নিশির অন্তিম প্রহরে পর্ব -০২

#নিশির_অন্তিম_প্রহরে
#পর্বঃ০২
#লেখিকাঃঅনন্যা_অসমি

ঘুম ঘুম চোখে দরজা খোলার পরেই বাইরে এনাক্ষীকে দেখে চমকে গেলো কায়ান। কয়েকবার চোখ খোলা-বন্ধ করলো সে কিন্তু না সে ঠিকই দেখছে। পড়তে তার লং কোট, হাঁটু সমান কুর্তি, গলায় লাল রঙের মাফলার পেঁ’চানো।

” এভাবে দেখোনা চোখ খু’লে পড়ে যাবে। আজ বুঝি আর ভেতরে ঢুকতে দেবে না?” একটা ছোট বানেনা মিল্ক এবং একটা প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বললো এনাক্ষী।

” তুমি এই সময়! আবার কোন সম’স্যা হলো নাকি?”

” সম’স্যা ছাড়া বুঝি আমি আসতে পারিনা?” মুখ গোমড়া করে বললো এনাক্ষী।

” না আমি তা বলিনি কিন্তু এতোদিন পর তুমি যে আবার আসবে তাও এই শীতের মধ্যে আমি আশা করিনি।”

” তোমার চাদরটা আমার কাছে ছিলো সেটাই ফেরত দিতে এলাম আর বানেনা মিল্কটা উপহার হিসেবে।”

” সত্যি?” সন্দেহ মিশ্রিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো কায়ান।

” না মোটেও সত্যি নয়।” মিষ্টি হেসে জবাব দিলো এনাক্ষী। হালকা হেসে কায়ান জিনিসগুলো নিয়ে দরজার কাছ থেকে সরে দাঁড়ালো। জায়গা পেতেই এনাক্ষী লাফিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো। মুখ হাত ধুয়ে কফি বানিয়ে ড্রইংরুমের টেবিলে রাখলো কায়ান কিন্তু কোথাও এনাক্ষীকে দেখতে পেলোনা সে।

” এনাক্ষী।”

” আমি বারান্দায়।”

বারান্দায় এসে কায়ান দেখতে পেলো এনাক্ষী তার বিড়ালের সাথে খেলছে।

” আমি পুরো একটা রাত তোমার বাড়িতে থাকলাম কিন্তু তোমার যে একটা বিড়ালও আছে আগে তো জানতাম না। আমার থেকে লুকিয়ে রেখেছিলে বুঝি?”

” কারণ সেসময় টামি নিচে আমার প্রতিবেশীদের কাছে ছিলো। আমি অফিসে যাওয়ার সময় তাদের কাছে টামিকে রেখে যায়৷ হা-রিন টামিকে খুবই পছন্দ করে।”

” তোমার বিড়ালটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমি যদি এটা নিয়ে যাই তুমি কি রা’গ করবে কায়ান সাহেব?”

এনাক্ষীর কথা শুনে কায়ানের কপাল কুঁচকে গেলো। মনে মনে সে বলছে,

” কি ডা’কাত মেয়েটা! হুট করেই এসে বলে বসলো আমার পেটকে নিয়ে যাবে। কি সাংঘাতিক মেয়ে!”

” নিশ্চয়ই ভাবছো দেবে না। কিন্তু তুমি না দিলেও আমি এসে চু’রি করে নিয়ে যাবো। টামি তুমি যাবে তো আমার সাথে?”

বিড়ালটা কিছুই বুঝতে না পেরে বড় বড় চোখ করে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ আদর করে টামিকে ছেড়ে দিলো এনাক্ষী।

” ভয় পেও না কায়ান সাহেব, তোমার পেট কে আমি নেবো না। তবে হ্যাঁ ইচ্ছে হলে কিন্তু আমি তাকে দেখতে চলে আসবো।”

” চলো কফি বানিয়েছি, এখন না খেলে ঠান্ডা হয়ে যাবে তখন খেতে বা’জে লাগবে।”

কিছুটা দূরত্ব রেখে দু’টো সোফায় বসে আছে কায়ান এবং এনাক্ষী, দু’জনের হাতে কফির মগ। নিরবতা ভেঙে কায়ান বললো,

” সাবধানে বাড়ি যেতে পেরেছিলে?”

” তুমিই তো সকাল বেলা পৌঁছে দিয়ে এসেছিলে, তাহলে আবার জিজ্ঞেস করছো যে।”

” তোমাদের বাড়ি আর আমার বাড়ি তো বিপরীত দিকে তাহলে আজ এদিকে আবার কি মনে করে এলে?”

” আচ্ছা কায়ান সাহেব আমি যদি সবসময় তোমার চোখের সামনে থাকি মানে একেবারে তোমার আশেপাশে তাহলে কি তোমার খুব অসুবিধে হবে?”

এনাক্ষীর কথার অর্থ কায়ান কিছুই বুঝতে পারলোনা, ভ্রু জোড়া উঁচু হয়ে গেলো তার।

” আমি না তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারিনি।”

” আমি তোমার পাশের ঘরটা ভাড়া নিয়েছি।”

এনাক্ষীর কথা শুনে কায়ানের মুখ গিয়ে আপনাআপনি বেরিয়ে যায়, ” কি! তুমি তাও আমার পাশের বাড়িটাতে।”

” এভাবে কি দেখছো?”

” তুমি আচমকা বাসা পরিবর্তন করলে যে? তুমি যে এখানে ভাড়া নেবে তাতো আমাকে আগে বলোনি।”

” আমার রুমমেইট ইন জু অন্য জায়গায় শিফট হয়ে গিয়েছে আর ঘরটা ভাড়া অনেক বেশি। সেইদিন আমি এ কারণেই বের হয়েছিলাম। তোমার পাশের ঘরটার ভাড়া কম আর সেইসাথে আমি এখানে তেমন কাউকে চিনিনা। সব চিন্তা করে এখানেই চলে এলাম।”

” ও আচ্ছা।”

এনাক্ষী আর কিছু বলবে তার আগেই তার ফোন বেজে উঠলো। ফোন কেটে দিয়ে সে উঠে দাঁড়ালো।

” আমার আসবাবপত্রগুলো চলে এসেছে, আমি যাই। কফির জন্য ধন্যবাদ।”

এনাক্ষী দরজা খুলবে তখন কায়ান পেছন থেকে আস্তে করে বললো,

” তুমি একা সব পারবে? আমি কি কিছুটা সাহায্য করবো?”

পেছন ফিরে তাকালো এনাক্ষী। কায়ান কথাটা বলে অনেকটা হেজিটেশন ফিল করছে তবে সে অপেক্ষা করছে এনাক্ষীর উওর কি হবে তা জানার জন্য।

এতোক্ষণ কাজ করে হাঁ’পিয়ে গিয়েছে দু’জনে। এনাক্ষী ধপ করে মাঝারি সাইজের ডাবল সোফায় বসে পড়লো। মাথাটা পেছনের দিকে এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ক্লান্তিভরা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললো,

” এতো ভারী কেন জিনিসগুলো? কাজ শেষ হলে আমি এক সপ্তাহ আর বিছানা থেকে উঠবোনা।”

আচমকা নিজের কপালে হাতে স্পর্শ পেয়ে ধরফরিয়ে চোখ খুলে ফেললো সে। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে কায়ান। আলতো হাতে কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে। নিজের কাজ শেষ করে নিঃশব্দে সরে এলো কায়ান তবে এনাক্ষী এখনো কায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে।

” কপালে ধুলো লেগে ছিলো তাই মুছে দিলাম। এক গ্লাস পানি হবে?”

এনাক্ষী দ্রুত হ্যাঁ বোধক মাথা নেড়ে একটা পানির বোতল এনে দিলো কায়ানকে।

” সব গুছানো শেষ?”

” হুম মোটামুটি সব শেষ। ধন্যবাদ তোমাকে, তুমি সাহায্য না করলে যে আমি কি করতাম ঈশ্বর জানেন।”

উঠে দাঁড়ালো কায়ান। মুচকি হেসে বললো, ” তাহলে এবার আমি আসি, সাবধানে থেকো। অপরিচিত জায়গা, তারউপর বলা যায় কি হয়ে যায়।”

কায়ান চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবো তখন এনাক্ষী আগ্রহ নিয়ে বললো,

” আমরা কি বন্ধু হতে পারি?”

চোখ ঘুরিয়ে এনাক্ষীর দিকে তাকালো কায়ান। মেয়েটার চোখে মুখে বন্ধু হওয়ার আগ্রহটা কায়ান স্পষ্ট বুঝতে পারছে। তবে সে কিছু বললোনা। দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালো। কায়ানের উওর না পেয়ে এনাক্ষীর মন খা’রাপ হয়ে গেলো। সে মনে মনে ভাবলো কায়ান হয়তো প্রথমদিনের কারণে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইছেনা।

” তোমার মতো বন্ধু পেলে ম’ন্দ হয়না। আর কিছু না হোক অন্তত এই বিদেশের মাটিতে বাংলায় কথা বলার লো’ভে হলেও তোমার সাথে বন্ধুত্ব করা যাই।”

কথাটা বলেই কায়ান দরজা বন্ধ করে চলে গেলো। এনাক্ষী কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো পরক্ষণেই সে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো।

রাতে এনাক্ষী জানতে পারলো কায়ান প্রায় সময় খাবার বাইরে খেয়ে থাকে কারণ তার সময় হয়না বাড়িতে রান্না করার। তাই সে আজ রাতে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছে। সময়ের কারণে এবং বেশি রান্না না জানার কারণে এনাক্ষী বেশি কিছু বানাতে পারেনি, যার কারণে তার অনেকটাই মন খা’রাপ।

কায়ানের সামনে একেক করে সুশি, কিমচি, সুপ এবং রামেন রাখলো এনাক্ষী।

” সরি, আসলে আমি বেশি রান্না পারিনা তাই এগুলোই করতে পেরেছি।”

” এগুলোই অনেক হবে। তুমি শুধু শুধু মন খা’রাপ করছো। বসো তুমিও খেয়ে নাও, রাত হচ্ছে।”

এরপর দু’জনে গল্প করতে করতে রাতের খাবার পর্ব শেষ করলো। এই অল্প সময়টাতে তারা একে অন্যের ব্যপারে বেশ কিছু জিনিস জানতে পেরেছে, আগের থেকে অনেকটা ফ্রী হতে পেরে তারা।

খাবার পরে কায়ান এনাক্ষীকে সব পরিষ্কার করে, গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করলো। কায়ানের এই সাহায্যকারী মনোভাবটা এনাক্ষীর খুব ভালোলাগলো। কি সুন্দর নিঃস্বা’র্থহীন ভাবে অন্যকে সাহায্য করে সে।

যাওয়ার আগে কায়ান এনাক্ষীর মাথায় হালকা করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

” সাবধানে থাকবে, দরজা ভালো করে বন্ধ করবে। আর যেহেতু বারান্দায় সম্পূর্ণ গ্রীল নেই তাই ভালো করে বারান্দার দরজা করবে। আর রাতে যাই হয়ে যাক না কেন সহজে দরজা খুলবে না। আর কোন সমস্যা হলে আমাকে বলবে।”

এনাক্ষী বুঝতে পারলো না কেন কায়ান বারবার সাবধানে থাকার কথা বলছে তবে সে ভালো মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।
.
.

দরজায় তীব্র কড়াঘাতের শব্দে এনাক্ষীর ঘুম ভেঙে গেলো, ধরফরিয়ে উঠে বসলো সে। এরকম শব্দ শুনে মনে মনে প্রচুর ভয় লাগছে তার। বাইরে থেকে এখনো কেউ দরজায় কড়া নেড়ে চলেছে। এনাক্ষী বুঝতে পারছেনা সে কি করবে। খুলবে নাকি বসে থাকবে।

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here