পথে হলো দেরি পর্ব ২২

#পথে_হলো_দেরি
#নুশরাত_জেরিন
#পর্বঃ২২

,
,
সারাদিনে একবারও ইরা শৌখিনের দেখা পেলোনা।ইরা যদিও শৌখিনের উপর রেগে আছে তারপরও শৌখিনকে দেখার জন্য তার মন আকুপাকু করতে লাগলো।
রাত দশটা বেজে যাওয়ার পরও শৌখিন বাড়ি ফিরলোনা।
ইরা ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে রইলো।
রেহেনা বেগম ডাকলেন ইরাকে।তিনিও ঘুমাননি আজ।
ইরার পাশে এসে বসলেন।বললেন,

—ঘুমাবিনা ইরা?

ইরা আমতাআমতা করলো।
বললো,

—ঘুম আসছেনা ফুপু।

রেহেনা বেগম চুপ করে রইলেন।তিনি জানেন ইরার মন ভালো নেই।মেয়েটা অন্যরকম।
যাকে ভালবাসে তাকে মন থেকে ভালবাসে।আজ রিফাত ইরার সাথে দেখা করার পর নিজে বিয়ে ভেঙে দিয়েছে।বলেছে তার নাকি ইরাকে পছন্দ না।অথচ ইরাকে দেখতে এসে সে বলেছিলো সে ইরাকে ভালবাসে।ইরার জন্য সব করতে পারে।
সেই ছেলের হঠাৎ এমন মতবিরোধে যে কারও পক্ষে ব্যাপারটা বোঝা সম্ভব।
ইরা নিশ্চয়ই রিফাতকে বিয়ে ভাঙতে বলেছে।
রেহেনা বেগমের মুখের ওপর না বলতে ইরা পারবেনা।তাই হয়তো এই পথ বেছে নিয়েছে।
তিনি বললেন,

—রিফাতকে তোর পছন্দ না ইরা?

ইরা চমকে ফুপুর দিকে তাকালো।বললো,

—রিফাত ভাই খুব ভালো মানুষ ফুপু।তাকে পছন্দ না হওয়ার মতো কোন কারনই নেই।

—তাহলে বিয়েটা কেনো ভাঙালি রিফাতকে দিয়ে?

ইরা মাথা নিচু করলো।ফুপু সবটা ধরে ফেলেছেন।যদিও ধরে ফেলারই ছিলো।ইরা তো লুকোয়নি কিছু।
তবু ভেতরে ভেতরে ইতস্তত করতে লাগলো।এখন যদি ফুপু জিজ্ঞেস করেন,কেনো ভাঙলি বিয়েটা?কার জন্য ভাঙলি?
তখন ইরা কি জবাব দেবে?কি বলবে?সে শৌখিনের জন্য বিয়েটা ভেঙেছে?তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না?
কিন্তু শৌখিন তো ঠিক বিয়ে করবে।

ইরার উত্তর না পেয়ে রেহেনা বেগম আবার বললেন,

—শৌখিনকে ভালবাসিস ইরা?

ইরা মাথা তুলে একনজর তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে।
সে ফুপুকে কিচ্ছু বলতে পারবেনা।কিচ্ছু না।

তবে না বললেও রেহেনা বেগম ঠিক বুঝতে পারেন।জোরেশোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি নিজের রুমের দিকে পা বাড়ান।

💮💮

সকালে কারো ডাকে ইরা হুড়মুড় করে উঠে বসে।এবং সাথে সাথেই সোফা থেকে সোজা ফ্লোরে পরে।
ইরা আর্তনাদ করে ওঠে।
তারমানে সে কাল রাতে এখানেই ঘুমিয়েছিলো?এই সোফায়?
নিজের বাহু ডলতে ডলতে সামনে তাকায়। দেখে রহিমা খালা।
ইরাকে তাকাতে দেখে তিনি বলেন,

–কি হয়ছে তোমার ইরা?এইখানে শুইয়া আছো কেন?
শরীর খারাপ লাগতাছে?

তার চোখমুকে আতংক দেখা যায়।ইরা এতো কষ্টের মাঝেও বুকের কোনে প্রশান্তির বাতাস খুজে পায়।তাকে ভালবাসার মানুষ এখনো আছে।
এই যে এই মহিলাটা।
আপন কেউ না হয়েও ইরাকে কতোটা ভালবাসে!কতোটা আপন ভাবে!তার চোখেমুখে চিন্তার ছাপই যে তার প্রমান।
ইরা হাত ঝেরে উঠে বসে।
বলে,

—না খালা,শরীর খারাপ না।
কাল এখানে বসে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি তা একদম বুঝতে পারিনি।

ইরার কথা শুনে রহিমা বড়সড় নিশ্বাস ফেলে।বলে,

—ওহ,তাই কও।আর আমি কতো ভয় পাইয়া গেছিলাম।ভাবলাম তুমি হয়তো অসুস্থ।
তো চা খাবা ইরা?

ইরা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়।সাতটা বেজে গেছে।শৌখিন বাড়ি ফিরেছে কতো রাতে কে জানে?তাকে দেখতে খুব মন চাইছে।কাল সারাদিন দেখা মেলেনি।
মনটা যে বড্ড বেহায়াপনা করে ইদানীং।
ভালবাসে না জেনেও তার কাছেই ছুটে যেতে চায়।
সে বলে,

—না খালা,আমি চা খাবোনা।
তবে এককাপ চা নিয়ে এসো।তোমার ছোট স্যারের রুমে আমি দিয়ে আসি।

—ছোট স্যার?

—হুমমম।

—কিন্তু উনি তো বাড়িতে নেই।

ইরা অবাক হয় খুব।বাড়িতে নেই মানে কি?কাল কি শৌখিন বাড়ি ফেরেনি?
বলে,

—কোথায় গেছে?

—চট্টগ্রাম।

—মানে?কখন?কবে,?

—তুমি জানোনা?

ইরা মাথা নারে।বলে,
—নাতো।

রহিমা বলে,

—রিফাত এই বাড়িতে তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসার পর পরই তো সে বাড়ি ছেরে চলে গেলো।যাওয়ার আগে বললো সে চট্টগ্রাম চলে যাচ্ছে। আর কোনদিন নাকি ফিরবেনা।

ইরা আঁতকে ওঠে।
কোনদিন ফিরবেনা মানে?কেনো ফিরবেনা?তবে কি সে মিতালিকে বিয়ে করে ওখানেই থাকবে?ঐখানেই সংসার পাতবে?
ইরার কথা একটুও মনে পরবেনা তার?কখনোই মনে পরবেনা?
সেকি ভালো থাকবে ইরাকে ছাড়া?
ইরা ডুকরে কেঁদে ওঠে।
রহিমা এগিয়ে আসতেই ইরা নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়।
হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে।
কান্নার আওয়াজ বাইরে বের করতে চায়না।
কিন্তু বুকের ভেতর ঠিকই তো রক্তক্ষরণ হয়।সেটা আটকানোর সাধ্য কি ইরার আছে?

💮💮
দেখতে দেখতে কেটে গেছে মাসখানেক।
ইরা আগের চেয়েও বেশি মনমরা থাকে ইদানীং। তার কথার পরিমানও কমেছে।দরকার ছাড়া একটা টু শব্দ ও তার মুখ থেকে বের হয়না।
শাম্মি ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে নিজেও গোমড়া হয়ে থাকে।সে নিজেও চায় ইরা শৌখিন সুখে থাক।সুখে সংসার করুক।আর পাঁচটা মানুষের মতোই জিবন কাটুক তাদের।
কিন্তু সে চাইলেই সব হবে কেনো?
বিধাতার অন্যকোন চাওয়াও তো থাকতে পারে।
শাম্মি দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তার দম আটকে আসে এসব দেখলে।
নিজের জিবনের সুখটাকেও সে উপলব্ধি করতে পারেনা।
ইরাকে দেখলেই বুকটা ফেটে যায়।
ইরা ভালো মেয়ে,খুব ভালো মেয়ে।
তবু তার ভাইটা যে কেনো ইরাকে মেনে নিতে পারলো না শাম্মি কিছুতেই বুঝতে পারেনা।
দুজনে চুপচাপ রাস্তা দিয়ে হাটে।
ইরার নিস্তব্ধতা শাম্মির ভালো লাগেনা।সে বলে ওঠে,

—এই ইরা?ইরা?

ইরা ছোট্ট করে জবাব দেয়,

–,হু।

—চলনা আজ ফুচকা খেয়ে আসি?
নয়তো আইসক্রিম খাবি?
তোর তো পছন্দ আইসক্রিম?
খাবি?

ইরা না সূচক মাথা নাড়ে।
শাম্মি হতাশ হয়।মুখ ফুলিয়ে সামনের সিনেমা হলের দিকে তাকায়।
বলে,

–তাহলে চলনা সিনেমা দেখে আসি?

—না।

—কেনো না?চলনা যাই।

সিনেমা হলের সামনে ইশারা করে চেচিয়ে বলে,

—ওই দেখ মুগ্ধ আর ওর বউ ও যাচ্ছে সিনেমা দেখতে।দেখ।
চলনা আমরাও যাই।

ইরা ইচ্ছে না থাকা সত্বেও চোখ মেলে তাকায়।মুগ্ধর পাশে হাত ধরা অবস্থায় মিতালিকে দেখে চমকে ওঠে।
বলে,

—মুগ্ধ আর কে?

—মুগ্ধ আর ওর বউ।কেনো মিতালি আপুকে চিনিসনা তুই?ওই যে রিফাত ভাইয়ের বোন।ওরা তো বিয়ে করেছে জানিস?

ইরা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,

—ওরা বিয়ে করেছে?

—হ্যাঁ,তোকে একবার বলেছিলাম তো যে মুগ্ধ বিয়ে করেছে।
বলেছিলাম না?

ইরা চোখ পিটপিট করে তাকায়।তার কিচ্ছু মনে পরছেনা এই মুহুর্তে। শুধু মনে হচ্ছে তার দারা ভুল হয়ে গেছে।মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে।
ভুলটায় তার নিজের জিবনের সাথে সাথে তার ভালবাসার মানুষটার জিবনও সে এলোমেলো করে দিয়েছে।ভুলটা শোধরাতে হবে।
অবশ্যই শোধরাতে হবে।
ইরা গলা ভেজায় বারবার।
অতিরিক্ত উত্তেজনায় তার হাত পা কাপে।
মাথা ঘুরে ওঠে।
শাম্মি পাশে কি বলছে তা কানে আসেনা।
চারপাশ ঘোলাটে হয়ে আসে।
চোখে নামে অন্ধকার।
চোখ বুজবার আগে আরেকবার ঘোলাটে চোখে মুগ্ধ মিতালির দিকে তাকায় ইরা,কি সুখি দেখাচ্ছে দুজনকে।কে বলবে,একসময় মিতালি শৌখিনকে ভালবাসতো?ইরা আর শৌখিনও কি এমন সুখি দম্পতি হতে পারতোনা?না হওয়ার কারনটা কি ইরা?দায়টা কি শুধুমাত্র তারই?
ইরা আর ভাবতে পারেনা।
রাস্তায় এলিয়ে পরে সে।

,

,

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here