না_চাইলেও_তুই_আমার পর্ব ১১+১২রোমান্টিক গল্প

#না_চাইলেও_তুই_আমার
[ সিজান ৩ ]
#লেখিকা_সারজীন_ইসলাম
#পর্ব- ১১
—-” আপু তুমি মানুষ কিনা তা নিয়ে আমার এখন সংশয় আছে! না হলে তুমি জিজু কে প্রপোজ না করে তার মাকে প্রপোজ করতে পারতে না। এখন তারা নিশ্চয়ই তোমাকে পাগল ভাবছো তাইনা? আর ভাববে নাইবা কেন? যে এমন ধরার কাজ করতে পারে তাকে পাগল ছাড়া আর কিছু ভাবার কথাও তো নয়!”

এইটুকু বলে নিঃশ্বাস নেয় তুলি। তোহা কানে ফোন নিয়ে বাঁ হাতের নখ ঘসতে ঘসতে বলল,

—-” ধুর পাগল কেন ভাববে আমায়? ইভেন মাম্মা আর পাপা তো আমাকে তাদের ছেলের বউ হিসেবে মেনেও নিয়েছে।”

তুলি আবার গলায় বলল,

—-” বলো কী? এত সব কাণ্ড করে তারা তোমাকে মেনেও নিয়েছে? আমি এবার হান্ডেট পার্সেন্ট সিওর তোমার মত তোমার শ্বশুর শাশুড়ি ও পাগল হয়ে গেছে।”

তোহা মৃদু গলায় বলল,

—-” তোর মাথা। এখন ফোন রাখ বকবক করে তো মাথা আমার খারাপ করে দিবি।”

তুলি অভিমানী গলায় বলল,

—-” হ্যাঁ! হ্যাঁ! এখনতো আর আমার কথা ভালো লাগবেই না। শ্বশুরবাড়ি তো পেয়েই গেছো।”

তোহা মৃদু হেসে বলল,

—-” হয়েছে আপনাকে আর ড্রামা করতে হবে না! ড্রামা কুইন কোথাকার!”

তোহার কথা শুনে তুলি খিলখিলিয়ে হেসে বলল,

—-” ঠিক আছে আপু, এখন ফোন রাখছি পরে কথা বলবো।

তোহা মৃদু হেসে বলল,

—-” আচ্ছা, ঠিক আছে।”

তুলি ফোন রেখে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে ভাবে, এবার বুঝি ওর বোন টা খুশির ছোঁয়া পাবে। ওকে আগলে রাখার জন্য কেউ থাকবে। এসব ভাবতে ভাবতে তুলি ওর আম্মুর রুমের দিকে যায়। তুলির আম্মুর রুমে ঢোকার আগে তুলি গলা ছেড়ে বলল,

—-” আম্মু! আম্মু! কোথায় তুমি?”

স্নেহা রুমের ভিতর থেকে সাড়া দিয়ে বলল,

—-” এইতো আমি রুমে কেন কী হয়েছে?”

তুলি রুমে ঢুকে সোজা গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে বলল,

—-” হওয়ার আর কী বাকি আছে? তোমার বড় মেয়ের খবর তুমি কিছু রাখো?”

স্নেহা চোখ ছোট ছোট করে বলল,

—-” খবর না রাখার কী আছে ও তো কনসার্টের জন্য শহরের বাইরে আছে।”

তুলি ঠোঁট চেপে বলল,

—-” তুমি সেই আশাতেই বসে থাকো। তোমার বড় মেয়ে এখন তার শ্বশুর বাড়িতে আছে।”

তুলির কথা শুনে স্নেহা হতবাক হয়ে যায়। চোখ বড় বড় করে তুলির দিকে তাকিয়ে বিস্ময় গলায় বলল,

—-” কী বললি ওর শ্বশুর বাড়িতে আছে মানে? ওর তো গানের অনুষ্ঠানের জন্য টাঙ্গাইলে যাবার কথা ছিল।”

তুলি ঠোঁট বাঁকা করে বলল,

—-” আমার কথার মানে বুঝবে কী করে? তোমার মেয়ে কখনো কারো কাছে ওর মনের কথা বলেছে যে তুমি বুঝবে? সে যাই হোক তোমাকে আমি প্রথম থেকে বলি তাহলে তুমি সবটা বুঝতে পারবে। আপুর একটা ছেলেকে দেখে তার ভালো লেগে যায়, বলতে পারো একতরফা ভালোবেসে ফেলেছিলো। পরে একটু একটু করে ছেলেটার খোঁজ নিতে শুরু। হঠাৎ করে জুঁই আপুর বিয়েতে কাকতালীয়ভাবে তার সাথে দেখা হয়ে যায়। সেই ছেলেটার বোনের সাথে আপুর খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে সেই ছেলেটা যখন চলে যায় আপু সেইদিন মন খারাপ করে বাড়ি চলে আসে। সেদিন তো তুমি দেখেছো আপু সারাদিন মন খারাপ করেন বাড়িতেই ছিল। কনসার্ট এর জন্য যখন টাঙ্গাইলে যায় তখন আবারো কাকতালীয়ভাবে সেই ছেলেটার বোনের সাথে এবং ওদের কাজিনদের সাথে দেখা হয়ে যায়। আপু এত রাতে একা বাড়ি ফিরবে কী করে তা ভেবে সেই ছেলেটার বোন ওকে জোর করে ওদের বাড়িতে নিয়ে যায়। আজ সকাল সকাল আপু তার মনের কথা সেই ছেলেটার মা মানে আপুর শাশুড়িকে বলে দিয়েছে। সব শুনে ছেলেটার বাবা-মা দু’জনেই আপুকে তাদের ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিয়েছে।”

কথা শেষ করে তুলি ওর আম্মুর দিকে তাকায়। উনি সোফায় বসে বিস্ময় চোখে তুলির দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছেন। সব শুনে তিনি ধীর গলায় বলল,

—-” এতো কিছু হয়ে গেলো অথচ আমি এসবের কিছুই জানি না।”

তুলি বিছানা থেকে উঠে এসে ওর আম্মুর পাশে বসে তার এক হাত জড়িয়ে ধরে বলল,

—-” আমিও কিছু জানতাম নাকি? সেদিন ছাদে বসে আপুর মন খারাপ দেখে আমি তাকে চেপে ধরি। তারপরে সে এই টুকুই বলে।”

স্নেহা চিন্তিত হয়ে বলল,

—-” আচ্ছা ছেলেটা রাজী হবে তো?”

তুলি ওর মাকে আশ্বাস দিয়ে বলল,

—-” ধুর, তুমি কী যে বলো না! আমার বোন হল লাখে একটা। তাকে মেনে নেবে না তো আর কাকে মেনে নেবে?”

তুলির কথা শুনে স্নেহা মৃদু হেসে বলল,

—-” সবই তো বুঝলাম, কিন্তু ছেলে কী করে?

তুলি দুষ্টুমি করে বলল,

—-” মানুষের হৃদয় নিয়ে কাজ করে।”

স্নেহা তুলির কথার অন্য মানে বুঝতে পেরে বলল,

—-” শেষমেষ তোহা একটা প্লেবয় ছেলেকে পছন্দ করলো? না না এ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারবোনা। আমি….

স্নেহার কথা শেষ করার আগেই তুলি তাকে থামিয়ে দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে বলল,

—-” আমি কী একবারও বলেছি আমার জিজু প্লেবয়? বলেছি যে আমার জিজু মানুষের হৃদয় নিয়ে কাজ করে। এর মানে হলো সে একজন কার্ডিওলজিস্ট। আপুর কাছে শুনেছি সে দেশের একজন নামকরা কার্ডিওলজিস্ট।”

স্নেহা রেগে তুলির দিকে তেড়ে গিয়ে বলল,

—-” তোর এই ফালতু কথার জন্য আর একটুর জন্য আমি ছেলেটাকে ভুল বুঝিনি।”

তুলি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেয়ে হাসতে হাসতে বলল,

—-” তুমি তো আমার কথার অন্য মানে বের করলে। আমি কী একবারের জন্য ওই কথা বলেছিলাম? বলিনি তো, তাহলে? যাইহোক আমি গেলাম ওদিকে আমার কার্টুন দেখার সময় হয়ে গেছে।”

এইটুকু বলে তুলি দৌড়ে ওখান থেকে চলে যায়। আর স্নেহা একা একা বিড় বিড় করে বলল,

—-” এই দুই মেয়ের যন্ত্রণায় নির্ঘাত আমি পাগল হয়ে যাবো।”

______________________________

হাসি ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে বেশ ভালই দিন কাটছে তোহার। তোহা আর মিরানের ব্যাপারটা বাড়ির বিশেষ কেউ জানে না। তবে এই ব্যাপারটা জানার লিস্টে প্রথমেই নাম রয়েছে অনন্যা আর টিয়ার। অনন্যা তো ব্যাপক খুশি তোহা কে ভাবি হিসেবে পাবে বলে। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে অনন্যা তোহার রুমে আসে। তোহা তখন সবে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে, অনন্যা কে ওর রুমে ঢুকতে দেখে তোহা উঠে বসে বলল,

—-” আরে মিরু কিছু বলবে আমায়?”

অনন্যা মাথা দুলিয়ে বলল,

—-” হ্যাঁ আপু থুক্কু ভাবি।”

তোহা কথা শুনে হাসতে হাসতে দিয়ে বলল,

—-” হয়েছে হয়েছে তোমাকে আর আপু আর ভাবি নিয়ে যুদ্ধ করতে হবে না। এখন কী বলতে এসেছো তাই বলো!”

অনন্যা মৃদু হেসে বলল,

—-” তোমাকে বলেছিলাম না আমরা সব কাজিনরা একসাথে পুকুর থেকে মাছ ধরি। এমনকি ভাইয়াও এতে আমাদের সঙ্গ দেয়। এখন পুকুরে পাম্প লাগানো হচ্ছে মাছ ধরার জন্য, দেখবে চলো।”

তোহা বিছানা থেকে উঠে বলল,

—-” চলো যাই, আমিও কখনো এসব সামনে থেকে দেখিনি।”

অনন্যা তোহার হাত ধরে বলল,

—-” চলো তাহলে।”

তোহা অনন্যার সাথে পুকুর পাড়ে এসে দেখে, অনন্যার সব কাজিনরা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তোহা কে দেখে সবাই ওর কাছে আসে। পরে ওখানে সবাই গোল হয়ে বসে গল্প করতে শুরু করে দেয়। গল্প করতে করতে কখন যে বিকেল হয়ে গেছে সেদিকে খেয়াল নেই কারো। তোহা অনন্যা কে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে উঠে যায় ওখান থেকে। তোহা নিজ মনে হিসেব করতে করতে রুমের দিকে যায়। রুমের দরজা খুলে চোখ বড় বড় করে তাকায় তোহা। এমন অপ্রীতিকর ঘটনা সম্মুখীন তোহা কখনো হয়েছে বলে মনে পড়ছে না ওর। তোহার দিকে তাকিয়ে কেউ মৃদু চিৎকার দিয়ে বলল,

—-” আ… আপনি? আপনি এখানে কী করছেন?”

মিরান বাড়ি ফিরে হলরুমে কাউকে না দেখে সোজা নিজের রুমে চলে আসে। শাওয়ার নিয়ে ট্রাউজার পড়ে খালি গায়ে মিররের সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে ছিলো। তখন মিররে কোন মেয়ের প্রতি ছবি দেখে মিরান পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে তোহা দাঁড়িয়ে আছে। পরে মিরান থতমত খেয়ে তোহার দিকে তাকিয়ে ঐ কথাটা বলল। তোহা মিরানের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে শুকনো গলায় ঢোক গিলে মিরানের দিকে এগিয়ে যায়।
#না_চাইলেও_তুই_আমার
[ সিজান ৩ ]
#লেখিকা_সারজীন_ইসলাম
#পর্ব- ১২
কিছুক্ষণ আগে কথা ভাবলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে মিরানের। কী সাংঘাতিক মেয়ে ভাবা যায়? ধুম করে একটা ছেলের রুমে ঢুকে যায় এমন একটা মেয়ে এই দেশে আছে কিনা তা নিয়ে মিরানের মনে এখন বেশ সংশয় আছে। রুমে ঢুকেছে সেটাও ভালো কথা কিন্তু অমন উদ্ভট আচরণ করার মানে কী? মেয়েটার মনে হয় লজ্জা শরম বলতে কিছু নেই। না হলে…. থাক থাক আর ভাবতে পারছে না মিরান। মিরান এসব ভাবতে শুরু করলে কেমন লজ্জা লজ্জা ভাব এসে যায় ওর মধ্যে। নতুন এক অনুভুতির শিকার হয়েছে মিরান। না অতিরিক্ত ভালো লাগা না অতিরিক্ত খারাপ লাগা। দুই দিক দিয়েই সমতল অনুভূতি রয়েছে। এই অনুভূতি কী নাম দেবে ও? মিরান এসব ভাবতে ভাবতে ওর মাম্মার রুমের দিকে যায়। মিরা রুম থেকে বেরিয়ে দরজার সামনে মিরান কে দেখে চমকে যায়। বেশি চমকায় মিরান কে এমন খালি গায়ে তোয়ালে জড়ানো অবস্থায় দেখে। মিরা ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

—-” কী রে কখন এলি বাড়িতে? আর এই ভাবেই বা ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন?”

মিরান ওর মাম্মার কথায় ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে হতাশ গলায় বলল,

—-” বাড়ি এসেছি অনেকক্ষণ। এই ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি কী আর সাধে। তুমি আমার রুমে কাকে থাকতে দিয়েছো?”

মিরা মিরানের কথা শুনে চিন্তায় পড়ে যায়। তাহলে কী মিরান কোনভাবে তোহার সম্পর্কে জানতে পেরেছে? মিরা মিরানের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

—-” তোহা, তোহাকে বলেছি। কিন্তু কী হয়েছে?”

মিরান কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,

—-” কী হয়েছে? আমাকে আবার রুম থেকে বের করে দিয়েছে আর তুমি বলছো কী হয়েছে?”

মিরানের কথা শুনে মিরা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়। যাক এই বিষয়ে এখনো কিছু জানতে পারেনি মিরান। পরক্ষণে মিরানের বলো শেষ কথাটা শুনে মিরা হাসি আটকাতে পারে না। মিরা তোহার কথা বলার ধরন দেখেই বুঝে গেছিল ও খুব অঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে। কিন্তু এতটা যে চঞ্চল হবে এটা মিরা ভাবতে পারিনি। শেষমেষ তার ছেলেকে তার রুম থেকে বের করে দিয়েছে। তোহার চঞ্চলতার মধ্যে তরুণী মিরা কে খুঁজে পায় মিরা। মিরানের কথা শুনে মিরা ঠোঁট চেপে হেসে দেয়। মিরা হাসি আটকে মিরানের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল,

—-” এই মেয়ের এত সাহস হয় কী করে আমার ছেলেকে তার রুম থেকে বের করে দেওয়ার।”

মিরার কথা শুনে মিরান মনে মনে ছক করতে শুরু করে, মাম্মা কে দিয়ে আজ এই মেয়েটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে। বলে কী না আমার রুম থেকেই আমাকে বেরিয়ে যেতে। মগের মুল্লুক নাকী? মিরান ওর মাম্মার দিকে তাকিয়ে আহ্লাদী গলায় বলল,

—-” মাম্মা তুমি চলো। তুমি গিয়ে মেয়েটাকে কিছু বলবে। আর আমি কতক্ষণই বা এই শীতের মধ্যে গায়ে একটা তোয়ালে জড়িয়ে থাকবো?”

মিরা মৃদু হেসে বলল,

—-” আচ্ছা চল আমি দেখছি।”

তোহা একটু একটু করে মিরানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তোহা মিরানের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে তাড়াতাড়ি করে তোয়ালেটা মিরান ওর গায়ে জড়িয়ে নেয়। মিরান তোহার দিকে তাকিয়ে ভীতু স্বরে বলল,

—-” আপনি এই ভাবে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন কেন?”

মিরানের কথার শব্দে তোহার ঘোর কাটে। তোহা মিরানের দিকে এক নজর তাঁকিয়ে দেখে ও মিরানের অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে। কখন যে এতটা কাছে চলে এসেছে তা তোহা খেয়াল করেনি। আবার মিরানকে এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে তার ভাল লাগার শেষ নেই। তোহা আরো দু’কদম মিরানের দিকে এগিয়ে গিয়ে তোয়ালের ওপর দিয়ে ওর বুকে হাত রেখে বলল,

—-” আমি তোমার কাছে আসবো না তো আর কে তোমার কাছে আসবে?”

তোহার কথা শুনে মিরান ছিটকে দু’কদম পিছিয়ে যায়। তোয়ালেটা আরো ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়ে উচ্চকিত হয়ে বলল,

—-” মা… মানে কী বলছেন এসব আপনি?”

তোহা মিরানের এমন ভয় জড়িত চেহারা দেখে বেশ মজা পায়। তোহা মিরানের সঙ্গে আরেকটু মজা করবে ভেবে ওর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

—-” ওমা তুমি বুঝতে পারছ না আমি কী বলছি? আর যদি তুমি না বুঝেই থাকো চাইলে আমি তোমাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিতে পারি।”

এই বলে তোহা মিরান কে চোখ টিপ দিয়। এসব দেখে মিরান চোখ বড় বড় করে তোহার দিকে তাকায়। না না মেয়ে ভালো কথা শোনার মেয়ে নয়। কিছু একটা করে একে এখান থেকে তাড়াতে হবে। মিরান মৃদু চিৎকার করে বলল,

—-” কিসব পাগলের মত আবোলতাবোল কথা বলে যাচ্ছেন। না আমি কিছু বুঝতে পারছিনা আর না আমি কিছু বুঝতে চাচ্ছি। আপনি প্লিজ এখন আমার রুম থেকে চলে যান।”

তোহা মিরানের কথা কানে না তুলে ওর কাছে গিয়ে এক হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে অন্য হাত গালে রেখে এক আঙ্গুল দিয়ে গালে স্লাইড করতে করতে স্লো ভয়েসে বলল,

—-” কেন আমি এখানে থাকলে কী খুব অসুবিধা হবে?”

মিরান তোহাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রাগ দেখিয়ে উচ্চকিত হয়ে বলল,

—-” আপনি কিন্তু এখন আপনার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন! আমি আপনার সাহস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। আর কিছু ঘটনা আগে আপনি প্লিজ আমার চোখের সামনে থেকে চলে যায়।”

তোহা মিরান কে আরেকটু জব্দ করার জন্য বলল,

—-” ও হ্যালো আমি কোথায় বেরিয়ে যাবো? আপনি বেরিয়ে যান এখান থেকে। মিরা আন্টি নিজে আমাকে এই রুমে থাকতে বলেছে। সুতরাং আপনি এখন এখান থেকে মানে মানে কেটে পড়ুন।”

মিরান ওর মাম্মার কথা শুনে চুপ হয়ে যায়। মিরান কখনো ওর মাম্মার সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলেনি।কিন্তু এই অবস্থায় তো আর রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়া যায় না। তার ওপর আবার হাড় কাঁপানো শীত। মিরান তোহার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে বলল,

—-” আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিন। আমি টি-শার্ট টা চেঞ্জ করে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি।”

তোহা কঠোর চোখে তাকিয়ে রাগী কন্ঠের অভিনয় করে বলল,

—-” না না তা হচ্ছে না আমি আপনাকে এক সেকেন্ডের জন্যও সময় দিতে পারবো না। আপনি এখন আসুন।”

মিরান আবারো করুন চোখে তোহার দিকে তাকায় কিন্তু তোহা বুকে হাত গুজে অন্যদিকে ফিরে তাকিয়ে আছে। মিরান আর সময় নষ্ট না করে রুম থেকে চলে যায়। মিরান চলে গেলে তোহা দরজা বন্ধ খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করে।

দরজায় নক করার শব্দ তোহা রোমাঞ্চকর ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসেছেন তোহা দরজা খুলে দেয়। মিরান আর ওর মাম্মা কে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তোহা দরজার সামনে থেকে সরে যায়। মিরা তোহার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

—-” তুমি আমার ছেলেকে কী বলেছো তোহা?”

তোহা মিরার থেকে চোখ সরিয়ে মিরানের দিকে তাকায়। মিরার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। নিশ্চয়ই ছোট বাচ্চাদের মত ওর মাম্মার কাছে নালিশ করেছে তোহার নামে! সাথে আবার মাম্মা কে নিয়ে এসেছে ওকে বকা খাওয়ানোর জন্য। এসব ভেবে না চাইতে হাসতে শুরু করে। তোহা ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বলল,

—-” আমি আবার কখন ওনাকে কী বললাম?”

মিরান এই মেয়ের চালাকি দেখে অবাক হয়ে যায়। এখন আবার ওর মাম্মার সামনে ভালো সাজা হচ্ছে। মিরান এগিয়ে এসে তীব্র কন্ঠে বলল,

—-” এখন মনে পড়ছে না একটু আগের ঘটে যাওয়া ঘটনা? আপনি তো আমার সাথে….

হঠাৎ করে মিরান থেমে যায়। মিরান ওর মাম্মার দিকে তাকায়। তিনি মিরানের কথা শোনার জন্য ওর দিকে তাকিয়ে আছে। এক্ষুনি কী বলে ফেলছিলাম মিরান। এসব ওর মাম্মা জানতে পারলে মাম্মা সামনের লজ্জার আর শেষ থাকবে না। একটা মেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল তা কিভাবে ওর মাম্মার সামনে বলবে মিরান! তোহা দুষ্টুমি হেসে বলল,

—-” কী হলো বলুন না, আমি আপনার সাথে কী?”

মিরান তোহার দুষ্টমিতে দমে না গিয়ে আবারো তীব্র কন্ঠ ধারণ করে বলল,

—-” না কিছুনা।”

মিরা তোহার দুষ্টুমি বুঝতে পেরে তোহার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

—-” তোহা তুমি আমার সাথে এসো তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। আর মিরান তুই চেঞ্জ করে নিয়ে রেস্ট নে আমি তোর খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি উপরে।”

মিরান ওর মাম্মার কথা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। মাথা দুলিয়ে ওর মাম্মার কথার সম্মতি জানিয়ে টি-শার্ট নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে যায়। মিরা কোমরে এক হাত দিয়ে তোহার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,

—-” ছেলেটা আসতে না আসতেই ওর পিছনে লাগতে শুরু করে দিলি তুইও মিরুর মত?”

তোহা ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,

—-” ধুর আমি কেন তোমার ছেলের পিছনে লাগতে যাবো? দেখলেনা তোমার ছেলে কেমন বাচ্চাদের মত আমার নামে তোমার কাছে নালিশ করেছে! এখন কে বলবে কে কার পিছনে লেগেছে?”

মিরা কোমর থেকে হাত সরিয়ে তোহার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বলল,

—-” থাক আপনাকে আর বিচার করতে হবে না। কে কেমন দুষ্টু তা আমার ভালো করে জানা আছে। এখন আপনি আমার সঙ্গে নিচে চলুন।”

তোহা মিরার কথা শুনে ঠোঁটের হাসি আরো প্রসারিত করে মিরার সঙ্গে নিচে যায়।

______________________________

টিয়া সবার চোখের আড়ালে বাড়ির পূর্ব দিকের বাগানে চলে এসেছে। এখানে এসেছে পর থেকে রাসেল ওকে এভোয়েড করে যাচ্ছে। দেখেও না দেখার ভান করে অন্যদিকে চলে যায়। টিয়া নামের কাউকে যে সে চিনে তাই যেন সে ভুলে গেছে। সময় নেই অসময় নেই মিমির সঙ্গে কথা বলা, সুযোগ পেলেই মিমি কে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে যাওয়া। দু’দিনে রাসেলের দেওয়া সব কষ্ট বুকের মধ্যে চেপে রেখেছিল টিয়া। কিন্তু আজ আর সহ্য করতে পারছে না টিয়া। পুকুরপাড়ে আসবে বলে টিয়া বের হয়েছিল। সদর দরজা থেকে বের হতে না হতেই রাসেল আর মিমির অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলে টিয়া। নিজের অজান্তেই ফোটা ফোটা অশ্রু ঝরতে শুরু করে চোখ দিয়ে। রাসেল টিয়াকে দেখে তাড়াতাড়ি করে মিমিকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। টিয়া আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে মুখে হাত দিয়ে কান্না আটকে ওখান থেকে চলে আসে। পিছন থেকে রাসেল কয়েকবার ডাকে কিন্তু টিয়া আর সাড়া দেয়নি। এইসব ভেবে টিয়ার বুকের যন্ত্রণাটা আরো তীব্র হতে শুরু করে। বড় একটা গাছের শিকড়ের উপর বসে মুখ চেপে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করছে টিয়া। টিয়া তো ভালোবেসেছিল রাসেলকে। আর রাসেলের আচরণ বলে দিতো রাসেলও টিয়াকে ভালোবাসে। তাহলে কী টিয়ার বোঝায় কোথাও ভুল ছিল? রাসেল ওকে ভালোবাসি নি? যা কিছু ছিল সবই আবেগ? না না আর কিছু ভাবতে পারছেনা টিয়া। কান্না থামাবার জন্য বারবার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে টিয়া। কিন্তু বারবার ওই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠে কান্না আরো বাড়তে থাকে।

দূর থেকে কেউ টিয়া টিয়া ডাকতে ডাকতে এদিকেই আসছে। কণ্ঠস্বর বলে দিচ্ছে এটা মিরু। টিয়া তাড়াতাড়ি করে চোখ মুছতে শুরু করে। মিরু যদি একবার তার চোখে পানি দেখে তাহলে অনর্থ লাগিয়ে দেবে। ছোটবেলা থেকেই টিয়া এটা খুব ভাল করেই জানে। ছোটবেলায় একবার খেলার সময় অন্য পাড়ার একটা ছেলে টিয়া চুল টেনে দিয়েছিলো, টিয়া তো ব্যথা পেয়ে কেঁদে ফেলেছিলো। আর মিরু রেগে মেগে ছেলেটির হাতে কামড়ে রক্ত বের করে দিয়েছিলো। এসব ভাবতে ভাবতে টিয়া চোখের পানি মুছে ফেলে। কণ্ঠস্বর একটু একটু কাছে থেকে শোনা যাচ্ছে দেখে টিয়া বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। বাড়ির পথে পা বাড়াবে আগেই মিরু তার সামনে দাঁড়িয়ে কোমরের দুই হাত রেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,

—-” তুই এখানে কী করছিস? আর আমি তোকে বাড়িতে আসপাশের সব জায়গায় খুঁজে ফেলেছি।”

টিয়া অনন্যা কে বুঝতে না দিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,

—-” কী আর করবো প্রকৃতি দেখতে এসেছিলাম।”

টিয়ার কথা শুনে অনন্যা টিয়ার দিকে তাকায়। চোখ মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে কান্না করছিল টিয়া। অনন্যা এগিয়ে গিয়ে টিয়ার গালে হাত দিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

—-” এই টিয়ু কী হয়েছে তোর? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে তুই অনেকক্ষণ ধরে কান্না করেছিস! বল না কী হয়েছে তোর। কেউ কিছু বলেছে তোকে? একবার তার নামটা বল দেখ আমি তার কী ব্যবস্থা করি!”

টিয়া আর নিজেকে সামলাতে না পেরে অনন্যার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে।

চলবে…..

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো। গঠনমূলক মন্তব্য করলে লেখা উৎসাহ আসে।
#চলবে…..

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো। গঠনমূলক মন্তব্য করলে লেখা উৎসাহ আসে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here