নয়নতারা পর্ব ১৫+১৬

#নয়নতারা_১৫
#জেরিন_আক্তার_নিপা

নক্ষত্র গাড়ি নিল। নয়নতারা ওর পাশে উঠে বসে খুশিখুশি গলায় বলল,

—-চলুন।’

খালামনির বাসা চট্টগ্রাম। নক্ষত্র যে কয়বারই গেছে নিজের গাড়ি নিয়ে গেছে। গাড়ি যখন নয়নতারাদের বাড়ির রাস্তা দিয়ে না গিয়ে অন্য রাস্তা ধরল তখন নয়ন প্রায় চেঁচিয়েই বলল,

—একি! কোথায় যাচ্ছেন? আপনি পথ ভুল করেছেন। এদিক দিয়ে তো আমাদের বাড়িতে যাওয়া যায় না। ভুল পথে এসে পড়েছেন। আমাদের বাড়ির রাস্তা ওদিকে। পেছনে ফেলে এসেছেন।’

নক্ষত্র ড্রাইভ করতে করতেই নয়নতারাকে দেখল। বলল,

—তোমাদের বাড়িতে কে যাচ্ছে?’

—কেন আমরা! আপনি আমাকে বাপের বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছেন না?’

নয়নের কথা শুনে নক্ষত্র আকাশ থেকে পড়ল।

—তোমাকে বাপের বাড়িতে রেখে আসতে যাব কেন?’

—আমাদের ঝগড়া হলো না! ঝগড়ার পর তো এরকমই হয়। বউ রাগ করে বাপের বাড়ি চলে যায়। আমিও তো ভেবেছিলাম আপনি রাগ করে আমাকে রেখে আসতে যাচ্ছেন।’

নক্ষত্র কাশতে লাগল। বলে কী এই মেয়ে! এর মাথার তার টার ছিড়ে গেছে নাকি? পাগলের মত এসব কী বলছে!

—তুমি এমনটা ভাবছিলে। আমি তোমার উপর রাগ করে তোমাকে তোমাদের বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছি। আর এজন্য তুমি এত খুশি হচ্ছিলে! এটা ভেবেই তুমি আমার আগে আগে রেডি হয়েছ!’

নয়নতারা মুখ নীচু করে নিল৷ নক্ষত্র ঠিক এখন তাকে বকবে। কিন্তু না। নক্ষত্র বকলো না। বরং শব্দ করে হাসতে লাগল। নয়ন ওর হাসির শব্দ শুনে অবাক হয়ে তাকায়। নক্ষত্রর হাসির কারণ বুঝতে পারছে না সে। এত হাসির কী হলো?

—-ও গড! তোমাকে নিয়ে আমি কোথায় যাব তারা! কী করব তোমাকে দিয়ে বলো তো! এতটা বাচ্চা কেন তুমি? আমি রাগ করে তোমাকে বাবার বাড়ি দিয়ে আসব এটা তুমি ভাবলে কী করে? এরকম একটু আধটু ঝগড়া স্বামী স্ত্রীর মাঝে হয়েই থাকে। তাই বলে আমিও তোমার মত পাগল নাকি? তুমি সত্যিই একটা আস্ত পাগল। নইলে এটা ভেবে এত খুশি হতে পারতে না।’

নক্ষত্র এখনো হাসি থামাতে পারছে না। নয়নতারার রাগ হলো। বাবার বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে না! তাহলে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে? আর এত বড় ব্যাগে কার জামাকাপড় নিয়েছে। নয়নতারা মিনমিন করে জানতে চাইল,

—-আমাদের বাড়ি না গেলে তাহলে কোথায় যাচ্ছি আমরা?’

—- চট্টগ্রাম। আমার খালার বাড়ি। খালাতো বোনের বিয়ে। আমরা ওখানেই যাচ্ছি। বুঝেছ বোকা।’

নয়নতারার মুখ অমাবস্যার রাতের আকাশের মত কালো হয়ে গেল। কী ভেবেছিল সে! আর কী হলো! নক্ষত্র আড়চোখে নয়নতারাকে দেখেও কিছু বলল না। তারার বোকামি দেখে এত মজা লাগছে তার! এই মেয়ের মাথায় এসব ভাবনা কোত্থেকে আসে? সারাক্ষণ বাড়ি চলে যাবার কথাই ভাবে নাকি?

খালামনির সাথে নক্ষত্রর আজ এক বছর পর দেখা হচ্ছে। খালামনি ওদের বাড়িতে যায় না। মা’ও আসে না। তারও কোন দরকার ছাড়া চট্টগ্রাম আসা হয় না। মাঝে মাঝে কখনো এলে খালামনির সাথে দেখা না করে যায় না। খালামনির তাকে দেখেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল।

—-নক্ষত্র আব্বু! কত বড় হয়ে গেছ তুমি! বাবাহ কী মিষ্টি পুতুলের মত মেয়েকে বিয়ে করেছ! ও নিশ্চয় তোমার পছন্দ। তোমার বাবা মা’র পছন্দ জানি আমি। যাচ্ছেতাই। ভালোই করেছ আব্বু। আল্লাহ! আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। এই মেয়ে আমার নক্ষত্র বাবার বউ।’

মনিকাও ওদের দেখে কম চিৎকার চেঁচামেচি করল না। নয়নতারাকে দেখে আহ্লাদে গলে পড়েছে সে। নিজের বিয়েতে নক্ষত্রকে পেয়ে খুশিতে পাগল হয়ে যাচ্ছে।

—-আমি জানতাম তুমি আসবে। আম্মুকে বলেছিও, খালামনি আসতে না দিলেও ভাইয়া আসবে। জিজ্ঞেস করো আম্মুকে বলেছি কি-না?’

নক্ষত্র মনিকার মাথা হালকা চাপড় দিয়ে বলল,

—-জিজ্ঞেস করতে হবে না। আমি জানি তুই একটা পাগলি।’

এখানে এসে নক্ষত্রর নিজেরও ভালো লাগছে। খালামনি কেমন তাকে পেয়ে খুশি হয়েছে। মনিকাও। এখানে সবাই কেমন আপন আপন লাগে। আর বাড়িতে আপনজনদেরও পর মনে হয়। নক্ষত্র ভুলেই গিয়েছিল সে এবার বউ নিয়ে এসেছে। মনিকার কথায় তারার কথা মনে পড়ল তার।

—-ভাবি কই? দেখা করাবে না? এই ভাইয়া এখন এটা বোলো না যে ভাবি আসেনি। তাহলে কিন্তু আমি খুব রাগ করব।’

নক্ষত্র আশেপাশে নয়নতারাকে খুঁজতে লাগল। কোথায় গেছে এই মেয়ে? এখানে কাউকে চিনে নাকি ও? তাকে না বলে কোথায় গেল? আল্লাহ এই মেয়ে সব সময় ঝামেলায় মাথায় নিয়ে ঘুরে। মনিকা নক্ষত্রর হঠাৎ অস্থিরতা দেখে বলল,

—-কী হয়েছে? কাকে খুঁজছ? ‘

—-গেল কই মেয়েটা? আমাকে না বলে কোথায় গেল! আজব তো!’

—-কে গেল কই? কাকে খুঁজছ?’

—-আরে তোর ভাবি। আমার বিয়ে করা বউ। দেখ তো কই গেল। পাচ্ছি না তো। আমার সাথেই তো থাকার কথা ছিল।’

মনিকা, নক্ষত্র দু’জন মিলে খুঁজে নয়নতারাকে বাড়ির ভেতর এসে পেল। খালামনি তখন তারাকে সাথে নিয়ে এসেছিল। নক্ষত্র খেয়ালই করেনি। এখন নয়নকে চোখের সামনে দেখে দেহে প্রাণ ফিরে পেল। নয়নতারা একটু সময়ের মধ্যে খালামনির সাথে কেমন মিশে গেছে। হেসে হেসে দু’জন কথা বলছে। নক্ষত্র মনে মনে ভাবল,

—-যাক, এখানে এসে তাহলে একদিক দিয়ে লাভ হয়েছে। তারার মন ভালো হয়ে গেছে। যতদিন এখানে থাকবে ও, ততদিন খালামনি মনিকার জন্য ওর মন খারাপ হতে পারবে না।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলল নক্ষত্র।

—-পরিবার মনে হয় একেই বলে। আসল পরিবারের মানে, পরিবারের অন্য সদস্যদের সুখে নিজে সুখী হওয়া। অন্যের হাসিতে মনে শান্তি পাওয়া। তার পরিবারকে কখনও পরিবার বলা যায় না। টাকাপয়সা দিয়ে সম্পর্ক তৈরি হয় না। হয় ভালোবাসা দিয়ে৷ তেমনি, ঘরবাড়ি গাড়ি দিয়েও পরিবার হয়না। ছোট একটা কুঁড়েঘরও যদি সবাই একসাথে মিলে হাসিখুশি থাকতে পারে। ওটাকেই পরিবার বলে।’

দূর থেকে নক্ষত্রকে দেখে মনিকার এক কাজিন বলল,

—ওই ছেলেটা কে রে মনি?’

মনিকা এক দল ছেলেগুলোর দিকে তাকাল। ওখানে নক্ষত্রর সাথে আরও কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারল না ইমা কার কথা বলছে। তাই মনিকা জিজ্ঞেস করল,

—-কোন ছেলেটা?’

—-আরে ওইদিকে দেখ না। নীল শার্ট। আরে ওই লম্বা ছেলেটা। কে রে ও? আগে তো কখনও দেখিনি। তোর আত্মীয়?’

মনিকা বুঝল ইমা নক্ষত্র ভাইয়ার কথা বলছে। সে হেসে বলল,

—-ও আমার ভাই।’

—-ভাই! দূর তোর আবার ভাই টাই কোত্থেকে এলো!’

—-আরে ও আমার খালার ছেলে। নক্ষত্র ভাইয়া।’

—-তোর খালাও আছে নাকি মনি?’

—-আছে একটা। যোগাযোগ নেই তেমন। ভাইয়া মাঝে মধ্যে আসে আমাদের বাড়িতে। তাই চিনিস না।’

—-ছেলেটা পুরা আগুন রে। ওর সাথে কথা বলিয়ে দে না মনি। হায়! কী হাসি! ওই হাসিতেই মেয়েগুলা ফেঁসে যাবে। আমার আগে অন্য কেউ ওর সাথে ভাব জমানোর আগে আমাকে কথা বলিয়ে দে।’

নয়নতারা ওদের সাথেই ছিল। সে মুখ হাঁ করে মেয়েটার কথা শুনছে। কেমন লুচ্চি মেয়ে! কোন মেয়ে যে কোন ছেলেকে দেখে এসব কথা বলতে পারে তা নয়নের জানা ছিল না। নয়নতারাও একবার মেয়েটার দৃষ্টি অনুসরণ করে নক্ষত্রকে দেখল। সত্যিই বত্রিশ দাঁত বের করে হাসছে। এত হাসির কী হলো? বাড়িতে থাকতে তো কখনো এভাবে হাসেনি। এখানে এসে মনে এত্ত খুশি লেগেছে যে, সারাক্ষণই ফিকফিকিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা কেমন করে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন চোখ দিয়ে গিলে খাবে। নয়নের এই ব্যাপারটা একটুও ভালো লাগল না। মনিকা নয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো ওর মনের অবস্থা কিছুটা আন্দাজ করে নিয়েছে। সে হাসতে হাসতে ইমাকে বলল,

—-তোর তো সারাজীবনই এই স্বভাব। কোন হ্যান্ডসাম ছেলে দেখলি মানেই পাগল হয়ে গেলি। এটাও জানার প্রয়োজন মনে করবি না ছেলেটা অলরেডি বিবাহিত।’

ইমার মন ভেঙে খানখান করে গেল। কাতর শব্দ করে বলল,

—-নাহ! ওর বউ আছে? না মনি না। বল তুই মিথ্যে বলছিস।’

—-ওভার অ্যাক্টিং বন্ধ কর। ওকে দেখ, ও হলো নয়নতারা। আমার মিষ্টি ভাবি। নক্ষত্র ভাইয়ার বউ। নক্ষত্র ভাইয়ার উপর এখন একমাত্র ওর অধিকার।’

ইমা তীক্ষ্ণ চোখে নয়নকে দেখল। তারপর হেসে ফেলে বলল,

—-তুমি তো ভালো মেয়ে! তোমার সামনে তোমার বরকে নিয়ে এতগুলো কথা বললাম আর তুমি আমার চুল ছিড়ে নিলে না! আমি তোমার জায়গায় হলে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতাম। আমার সামনে কোন মেয়ে আমার স্বামীর দিকে নজর দিবে, আর আমি তাকে ছেড়ে দেব! অসম্ভব।’

নয়ন কিছু বলল না। ইমা মেয়েটা চটপটে হলেও খারাপ না। তবুও তার রাগ হচ্ছে। মেয়েটার উপর না। নক্ষত্রের উপর। এখনো কেমন দাঁত দেখিয়ে হাসছে। ছেলে ছেলে মিলে কী এমন গল্প করছে যে হাসি থামছেই না। ইমা নয়নের গাল টেনে দিল।

—-তুমি ভীষণ মিষ্টি মেয়ে। তোমাকে আমার ভালো লেগেছে। দেখো নয়ন, এত হ্যান্ডসাম বরকে সামলে রেখো। পারলে আঁচলের নিচে লুকিয়ে রেখো। যা কাতিল করা হাসি! মেয়েরা না ওকে তোমার থেকে চুরি করে নেয়। পিচ্চি মেয়ে তুমি, তখন কেঁদেকেটে বুক ভাসাবে।’

কথাটা নয়নের মনে গেঁথে গেল। তার খারাপ লাগতে শুধু করেছে। পরমুহূর্তে নয়ন ভাবল, আমি কেঁদেকেটে বুক ভাসাব কেন? উনাকে অন্য মেয়ে চুরি করে নিলে আমার আরও ভালো। আমি বাবার কাছে চলে যাব। সারাক্ষণ উনার ধমক, শাসন থেকেও বেঁচে যাব। নয়ন মুখে এই কথা বললেও মনে মনে রাগটা তো থেকেই গেল। মেজাজ কেমন খিটখিটে লাগছে। এতক্ষণ সবকিছু সুন্দর লাগছিল। জায়গাটা সাজানো পছন্দ হয়েছিল। এখন সবকিছু অসহ্য লাগছে।

মনিকার বিয়েতে ওর কাজিন মহলের বেশ কয়েকজনের মন ভেঙেছে। একেকজন নিজেদের দেবদাস মনে করছে। ওরা মনিকার বিয়ে মেনে নিতে পারছে না। আবার ওর বিয়েতে আসার লোভও সামলাতে পারেনি। বিয়ে বাড়িতে ভালো ভালো সব খাবার, সুন্দর সুন্দর সব মেয়ে। ওদের এসব কথা শুনেই নক্ষত্রর হাসি থামছিল না।
হঠাৎ তার চোখ মনিকার সাথে দাঁড়ানো নয়নের উপর পড়ল। বাহ! নয়নকে তো শাড়িতে বেশ লাগছে। একদম পিচ্চি লাগছে না। বড় বড় লাগছে। নক্ষত্রর কপালে ভাঁজ পড়ল। নয়ন তাকে দেখে ওভাবে মুখ মুচড় দিয়ে ওপাশে ফিরে গেল কেন?

—-এই মেয়ের মতিগতি বোঝা তোর দ্বারা সম্ভব না নক্ষত্র। এই মেয়ের মাথার তার কয়েকটা ছিড়া।’

।#নয়নতারা_১৬
#জেরিন_আক্তার_নিপা

নক্ষত্রর চোখ এখানে উপস্থিত সবার মাঝে এক জনকেই খুঁজে যাচ্ছে। সবাই এখানে থাকলেও তার চোখ যাকে খুঁজছে সে এখানে নেই। অনেকক্ষণ ধরে পাগলিটাকে দেখছে না। কোথায় গেল?
নক্ষত্র ছেলেদের ভিড় থেকে মেয়েদের দলটার কাছে এগিয়ে আসছে। ওখানে তারা থাকলেও থাকতে পারে।

—-মেয়েটার মাথার তার সত্যিই ছেড়া। কখন কোথায় যায়? কী করে? কে জানে। দু’টা মিনিট চোখের সামনে থাকবে না। ওকে আমার খুঁজে খুঁজে বের করা লাগে। বিয়ে করে ভালো জ্বালায় পড়েছি। তারাকে বিয়ে করা মানে নিজের শান্তির গলা টিপে হত্যা করা।’

মেয়েদের দলটায় সবাই ছিল। শুধু তারা নেই। নক্ষত্রকে ওদের কাছে আসতে দেখতে সব গুলো মেয়েই হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের উপর গড়িয়ে পড়ছে। কয়েকজন নানা ভঙ্গিমায় ওর মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। নক্ষত্র ওদের কাউকেই পাত্তা দিল না। তারাকে এই দলে না দেখে সে মাঝ পথ থেকেই ব্রেক কষে নিল। ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্য দিকে হাঁটা ধরল। নক্ষত্রর এই কাজে কয়েকজন বেশ আহত হলো। না পেরে একজন বলেই ফেলল।

—-ও কি আমাদের মাঝ থেকে কাউকে পছন্দ করে?’

—-কে জানে? তবে ছেলেটা হট আছে৷ যার কপালেই জুটবে তার আর কিছু লাগবে না।’

—-আরে ও অলরেডি ম্যারিড।’

—-হাহ্, বলছিস কি?’

—-হ্যাঁ। ওই ছেলে মনিকার কাজিন। বউ নিয়ে এসেছে। ওর বউকে দেখিস নি তোরা?’

—-না। আমি তো জানতামই না ওই ছেলে বিবাহিত।’

—-ওর বউটাও সুন্দর আছে। একদম বাচ্চা বাচ্চা।’

একজন জ্বলে উঠে বলল,

—-আজকাল সব শালারই কচি মেয়ে পছন্দ।’

ওর কথা শুনে আরেক দফা সবাই হেসে একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ল। দলের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে নয়নতারাকে না দেখেই ওকে নিজের কম্পিটিশন বানিয়ে ফেলল।

—-তোরা যত যাই বলিস। ওই মেয়ে নিশ্চয় আমার থেকেও সুন্দরী না। হাহ্, ওরকম কত ছেলের আমার পেছনে পড়ে আছে। আমি কাউকে পাত্তাই দেই না।’

নক্ষত্র মেয়েগুলোর এসব আলোচনার কিছুই জানল না। তাকে নিয়ে কিছু মেয়ে মনে মনে কতদূর ভেবে নিয়েছিল তা নক্ষত্রর সম্পূর্ণ অজানা।
নক্ষত্র পেছন থেকে এসে মনিকার মাথায় টুকা মারল।

—-তোর ভাবি কই রে মনি? অনেকক্ষণ ধরে দেখছি না। কোথায় গেল?’

মনিকা ভাবির প্রতি ভাইয়ের অত কেয়ার দেখে একটু মজা নিল।

—-বাব্বাহ! বউয়ের কত খেয়াল রাখা হয়! আমার ভাইটা দেখছি ভাবিকে চোখে হারায়। দু’মিনিটের জন্য চোখের আড়াল হতে দিতে রাজি না। এতই যখন ভাবিকে মিস করছো, তাহলে ওকে একা না রেখে গিয়ে হাত ধরে সাথে সাথে রাখলেই তো পারো।’

—-তোর হিংসে হচ্ছে নাকি?’

—-ভীষণ! তোমার মত যদি আমার ক্যাবলা বরটা হত!’

—-হবে, যা দোয়া করে দিলাম। আমার থেকেও ভালো হবে। তোর খেয়াল রাখতে রাখতে জীবন তিতা করে ফেলবে।’

—-এরকম দোয়া করলে আমিও তোমার জন্য দোয়া করব, তোমার বউ যেন তোমাকে পাত্তাই না দেয়।’

নক্ষত্র এবার মনিকার চুল ধরে টান দিল। ব্যথা পাওয়ার জন্যই দিয়েছে। মনিকা ব্যথায় কাতরে উঠল।

—-ভাইয়া! ভালো হলো না কিন্তু।’

—-খারাপ হলেও সই। এখন বল তারা কই?’

—-রুমে চলে গেল।’

—-কেন?’

—-জানি না। বলছিল মাথা ব্যথা। তবে আমার জানো কী মনে হয়? মাথা ব্যথা অজুহাত মাত্র। আসল কারণ অন্যটা।’

নক্ষত্র কপাল কোঁচকাল। মনিটা সারাজীবন অর্ধেক কথা পেটে রেখে দেয়।

—-আসল কারণটা কী?’

—-তোমার উপর রেগে আছে সে। বাইরে ওর সামনে ইমা তোমাকে নিয়ে মজা করে কিছু কথা বলেছিল। সেসব শোনার পর থেকেই ভাবির মুখ থেকে হাসি উড়ে গেছে। ওখান থেকে সোজা ঘরে চলে গেছে।’

নক্ষত্র মনিকার গাধামিতে মনে মনে হতাশ হলো। মনি যদি জানত ওদের বিয়ে কোন পরিস্থিতিতে হয়েছে, তাহলে এই ধারণা মনে পুষত না। তারার মনে তাকে ঘিরে কোন ফিলিংস নেই। সে তো বরং নক্ষত্রকে ছেড়ে বাপের বাড়ি যেতে পারলেই বাঁচে। সারাক্ষণ ওই ধান্দাতেই থাকে। ইমা টিমা যতই তারার সামনে তাকে নিয়ে কথা বলুক, তারার তাতে কিচ্ছু যাবে আসবে না। সে আরও হাসতে হাসতে নক্ষত্রকে অন্য মেয়ের হাতে তুলে দিয়ে নিজের জান বাঁচাবে।
এই কথাগুলো ভাবতে নক্ষত্রর কেনই যেন খারাপ লাগল। এমন লাগার কোন কারণ নেই। সে নিজেও তারাকে ভালোবাসে না। বোকাসোকা, অবুঝ, পাগলী জেদি একটা মেয়ে হিসেবে পছন্দ করে। কিন্তু এই পছন্দ সেই পছন্দ না। এই পছন্দ দিয়ে তারাকে সে সারাজীবন নিজের কাছে রাখতে পারবে না।
নিজেদের ঘরের দিকে এগোতে এগোতে নক্ষত্র নিজেকেই যেন বলল,

—-ইলার থেকে প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত তারা আমার কাছে থাকবে। তারপর তার ইচ্ছে। সে চলে যেতে চাইলে আমি আটকাব না। তারাকে বাধা দেওয়ার আমার কোন অধিকার নেই। এমনিতেই ওকে যথেষ্ট কষ্ট দিয়ে ফেলেছি আমি। তারা যদি ডিভোর্স নিয়ে জীবনটা নতুন করে শুরু করতে চায়, তাহলে আমি খুশি খুশি তাকে ডিভোর্স দিব। তারাকে ভালো থাকতে দেখতে চাই আমি। যেকোনো মূল্যে ওর মুখে হাসি দেখতে চাই। ওকে সুখী দেখলে নিজের অপরাধ কিছুটা হয়তো কমবে।’

নক্ষত্র ঘরে এসে দেখে নয়ন সত্যি সত্যিই শুয়ে আছে। মুখ ওপাশে ফেরানো বলে নক্ষত্র নয়নতারাকে দেখতে পাচ্ছে না। কাচুমাচু হয়ে মেয়েটা শুয়ে আছে। দেখে নক্ষত্রর মায়াই হলো। মাথা ব্যথায় সত্যিই কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা। আর সে বউয়ের খোঁজ না নিয়ে বাইরে আড্ডা দিচ্ছিল। নয়নতারার শাড়ি পায়ের দিকে কিছুটা উপরে উঠে আছে। তার ফর্সা পায়ের অনেকটা দেখা যাচ্ছে। নক্ষত্রর চোখ সেদিকে গেলে সাথে সাথে ফিরিয়ে আনল। গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করল। নয়নতারা আগেই বুঝতে পেরেছে নক্ষত্র ঘরে এসেছে। তবুও সে নড়াচড়া করল না। নক্ষত্রকে বুঝতে দিল না সে নক্ষত্রর উপস্থিতি টের পেয়েছে। মনের মধ্যে সেই রাগটা এখনো রয়ে গেছে নয়নের। বাজে লোকটা শুধু তাকেই সারাক্ষণ ধমকের উপর রাখে। বাকি সবার সাথে কত হেসে হেসে কথা বলে। নয়ন নিজেও বুঝতে পারছে না সে ভেতরে ভেতরে জেলাস ফিল করছে।
নক্ষত্র ডাকল,

—-তারা! এই তারা।’

কোন সাড়াশব্দ নেই। নক্ষত্র বেডের দিকে এগিয়ে এলো। উঁকি দিয়ে নয়নের মুখ দেখতে চাইল।

—-খুব মাথা ব্যথা হচ্ছে, তারা? কষ্ট হচ্ছে তোমার?’

নয়নতারা মনে মনে বলল,

—-কার মাথা ব্যথা! আর কিসের মাথা ব্যথা?’

পরমুহূর্তে তার মনে পড়ল, মনিকাকে মাথা ব্যথার কথা বলেই ঘরে এসেছে সে। মনিকাই নিশ্চয় নক্ষত্রকে বলেছে। যাক, বজ্জাত লোকটা একটু টেনশন করুক। সে সত্যিটা বলবে না।

—-কথা বলছো না কেন? তুমি কি ঘুমিয়ে আছো?’

নক্ষত্র বেশ নরম গলায় কথাগুলো বলছে। নয়নের মজাই লাগছে। নক্ষত্র ভাবল, তারা হয়তো ঘুমিয়ে আছে। সে নয়নতারার পাশে বসে ওর কপালে হাত রাখল। নয়ন বুঝতে পারেনি নক্ষত্র এমন কিছু করবে। নক্ষত্র ঠিক তার মাথার পাশে বসে আছে। নয়নের পিঠে ওর ছোঁয় পাচ্ছে। তার কপালে যখন নক্ষত্রর স্পর্শ পেল ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠেছে নয়ন। সাথে সাথে নড়ে উঠল সে। একটু সরে গিয়ে বলল,

—-কী হয়েছে?’

—-তোমার নাকি মাথা ব্যথা।’

—-হ্যাঁ মাথা ব্যথা। তাতে আপনার কী? আপনি নিচে যান না। গিয়ে বিয়ে বাড়ি উপভোগ করুন।’

—-এটা কেমন কথা তারা! তুমি কষ্ট পাচ্ছ আর আমি গিয়ে সবার সাথে মজা করব!’

—-কেন করবেন না? এতক্ষণ তো করছিলেন।’

—-এতক্ষণ আমি জানতাম না তুমি মাথা ব্যথায় ঘরে চলে এসেছ। জানলে আমিও অনেক আগেই চলে আসতাম। তুমিও তো আমাকে জানাওনি। রুমে আসার আগে তোমার আমাকে বলে আসা উচিত ছিল।’

—-হ্যাঁ আমি মাইক হাতে নিয়ে সবাইকে জানিয়ে আসতাম আমার মাথা ব্যথা।’

নক্ষত্র বুঝল তারা ব্যথা সহ্য করতে না পেরেই হোক বা তার উপর রাগ করেই হোক, দুইটার থেকে একটা কারণে এরকম রেগে যাচ্ছে।

—-এদিকে ফিরো তো। আমি তোমার কপাল ম্যাসাজ করে দিই। আরাম পাবে। আমি খুব ভালো ম্যাসাজ দিতে পারি।’

—-লাগবে না। এমনিতেই ব্যথা সেরে যাবে। আপনি যান। আপনার জন্য অনেকে হয়তো অপেক্ষা করছে।’

নক্ষত্রর এবার তারার উপর রাগ হতে লাগল। ত্যাড়ামির একটা সীমা আছে। নিজে কষ্ট পাচ্ছে তবুও ত্যাড়ামি ছাড়ছে না। নক্ষত্র গলাটা একটু কঠিন করল।

—-আজব কথা বলছো তো! আমার বউ ঘরে শুয়ে কষ্ট পাবে আর আমি বাইরে গিয়ে ঘাস কাটব! যা বলছি তা করো। এদিকে ফিরে শোও। তাকাও আমার দিকে। বলছি মাথা ম্যাসাজ করে দিই। তা না। সারাক্ষণ আমার কথার অবাধ্য না হলে তোমার চলে না৷ মনে হচ্ছে আমার ধমক না খেলে তোমার পেটের ভাত হজম হয় না। বকা খাওয়ার জন্যই এরকম ত্যাড়ামি করো।’

নয়নের আরও রাগ হলো৷ মনে মনে নক্ষত্রর মাথামুণ্ডু চিবিয়ে খাচ্ছে সে। পারলে নক্ষত্রর চুল টেনে ধরে।

—- মুখে বলছে বউকে ফেলে গিয়ে ঘাস কাটব নাকি? কাজে তো সেরকমই করে। বউকে একা রেখেই সারাটা সময় দূরে দাঁড়িয়ে হাসছিল। মুখ থেকে হাসি সরছিলই না। মেয়েগুলোকে দেখে ইচ্ছে করে হাসছিল। আমি কি বুঝি না মনে করেছে! সব বুঝি আমি। সুন্দর মেয়ে দেখলে কোন ছেলেদেরই মাথা ঠিক থাকে না। উনিও অন্য সব ছেলের থেকে আলাদা হবে এমনটা কেন ভাবতে গেলাম আমি। গাধা নয়ন। তুই একটা আস্ত গাধা।’

নক্ষত্র এতক্ষণে নয়নের বাহু ধরে ওকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। নয়ন চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। নক্ষত্র কিছুক্ষণের জন্য নয়নের মুখের উপর থেকে চোখ সরিয়ে আনতে পারছিল না। সে নয়নের কপালে মৃদু করে চেপে চেপে ম্যাসাজ করে দিচ্ছে। নয়ন কয়েকবার বাধা দিলে নক্ষত্র দিল এক ধমক।

—-চুপ। একদম নড়াচড়া করবে না। তোমার গলা টিপে ধরছিল না আমি। মেরে ফেলব না তোমাকে। ভয় নেই। তোমার আরামের জন্যই মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। নড়াচড়া করলে বাইরে নিয়ে গিয়ে সাউন্ড বক্সের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখব। তখন মজা বুঝবে।’

নয়ন বেচারি নিজের জালে নিজেই ফেঁসে গেল। এখন মাথা ব্যথা নেই বললেও ফেঁসে যাবে। ব্যথা আছে বলে নাটক চালিয়ে গেলেও কতক্ষণ এভাবে পড়ে থাকতে হবে কে জানে? লোকটা ওকে সহজে ছাড়বে না। তবে একটু পর থেকে নয়নের ভালোই লাগছিল। নক্ষত্র আলতো হাতে চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। ঘুম এসে যাচ্ছে তার। আস্তে আস্তে নয়নের রাগও কেটে যাচ্ছে। নক্ষত্রর উপর এখন আর ততটা রাগ কাজ করছে না। একসময় নয়ন আধোঘুমে চলে গেলে নক্ষত্র নিজের সুবিধার জন্য নয়নের মাথা ওর কোলের উপর তুলে নিল। বাঁকা হয়ে বসে থেকে থেকে কোমর ব্যথা করছিল। এবার সোজা হয়ে বসে বউয়ের সেবা করুক।

—-বিয়ে করেছ বাবা। আর বউয়ের সেবা করবে না! এমনটা কি হয়? কাজে তো লেগেই পড়েছ। এখন লেগেই থাকো। তোমার কপালে শেষ পর্যন্ত বউয়ের মাথা টিপাও লেখা ছিল!’

সন্ধ্যার পরের পুরো সময়টা নয়ন ঘুমিয়েছে। নক্ষত্র ওকে জাগাল না। নিজেও উঠে চলে গেল না। একইভাবে বসে রইল। মনিকা এসে একবার তাকে এই অবস্থায় দেখে গেছে। পরে একবার খালামনিকেও ধরে নিয়ে এসে দেখিয়েছে। খালামনি, মনিকা দু’জন মিলে মজাও নিয়েছে অনেক। খালামনি তাকে অলরেডি ‘বউ পাগলা’ নিক নেম দিয়ে ফেলেছে।

চলবে____

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here