প্রেমের খেয়া পর্ব ৮

#প্রেমের_খেয়া
#লেখিকা_জান্নাতুল_মীর
#পর্ব_৮

নিস্তব্ধ পরিবেশ!! চারপাশে শুধু ঝিরিঝিরি বাতাসের শব্দ।
রকিং চেয়ারে বসে আছে সামরান।চোখ জোড়া সামনে থাকা ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্থির।ল্যাপটপের স্ক্রিনে রাহাদ আর মায়া। মায়ার হাত ধরার দৃশ্য টা বার বার দেখছে সামরান। চোখ জোড়া লাল বর্ণ ধারণ করেছে। শ্যাম বর্ণ মুখটায় যেন আরো অন্ধকার নেমে এলো। চেয়ারে মাথা এলিয়ে দুলতে থাকে সামরান।আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। গম্ভীর কন্ঠে বলে,

“-নাম,কি করে,কোথায় থাকে,সব আমার চাই!! গার্ডরা সামরানের দিকে একবার তাকালো তারপর বললো,
“-চিন্তা করবেন না স্যার আমরা সকাল হওয়ার আগেই আপনাকে সব ইনফরমেশন এনে দেবো। বলেই বেরিয়ে গেলো গার্ডরা।সামরান মাথা হালকা তুলে ল্যাপটপের দিকে তাকালো।
তারপর আবারো মাথা এলিয়ে দিলো।শূন্য দৃষ্টি রেখে বললো,
“-যেটা আমার!সেটা শুধুই আমার।সামরান মালিক তার কোনো কিছুতে কারো সামান্যতম হস্তক্ষেপ মেনে নেয়নি আর নেবেও না।আর যে এই কাজ করার দুঃসাহস দেখাবে তার পরিণতি হবে মৃত্যু। আর জিনিসটি যখন স্বয়ং অলকানন্দা তখন মৃত্যু তো অনিবার্য!!বলেই হালকা হাসলো সামরান।

সেলিনা মালিক স্টোর রুমে বসে আছে।সামনেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অবেক গুলো ছবি। হালকা আলো জ্বলছে স্টোর রুমে। ধুলো বালিতে অর্ধেক নষ্ট হয়েছে ছবিগুলোর।
সেলিনা মালিক একটি ছবি হাতে তুলে নিলেন।তারপর আঁচল দিয়ে ছবিটি পরিষ্কার করার চেষ্টা করলেন।কিন্তু না ছবিটি অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে।পরিষ্কার হবে কি করে? আরো কয়েকটি ছবি হাতে তুলে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে সেলিনা মালিক।

“-আমি অনেক পাষাণ! তোর খোঁজ ও আমি নিই না।আমার মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে যে আমার একটা ছেলে না আমি দুই সন্তানের মা।আমার ছেলে দুইটি। কিন্তু আমি চাইলেও বলতে পারবো না।তুই কি কখনো ফিরে আসবিনা? আমি কি আর আমার আগের সেই পরিবার, আমার সেই সুখের সংসার ফিরে পাবোনা।কেন এমন হয়ে গেলো সব?কেন আমার সুখের সংসার টা এইভাবে এলোমেলো হয়ে গেলো? এতো বড় বাড়িতে শুধু ৩জন মানুষ। একজনের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নই। আমার সামরান ও আগের মত নেই।একজন কে আমি হারিয়ে ফেলেছি।আর একজন থেকেও যেন নেই। বাড়িতে তার সামান্য আওয়াজ ও পাওয়া যায় না। আছে কি নেই সেই আভাস ও পাওয়া যায় না।কেন এমন হতে হলো?এমন হওয়াটা কি খুব দরকার ছিল? কেন সবাই আমার ভেতর টা বুঝতে চায় না।

কথা বলতে বলতে ছবিটি বুকের থেকে আলাদা করে হাত বুলায় সেলিনা মালিক।

তুই কি কখনো ফিরে আসবিনা? আসবিনা?চোখ থেকে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে সেলিনা মালিকের।চোখের পানিতে শাড়ির আঁচল ভিজে যাচ্ছে। একজন মায়ের কষ্ট হয়তো এমনই। বেচেঁ থেকেও সন্তান কে মৃত বলে পরিচয় দেওয়াটা যে কত কষ্টের তা শুধু সেই মা জানে। মায়ের হৃদয়ের হাহাকার মিটবে এমন জিনিস দুনিয়াতে নেই।সন্তানের অভাব সেই মা কে আজীবন পোড়ায় যে মা নিজের সন্তান কে মৃত বলে পরিচয় দেয়।
কাদঁছে সেলিনা মালিক।প্রতিবছর এই দিনে সেলিনা মালিক স্টোর রুমে এসে কাদেঁ। কেউ হয়তো জানতে পারেনা।

ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে পড়ে শেহেরজাদ।অফিস থেকে এসে কাজ করতে করতে ডিভানে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।হঠাৎ করেই একটা বাজে স্বপ্নে ঘুম ভেঙে গেলো শেহেরজাদের। ঝরঝর করে ঘাম ছুটে গেলো শেহেরজাদের।পাশে পড়ে থাকা রিমোট তুলে নিয়ে এসি বাড়িয়ে দিলো।নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে যায় শেহেরজাদের।শার্ট খুলে খালি গা এলিয়ে দেয় ডিভানে।সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। রান্না ঘরে কাজ করছিলো সিমি।এসির ঠান্ডা আভাস পেতেই ড্রয়িং রুমে আসে সিমি। এসে শেহেরজাদের সেই চিন্তিত চেহারা দেখে থমকে যায় সিমি।এগিয়ে এসে শেহেরজাদের কপালে হাত রাখে।সিমির হাত ভিজে যায়।শেহেরজাদ এত ঘেমেছে কেন?এসি তো ঠিক আছে…
সিমির হাতের স্পর্শ পেয়ে শেহেরজাদ চোখ মেললো।

“-আপনি ঠিক আছেন?সমস্যা হচ্ছে কোনো?
“-নাহ ঠিক আছি! শোয়া থেকে উঠে বসে বলে শেহেরজাদ। সিমি পাশে বসে। গায়ের ওড়না দিয়ে শেহেরজাদের কপালের ঘাম মুছে দিতে থাকে।শেহেরজাদ সিমির দিকে তাকালো।সিমি শেহেরজাদের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বললো,
“-হ্যাপি বার্থডে!!
শেহেরজাদ সিমিকে হুট করেই জড়িয়ে ধরে। সিমি একটু হেলে যায়। পরে এক হাতে ডিভানে ভর দিয়ে সামলে নেয় নিজেকে।অন্যহাত শেহেরজাদের পিঠে রাখে,
“-কি হলো?আপনি ঠিক আছেন?
“-৪টা বছর হয়ে গেলো সিমি।আজ চার বছর! আমার আবার খারাপ লাগছে। আজকের দিনটা কেন আসে সিমি।আমি কিছুতেই এই দিনটা সহ্য করতে পারিনা।এই দিনটা অনেক ভারী আমার জন্য।আমার ইচ্ছে করে নিজে নিজেই খুন করে দিই।
শেহেরজাদের কথা শুনে সিমি আঁতকে উঠে। সরে আসে সিমি।শেহেরজাদের গালে হাত রাখে,
“-কেন এমন করছেন? একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।দেখবেন সব খুব শীগ্রই ঠিক হয়ে যাবে।
“-হচ্ছে না তো!অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে শেহেরজাদ।
“-হবে আমি বললাম তো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।বলেই শেহেরজাদের কপালে চুমু খেলো সিমি। চুমু দিয়ে সরে আসে সিমি তারপর বলে,
আপনার জন্য আজ আমি অনেক মজার মজার খাবার রান্না করেছি।চলুন খাবেন।সব আপনার পছন্দের।বলেই যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো সিমি।
শেহেরজাদ সিমির হাত ধরে নেয়।হাতে টান পড়তেই সিমি পেছন ফিরে তাকালো।কাপাস্বরে বললো,
“-কি হলো?
শেহেরজাদ উঠে সিমিকে কাছে টেনে নেয়।তারপর বলে,
“-আমায় গিফট দেবে না?
“-আমি তো বাহিরে যায়নি।কিছু আনতে পারিনি।কি দেবো? অসহায়ের মত মুখ করে বলে সিমি।শেহেরজাদ ঠোঁট কামড়ে হাসলো।তারপর সিমির চুল একপাশে নিয়ে আসে।কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“-একটা বাবু দিয়ে দাও! অনেক তো হলো।এবার কেউ আসুক!!
শেহেরজাদের কথা শুনে সিমি চোখ বন্ধ করে নিলো।ঢোক গিললো কয়েকবার।শেহেরজাদ সরে এসে সিমির দিকে তাকালো।সিমি চোখ বন্ধ করে আছে দেখে সিমির চোখের পাতায় চুমু দিলো।সিমি চট করেই চোখ খুলে নিলো,
“-কি হলো!
“-রান্না ব বসিয়ে এসে এসেছি।য যাই…?
“-শেহেরজাদ ছেড়ে দিলো সিমিকে।হালকা হেসে বললো,যাও”!
সিমি লম্বা পা ফেলে রান্না ঘরে চলে এলো। ফ্রিজ ঘেঁষে ফ্লোরে বসে পড়ে সিমি।নিজের মুখ নিজেই চেপে ধরে।
“-কাউকে চাইনা আমি!কাউকে না। আমি কাউকে চাইনা।বলেই কাদঁতে থাকে সিমি।দু’হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে পাছে কান্নার আওয়াজ শেহেরজাদের কানে আসে!!

শেহেরজাদ ডিভানে বসে পড়ে।বড় নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,
“-আজকের দিন যতই খারাপ হোক।সেই আচ আমি তোমার উপর আসতে দেবো না। তোমার মন খারাপের কারণ আমি হতে চাইনা। তোমার খুশির আগে আমার এই মন খারাপ কিছুই না।কিছু না….!!!

টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে আছে সেলিনা মালিক।সব সামরানের পছন্দের খাবার।সামরান এখনো আসছেনা।৩টা বাজছে। সেই অনেক্ষণ ধরে বসে আছে সেলিনা মালিক।সামাদ মালিক উঠে এসে সেলিনা মালিক এর পাশে এসে দাঁড়ায়,

“-ও আসবেনা তুমি কেন অপেক্ষা করছো।
“-আবারও?কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলে সেলিনা মালিক।
“-এই দিনে ও থাকে বাড়িতে? আশা করাটা বোকামী নয় কি?
“-আজ ওর জন্মদিন…বলেই কেদেঁ দিলো সেলিনা মালিক।সামাদ মালিক সেলিনা মালিক কে জড়িয়ে ধরে।

সামনে থাকা কাচের বোতলে শুট করছে সামরান।প্রচন্ড আওয়াজে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছে। সামরান একের পর এক শুট করেই চলেছে। চোখ গুলো জ্বলজ্বল করছে।চোখের চারপাশ সাদা থেকে লাল হয়ে এসেছে। কপালের রগ ফুলে উঠেছে। দপদপ করছে। কন্ঠনালী একবার ভেতরে দেবে আবারো ভেসে উঠছে।প্রচন্ড গরমে ঘামছে সামরান। হঠাৎ একজন গার্ড এসে বলে,

“-স্যার ছেলেটির নাম রাহাদ আহমেদ”!
সামরান থেমে যায়।পেছনে ফিরে গার্ডের দিকে তাকালো। গার্ড মাথা নিচু করলো। সামরান এগিয়ে এসে গার্ডের সামনে দাঁড়ায়।

কোমরে ওড়না গুজে সিলিং ফ্যান পরিষ্কার করছে মায়া।চুল গুলো খোপা করে রেখেছে।কাটা চুল কানের পাশে গুজে রেখেছে। চেয়ারের উপর টুল দিয়ে সেখানে দাড়িয়েছে মায়া।
শেহনাজ রান্নাঘর থেকে এসে মায়াকে এইভাবে দেখে ডাক দিলো,
“-এখানে কেন উঠেছিস,যদি পড়ে যাস।শেহনাজের কথা অনুসরণ করে পেছনে ফিরতে গেলেই মাগা পা ফসকে পড়ে গেলো।
শেহনাজ ছুটে গিয়ে ধরলো,
“-দিলে তো ছোট মা!সব ঠিকঠাক ছিলো তোমার কারণে আমার কোমর। আহহহহ!বলেই কোমরে হাত রাখলো মায়া।
“-আহারে সরি রে বাবু।খেয়াল করিনি আয় আমি গরম পানি করে আনছি।তুই বসে থাক এখানে।
“-গরম পানি কেন”! চিৎকার করে বলে উঠে মায়া।
“-কেন মানে।সেক দেওয়ার জন্য!!
“-ওহহহ!আচ্ছা যাও। জোর করে হেসে।

ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফেরে আমীর। সোফায় বসে চোখের চশমা খুলে টেবিলে রাখলো।মায়া পাশে এসে বসে।
“-কি ছোট আব্বু এত চিন্তিত দেখাচ্ছে তোমাকে?কিছু হয়েছে।
“-না কিছু হয়নি? তুই কেমন আছিস।শুনলাম ব্যাথা পেয়েছিলি?
“-এখন ঠিক আছি এত ব্যাথা পাইনি।
“-যা ভেতরে গিয়ে রেস্ট নে।
“-আচ্ছা।মায়া ভেতরে চলে যেতেই শেহনাজ এসে পাশে বসে।
“-কি হয়েছে?তোমাকে অনেক চিন্তিত দেখাচ্ছে?
“-আমাদের কোম্পানি টা হুট করেই সেল করে দিলো। জানিনা চাকরী টা থাকবে কি না..কারণ নতুন বস কেমন হবে তা এখনো কেউ জানেনা।
“-হুট করেই বিক্রি কেন করলো?
“-জানিনা।কোনো কথা নেই বার্তা নেই হুট করেই।
“-কোনো ঝামেলা হয়নি তো?
“-না তা হয়নি।
“-তাহলে…?
“-জানিনা..!
“-,চিন্তা করোনা। কিছু হবে না।আল্লাহ যা করেন ভালোই করেন। অভয় দিয়ে বলে শেহনাজ।
“-তাই যেন হয়…বলেই হালকা হাসলো আমীর।

বিঃদ্রঃ কারেন্ট ছিলো না কালকে তাই দিতে পারিনি।আর এর আগে ঝামেলায় ছিলাম অনেক। সবাই গল্প দেরীতে দিই এই কারণে অভিযোগ আনেন। আমার পড়া আছে।তার উপর ঘরের কাজ। তার উপর আবার দুইটা গল্প রানিং।সব সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। #শুধু_আমার শেষ করার আগে এই গল্প আর পাবেন না।কিছুদিনের মধ্যেই শেষ করে দেবো।তারপর এটা নিয়মিত দিবো।নাহলে আমার উপর খুবই প্রেশার পড়ে যাচ্ছে। দেরীতে দেওয়ার জন্য দুঃখিত!!

হ্যাপি রিডিং……

চলবে………

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here