পুতুল খেলা পর্ব -০৭

#পুতুল_খেলা
#পর্বঃ৭
#লেখিকাঃদিশা মনি

রিপ্তি রুমে এসে চোখমুখে পানি ছিটায়। রিপ্তি হাতমুখ পরিস্কার করে বিছানায় এসে বসে। তার মাথায় বিভিন্ন ধরনের চিন্তা ভাবনা ঘোরাফেরা করছিল। রিপ্তি সেসব চিন্তাভাবনাকে আমলে না নিয়ে ফোনটা বের করে। আবার সেই অজানা নাম্বার থেকে ম্যাসেজ এসেছে। রিপ্তি বিড়বিড় করে বলে,
‘আমি এই লোকটাকে বিশ্বাস করে ভুল করছি নাতো? উনি যা বলছেন সেটা তো মিথ্যাও হতে পারে। না না এত সহজে কাউকে বিশ্বাস করা ঠিক হয়। কিন্তু উনি যে প্রমাণগুলো আমাকে দিয়েছেন সেগুলো তো,,,,’

আমানও রুমে চলে আসে। আমানকে দেখে রিপ্তি আর কিছু বলে না। আমান রিপ্তির দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে,
‘তুমি যদি চাও আমি এই রুমে থাকব না।’

‘আমি সেটাই চাই। এখন যান এখান থেকে।’

আমান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বেড়িয়ে যায়। রিপ্তি ভাবতে থাকে,
‘এই বাড়ির কাউকে আমি বিশ্বাস করি না। এই বাড়ির মধ্যে আমার মা-বাবার খু’নি লুকিয়ে আছে। সবার আগে আমার তাকে খুজে বের করতে হবে। নিজের হাতে আমার মা বাবার খু’নের বদলা আমাকে নিতে হবে।’

রিপ্তির এসব ভাবনার মধ্যে তার ফোনে আবার ম্যাসেজ আছে। ম্যাসেজটা দেখে রিপ্তি বলে,
‘সিতারা বেগম,,,আপনি আমার সন্দেহের তালিকায় প্রথম আছেন। সবার আগে আমায় আপনাকেই বাজিয়ে দেখতে হবে।’

১৩.
সিতারা বেগম টিভিতে স্টার জলসার সিরিয়াল দেখছিলেন। রিপ্তি এসে টিভিটা অফ করে দেয়। সিতারা বেগম রেগে গিয়ে বলেন,
‘এই মেয়ে টিভিটা অফ করলে কেন? আমার পছন্দের নাটক হচ্ছে।’

‘এসব সিরিয়াল দেখেই বোধহয় কূটকাচালি করা শিখে গেছেন?’

‘মা,,মানে? তোমার কথার মানে ঠিক বুঝলাম না।’

‘আপনাকে আর কিছু বুঝতেও হবে না আম্মা। যান গিয়ে ময়লা কাপড়-চোপড় গুলো পরিস্কার করুন। অনেক কাপড়, বিছানার চাদর সবকিছু পরিস্কার করতে হবে।’

‘আমি এসব কাজ কেন করব?’

‘সারাদিন পায়ের উপর পা তুলে বসে খেতে তো খুব ভালোই পারেন। এখন এসব কাজও আপনাকে করতে হবে।’

‘এবার বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। ভুলে যেওনা আমি তোমার শাশুড়ি হই।’

‘আমি কিছু ভুলিনা আম্মা। আপনি হয়তো ভুলে গেছেন বিয়ের পর কিভাবে আমাকে দিয়ে বাড়ির সব কাজ করিয়ে নিতেন। আমারও তখন খুব কষ্ট হতো। এখন আপনিও কষ্টটা উপলব্ধি করুন।’

‘ও তারমানে তুমি শোধ তুলছ?’

‘আপনি যদি এমন মনে করেন যে আমি শোধ তুলছি, তাহলে হ্যা সেটাই আমি শোধ তুলছি।’

‘কাজটা কিন্তু একদম ঠিক করছ না।’

‘ঠিক ভুল নিয়ে আপনাকে এত ভাবতে হবে না। যান আপনি গিয়ে কাজে লেগে পড়ুন।’

মুনিয়া এসে বলে,
‘আমি বরং করে দেই। আম্মু একটু ওনার সিরিয়াল দেখুক।’

রিপ্তি চোখ রাঙিয়ে বলে,
‘খবরদার বেশি পাকামি করবে না। তুমি গিয়ে রান্নাঘর সামলাও। রান্নাবান্না করো। ওসবই তোমার কাজ। আর এই বুড়ি চুপচাপ বসে আছিস কেন। ওঠ উঠে গিয়ে কাপড় চোপড় পরিস্কার কর।’

সিতারা বেগম রেগে যান রিপ্তির কথায়।

‘এই মেয়ে তুমি আমার সাথে তুই তুকারি করছ। তোমার মধ্যে একটুও নম্রতা ভদ্রতা নাই?’

‘না নেই। যা গিয়ে আমার কথামতো কাজ কর। যদি না করিস তাহলে ঘাড় ধরে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে রেখে আসব।’

‘রিপ্তি,,,,’

আমানের রাগী গলায় রিপ্তি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে থাকে। আমান রিপ্তির কাছে এসে বলে,
‘তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। তুমি কোন সাহসে আমার মায়ের সাথে এভাবে কথা বলছ?’

‘এই একদম আমায় চোখ রাঙাবি না। তোর চোখ রাঙানিকে আমি ভয় পাইনা। বিয়ে করে কাপুরুষের মতো আমাকে ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলি এখন ফিরে এসে নাটক হচ্ছে। তোর সব নাটক আমি বের করে দেব। আমার সামনে থেকে দূর হ। নাহলে তোকে জু’তা খুলে মা’রতে কিন্তু আমার হাত কাপবে না।’

রিপ্তির এহেন ব্যবহারে আমান সহ বাড়ির বাকি সবাই তাজ্জব হয়ে যায়। মুনিয়া বলে,
‘আমি রান্নাঘরে যাচ্ছি। অনেক কিছু রান্না করতে হবে। আজ নাকি অনেকে খেতে আসবে।’

আমান জিজ্ঞেস করে,
‘কে আসবে আজকে?’

রিপ্তি উত্তর দেয়,
‘আমার স্কুল-কলেজের কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবী আসবে। তাদের জন্য এত আয়োজন।’

‘তুমি তো আমাকে এই ব্যাপারে কিছু বলো নি।’

‘আমি কাউকে কিছু বলতে বাধ্য নই। আমার উপর একদম এসব স্বামীর অধিকার ফলাতে আসবি না। আর এই বুড়ি তুই দাড়িয়ে আছিস কেন? যা গিয়ে কাপড় চোপড় পরিস্কার কর। তারপর গোটা বাড়ি রগড়ে রগড়ে পরিস্কার করবি। আমি মোর্শেদ সিরাজ সবাইকে বলেছি পার্টির আয়োজন করতে।’

সিতারা বেগম কোন কিছু না বলে চুপচাপ চলে যান বাতরুমের দিকে। মনে মনে বলতে থাকেন,
‘এসব আমারই কর্মফল। মেয়েটাকে তো কম কষ্ট দেইনি। কষ্ট সহ্য করতে করতে মেয়েটার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এখন তাই এরকম করছে। আমি ওকে এই ব্যাপারে কোন দোষ দেবোনা। কিন্তু ও যেটা ভাবছে সেটা তো ভুল। ওর বাবা-মাকে তো,,,’

‘এখানে দাড়িয়ে আছেন কেন? যান গিয়ে পরিস্কার করুন।’

সিতারা বেগম রিপ্তির দিকে একনজর তাকিয়ে চলে যান।

‘এই যে তুই আর দাড়িয়ে না থেকে এই লিস্ট অনুযায়ী সব বাজার নিয়ে আয়।’

রিপ্তি কথাটা শুনে আমানের ইচ্ছা করছিল এখনই তাকে ঠা’স করে একটা থা’প্পর মা’রতে। অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সে চলে যায় বাজারের উদ্দ্যেশ্যে।

১৪.
রাতে পার্টির আয়োজন সব সমাপ্ত হয়। রিপ্তির বন্ধু-বান্ধবরাও একে একে আসতে শুরু করে। রিপ্তি সবাইকে ওয়েলকাম করছিল।

সিতারা বেগম সবকাজ শেষ করে বিছানায় এসে সবেমাত্র ঘুমিয়েছিল। তখনই মুনিয়া এসে বলে,
‘নিচে চলুন আম্মু। রিপ্তি আপনাকে ডাকছে।’

‘এখন আবার কি হলো?’

‘কি জানি। ওর বন্ধুরা এসেছে। হয়তোবা পরিচয় করিয়ে দেবে।’

সিতারা বেগম অনেক কষ্টে উঠে দাড়ায়। সারাদিন অনেক কাজ করার জন্য তার কোমড়ের ব্যাথা উঠে গেছে। মুনিয়ার সাহায্যে কোনরকমে পার্টির স্থলে আসেন সিতারা বেগম।

রিপ্তি সিতারা বেগমকে দেখে তার কাছে আসে।

‘এতক্ষণে আপনার আসার সময় হলো মহারাণী। আসুন এসে আমায় উদ্ধার করুন। আমার বন্ধুদের জুস,খাবার পরিবেশন করবে কে?’

‘মানে কি বলতে চাইছ তুমি?’

‘ঐ যে দেখছেন জুসের ট্রে, কাবাব এগুলো সবার মাঝে পরিবেশন করুন।’

‘আমি এসব কাজ করব?’

‘আপনি করবেন না তো কি আমি করব? যান তাড়াতাড়ি কাজে লেগে পড়ুন।’

‘আমার কোমড়ে ব্যাথা,,’

‘এসব আপনার ব্যাথা,,আর আমি যখন পিরিয়ডের ব্যাথা নিয়ে রান্নাবান্না করতাম। আপনার আত্মীয় স্বজন চোদ্দগুষ্টির জন্য রাজভোগ করতাম। তখন আমার ব্যাথা হতো না? আপনার জন্য পিরিয়ডের সময় আমায় শিল পাটায় বাটনা বাটতে হয়েছিল। আমি কিছু ভুলিনি।’

‘আমার কথাটা শোন,,’

‘আপনাকে ১০ মিনিট সময় দিলাম। পরিবেশন যদি না করেন তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।’

সিতারা বেগম বুঝতে পারেন রিপ্তিকে বুঝিয়ে আর কোন লাভ নেই। তাই তিনি কোমড়ের ব্যাথা নিয়েই পরিবেশনের কাজ করতে থাকেন।

রিপ্তি আত্মতৃপ্তি পায়। বলে,
‘এর থেকে আরো অনেক কষ্ট আমি দশটা মাস সহ্য করেছি। তার কাছে এই সামান্য কষ্ট কিছুই না। আপনারা যা করেছেন তাতে এটা খুব কমই হয়ে গেছে। আমাকে নিয়ে পুতুল খেলেছেন, আমার মা-বাবাকেও আপনারাই খু’ন করেছেন। আপনাদের আমি তিলে তিলে মা’রব।’

খাবার পরিবেশন করতে করতে পড়ে যান সিতারা বেগম। আমান এসে তাকে টেনে তুলে।

‘রিপ্তি তুমি এটা কি করলে? আমার মাকে এত কষ্ট দিচ্ছ কেন?’

‘যা করেছি একদম ঠিক করেছি। বেশি দরদ না দেখিয়ে তুইও কাজে লেগে পড়।’

আমানের সহ্যের সীমা পেরিয়ে যায়। আমান এসে রিপ্তিকে থা’প্পর মা’রতে চায় তখন রিপ্তি আটকে বলে,
‘এই ভুল করবি না। তোকে পৃথিবী থেকে তুলে দেব আমি। প্রতিশোধের আগুন দেখেছিস। এবার সেই আগুনে জ্ব’লতে দেখবি।’
চলবে ইনশাআল্লাহ ✨

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here