাইরে যাচ্ছেন বন্ধন।বুয়া এসে নানু ও বাবাইকে খাবার দিয়ে মিতুর রুমে নীচে শুয়ে পড়ে।
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে মিতু।ফের লাইটটা জ্বালায়।বন্ধন সাহেব অবশ্য ডিমলাইট জ্বালিয়ে ঘুমান।মিতুর ঘর অন্ধকার করে ঘুমাতে ভালো লাগে।আলো জ্বালিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিজেকে দেখে সে।তার গালের দুপাশে কলির মতোন।নিশা ছাড়াও তার ভাবী ফুপাতো ভাইয়ের বউ ও একথা বলেছিল।নিশা নিয়মমতো রূপচর্চা ও ফিটনেস এর কথাও বল্ল আজ।যেটা পারুলও বলে তাকে।
তারপর টেবিলে রাখা তাদের বিয়ের ছবিটা হাতে নেয়।ওয়ার্ডরবের উপরে রাখা ঘড়িটার দিকে তাকায়।সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে।বন্ধন এতক্ষনে আকাশে উড়ছে।নিশার কথাগুলো বারবার তার কানে যেন বাজছে।কেমনজানি ভালোলাগা কাজ করে তার বেখেয়ালী মনে।মিতু শব্দ করেই হাসে এবার।তারপর,বন্ধনের ছবিটায় হাত দিয়ে স্পর্শ করে মিতু।হঠাৎ কি যেন ভেবে উন্মনা হয়ে যায় সে?(চলবে)দ্বিতীয় বাসর (গল্প) পর্ব-৭
হাসিনা সাঈদ মুক্তা

বন্ধন সাহেব আজ ফিরলেন।মিতুকে অবাক করে দিয়ে একটা গিফট প্যাক দিলেন।
মিতুকে বল্লেন,
“মিতু এই গিফটটা তোমার জন্যে?’
মিতু বলে উঠল,
“কি এটা?’
“খুলে দেখো।ও হ্যা এই গিফটা সিংগাপুরে আমার বন্ধুর ওয়াইফ তোমাকে দিয়েছে।বন্ধু ও ভাবী তারা ওখানেই থাকে।’
ফের বল্লেন,”খুলে দেখো চমৎকার গিফট।আর আমাকে এখনি যেতে হবে।অফিসে কাজ আছে, দুদিন তো বাইরেই ছিলাম।’
বন্ধন তারাহুরো করে বের হয়ে গেলেন।বাবাই ও আজ স্কুলে যায় নি।দুইটার দিকে স্কুল ছুটি হয় ওর।এগারোটায় ক্লাস শুরু।বাবার সাথে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটায় ও।মিতুর দেখে ভালো লাগে।
“ছেলেটা বাবাকে একেবারেই কাছে পায় না।’কিন্তু বাবাই তার বাবাকে মিস করে।যদিও মিতুর বিয়ের পর মিতু ও ছোট চাচু নীবিড় এর সাথে সময়টা ভালোই কেটে যাচ্ছে।
আজ স্কুলে যাবার ঝামেলা নেই।স্কুলের চাকরীটা ছেড়ে দিয়েছে মিতু।মিতুর বাবা ও সেতারাই বলে দিয়েছে।মালয়শিয়ায় চলে যাবার আগে তার মায়ের মতো বড় বোন বলে গেছে মিতুকে, “আর চাকরী করে কাজ নেই।স্কুলে কত টাকাই বা বেতন পাস?এখন আর্মি অফিসারের বউ তুই,রাজরানী হয়ে থাকবি।’
মিতু অবশ্য চায় পরে সুযোগ পেলে আবার চাকরীটা করবে।স্কুল থেকে যা পায় বাবা ও মুহিনকে দিবে।মুহিনের ইন্টার শেষে ভার্সিটির ভর্তি দৌড়।এসব বোনকে বলায় সেতারা বল্ল,
“বাবার তো তিনতলা একটা বাড়ী আছে।আর মুহিন এখন টিউশনী করছে।বাড়ী ভাড়ার টাকা তারা পাচ্ছে না?আর আমি তো আছি।তোকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না মিতু।’
“যাক আজ আর স্কুলে যাবার ঝামেলা নেই।’এবার প্যাকেটটা হাতে নেয়।প্যাকেটের ভিতর থেকে জিনিসটা বের করতেই ভীষন অবাক হয় মিতু!ওর ভেতরে সুন্দর কালারের স্লিপিং স্যুট বা নাইটি।কাপড়টা ধরে দেখে সে অনেক সফট। দামী সিল্কের কাপড়।ও বিয়েতে আর একটা নাইটি পেয়েছিল, সেটা সার্টিনের।এই নাইটির একটা বিশেষত্ব আছে।এটার পার্ট দুটা।ভিতরে খোলা বা স্লিভলেস আর বাইরে দিয়ে লম্বা শার্টের মতো বেল্টও আছে।মিতু দরজা লাগিয়ে স্লিভলেস পার্টটা পড়ে।অফওয়াইট আর সাদা ফ্লোলেল শেডের সুন্দর একটা নাইটি।মিতুর ফর্সা হাত ও বাহু বের হয়ে আছে।অদ্ভুত সুন্দর লাগছে তাকে!কিন্তু এই অবস্থায় বন্ধনের সামনে যাবে মিতু?লজ্জায় হাত দিয়ে মুখ লুকায় সে।বিয়েতে পাওয়া নাইটিটাও আজ পর্যন্ত পড়েনি।সেটাও সুন্দর,পার্পেল রং এর। তবে এটার মতো এত খোলামেলা না।মিতু এবার সার্টের মতো গাউনটা পড়ে নেয়।”হুম এই ভাবে বন্ধন সাহেবের সামনে যাওয়া যেতে পারে।’
“আচ্ছা আজকে এভাবে পড়ে ঘুমালে কেমন হয়?’মিতু ফিক করে হেসে ফেলে।
হঠাৎ মিতু কি যেনো ভাবে।বন্ধনের এই সিংগাপুর ট্যুরে যাবার কিছুদিন আগের ঘটনা।নানু সেদিন বাসায় ছিলেন।বন্ধন ও তার ছোট ভাই নীবিড়,মিতু ও বাবাইকে নিয়ে শপিং মলে গিয়েছিলেন।ছোটভাই কানাডায় থাকে।দেশে এবার এসেছে ভাইয়ার বিয়ের জন্যে।ভাইকে অনেক ভালোবাসেন বন্ধন।মূলত ভাইকে সপিং করে দেয়াটাই উদ্দেশ্য ছিল।এতদিন পর কাছে পেয়েছেন তিনি তার ভাইকে।তাদের আরও এক ভাই আছে।তার নাম আবির।সে মেঝো,বন্ধনই সবার বড়।সেও বউ ও দুই বাচ্চা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থাকে।ফরেনার মেয়ে বিয়ে করেছে আবির।তবে বন্ধনের প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর সেই আপাততো বিবাহিত ছিল তিন ভাইয়ের ভিতর।বাচ্চা গুলি এক একটা কিউটের ডিব্বা।মিতুর বাসার সবাই তিন ভাইয়ের অনেক প্রশংসা।তিন ভাইই নাকি দেখতে হিরোদের মতন।ছোটমামী তো নিবীড়কে মনে মনে তার মেয়ে পারুলের জন্যে পছন্দ করে ফেলেছে।মামী ইদানীং খুব খোঁজ নেয় মিতুর।কতবার পারুলকে খাবার দিয়ে পাঠাতে চেয়েছে।পারুলই আসতে চায় না।পারুল আসার আগে মিতুকে ফোন করে সাফ বলে দেয়।,”দেখো মিতু আপু নিবীড় ভদ্রলোক যেদিন থাকবেন না সেদিন আসবো।মার যে কি আমার বিয়ের ভুতে পেয়েছে?আমি কোনভাবেই এখন বিয়ে করবো না।আর তোমার দেওরকে তো নয়ই।’
মিতু যেন রেগে যায় শুনে,”আমার দেওর কে না মানে?আমার দেওর কি সস্তা?’
“ও আচ্ছা তাই এত দরদ?দুদিনেই দেওরকে পেয়ে এত ভালোবাসা?’
“বাসবো না কেন ও মুহিনের মতো আমার আর একটা ছোট ভাই।ওর বাবা মা নেই।ছেলেটা কদিন এর জন্যে এখানে আছে কদিন পরেই আবার চলে যাবে।’
আবির অবশ্য বিয়ের পরপরই চলে যায় অস্ট্রেলিয়ায়।সেখানে ভালো ব্যাংকে জব করে।তাদের ওখানে এখন নিজেদের রেস্টুরেন্ট আছে।তার ওয়াইফ সেটা চালায়।
সেদিন শপিং শেষ করে।মিতুও বেশ পছন্দ করে তার দেবরের জন্যে কেনাকাটায়।নিবীড়ের সাথে জমেছেও ভাব মিতুর।এত অল্প দিনে নিবীড়েরও যেন ভাবিকে ছাড়া একেবারেই চলে না।মিতু অবশ্য জানতে চেয়েছিল কেয়া ও তাদের মাঝে সম্পর্কটা কেমন ছিল।নিবীড় কেমন যেন এড়িয়ে যায়।নানুও তেমন কিছু বলে না।শুধু বলে কেয়া অনেক চঞ্চল ছিল।প্রথমে নাকি অনেক হাসিখুশি বউ ছিল।তারপর কেমন জানি বদলে গিয়েছিল।বন্ধনের ক্লাসমেট।ভালোবেসে বিয়ে করেছিল।তবে বন্ধন তাকে অনেক ভালোবাসত।নানুই বলত” আগের বউটার কথায় উঠত আর বইতো বাবুসোনা।কি খাওয়ায়ে যে পাগল বানায়ে রাখসিল আমার নাতিটারে,বউ সারা কিইসসু বুঝতো না।কেয়া মইরা যাওয়ার পরও ওর ছবি বুকে কইরা ঘুমাইতো।’
“হুম তোমার বাবুসোনা এখনো কেয়ার জন্যেই পাগল।সেটা তো আর তোমরা জানো না।’মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে মিতু।
শপিং শেষ করে তারা রেস্টুরেন্টে খায়।নিবীড় সেলফি তোলে সবাইকে নিয়ে।মিতুর সে দিনটা খুবই ভালো লাগে।খাওয়া শেষ করে গাড়ীতে উঠবে তারা।পার্কিং রাস্তার ঐপারে।মিতুর রাস্তা পারাপারে একটা ফোবিয়া আছে। খুব ভয় পায় ও রাস্তা পার হতে।ভয়ে আরও বেশী অন্যমনস্ক হয় মিতু।সবাই সুন্দর করে রাস্তা পার হচ্ছিল।মিতু পিছনে একলা পড়ে গেল।হঠাৎ পার হতে গিয়ে চলন্ত একটা ছোট প্রাইভেট কারের ইন্ডেকেটর গ্লাসের সাথে সজোরে বাড়ী খায় মিতু।প্রচণ্ড রকম ব্যাথা পায় সে কব্জিতে।নিবীড় বাবাইকে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল।বন্ধন ততক্ষনে গাড়ীতে বসে গাড়ী স্টার্ট দিচ্ছিল।সেদিন আর ড্রাইভার ছিলনা।বন্ধন দূর থেকে লক্ষ্য করলো ব্যাপারটা।দেখামাত্রই দৌড়ে ছুটে গেল মিতুর কাছে।”দেখি দেখি কোথায় লেগেছ?’এমন বাড়ি খেয়ে মিতুর মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরছে।বন্ধন ধরে ফেল্ল তাকে।মিতুর লোপ্রেশারের প্রবলেম আছে সেটা মুহিনও পারুলের কাছে জেনেছিল বন্ধন পরে।মিতুর কব্জিটা ধরে তারপর বাহুর দুপাশ থেকে দুহাত দিয়ে ধরল বন্ধন মিতুকে প্রায় সাথে সাথে।আর বকতে লাগল মিতুকে,”এভাবে রাস্তা পার হয়?আপনি গাড়ী না দেখেই পার হচ্ছিলেন কেন?আর একটু হলেই তো গাড়ীটা মেরে দিতো? তখন?’তখনো মিতুকে আপনি বলতো বন্ধন।নিবীড় দৌড়ায় রাস্তায় গাড়ীটাকে আঁটকানোর চেষ্টা করে।কিন্তু প্রাইভেট কারটা তাদের নাগালের বাইরে ততক্ষণে।বন্ধনের কথাগুলি অস্পষ্ট লাগে।জ্ঞান হারিয়ে ফেলে মিতু।
বাসায় এসে নিজেকে বিছানায় দেখে মিতু।বন্ধন বলতে থাকে,”আপনার লো প্রেশারের প্রবলেম। কই বলেননিতো।’বাসায় মুহিন ও পারুল এসেছে।তারা এটা জানায় দুলাভাইকে।মিতুর মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ায় ভড়কে যায় বন্ধন সাহেব।
মিতু বিছানা ছেড়ে উঠতে নেয়।সাথে সাথে আবার বকা দিয়ে ওঠেন বন্ধন।”আপনি উঠছেন কেন?আজ সারাদিন বেডরেস্ট আর সলিড ফুড খাবেন ওকে।’
ফের বলেন,”এখন কেমন লাগছে?বিকেলে ডঃ এর কাছে যেতে পারবেন নাকি তাকে খবর দিবো।’মিতু লাগবেনা বলে।একটু পরই ঠিক হয়ে যাবে।পারুল ও মুহিন তাদের দুলাভাই এর চোখে মুখে চিন্তার রেখা দেখতে পায়।তারা একটু পর চলে যায় বোনকে দেখে।মিতু খেয়াল করল তার টেবিলের পাশে আইস হোল্ডার। বন্ধন নাকি আইস দিয়ে ঢলে দিচ্ছিলেন তার বা হাতের কব্জিটায় যেখানে সে ব্যাথা পেয়েছে।পারুল ও মুহিন তাকে বলে সেটা।বন্ধনও ফের অফিসের কাজে বের হয়ে যায়।যাবার আগে নিবীড়কে বলে যায় মিতুর দিকে খেয়াল রাখতে।
মিতু নাইটির ফাঁক দিয়ে কব্জির সেখানটায় স্পর্শ করে আজ আবার। বন্ধন তাকে কিভাবে ধরেছিল সেটা মনে করার চেষ্টা করে।”আচ্ছা সত্যি কি বন্ধন সাহেব আমাকে নিয়ে উতলা হয়েছিলেন?’হঠাৎ তাদের ল্যান্ডফোনটা বেজে ওঠে।মিতু বলে ওঠে,”হ্যালো আসসালামু আলাইকুম?’
ওপাশ থেকে এক ভদ্রমহিলা বলে ওঠে,”ওয়ালাইকুম আসসালাম।কে ভাবী বলছিলেন?’
“জ্বী আমি মিসেস মিতু আহমেদ।’মিতু পরিচয়টা দিয়ে হেসে উঠল।
“জ্বী ভাবী ভালো আছেন?আমি সিংগাপুর থেকে ভাইয়ার বন্ধুর ওয়াইফ তামান্না বলছি।’
মিতু এবার বুঝল এই সেইজন যে তাকে নাইটিটা দিয়েছে?ফের তামান্না বল্ল,”ভাবী ভাই কখন পৌঁছেছে?আপনার ভাই এর সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল।হঠাৎ লাইনটা কেটে গেল।তাই ও বল্ল আবার আর একটু খোঁজ নিতে।’
মিতু সময়টা জানিয়ে দেয় দুজনের সৌজন্য আলাপ।ফোন রাখবার আগে মিতু তামান্নাকে ধন্যবাদ জানায় এত সুন্দর গিফটের জন্যে?তামান্না এবার একটু অবাক হয়, “কোন গিফট ভাবী?আমি তো আপনাকে কোন গিফট পাঠায়নি?’মিতুও অবাক হয় শুনে,”ভাবী পিংক অফওয়াইট নাইটি, উনি তো বল্লেন আপনি কিনে পাঠিয়েছেন।’ফের তামান্না বল্ল,”ও আচ্ছা ভাবী আপনি বুঝতে ভুল করেছেন ঐটা ভাই ই পছন্দ করে কিনেছে আপনার জন্যে?আমাকে শুধু বলেছে সুন্দর একটা নাইটি কিনবো আমাকে হেল্প করো কোথা থেকে কিনবো।আমি শুধু ভাইয়াকে শপিংমলে নিয়ে গিয়েছিলাম?’মিতু আবারো জানতে চায়, সত্যি বন্ধনই তার জন্যে নাইটিটা কিনেছে কিনা।তামান্না আবারো বন্ধনের কথাটাই বলে।
ফের মিতু ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিজেকে দেখে,সব পুরুষরাই মেয়েদেরকে একটু আলাদা বেশে দেখতে চায়।তবে তাকে যাকে সে ভালোবাসে।”তবে কি বন্ধন সাহেব……..কিন্তু তা কি করে হয় ?এই চারমাসে বন্ধন তো তাকে একবারো স্পর্শ করতে চায়নি?নাকি বন্ধন সাহেবের মনে এখন দৈহিক লালসা পেয়ে বসেছে?ভালোবাসবেনা কিন্তু চাহিদা পূরণ করবে?’সরাসরি বলেনি মিতুকে তাই এমন একটা উপহার এনে দিয়ে অন্যের নামে চালিয়ে দিচ্ছে?
“কেন এই লুকোচুরি বন্ধন সাহেবের?তামান্না তাকে এই উপহার দিয়েছে…….এমন মিথ্যে কথা কেন বল্লেন?'(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here