পুরোনো ডাকবাক্স পর্ব -০৯

#পুরোনো_ডাকবাক্স
#তানিয়া_মাহি(নীরু)
#পর্ব_০৯(অতঃপর ঘটনার শুরু আর শেষ এখানেই)

” বল কেন তুই মন্ত্রী সাহেবকে খু*’ন করেছিস বল, তোর এত সাহস হলো কিভাবে?(অফিসার)

প্রশ্ন করার সাথে সাথে লোকটি অফিসারের নাক বরাবর জোরে একটা আঘা*’ত করে। অফিসার ছিটকে মেঝেতে পড়ে যায়। উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত হয়ে যায়।

” আমি বলেছি না আমি বলব? তারপরও আমাকে তুই করে জিজ্ঞেস কেন করবি তুই? শাস্তি দিতে চাইছিস না আমাকে নিজেই যদি নিজেকে শাস্তি দিয়ে দেই তাহলে তোরা তোদের মনস্কামনা পূর্ণ করবি কিভাবে? আমার সাথে খারাপ ব্যবহার না ওকে?

ওখানে থাকা বড় অফিসার সবাইকে শান্ত হতে বলে কারণ বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিপরীত কিছু হয়ে যেতে পারে। নিজেও লোকটিকে শান্ত হয়ে বসতে অনুরোধ করেন। কিছুক্ষণ পর পরিবেশ ঠান্ডা হয়ে যায় কিন্তু পরক্ষণেই লোকটা কান্না করে ওঠে। সেখানে থাকা সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে কান্নার কারণটা কি! অফিসার কাওসার সবাইকে ঠান্ডা হতে বলেন।

” নাম কি তোমার?( কাওসার)

” রফিক।

” জানো তো তাই না তোমাকে এখানে কেন ডাকা হয়েছে?

” হ্যাঁ ওই আমজাদ শেখ নামক জা*’নোয়া*’রের বাচ্চা*টাকে খু*’ন করার অপরা*’ধে।

রফিকের শেষ উক্তি শোনা মাত্র আলিজা রেগে দাঁড়িয়ে যায়। কোন মেয়েই তার বাবা সম্পর্কে খারাপ কথা হজম করতে পারবে না আলিজাও তার ব্যতিক্রম নয়। আরসালের বাবা আলিজাকে বসতে বলে আর চুপচাপ শুনে যেতে বলে।

রফিক প্রথম থেকে বলা শুরু করে–(তার কথায়)

আমি বিয়ে করেছি দুই বছর হয়েছে, বউ নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে আসি। মোটামুটি ভালো বেতনের একটা জব ও পাই পেশা সাংবাদিক। ভালোই চলছিল আমাদের দুজনের সংসার। সারাদিন যত পরিশ্রম করি না কেন রাতে বাসায় ফিরে বউয়ের হাসিমাখা মুখ, খুনসুটি এসবেই আমার দিন কেটে যাচ্ছিলো। আমার আর ওর কাছের বলতে কেউ ছিল না। আমরা দুজনই দুজনের একমাত্র আপন জন ছিলাম। ভালো লাগা খারাপ লাগা আমাদের একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করে নিতে হতো। সে কোন বিষয় নিয়ে রাগ করলে আমি খুব সহজেই রাগ ঠিক করে ফেলতাম কারণ সে রাগ পুষে রাখতে পারতো না।
এভাবে কয়েক মাস কেটে যায় আমাদের। একদিন বাসায় ফিরছিলাম, রাস্তায় গাড়ি থেকে নেমে মিনিট দুয়েক সময় বাসায় হেটে যেতে হয় আমার। প্রতিদিনের মতো হেটেই যাচ্ছিলাম তখন রাত এগারোটার বেশি বেজে গিয়েছে। এক জায়গায় দেখি পাঁচ থেকে ছয়জন লোক মিলে একজনকে মা*’রছে। এক পর্যায়ে পি*’টানোটা খু*’নের পর্যায়ে চলে যায়। খু*’ন করে দলের মাঝখান থেকে একজন বেরিয়ে আসে। আমার ভিডিয়োটা তখনই এক্সপেন্সিভ হয়ে যায় দেখি খু*’নী আর কেউ না সবার প্রিয় মন্ত্রী সাহেব আমজাদ শেখ। আমি অবাকের চড়ম পর্যায়ে চলে যাই। দল থেকে বের হয়ে ছু*’ড়ি ধুয়ে নিজের হাত ও ধুয়ে নিল। আমি একদম এক পাশে থেকে ভিডিয়ো করছিলাম। এমন সময় মন্ত্রী সাহেব নিজেই আমাকে দেখে নেয়। আমি আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ওখান থেকে পালানোর উদ্দেশ্যে দৌঁড়ে পালাই। পিছনে তেমন কাউকে না দেখে বাসায় ঢুকে যাই। ভয় লাগছিল আবার কৌতুহল ও জেগেছিল আমি তো দেখলাম মন্ত্রী সাহেব আমাকে দেখেছে তাহলে আমাকে ধাওয়া করল না কেন তার লোক! আমার রাতের খাওয়া,কাজ ভয়ে উধাও হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর দরজায় নক করার শব্দে ভয় পেয়ে যাই, বুঝতে পারছিলাম না কি করব! দরজা না খুলে দেওয়ায় দরজা ধাক্কানো শুরু করে দেয়। আমি আমার স্ত্রীকে খাটের নিচে লুকাতে বলি সে বুঝতে পারছিল না কি হয়েছে কারণ আমি তো তাকে কিছু বলিই নি। সে আমার কথা শুনতে চাচ্ছিলো না এক পর্যায়ে রাজি হয়ে খাটের নিচে চলে যায়। আমি তাকে বলি যে আমি না বললে যেন বাহিরে বের না হয় সেও মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। আমার স্ত্রী খাটের নিচে গেলে আমি ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দেই। বাহিরে তাকিয়ে দেখি আমজাদ শেখ এর খারাপ কাজের দলবল। তবে কি আমি যা ভেবেছিলাম তাই হতে চলেছে! এই একটা ভিডিয়ো কি আমার জীবন তচনচ করে দেবে? আমি একটুও দেরি না করে নিজের আর স্ত্রীর ক্ষতি হওয়ার ভয় করে ফোনটা সামনে ওদের দিকে বাড়িয়ে দেই।

” প্লিজ আমার ভুল হয়ে গিয়েছে এই নিন ফোন, আমি আর কখনও এরকম কাজ করব না। আমি ভীষণভাবে লজ্জিত প্লিজ মাফ করবেন।

” ভুল যেহেতু হয়েই গিয়েছে এর শা*’স্তি তো পেতেই হবে। এই ফোনটা রাখ আর ওকে ধরে রাখ। দেখ তো রুমে কেউ আছে কি না, মাইয়া মানুষ থাকলে তো কোন কথাই নাই আজকের পাখি পেয়ে যাবি একদম ডানা ছেটে দিবি শা*’লার কত বড় সাহস ভিডিয়ো করে!! এই ধর ওরে… (কয়েক জনকে উদ্দেশ্য করে)

দুজন লোক ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়, আমার বুকের মধ্যে তখন ঝড় শুরে হয়ে গিয়েছে সবটা হারানোর ভয়।

” না প্লিজ ভাই ঘরে কেউ নাই আমারে এবারের মতো মাফ করে দেন, মন্ত্রী সাহেব কোথায়? আমি উনার কাছে ক্ষমা চাইবো সারাজীবন উনার গোলাম হয়ে থাকব।

” কিছু ভুলের জন্য সারাজীবন পস্তাতে হয়।

ভেতরে দুজনের হাসির শব্দ আর আমার স্ত্রীর চিল্লানোর শব্দ শুনতে পাই, একজন বলে ওঠে ” মা*’লটারে পাইছি আইজ রাইতে সজ্ঞোলের মন ভইরা যাইবো ভাই।”

আমি বারবার অনুনয় করতে থাকি ভেতরে স্ত্রীর কান্না শুনতে পাই নিজেকে খুব অপ*’রাধী মনে হচ্ছিলো আমি ছুটোছুটি করছিলাম কিছু করতে পারছিলাম না বারবার আল্লাহকে ডাকছিলাম। দোয়ার সাথে দাওয়া ও তো লাগে কিছু কিন্তু শুধু আল্লাহর কাছে চাইতেই পারছিলাম কিছু করতে পারছিলাম না।

অতঃপর সব শেষ………

এতটুকু বলে লোকটা থেমে গেল, সবাই চুপ হয়ে গিয়েছে তার বর্ণনা শুনে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে লোকটা উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।

সবার যেন তার বলা বর্ণনার ঘোর এখনও কাটে নি। ওদিকে আলিজার চোখ দিয়ে পানি ঝরে যাচ্ছে। হয়তো চোখের এই পানির সাথে বাবাকে দেওয়া সম্মানের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটার পরিবর্তন ঘটছে। আরসাল আলিজার অবস্থা বুঝতে পারে নিজের বাবার করা এরকম অন্যা*”য়ের ঘটনার সত্য সামনে আসায় আলিজা ভেঙে পড়েছে। আলিজার কাধে হাত রাখতেই আলিজা আরসালের দিকে তাকায়।

” আপনি কেন কান্না করছেন? একদম কান্না করবেন না… (আরসাল)

” ওই লোক মিথ্যা বলছে তাই না?

” মিথ্যা বলে কি লাভ হবে বলেন খু*’ন তো সে করেই ফেলেছে শাস্তি তাকে পেতেই হবে। মিথ্যা বলে তো শাস্তি কমাতে পারবে না।

” আমি বিশ্বাস করি না, আমার বাবা এটা করতে পারে না।

” আচ্ছা কান্না থামিয়ে দেখুন কি বলে।

আলিজা কান্না করতেই থাকে তার কান্না যেন থামছেই না। ওদিকে রফিক ও কান্না শুরু করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে নিজেই বলতে থাকে……

প্রায় দুই ঘণ্টা পর একে একে সবাই বাহিরে চলে এসে তৃপ্তির হাসি হাসে আমার স্ত্রীর গলা আর শোনা যাচ্ছিলো না। আমি জ*’বাই করা বকরির মত ছটফট করে যাচ্ছিলাম আর কান্না করে করে আল্লাহকে ডাকছিলাম। আমার মত অসহায় হয়তো সেদিন কেউ ছিল না আমিই একমাত্র আমার নিজের তুলনায় নিজে পরিপূরক ছিলাম।

কিছুক্ষণ পর আমাকে গাড়িতে তোলা হয় খেয়াল করি আমার স্ত্রীকেও দুজন মিলে পাজাকোলে করে গাড়িতে উঠায়। গাড়ি চলতে থাকে, চলতেই থাকে। আমি সারারাস্তা কান্না করে যাচ্ছিলাম। কিছু সময় পর গাড়ি একটা ফাঁকা জায়গায় এসে থেমে যায়।
সবাই মিলে নেমে পড়ে আমাকেও নামিয়ে একপাশে দুই তিনজন মিলে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে। স্ত্রীকেও নামানো হয় তখনও বুঝিনি সে মৃ*’ত লা*’শ হয়ে গিয়েছে। গাড়ি থেকে পেট্রোল নিয়ে তার শরীরে ঢেলে দেওয়া হয়। আমি বুঝতে পারছিলাম কি হতে চলেছে। জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকি। কিন্তু কোন কাজ হয় না, একটা জ্বলন্ত দিয়াশলাইয়ের কাঠি গিয়ে তার শরীরে পরে ব্যাস সব শেষ। ওখানে দুইটা জীবন শেষ হয়ে গিয়েছে সেদিন একটা শুধু শরীর বেঁচে ছিল।

কথা শেষ করে লোকটা নিজের মাথা চুলকিয়ে সব শেষ সব শেষ করতে থাকে। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় সকলের চোখ ছলছল করছিল, কে কি বলবে সবাই বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। সামান্য ভিডিয়োর জন্য একটা মানুষের জীবন শেষ করে দিতে পারে কেউ!

অফিসার কাওসার এবার লম্বা সময় চুপ থাকার পর প্রশ্ন করেন,” আচ্ছা খু*’নটা করলে কীভাবে? কিভাবে জানলে মন্ত্রী সাহেব ওই সময় বের হবে?”

রফিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে,” ওই শা*’লা তো একটা পিঁপড়া, শা*’লারে আমি পা দিয়ে পিষে ফেলেছি। আমার জীবনটা তচনচ করে দেওয়ার পর আমি একটা সেকেন্ড ও ঘুমাতে পারি নি। সবসময় ওই কু*’*ত্তার বাচ্চার বাড়ির আশেপাশে অপেক্ষা করতাম কখন বের হবে হবে সুযোগ পাবো। আর সেদিন ভোরবেলা একপ্রকার গার্ড ছাড়া দেখে সুযোগ আর মিস করি নি।
হাহাহাহাহাহাহ সুযোগ আমি মিস করি নি শা*’লারে শেষ করে দিয়েছি। শেষ সব শেষ, সব শেষ……

আলিজা নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দৌঁড়ে বাহিরে চলে যায়। নেওয়াজ সাহেব ইশারা করে আরসালকেও আলিজা কোথায় গেল তা দেখতে বলে। আরসাল নিজেও এবার বেরিয়ে যায়।
আলিজা পুরো থানায় একটুও দাঁড়ায় নি একদম বাহিরে চলে গিয়েছে। আরসালও আর দেরি না করে আলিজার পিছু নেয়।

বাহিরে বের হয়ে গেলে আরসাল গিয়ে আলিজার হাত ধরে ফেলে। আলিজা নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু কিছুতেই আরসাল তার হাত ছাড়ে না।

” কি হয়েছে আপনার, কোথায় যাচ্ছেন?

” আমার বাবা নামক অপ*’রাধের ঝুলির কাছে সব জানাতে, আমি তার আসল সত্য জেনে গিয়েছি।

” আপনার কোথাও যেতে হবে না এখন।

” আমার যেতে হবে আপনি বুঝতে পারছেন না।

” বললাম তো যেতে হবে না, এখন আমাদের বাসায় যেতে হবে। যা শা*’স্তি দেওয়ার ওই লোকটাকে আইন দেবে।

” তারই বা কি দোষ আছে বলুন। বাহিরে আমার ছোটমাকে দেখেছেন কি কান্না করছে স্বামীর আসল চেহারা সামনে আসায়? এটা জানাজানি হলে সে কোথাও মুখ দেখাতে পারবে? আমার কথা নাহয় বাদই দিলাম।

” এখন কিছু ভাবতে হবে না আপনার, ভেতরে চলুন।

” আমার শেষ রিকুয়েষ্ট এরপর আর কখনও আমার বাবার কাছে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করব না।

” আলিজা…..

” প্লিজ।

” ঠিক আছে চলুন।

আরসাল জানতো আলিজাকে হাজারবার নিষেধ করলেও সে শুনবে না আজকে এখন তার ওখানে যেতেই হবে। মেয়েটা এতদিন বাবা হারানোর শোকে ছিল আর এখন বাবার আসল সত্য সামনে আসায় একদম ভেঙে পড়েছে।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামলে আলিজা গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে বাবার কবরের দিকে যায়। আরসাল ও আলিজার পিছু নেয়।
আলিজা গিয়ে বসে পড়ে সেখানেই কান্নায় ভেঙে পড়ে আরসাল আর তাকে থামায় না চিৎকার করে কান্না করা একটু প্রয়োজন আছে তার। যদি মনটা একটু হালকা হয় তাতে।

” কারও সাথে এতটা অন্যায় না করলেও পারতেন আপনি, এখন তো আপনাকে বাবা বলতেই আমার রুচিতে বাধছে। আপনাকে আমি আমার জীবনে সবথেকে উচু জায়গাটা দিয়েছিলাম এখন আপনার অবস্থান কোথায় জানেন, কোন অবস্থান বাকি নেই আপনার জন্য। এই আমি নাকি বোকার মত এতদিন আপনাকে হারিয়ে কষ্ট পাচ্ছিলাম, ছিঃ কত বোকা আমি। পুরো দুনিয়া তো আমায় ঠকিয়ে গেল, আপনিও ছাড়লেন না। নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে আপনিই পুরো দুনিয়াকে ঠকিয়েছেন আর আপনার পাপের ফলস্বরূপ পুরো দুনিয়া আমাকে ঠকালো।
আপনার স্মৃতি আগলে ছিলাম এই কয়েকদিন আর তো কিছু অবশিষ্ট রইলো না, আমার কেউ রইলো না আমি একা ছিলাম একাই আছি সারাজীবন হয়তো একাই থাকতে হবে। আমাকে কেউ শুভ্র হৃদয়ের শুভ্র ভালোবাসা দিলো না।

আলিজা বিলাপ করে কান্না করতে থাকে আর আরসাল পিছে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে থামানোর মতো কোন সিমপ্যাথি যে আর তার কাছে নেই। মেয়েটার মতো হয়তো সত্যিই আর কেউ এতটা ঠকে যায় নি, ভালোবাসা ছাড়া থাকে নি। তারও তো অধিকার আছে ভালো থাকার, কাউকে ভালোবাসার আর কারও থেকে ভালোবাসা পাবার।

যারা পড়বেন, লাইকটা অন্তত দিয়ে রাখবেন। প্রতিদিন যারা গল্প বিষয়ক মন্তব্য জানান তাদের প্রতি রইলো ভালোবাসা ❣️
চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here