প্রণয় বর্ষণ পর্ব -০৮

#প্রণয়_বর্ষণ (৮)
#বোরহানা_আক্তার_রেশমী
_______________

সকাল সকাল স্পর্শী, তানিয়া, রেণু আপার হাতে হাতে রান্না করে নিলো। দুজনই ভার্সিটিতে যাবে বাড়ি থাকবে শুধু রেণু আপা। রেণু আপাকে সব বুঝিয়ে দিয়েই দুজনেই খেয়ে বের হয় ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। সিড়ি বেয়ে নিচে আসতেই দেখা পায় বাড়িওয়ালার ছেলে নাঈমের সাথে। নাঈম তখন অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে কেবল। তানিয়া আর স্পর্শীকে একসাথে দেখে শুধু সৌজন্যমূলক হাসলো। স্পর্শী আর তানিয়াও কথা বাড়ালো না৷ দুজনেই কিছুটা হেঁটে গলি পার করে। কথায় কথায় তানিয়া পিঞ্চ মে’রে বলে,

‘আজ তোর বডি বিল্ডার নিতে আসলো না?’

স্পর্শী ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘আমার বডি বিল্ডার মানে?’

তানিয়া গলা পরিষ্কার করে। দাঁত বের করে বলে, ‘তুই আজকাল অতিরিক্ত ভুলভাল শুনিস। মন কোথায় থাকে তোর? আমি তোকে ‘তোর বডি বিল্ডার’ বলিনি, বলেছি আমাদের বডি বিল্ডার তোকে আজ নিতে আসলো না কেন?’

স্পর্শী কিছুক্ষণ কপালে ভাজ ফেলে তাকিয়ে থাকে। তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘দেখতেই তো পাচ্ছিস আসেনি। সে যখন আসেনি তার মানে আশে পাশে তার চ্যা’লাগুলো আছে।’

তানিয়া তড়িঘড়ি করে বলে, ‘তুই কেমনে জানলি?’

‘এটা জানার মতোই কথা। সেদিন যখন বি’পদে পড়েছিলাম উনি ছিলো না ঠিকই কিন্তু ২ মিনিটের মাথায়ই উনার চ্যা’লা প্যালা হাজির৷ তারপর থেকেই বুঝছি।’

তানিয়া ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বিড়বিড় করে বলে, ‘রুদ্র ভাইয়ের এতো কিছু জানে বুঝে! বাব্বাহ।’

‘বিড়বিড় না করে জোড়ে বল। আর এসব আজাইরা প্যাচাল বাদ দিয়ে একটা হেল্প কর।’

‘কি হেল্প?’

‘কিছু তো একটা করতে হবে। আমার কাছে জমানো টাকা, আম্মুর কিছু টাকা সব মিলিয়ে এই মাস টা কেটে যাবে কিন্তু তারপর! কোনো জব বা টিউশনি পেলে অনেক ভালো হতো।’

তানিয়াও ভাবে। আসলেই তাই! আর এ মেয়ের যা আত্মসম্মানবোধ তাতে জীবনেও তার থেকে টাকা নিবে না। তানিয়া কিছুক্ষণ ভেবে বলে, ‘দোস্ত সামিরার চাচাতো বোন আছে না! ওর জন্য তো টিউটর খুজতেছিলো। তুই পড়াবি ওকে?’

‘আগে সামিরার সাথে কথা বলতে হবে।’

দুজনে মোড় থেকে রিক্সা নিয়ে ভার্সিটিতে আসে। ভার্সিটির সামনেই রুদ্র দাঁড়িয়ে ছিলো। রুদ্রকে দেখে স্পর্শী ভাবে ইগনোর করে চলে যাবে। রুদ্র আর তানিয়াও একই কথা ভাবে। কিন্তু দুজনের ভাবনা মিথ্যে করে দিয়ে স্পর্শী এগোয় রুদ্রের কাছে। রুদ্র হা করে তাকায় তার দিকে। এ মেয়ে পারলে তার থেকে গুণে গুণে ১০ হাত দুরে থাকে আর আজ নিজে এগিয়ে আসলো! স্পর্শী রুদ্রের কাছে এসে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,

‘রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো দরকার আছে কি? পেছন পেছন তো আপনার চ্যা’লা প্যালা গুলো ঠিকই আসে। আপনার এখানে কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকার কি দরকার?’

রুদ্র অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ঠোঁট চেপে হাসে৷ স্পর্শী ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘ওদিকে তাকিয়ে কি করছেন?’

রুদ্র মুখে গম্ভীরতার ছাপ এনে কপালে ভাজ ফেলে বলে, ‘তুই কিভাবে জানলি আমার চ্যা’লা প্যালা তোর পেছনে ঘুরে? ওদের কি আর কোনো কাজ নাই?’

‘কথা ভালোই প্যাচাইতে পারেন। যায় হোক এমনে ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে নাা থেকে, গু’ন্ডা-মা’স্তানি ছেড়ে একটা জব খুঁজেন। অন্তত ফুপি, ফুপা খুশি হবে।’

আর কিছু না বলে পেছনে ঘুরে তানিয়ার কাছে আসে। পেছন থেকে রুদ্র ফিসফিস করে বলে, ‘আমার জন্য এত্তো চিন্তা! বাব্বাহ।’

স্পর্শী তানিয়ার কাছে আসলেও তানিয়া তখনো হা করে তাকিয়ে আছে। বেচারি শকড। স্পর্শী তানিয়ার বাহুতে গুতো দিয়ে বলে, ‘কিরে! এমন হা করে আছিস কেন? চল।’

তানিয়া নিজের হাতে জোড়ছে চি’মটি কাটে। সাথে সাথেই ‘আও’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। স্পর্শী কপাল চাপড়ে হাত টেনে ভার্সিটির ভেতরে ঢুকে যায়। ক্যাম্পাসে সাফিন, সামিরা, নাহিদ, নীরব সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। তানিয়া আর স্পর্শীকে একসাথে আসতে দেখে সবাই ভ্রু কুঁচকায়। স্পর্শীর বাড়ি যাওয়ার পথ বাম দিকে আর তানিয়ার ডান দিকে। তাহলে দুজন একসাথে কেমনে আসলো! সবার ভাবনার মাঝেই স্পর্শী আর তানিয়া এসে সবার পাশে বসে। সামিরা সন্দিহান গলায় বলে,

‘কিরে বান্ধবী! দুইজন এক সাথে কেমনে?’

স্পর্শী দীর্ঘশ্বাস নেয়। বলে, ‘বলতেছি তার আগে বল তোর কোন চাচাতো বোনের জন্য যেনো টিউটর খুজতেছিলি, পাইছিস?’

সামিরা কিছুটা চেপে বসে স্পর্শীর কাছে। ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘,তুই কেন জিজ্ঞেস করছিস? তুই কি ওর টিউটর পাইছিস? আচ্ছা দোস্ত ছেলে নাকি মেয়ে রে?’

সামিরা শেষের প্রশ্নটা খুশিতে গদগদ হয়ে করে। স্পর্শী ঠা’স করে একটা থা’প্প’ড় দেয় সামিরার হাতে। বলে, ‘সবসময় ছেলে না খুঁজে সিরিয়াস হ। আমি তোর চাচাতো বোনকে পড়াবো।’

সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায়। নাহিদ বলে, ‘তোর বাপের কি টাকার অভাব পড়ছে যে তুই টিউশনি করাবি?’

তানিয়া সবাইকে চুপ করিয়ে ধীরে ধীরে সবটা বলে। সব শোনার পর সবাই চুপ হয়ে যায়। সামিরা নিজেকে সামলে হাসার চেষ্টা করে বলে, ‘চিন্তা করিস না দোস্ত। আমি আজকেই কাকিকে বলবো তোর কথা।’

স্পর্শী কিছু বলে না। একটা টিউশনিতে তো আর হবে না। সে আর রেণু আপা একসাথে থাকবে। তার আরো কিছু করতে হবে। স্পর্শীকে চিন্তা করতে দেখে সবাই হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারে৷ নীরব পাশ থেকে বলে,

‘তুই চিন্তা করছিস কেন? আমরা তোকে স্টুডেন্ট খুঁজে দেবো। একদম চিন্তা করিস না।’

সাফিন নীরবের কাঁধে হাত দিয়ে বলে, ‘আজকে প্রথম কাজের কথা বললি।’

সবাই সাফিনের বলার ধরনে হেঁসে দেয়। নীরব মুখ ফুলায়। এমন একটা বন্ধুমহলের জন্য স্পর্শী হাজার বার শুকরিয়া আদায় করে। যেখানে পরিবারের মানুষগুলো তাকে পর করে দিয়েছে সেখানে বন্ধু গুলো একে একে পাশে দাড়াচ্ছে। এমন বন্ধু বান্ধব ক’জন পায়?

___________
কেটে গেছে ১৫ দিন। স্পর্শী সামিরার চাচাতো বোনের সাথে আরো ১ জন কে পড়ায়। নীরব ১ জনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। মোট ৩ জনকে পড়িয়ে ভালোই সময় কাটে স্পর্শীর। ভার্সিটি শেষ করে ওদের পড়িয়ে আসে। প্রতিদিন রুদ্র সকালে ভার্সিটির সামনে আর বিকেলে সামিরার বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। স্পর্শীর কোনো বারণই সে কানে তোলে না৷ স্পর্শী প্রথম প্রথম বিরক্ত হলেও পরে মেনে নিয়েছে। প্রতিদিনের মতো আজও সামিরার চাচাতো বোনকে পড়িয়ে বাড়ি থেকে বের হতেই রুদ্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। স্পর্শী দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে আসে তার কাছে। রুদ্র বাইক স্টার্ট দিতে দিতে বলে,

‘দ্রুত বাইকে ওঠ। আজ একটু তাড়া আছে।’

‘এতো তাড়া থাকলে আসলেন কেন? আমি একাই তো চলে যেতে পারতাম।’

‘বেশি বুঝিস না৷ একটু পর সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তোকে একা যেতে দিবো! কথা কম বলে বাইকে ওঠ।’

স্পর্শীও আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ বাইকে ওঠে। রুদ্র স্পর্শীকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে বলে, ‘কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা ফ্ল্যাটে চলে যা।’

স্পর্শী মাথা নাড়িয়ে চলে যায়। অন্যদিন রুদ্র দাঁড়ালেও আজ আর দাঁড়ায় না৷ দ্রুত বাইক ছুটিয়ে চোখের নিমিষে হাওয়া হয়ে যায়। স্পর্শী ১ তালা পেরোতেই পেছন থেকে ডাকে নাঈম। স্পর্শী সৌজন্যমূলক হেঁসে তাকায়। এই ১৫ দিনে নাঈমের সাথে টুকটাক পরিচয়ে ভালো বন্ডিং হয়ে গেছে। শুধু স্পর্শীর একার না, তানিয়ারও। নাঈম হেঁসে বলে,

‘আরেকজন কই?’

‘সে অনেক আগেই চলে আসছে। আপনি এই সময়!’

‘আজ তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে চলে এসেছি। মাইন্ড নাা করলে একটা প্রশ্ন করি!’

‘জ্বি অবশ্যই।’

‘বাইকে করে দিয়ে গেলো উনি কে?’

স্পর্শী হেঁসে বলে, ‘আমার ফুপাতো ভাই।’

নাঈম ‘ওহ আচ্ছা’ বলে কিছুটা চিন্তায় পড়ে যায়। স্পর্শী নাঈমের অন্যমনষ্কতা খেয়াল করে চোখের সামনে তুড়ি বাজায়। হেঁসে বলে, ‘মন কোথায়?’

নাঈমও হেঁসে বলে, ‘একজন চু’রি করে নিয়ে গেছে।’

স্পর্শী হাসে। বলে, ‘আচ্ছা তবে আমি যাই৷ পরে কথা হবে।’

নাঈমও সম্মতি দেয়। স্পর্শী ফ্ল্যাটে এসে কলিং বাজালে তানিয়া দরজা খুলে দেয়। রেণু আপাকে এক গ্লাস পানি দিতে বলে সোফায় গা এলিয়ে দেয়। রেণু আপা পানি এগিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে। স্পর্শী খেয়াল করে বলে,

‘কিছু বলবে?’

‘কইতাম কিন্তু..

‘কি হয়ছে খুলে বলো!’

‘আসলে আপা কইতাছিলাম কি আমি এক বাড়ির কাম দেখছি। বাড়ির মানুষ গুলান ম্যালা ভালা। কাইল থেইকা..

‘আর একবার এসব শুনলে খবর আছে।’

স্পর্শীর রাগী গলায় এমন বাক্যে ‘থ’ মে’রে যায় রেণু আপা। পাশ থেকে তানিয়াও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি রেণু আপা। আমরা তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করতেছি আর তুমি অন্যের বাড়ি কাজ খুজতেছো!’

রেণু আপা মাথা নিচু করে নেয়। স্পর্শী কিছু না বলে চুপচাপ রুমে চলে যায়। তানিয়া রেণু আপাকে বোঝাতে থাকে।

________
ভার্সিটি শেষ করে মাত্রই বেরিয়েছে সবাই। স্পর্শী নীরবের দেওয়া স্টুডেন্টকে পড়ানোর জন্য রিক্সা নিতেই হাজির হয় নাঈম। স্পর্শীর দিকে তাকিয়ে হেঁসে বলে,

‘উঠবো?’

স্পর্শী একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে ইতস্তত করে বলে, ‘জ্বী৷’

নাঈম উঠে বসলে স্পর্শী একদম এক কোণে বসে। নাঈম হেঁসে বলে, ‘পড়ে যাবেন তো৷ সোজা হয়ে বসুন।’

স্পর্শী সৌজন্যমূলক হেঁসে বলে, ‘ইটস ওকে। আপনি এ সময়!’

‘ভাবলাম আপনার সাথে একটু ঘুরা যাক।’

‘আমার তো টিউশনি আছে। অন্য..

স্পর্শীকে থামিয়ে নাঈম বলে, ‘কোনো কথা শুনছি না। আপনার বেশি সময় নষ্ট করবো না৷ এসেছি যখন প্লিজ!’

‘কিন্তু..

‘আরেহ সামনে একটা ফুসকার দোকান আছে। অন্তত এক প্লেট ফুসকা? প্লিজ!’

স্পর্শী কি করবে ভেবে পায় না। এই লোকটার সাহায্যের জন্যই তো এখনো তানিয়ার বাড়িতে থাকতে পারছে সে। নয়তো বাড়িওয়ালা সেদিনই বের করে দিতো হয়তো। এভাবে মুখের ওপর নিষেধ করে দিবে? ব্যাপারটা কি ভালো দেখায়! অনেক ভেবে সে হ্যাঁ করে দেয়। এক মুহুর্তের জন্য ভুলে যায় রুদ্র নামক ভ’য়ং’কর মানুষটির কথা। নাঈম খুশি মনে রিক্সাচালককে ফুসকার দোকানের সামনে দাঁড়াতে বলে৷ ফুসকার দোকানের সামনে রিক্সা দাঁড়াতেই দুজন নামে। নাঈম দু প্লেট ফুসকার অর্ডার দিয়ে স্পর্শীর সাথে গল্প জুড়ে দেয়। স্পর্শী বার বার সময় দেখছে। দেড়ি হয়ে গেলে সমস্যা। নাঈম স্পর্শীর অস্থিরতা খেয়াল করে বলে,

‘রিল্যাক্স। কিচ্ছুটি দেড়ি হবে না।’

স্পর্শী কিছু না বলে হাসার চেষ্টা করে। নাঈমের সাথে গল্পে মেতে ওঠে। এর মধ্যেই ফুসকা দিয়ে যায় ফুসকাওয়ালা। দুজনেই হেঁসে হেঁসে খেতে শুরু করে আর গল্প করে। স্পর্শী কেবল দুটো ফুসকা মুখে পুড়েছে সে সময়ই ঠা’স করে থা’প্প’ড় পড়ে তার গালে৷ গাল জ্বা’লা করে ওঠে। এক মুহুর্তের জন্য মনে হয় দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেছে। হাত থেকে ফুচকার প্লেট ততক্ষণে পড়ে গেছে। নাঈম তাড়াতাড়ি আগলে নেয় স্পর্শীকে। স্পর্শী মাথা তুলে রুদ্রকে দেখেই আঁতকে ওঠে। ২য় বারের মতো থা’প্প’ড় খেয়ে সে হতভম্ব। নাঈম স্পর্শীকে আগলে নিয়েছে বিষয়টা যেন হজম করতে পারে না ক্ষ্যা’পা রুদ্র। চোখ দিয়ে আ’গুনের ফুলকি পড়ছে। স্পর্শী নাঈমের হাত ছাড়িয়ে কেবল দুপা এগিয়েছে রুদ্রের দিকে আর সাথে সাথেই নাঈমের নাক বরাবর ঘু’ষি পড়ে…

চলবে..
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here