ধূসর প্রেমের অনুভূতি পর্ব -৩৪

#ধূসর_প্রেমের_অনুভূতি
#ফারহানা_ছবি
#পর্ব_৩৪
.
.
ফারিহা বা অর্নিলের কারোর চোখে এখন অব্দি পড়লো না পাশের ব্যালকনিতে দাড়িয়ে থাকা মানুষটাকে৷ ফারিহা আর অর্নিলের সুন্দর মুহূর্ত গুলো দেখে ভেতরে ভেতরে অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে আর ভাবছে কি করে এই সুন্দর মুহূর্ত গুলোয় আগুনের ফুলকি ছিটিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে৷
.
.
.
সকাল সকাল রাফি আদিল নাস্তা করে বেরিয়ে যায়৷ ফারহা রেডি হয়ে নিচে এসে দেখে তনু বাদে প্রত্যেকে ডাইনিংয়ে উপস্থিত ৷ ফারহা চারিদিক চোখ বুলিয়ে সারভেন্ট এর কাছে তনুর কথা জিজ্ঞাসা করতে সারভেন্ট জানায় “তনু নাকি সকাল সকাল বেরিয়ে গেছে৷ ” কথাটা শুনে ফারহার আর খাওয়াটা যেন মুখে রুচছে না৷ ফারহা যাস্ট জুসটা খেয়ে উঠে পড়ে৷ আইরিন খান মেহরীমা চৌধুরী ফারহাকে না খেয়ে উঠতে দেখে দুজনে চোখ পাকিয়ে বলে,” এই তুই না খেয়ে উঠছিস কেন?”
আইরিন খানের কথা শুনে ফারহা চোখ মুখ কঠিন করে বলল,” মম একটা ইম্পট্যার্ন্ট কাজ আছে ৷ আমাকে এখুনি যেতে হবে৷”

ফারহার কথা শুনে মেহরীমা চেয়ার ছেড়ে উঠে ফারহার হাত ধরে চেয়ারে বসিয়ে ব্রেড নিয়ে ফারহার মুখের সামনে ধরে৷

” মামুনি কোন গাই গুই শুনবো না দ্রুত খেয়ে নেও৷”

ফারহা মেহরীমার শাসন দেখে ফিক করে হেসে দিয়ে ব্রেডে একটা বাইট দিয়ে মেহরীমাকে বলে,” মামুনি তুমি আর বদলালে না ৷ ছোট বেলার মত এখনো চোখ পাকিয়ে আমাকে খাইয়ে দেও৷”

মেহরীমা ফারহার কান মলে দিয়ে বলে,” বেশি পেকে গেছো? কথা কম বলে দ্রুত খেয়ে নেও৷”

ফারিহা অর্নিল দুজনে বউ শাশুড়ীর খুনশুটি ভালোবাসা দেখছে৷

ফারিহা এই সব দেখে আনমনে বলে উঠলো,” ইস এমনও শাশুড়ী হয়! বউমা খেতে চাচ্ছে না বিধায় জোর করে খাইয়ে দিচ্ছে৷”

অর্নিল ফারিহার পাশের চেয়ারে বসা বিধায় ফারিহার কথা গুলো স্পষ্ট শুনতে পেয়ে বলল,” ডোন্ট ওয়ারি সুইটহার্ট তোমার শাশুড়িও তোমাকে এভাবে কেয়ার করবে৷”

ফারিহা মেকি হাসি দিয়ে অর্নিলকে বলে উঠলো,” মানুষ যেটা চায় সেটা পায় না৷ আর যেটা পায় সেটা চায় না৷”

অর্নিল ফারিহার কথার মানে বুঝতে না পেরে বলল,” মানে!”

” নাথিং , খেয়ে নেও অর্নিল৷”

ফারিহা আবার তার খাওয়ায় মনোযোগ দিলো৷

___________

” ওহ জেসিকা এ্যাট লিস্ট তুমি এলে৷”
কিং ফায়ারের গালে হাত দিয়ে স্লাইট করতে করতে বলল,” আমি যদি না আসি তাহলে কি তোমাদের চলবে কিং ফায়ার?”

কিং ফায়ার হুট করে জেসিকার হাত ধরে টেনে নিজের বুকের উপর ফেলে বলে,” চলবে কি জেসি? তোমাকে ছাড়া এই কিং ফায়ারের এক মুহূর্ত যে চলে না৷ ”

” রেইলি?”
” ইয়াপ বেইব৷ বাট ইউ নো না আরু মারু যতোদিন বেঁচে আছে ঠিক ততোদিন আমি ঠিক ভাবে না বাঁচতে পারবো আর না আমি আমার টিম লিড করতে পারবো৷”

” ডোন্ট ওয়ারি জান আমি আছি তো? আমি না হয় তোমার হয়ে টিম লিড করবো৷”

দরজার আড়ালে দাড়িয়ে হ্যারি তনু আর কিং ফায়ারের প্রত্যেকটা কথা শুনতে পেয়ে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে আড়াল থেকে সরে গেল৷

নিজের রুমে এসে হ্যারি বেডের বালিশ তোশক ছুড়ে ফেলে রুমের অবস্থা নাজেহাল করে ফেললো৷ তবুও রাগটা কমছে না হ্যারির৷ হ্যারি বেডের উপর বসে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলতে লাগলো,” জেসিকা টিম লিড করবে? কিং ফায়ারের জায়গা নিবে? হাহ্! যে পজিসনের জন্য আমি এতো বছর কিং ফায়ারের পায়ের নিচে পরে ছিলাম৷ আর সেই পজিসন কিছু না করে জেসিকা নিয়ে নিবে? নাহ এটা তো আমি হতে দিতে পারি না৷ এই সব কিছু আমার হবে৷ যদি কেউ কিং ফায়ারের জায়গা নিতে পারে সেটা একমাত্র আমি জেসিকা নয়৷ নাহ এবার আমাকে কিছু একটা করতেই হবে নাহলে জেসিকা কিং ফায়ারকে হাত করে সবার মাথায় ছুরি ঘুড়ানো বের করছি আমি যাস্ট ওয়েট জেসিকা৷ ”

হ্যারি ফ্লাটের টেলিফোন টা নিয়ে নিজের রুমে এসে কাউকে ফোন করে৷

(৬৩)

” স্যার সকালথেকে চরকির মতো ঘুড়ছি আদিল রাফির পেছনে কিন্তু কোন প্রকার ক্লু তো খুজে পাচ্ছি না৷”

মেঘ বা’হাতের দু’টো আঙ্গুল দিয়ে কপালে ঘষে কিছু একটা ভেবে আসলামকে বলে,” আসলাম অফিসে ফিরে এসো ৷ ওদের পেছনে আর ঘুড়তে হবে না৷ ”

” ওকে স্যার৷”

এদিকে গাড়ির ব্যাক মিররে আসলামের গাড়িটা ফিরে যেতে দেখে আদিল রাফি দু’জনে হেসে ওঠে বলে,” দেখলে ভাই আসলাম ব্যাটাকে নাকে দরি দিয়ে চরকির মতো ঘুড়িয়ে কিভাবে চোরের মত পালিয়ে যেতে হলো হা হা হা”

” রাফি সবটা কিন্তু ফারু আপুর প্লান ছিলো৷ আপু আমাদের মেসেজ করে সবটাই সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছে৷ মেঘ জিজু যে আমাদের পেছনে লোক লাগাবে এটা আপু আগেই বুঝতে পেরেছিলো বলে আমাদের সতর্ক করে দিয়ে ছিলো৷”

” একদম ভাই৷ ভাই দি’কে একটা মেসেজ করে জানিয়ে দে এদিকটা৷ আমি ততোক্ষণ ড্রাইভ করি৷”

” হুম তাই কর৷ আমি আপুকে ফোন করে সবটা জানিয়ে দিচ্ছি৷”

আদিল ফোন বের করে ফারহাকে কল করতে যাবে তৎক্ষনাৎ রাফি খুব জোরে গাড়ি ব্রেক কষে , আদিলের হাত থেকে ফোনটা নিচে পরে যায়৷ আদিল রাগি চোখে রাফির দিকে তাকাতে দেখে রাফি এক দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে৷ রাফির দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকিয়ে দেখে কতো গুলো লোক হাতে অস্র সস্র নিয়ে দাড়িয়ে আছে৷ আদিল চোখ বন্ধ করে দ্রুত রাফিকে বলল,” রাফি দ্রুত গাড়ি ঘুড়িয়ে নে৷ আর ফুলস্পিডে চালিয়ে এখান থেকে চল৷”

রাফি কোন কথা না বলে দ্রুত গাড়ি ঘুড়াতে নিলে দু’টো লোক এসে গাড়ির কাঁচ ভেঙে আদিল রাফির দিকে রিভালবার তাক করে যেই না শুট করতে যাবে তখনি দু’টো গুলি এসে লোক দুটোর বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়৷ মুহূর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে লোক দুটো৷ বাকি লোক গুলো মৃত লোক দুটোর কাছে এসে কাছে এসে সামনে তাকাতে দেখে হুডি পড়া মুখে মাক্স হাতে রিভালবার নিয়ে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে৷ লোক গুলো সামান্য ঘাবড়ে গিয়েও নিজেদের সামলে নিয়ে তার দিকে রিভালবার তাক করে শুট করতে যাবে তৎক্ষনাৎ কয়েক টা বুলেট এসে লোক গুলোর বুকে গেথে গেল৷

সামনে এতো গুলো মৃত্যু দেখে আদিল রাফি দুজনে হতবিহ্বল স্তম্ভিত কিংকতব্যবিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল৷

গাড়ির দরজা খোলার শব্দে দুই ভাইয়ের ধ্যান ভাঙে , আতঙ্কিত হয়ে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকিয়ে ফারহাকে দেখে দুজনে যেন কলিজায় পানি পেল৷ আদিল রাফি গাড়ি থেকে নেমে ফারহাকে জড়িয়ে ধরে৷ আচমকা এতো গুলো মৃত্যু দেখে যে আদিল রাফি কেউ স্বাভাবিক থাকবে না এটা ফারহা জানে৷ ভয় আতঙ্ক দুটোই দুই ভাইয়ের ভেতর বর্তমানে বিদ্যমান৷ ফারহা গাড়ির ভেতর থেকে পানির বোতল নিয়ে আদিলকে দিয়ে বলে,” তোরা ঠিক আছিস?”

” হ,,হ্যাঁ আপু আমরা ঠিক আছি৷ কিন্তু এরা কেন আমাদের মারতে চাইলো? আমরা কার কি ক্ষতি করেছি?”

” তোরা কারোর ক্ষতি করিস নি পিচ্চি ছোটু তবে তোরা যে আমার ভাই তাই তোদের এতো সমস্যার সম্মক্ষিণ হতে হচ্ছে৷ ”

” দি এরা কারা? ”

” ভাড়া করা গুন্ডা যারা টাকার বিনিময়ে মানুষ খুন করে৷”

” কিন্তু এরা কেন আমাদের মারতে চায়? আর তুই হঠাৎ এখানে কি করে …” বাকিটা বলার পূর্বে আদিল বলে ওঠে ,” রাফি এখানে আমাদের আর বেশিক্ষণ দাড়ানোটা ঠিক হবে না৷ আমাদের এখুনি যেতে হবে তাই না আপু?”

” হুম তোরা বাড়িতে ফিরে যা আমি কিছুক্ষণ পর আসছি৷”

” আসছি মানে? কোথায় যাচ্ছি তুই?”

” লাশ গুলোর ব্যবস্থা করতে হবে পিচ্চি৷ ”

” তাহলে একা কেন? আমরাও তোর সাথে আছি৷”

রাফি আদিল কেউ ফারহার কথা শুনলো না ৷ পাশে ঝোপঝাড়ে লাশ গুলোকে রেখে গাড়ি নিয়ে ফারহা আদিল রাফি বেড়িয়ে গেল৷

ফারহা গাড়ি ড্রাইভ করে বাড়ির রাস্তায় না নিয়ে উল্টো দিকে যেতে লাগলো৷ আদিল রাফি এই পথ চিনে বিধায় চুপ রইল৷

দুপুর ০১ঃ২০

কালো ওড়নার দিয়ে মুখ ঢেকে একটা মেয়েকে বিল্ডিং থেকে বের হতে দেখে ফারহা সহ আদিল রাফি লুকিয়ে পড়ে৷ মেয়েটি চলে যেতে ফারহা আদিল রাফি বিল্ডিংয়ে ঢুকে গেল৷

একটা রুমে নার্স তিনজন অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে৷ কিং ফায়ার হ্যারি লিও যে যার রুমে রেস্ট নিচ্ছে৷ ফারহার নির্দেশ মতো লিও এবং হ্যারির রুমের দরজা বাইরে থেকে লক করে দিলো৷

কিং ফায়ার নিজের বেডে হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে আছে৷ আদিল রাফি রিক্স না নিয়ে ক্লোরোফর্ম স্প্রে করে দিলো কিং ফায়ারের মুখে, গভীর নিদ্রায়মাণ হয়ে পড়লো কিং ফায়ার ৷

_______

একের পর এক ফোন কল করেও ফারহার সাথে যোগাযোগ করতে পারলো না মেঘ ৷ প্রচন্ড টেনশন হচ্ছে মেঘের উহু সেটা ফারহার জন্য নয় ৷ টেনশনটা হলো আজ যে বা যারা ফারহার শিকার হবে তাদের জন্য, ফারহা একজন কোল্ড মার্ডারার ৷ ফারহা সব সময় ঠান্ডা মাথায় প্রত্যেকটা পদক্ষেপ গ্রহন করে৷ তবে আজ মেঘের ভিষণ অস্থির অস্থির লাগছে আসলামের কাছ থেকে আদিল রাফি কান্ড গুলো শোনার পর, সব শুনে মেঘের মনে হলো আদিল রাফি ইচ্ছে করে আসলামকে ঘুরিয়েছে৷ নয়তো এতো ঘন্টা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতো না দুই ভাই৷

গোধূলির শেষ লগ্নে প্রকৃতির রুপ যেন আরো বৃদ্ধি পায়৷ সবুজ ঘণ বনের মধ্যে পাখির কিচিরমিচির শব্দে বণ মুখরিত ৷ বেশ বড় সর খালের সামনে দাড়িয়ে আছে ফারহা৷ ফারহার দৃষ্টি খালে থৈ থৈ করা পানির দিকে, মুখে নেই মাক্স না চোখে সানগ্লাস বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণ ভরে শ্বাস নিচ্ছে ফারহা৷ খালে ভরা পানিতে কিছুক্ষণ পর পর বড় বড় মাছ উকি ঝুকি মেরে গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে৷

রাফি আদিল অনেকক্ষণ যাবত ফারহাকে লক্ষ্য করছে৷ ঘন্টা দুয়েক ফারহা এভাবে দাড়িয়ে আছে কিন্তু কেন এটা দুজনের কেউ জানে না৷ হঠাৎ ফারহা আদিল রাফির উদ্দেশ্য বলে ওঠে,” পিচ্চি ছোটু তোরা নিশ্চিত তো এই খালে বিশাল আকৃতির মাংস খেকো মাছ আছে?”

” দি গত সপ্তাহে আমরা কয়েক জন বন্ধুরা মিলে এখানে এসেছিলাম পিকনিক করতে৷ তখন এক গাধা মানে আমার ফ্রেন্ড কত থেকে একটা ছাগল নিয়ে আসে ৷ বলল জবাই করে মাংস রান্না করবে৷ কিন্তু সমস্যা ছিলো আমরা কেউ জবাই করতে পারছিলাম না হাত কাপঁছিলো৷ তখন কিভাবে যেন ছাগল টা হাত থেকে ছুটে খালে লাফ দেয় ৷ ইউ কান্ট ইমাজিন দি দু মিনিটের মাথায় পুরো খালের পানি রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিলো৷ কিন্তু আমরা এটা শিওর ছিলাম না সেটা কোন প্রানী ছিলো মাছ নাকি অন্য কিছু? ”

” তাহলে এখন কি ভাবে শিওর হলি যে এখানে মাংস খেকো মাছ আছে?”

” তার দুই দিন পর আমরা এখানকার আশে পাশে খোজ নিয়ে জেনেছি৷ কোন এক বিজ্ঞানী রিসার্চ করার জন্য এই খালে সাগর থেকে তুলে আনা কয়েক প্রজাতির মাছ ছেড়ে দিয়ে ছিলো৷ দি সামনে খেয়াল করলে দেখতে পাবি এই খালের পরিধি অতি সিমিত ৷ এবং এখানে অন্য জলাশয় নদী পুকুরের পানি আসতে পারেনা৷ ”

ফারহা ভালো করে দেখে সত্যি তাই৷ ফারহা খালে ইটের একটা টুকরো ফেলে রহস্যময় হাসি দিলো৷

(৬৪)

চোখে মুখে পানির ছিটে পড়তে টিপ টিপ করে চোখের পাতা মেলে কিং ফায়ার সামনে দাড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে ভয় পেয়ে চমকে উঠলো৷ সেই তীক্ষ্ম চোখ সেই মুখের বাঁকা হাসি আর চোখে মুখে হিংস্রতা৷ কিং ফায়ার কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো,
.
.
.
#চলবে…………

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here