প্রেমের খেয়া পর্ব ১০

#প্রেমের_খেয়া
#লেখিকা_জান্নাতুল_মীর
#পর্ব_১০

আজ থেকেই মায়ার এক মাসের সব খরচ সামরান বহন করবে। শর্তানুযায়ী এই এক মাসের প্যাকেজে মায়াকে প্রতিদিন কলেজ নিয়ে আসা থেকে শুরু করে সব কিছুই দিবে। সকাল বেলা মায়া কলেজে চলে এসেছে। বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলো। নবাবী ভঙ্গিতে মায়াকে কলেজ পৌছে দিল। কলেজের বাকি সবাই এতে জ্বলে পুড়ে শেষ।

কলেজ ছুটি হতেই মায়া বেরিয়ে আসে। প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে কিছু মুখে না দিলে মায়ার বোধহয় প্রাণই বেরিয়ে যাবে। কলেজ গেইটে এসে দাড়াতেই গাড়ির হর্ন শুনে পেছনে ফিরে তাকালো মায়া। মায়ার বুঝতে বাকি রইলো না যে সামরানের গাড়ি। যদিও সামরান নিজে আসবেনা কিন্তু গাড়ি দেখে মায়ার চিনতে অসুবিধে হয় নি। সকাল বেলাও এই সেম গাড়ি এসেছিলো। গাড়ির পেছনের দরজা খুলে মায়া বসে পড়লো। গাড়িতে বসে দরজা ধপ করে বন্ধ করে দিলো মায়া। অস্থির কন্ঠে বললো,

— তাড়াতাড়ি চলুন প্লিজ। আমার খিদে পেয়েছে।

— এত খিদে? আপনি কি কলেজে হাল চাষ করেছেন?

মায়া নিচের দিকে তাকিয়ে কথাটি বলেছিল। কিন্তু অলর কন্ঠস্বর টি কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই মায়া চমকে সামনে তাকালো। ড্রাইভিং সিটে বসে আছে সামরান। নিজের কথা শেষ করে পেছনে ফিরে তাকালো। মুখে মৃদু হাসি চিহ্ন। মায়ার দৃষ্টিজোড়া আটকে গেল। কণ্ঠনালী যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ঠোঁট চেপে ধরল।

–সস্যার আপপনি?

— কেন? আশা করেন নি নাকি?

— না মানে সকালে তো ড্রাইভার ছিল তাই। কথা শেষ করেই মায়া দৃষ্টি নত করে নিলো। সামরান হাসলো।

— আমি ফ্রী ছিলাম। ভাবলাম নিজেই সার্ভিস দিয়ে দিই।
তা বলুন কলেজে কি এমন করলেন যে খিদে পেয়ে গেল। ভ্রু নাঁচিয়ে প্রশ্ন করল সামরান।

— কিছু না। একটু বেশিই হাসাহাসি করেছি তো তাই খিদে পেয়ে গেছে।

— এত হাসবেন না। হাসা পাপ। সামনে ফিরে লুকিং গ্লাসে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলে সামরান।

সামরানের কথা শুনে মায়ার ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো। হাসা পাপ মানে? কি বলে এই লোক? হাসলে কেন পাপ হবে?

–হাসলে শরীর মন ভালো থাকে। হাসলে কেন পাপ হবে?

— এত কথা বাদ। চলুন আপনাকে আগে কিছু ঠুষে দিই তারপর বাড়ি দিয়ে আসবো।

সামরানের কথা শুনে মায়া চমকে তাকালো।

–মানে? ঠুষে দিবেন মানে?

গগন কাঁপানো হাসি দিল সামরান। সামরানের এহেন হাসিতে মায়ার রাগ হলো। সামরান পেছনে ফিরে বলল,

— মানে কিছু খাইয়ে দিই। খিদে পেয়েছে তো?

— এএসব কি ভভাষা।
মায়ার কথা শুনে সামরান আবারো হাসলো।

— আপনি বুঝবেন না। শুদ্ধ বাংলা।

গাড়ি স্টার্ট দিলো সামরান। লুকিং গ্লাসে বার বার মায়াকে দেখছে। কিছুদূর গিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিলো। তারপর পেছনে ফিরে বলল,

— বসুন ২মিনিট আমি আসছি। বলেই বাহিরে বেরিয়ে গেল সামরান।

পুলের পাশেই একটি ডিভানে বসে আছে শেহেরজাদ। সিগারেট ধরিয়ে টান দিতেই ধোয়া চারদিকে ছড়িয়ে গেল।
এক হাতে সিগারেট আর অন্য হাতে অর্ধ শুকনো একটি কাগজ। কাগজের লেখা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এটা সেই কাগজ যেই কাগজ সিমি পুলের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। দু-তিনবার টান দিয়েই সিগারেট ছুড়ে ফেলে দিল। কাগজটিতে হাত বুলাতে থাকে শেহেরজাদ। মাথার চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। কপালের সামনে কিছু চুল ঝুলছে।

— তুমি এখনো আমাকে আপন করে নিতে পারো নি। এই সামান্য কাগজ তোমার মনে যত জায়গা করে নিয়েছে আমি ততটা পারি নি। কেন? আমার ভালোবাসায় কি কমতি ছিল? কেন তুমি নিজের মনের কথা আমাকে বলো না? আমাকে এক বার বললে আমি পুরো দুনিয়াটা তোমার হাতের মুঠোই এনে দেব। কিন্তু তুমি তো বলোই না।

ডিভানেই শুয়ে পড়ে শেহেরজাদ। চোখ জোড়া রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। কপালের রগ ফুলে উঠেছে। চোখ বন্ধ করতেই রগ গুলো আরো ফুলে উঠল। কাঁপছে রগগুলো। দাতেঁ দাতঁ চেপে নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে শেহেরজাদ।

অনেক্ষণ হল সামরান গেল। এখনো এলো না। মায়া গাড়ির দরজা খুলতে গেলেই অবাক হলো। গাড়ি লক। সামরান গাড়ি লক করে গেল কেন? কোথায় গেল উনি?
মায়ার ভাবনা ভঙ্গ করে সামরান গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে পড়ল। হুট করেই সামরান ভেতরে বসাতে মায়া অনেকটা পিছিয়ে গেল। সামরান ভ্রু কুঁচকালো,

–কুললল! এই নিন খাবার। খিদে পেয়েছিল তো? খেয়ে নিন।
সামরানের হাতে খাবার। বার্গার, জুস,স্যান্ডউইচ।

–এসব কেন আনতে গেলেন? আমিতো বাসায়ই যাচ্ছিলাম।

–সারা রাস্তায় খিদেই কষ্ট করতেন? আমার সার্ভিসের মধ্যে পড়ে না। যাই হোক খেয়ে নিন। বলেই মায়ার সামনে রেখে দিল সামরান। সোজা হয়ে বসে পড়ল সামরান।

মায়া বার্গারে কামড় বসালো। সামরানের ফোন বেজে উঠলো। ফোন বের করে রিসিভ করল। কথা বলতে বলতে বের হয়ে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে সামরান। লুকিং গ্লাস ঠিক করে তাকালো। মায়ার মুখ দেখে মৃদু হাসল।

— তাকে ব্যস্ত রাখো। এই দুই শব্দের নাম নেওয়ার ফুরসত ও যেন তার না মেলে। প্রয়োজনে টাকার এমাউন্টও দ্বিগুণ করে দাও। শুধু খেয়াল রেখো সে যেন ফুরসত না পায়। এই নাম তার মুখে শোভা পায় না। বলেই হাসলো সামরান। মুখে হালকা হাসি। আর চোখ জোড়া লুকিং গ্লাসে স্থির।

সামরানের কথা শুনে মায়া ভ্রু কুঁচকালো।

বড়লোকদের এই একটাই সমস্যা। সবসময় টাকার গরম দেখায়। না জানি কার উপর কাজের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। বেচারা! মনে মনে অচেনা ব্যাক্তির জন্য প্রার্থনা করতে লাগল মায়া।

ড্রয়িংরুমে বসে কথা বলছেন সামাদ মালিক। সামনেই বসে আছে বড় বড় রাজনীতিবিদ। সামাদ মালিক তারই সিটির মেয়র পদে আছেন। সামনেই নির্বাচন। তার লক্ষ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ। রাজনীতিতে বিগত ৫বছরে অনেক অনেক সুনাম অর্জন করেছেন তিনি। তাই নির্বাচনে তার জয় নিশ্চিত। কিন্তু বিরোধীদলের নেতারা পথের কাটা স্বরুপ রয়েই গেল। কিছুতেই তারা সামাদ মালিক কে জিততে দেবে না।
উপর থেকে সামাদ মালিক কে দেখছেন সেলিনা মালিক। এই বাড়িতে সবাই সবার মত ব্যস্ত। সামরান টা যতক্ষণ বাড়ি থাকে ততক্ষণ মায়ের পিছু পিছু ঘুর ঘুর করে। কিন্তু ছেলেটা কাল রাত থেকে বাড়ি ফেরেনি। ফোন করেও লাভ হয় নি। ছেলেটা থাকলে সেলিনা মালিকের ভালোই লাগে। বাচ্চার মত এটা ওটার বায়না ধরে।

মায়ার বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই সামরান পেছনে ফিরে তাকালো।

–এসে গেছি।

— থ্যাংক ইউ! মৃদু হেসে গাড়ির দরজায় হাত রাখতেই মায়ার ফোন বেজে ওঠে। মায়া গাড়িরে বসেই ফোন রিসিভ করল। ওপাশের ব্যাক্তির কথা শুনে মায়ার মুখ জুড়ে খুশির ঝলক ছড়িয়ে পড়ল।

–কীহ্ সত্যি তুমি নিউ জব পেয়েছো। ওয়াও স্যালারিও অনেক ভালো। যাক মিষ্টি কখন খাওয়াবে?

— বিকেলে নিয়ে আসবো? নাকি দেখা করবে তুমি?
ওপাশ থেকে বলে ওঠে রাহাদ।

— আমি বের হতে পারবো না। তুমিই এসো।

— আচ্ছা আমি আপনার মিষ্টি নিয়ে বিকেলেই হাজির হবো ম্যাডাম। বলেই রাহাদ ফোন রেখে দিলো।

সামরানের বুঝতে বাকি রইল না ফোনটা রাহাদের ছিলো।
শক্ত হাতে গাড়ির স্টেয়ারিং চেপে ধরলো। চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে। মায়া গাড়ি থেকে বের হয়ে সামরানের সিটের গ্লাসে নক করে। সামরান গ্লাস নামিয়ে দিলো।

— থ্যাংক ইউ!! আসছি।

সামরান মায়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। উত্তরে কিছুই বললো না। মায়া চলে যেতেই সিটে মাথা এলিয়ে দিল।
এক হাতে নিজের মাথার চুল চেপে ধরলো। গাড়ি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিল। চোখ জোড়ায় যেন তপ্ত আগুনের লাভা উপচে পড়ছে। এই বুঝি কাউকে ভষ্ম করে দেবে। কালো মুখশ্রী আরো কালো বর্ণ ধারণ করল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামেরা আসর বসিয়েছে। চোখ জোড়া চিকচিক করছে। চোখের কোণ লাল হয়ে আছে।

দু হাত ভর্তি মিষ্টি নিয়ে আসে আমীর। সুখবর শেহনাজ কে দিতেই শেহনাজ আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করল।
বাড়িতে প্রবেশ করে মিষ্টি দেখেই মায়া খুশি হয়ে গেল।

— ছোট মা এত মিষ্টি কেন?

— তোর বাবার প্রমোশন হয়েছে সেই খুশিতেই। হাসি মুখে বলে শেহনাজ।

— ওয়াওও! তাহলে আমি আগে খাই। বলেই মায়া মিষ্টি মুখে পুরে দিল।

— আগে তুই খা। তোর জন্যই তো এনেছি। তুই ছাড়া আমার কাছে এত বিশেষ কেউ নেই। টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে এসে চেয়ারে বসে আমীর।

-কংগ্রেচুলেশন ছোট আব্বুউউ!! জড়িয়ে ধরে মায়া।

— হুম থ্যাংক ইউ ডিয়ার।

–আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।

— আচ্ছা যা। মায়া নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো।

অফিসে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে সামরান। ম্যানেজার সামনে দাড়াতেই ম্যানেজার কে সজোরে গলা চেপে ধরে।

— আমি কি বলেছিলাম? কি বলেছিলাম আমি? তাকে ব্যস্ত রাখতে? আর কি করলে তোমরা?

— সস্যারর আজজ ততো প্রথমম দদিন ছিলল ততাই। ম্যানেজার এর কন্ঠস্বর ভেঙ্গে আসছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।

–আমি এত এক্সকিউজ চাই না। আমি শুধু বুঝি সে ব্যস্ত থাকবে। কপাল বেয়ে পড়া ঘাম ও যেন সে মুছতে না পারে। আর যদি এমন না হয় তাহলে কাপন পরার জন্য রেডি থাকবে। এটা নিশ্চয় জানো আমার হাতে কাপন পরতে হলে খুব একটা আনন্দদায়ক হবে না। সো বি কেয়ারফুল!

দাতেঁ দাতঁ চেপে কথা গুলো বলে এক ধাক্কায় ম্যানেজার কে সরিয়ে দিল সামরান। দেওয়ালের সাথে আঘাত লেগে ম্যানেজার এর কপালের সাইড ফেটে যায়। রাগে সামরানের সারা শরীর থরথর করে কাপঁতে থাকে। সোফায় বসে নিজের মাথা দুহাতে চেপে ধরে সামরান।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here