নীলাঞ্জনা পর্ব -১৭ ও শেষ

#নীলাঞ্জনা
#পর্ব_১৭
#লেখনীতে_শুভ্রতা(প্রাণ)

অভ্রর অপারেশন শেষ করে ডাক্তার বের হয়ে জানান সে এখন আউট অফ ডেঞ্জার। হার্টের কাছ ঘেঁষে চলে গেছে গুলি তাই বাঁচানো গেছে। তবে হার্ট এ লাগলে আর সম্ভব হতো না। জ্ঞান ফিরলে দেখা করা যাবে বলে চলে যান ডাক্তার। রেহমান সাহেব আর রওনক সাহেব নীলের সাথে আছে। অভ্রর জ্ঞান ফিরলে সে নীলের সাথে কথা বলতে চায়। নীল যায় অভ্রর কেবিনে।

“এখন কেমন আছো অভ্রদা?”

নীলের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে অভ্র।
“নভ কোথায়? আর তুই ওকে গুলি কেনো করলি?”

অবাক হয় নীল। নভ তো তার দিকেই বন্দুক তাক করে রেখেছিলো। আর সেই অভ্রই কিনা নভর খোঁজ করছে?

“অভ্রদা উনি তোমাকে গুলি করতে যাচ্ছিলেন।”

“ও আমাকে নয় আমার পেছনে থাকা লোকটাকে গুলি করতে যাচ্ছিলো ড্যাম ইট। তোর বোকামির জন্য আমি নভ দুজনেই গুলি খেলাম। এই জন্যই তোকে সাথে নিতে চাইনি আমি।”

হতোভম্ব হয়ে যায় নীল।
“মানে কি বলছো এগুলো?”

“নভই সেই সিক্রেট অফিসার যার পরিচয় তোর থেকে গোপন রাখা হয়েছে।”

অভ্রর কথা শুনে বাজ পড়ে নীলের মাথায়। নভ যদি সিক্রেট অফিসার হয় তাহলে তাকে কে নিয়ে গেলো? পুলিশ ফোর্স এর কেউ তো ছিলো না তাহলে? আর কিছু ভাবতে পারে না নীল। কান্নায় ভেঙে পড়ে।

“এখন আর কেঁদে কি হবে! বল নভ কোথায়?”

কাঁদতে কাঁদতে নীল
“আমি জানিনা অভ্রদা।”

ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে অভ্র
“জানিস না মানে?”

সব খুলে বলে নীল অভ্রকে। তা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়ে অভ্র। অতঃপর একজন লোক ফোন করে জানায় সিক্রেট অফিসার নভ সওদাগরও এই হাসপাতালে ভর্তি। তার হাতে গুলি লেগে কিছুটা আহত হয়েছেন এবং কোনো একটা কারণে উনি কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। ধারণা করা হচ্ছে অতিরিক্ত চিন্তার কারণে এমন হয়েছে। সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে ঠিক হয়ে যাবে। কথা গুলো শুনে অভ্র নিশ্চিন্ত হলেও প্রশ্ন একটা থেকেই যায়। নভকে হাসপাতালে কে আনলো? যদি পুলিশ এর কেউ বা তাঁদের অফিসের কেউ আনে তাহলে নীলকে লুকিয়ে কেনো আনলো? নীল তো আজ এমনিতেই জানতে পারতো নভর সিক্রেট অফিসার হওয়ার কথা। তাহলে!
অসুস্থ অবস্থায় আর কিছু ভাবতে পারে না অভ্র। নীলকে নভর কথা জানিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয় সে।

অভ্রর মুখে নভর এই হাসপাতালে থাকার কথা শুনে তাকে খুঁজে বের করে নীল। কে নিয়ে এসেছে জানতে চাইলে জানায় মাস্ক, টুপি পরিহিত এক লোক এসে ভর্তি করিয়ে দিয়ে চলে গেছেন। যাওয়ার আগে ইন্টেলিজেন্স অফিসার অভ্র আকশারকে পেসেন্ট এর কথা বলে দিতে বলেন তিনি। তখন এখান থেকেই কল করে জানানো হয়। কথা গুলো শুনে অবাক হয় নীল। মাস্ক, টুপি পরিহিত কোনো লোক নভকে হাসপাতালে আনবে কেনো? আর লোকটা না বলে চলেই বা যাবে কেনো? আবার তিনি অভ্রকেও চেনেন! সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আর সবচেয়ে বড় কথা নীল নভর সামনে দাঁড়াবে কীভাবে? কিছু না জেনেই তো নভকে শুট করেছে সে! এখন কোন মুখে দাঁড়াবে তার সামনে।

ধীরে ধীরে অভ্র, নভ দুজনই সুস্থ হয়ে ওঠে। নভকে গ্রামে তাঁদের বাড়িতে আর অভ্রকে আকশার বাড়িতে নেওয়া হয়। এখনো নভর সামনে দাঁড়াতে অস্বস্তি হয় নীলাঞ্জনার। নভ সুস্থ হওয়ার পর তাকে নিজের কাছে আসা ভিডিও, ছবি, টেক্সট গুলো দেখায় নীলাঞ্জনা। বুঝিয়ে বলে তাকে ভুল বোঝানো হয়েছে। সাথে সাথে সেই নাম্বার এর সব ডিটেইলস বের করতে দেয় নভ। যদিও সে আন্দাজ করতে পারছে কাজটা কার হতে পারে। নীল ভাবে এটা তার মাথায় কেনো আসলো না? অতঃপর নভর সন্দেহ সত্যি করে তার ভাবনার সাথে মিলে যায় রিপোর্ট। রিপোর্ট হাতে পাওযার পর নভ তাঁদের বাড়িতে অভ্র সহ আকশার বাড়ির সবাইকে ডেকে পাঠায়। বাড়িতে থাকতে বলে নওশাদ শেখকেও।

হঠাৎ নভর এমন তলব পেয়ে সবাই অবাক হলেও উপস্থিত হয় গ্রামে এসে। রওনক আকশার, রেহমান আকশার, নয়না আকশার, পলাশ চৌধুরী, আয়শা বেগম, পিয়াল সহ নওশাদ শেখ, আয়রা বেগম, আনোয়ারা বেগম সবাই। বাদ যায় না নিহা, নয়নও। সবাই এসে অপেক্ষা করছে নভর জন্য। অথচ নভ এখনো ঘর থেকে বের হচ্ছে না। রওনক আকশার তাড়া দিলে নীল নভকে ডাকতে যেতে চায়। তখনই নভ এসে উপস্থিত হয় সেখানে।

ভনিতা ছাড়াই শুরু করে নভ।
“রওনক আকশারের অফিসে কিছু দিন আগে থেকে কাজকর্ম গুলো কেমন অচেনা হতে থাকলো। কাজ শুরু করার পর থেকে এরকম কখনো লাগেনি আমার। অনেক আগেই সেখানে কাজ করতে করতে আমার চাকরি হয় ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিতে কিন্তু তা সবার কাছে গোপন রাখি আমি। অভ্রকেও বলি গোপন রাখতে। কিছু দিন আগে রওনক স্যারের কেবিনে কেউ মেয়ে বিষয়ক কোনো কথা বলছিলেন ফোনে কারো সাথে আর ভুল বশত আমি ওই সময়ে তার কেবিনের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। ভেতরের লোকটা জানতেন না আমার সেখানে থাকার কথা। নির্দ্বিধায় কথা চালিয়ে যান তিনি। যার সারমর্ম এরকম যে কিছু মেয়ে তিনি বাইরে পাঠাবেন আর তার আগে কিছু ড্রাগস্ও এখান থেকে রাজশাহীর দিকে অন্যান্য জিনিসের সাথে পাঠাবেন। অবাক হয়ে যাই আমি। রওনক সাহেব এগুলো কি বলছেন? এই সৎ ব্যাবসার পেছনে তাহলে তিনি এসব কাজ করেন! বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও নিজের কানকে তো আর বিশ্বাস না করে পারা যায় না।”

নভর কথা শুনে সবাই অবাক এর পর অবাক। অবাক রওনক সাহেবও। একপাশে দাঁড়িয়ে একজন ঘেমে নেয়ে একাকার। তার এত দিনের জমানো সম্মান আজ শেষ হতে চলেছে। তাও তার সন্তানের বয়সি এক ছেলের হাত ধরে। এটা কীভাবে হতে দেবেন তিনি!

নভ আবার বলতে শুরু করে।
“আমি নজর রাখতে শুরু করি তার ওপর কিন্তু সন্দেহজনক কিছু দেখতে না পেয়ে হতাশ হই। হতাশ হয়ে যখন থেমে যাবো তখন মনে পড়ে অন্য একজনের কথা। সে তো কিছু দিন আগেই জয়েন করেছে। আর কাজকর্ম উল্টাপাল্টা হচ্ছেও কিছু দিন আগে থেকে। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারি না। আমি সন্দেহ করছি বুঝতে পেরে লোকটা নীলকে আমার বিরুদ্ধে নিতে ফাঁদ পাতেন। আর আফসোসর বিষয় এই যে নীলও তাকে বিশ্বাস করে আমার কাছে কিছু না শুনেই।”

কথা গুলো শুনে নীল ছলছল চোখে তাকিয়ে বলে
“আমার জায়গায় থাকলে আপনিও ভুল বুঝতেন!”

তাচ্ছিল্যের সাথে হাসে নভ।
“তার ব্যাপারে শিওর হতে আমাকে সাহায্য করেছে তারই পাঠানো ভিডিও, ছবি। যে নাম্বার থেকে সেগুলো পাঠিয়েছিলেন সেটা পরীক্ষা করেই জানতে পারি আমার সন্দেহ সত্য।”

সবাই ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকান রওনক সাহেবের দিকে। তিনি করুণ চোখে চেয়ে বলেন
“বিশ্বাস করো তোমরা এগুলো আমি করিনি। আমি তো এসব জানিই না।”

রেহমাম সাহেব ভাইয়ের মুখের ওপর বলে ওঠেন
“তাহলে নভ কি মিথ্যে বলছে ভাইয়া? আর তোমার কেবিনে তুমি ছাড়া কেই বা থাকবে?”

আরো কিছু বলবেন তার আগেই নভ থামিয়ে দেয় রেহমান সাহেবকে।

“উনি ঠিক বলছেন আঙ্কেল। এগুলো করেননি উনি এমনকি জানেনও না।”

এবার আরো বেশি অবাক হয় উপস্থিত সবাই। একসাথে বলে ওঠে
“মানে?”

নিজের অবস্থানে থেকেই বলে নভ
“মানেটা কি আমি বলবো নাকি আপনি নিজেই বলবেন শশুর মশাই?”

নভ শশুর মশাই বলতে ঠিক কাকে বোঝাচ্ছে তা জানতে নওশাদ শেখ ও রওনক আকশার একে অপরের দিকে তাকান। কিছু বুঝতে না পেরে তাকান পলাশ চৌধুরীর দিকে। চমকে ওঠেন দুজনেই। পলাশ সাহেব এমন করে ঘামছেন কেনো? তাহলে কি…? আর কিছু ভাবতে পারে না তারা, নভ কথা বলে ওঠে।

“আচ্ছা আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমিই নাহয় বলি। অফিসের যত উল্টাপাল্টা সব পলাশ চৌধুরী আসার পর থেকেই। আর নীলের কাছে ছবি, ভিডিও পাঠানো নাম্বারটাও ওনার নামেই রেজিস্ট্রেশন করা। কি শশুর মশাই আর কিছু বলবো?”

এই বলে পলাশ চৌধুরীর দিকে তাকায় নভ। বাকিরাও সেদিকে চেয়ে দেখে পলাশ চৌধুরীর অবস্থা কাহিল। সবাই বুঝে যায় কে আসল কালপ্রিট। নয়না আকশার এগিয়ে গিয়ে চড় বসিয়ে দেন স্বামীর গালে। পিয়ালও তাকায় একরাশ ঘৃণা নিয়ে। রওনক সাহেব প্রচন্ড রেগে তাকে মারতে গেলে নভ আর অভ্র থামিয়ে দেয়। নভ পুলিশ ডেকে পলাশ সাহেবকে নিয়ে যেতে বলে। পুলিশ চলে যাওয়ার পর সে নিজেও চলে যায় ঘরে। বাকিরাও যার যার গন্তব্যের দিকে এগোতে থাকে। এখনো কাটেনি তাঁদের অবাক ভাবটা।

৫ বছর পর

রান্নাবান্না শেষে শাড়ির আঁচলে ঘাম মুছতে মুছতে রুমে প্রবেশ করে নীলাঞ্জনা। বেডে হেলান দিয়ে বসে আছে নভ। তার কোলে ঘুমিয়ে আছে তাঁদের ছোট্ট ছেলে অভয়। যার বয়স মাত্র তিন বছর। মায়ের মতোই আধো বুলিতে কথা বলে অভয়। নীল চলে যায় গোসল করতে। ফিরে এসে দেখে নভ ঘরে নেয়। বেডে ঘুমিয়ে আছে অভয়। বেলকনিতে এগিয়ে যায় নীল। আকাশ পানে চেয়ে আছে নভ।

“আমাকে কি আজও ক্ষমা করতে পারোনি নভ?”

নীলের কথা শুনে তার দিকে ফেরে নভ। তার চোখে বিরাজ করছে শূন্যতা। নীল জানে না কিসের এ শূন্যতা। তবে নভর এই দৃষ্টি বড্ড পোড়ায় তাকে। সেই ছোট্ট একটা ভুলের জন্য আজও নীলের সাথে ঠিকভাবে কথা বলে না নভ। সব কিছু বদলে গেছে। তাঁদের জীবন সহ আশেপাশের সবার জীবন। পিয়াল স্টাডি শেষে জব করছে। পলাশ চৌধুরী জেলে। নিহার বিয়ে হয়ে গেছে অভ্রর সাথে। সবাই একসাথে আছে। সবাই ভালো আছে শুধু ভালো নেই নীলাঞ্জনা। অপরাধ বোধ আজও তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। নভ কি কোনোদিন ক্ষমা করবে না তাকে?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে নভ কেবল বলে
“তুই আমার প্রথম প্রেম হলে কি হবে? তুই আমাকে ভালোবাসিসনি নীল। #নীলাঞ্জনা ভালোবাসেনি তার নবুকে!”

সমাপ্ত

[আস্সালামুআলাইকুম। জানি শেষটা অনেক অগোছালো হয়ে গেছে কিন্তু কিছু করার নেই। ক্ষমা প্রার্থী আমি 🖤]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here