প্রেয়সীর শব্দপ্রেম পর্ব -১৩

#প্রেয়সীর_শব্দপ্রেম
#ফারজানা_মুমু
[১৩]

রোদের উত্তাপে ঘরে থাকা দায়। কৃষ্ণকালো মেঘের ছিটেফোঁটা নেই আকাশ জুড়ে। সূর্যের তেজে জ্বলছে দেশ। গরমে অতিষ্ট জনগন। ট্যাংকির পানি ফুটন্ত গরম। চা পাতা দিলেই গরম-গরম চা হয়ে যাবে। বিদ্যুতের কথা না বললে নয়। ঘণ্টায় আসে মিনিটে থাকে এমন অবস্থা। খাঁ-খাঁ গরমের উত্তাপ বিষাক্ত করে তুলে শরীর। শান্তি নেই কোথাও। শহরের প্রতিটি ফ্ল্যাট জ্বলন্ত আগুনের ন্যায় উত্তাপ। ঘরে-বাইরে কোথাও শান্তিতে থাকা যাচ্ছেনা। ঝুমঝুমি ঘেমেনেমে একাকার। শরীরের ঘাম বোরকায় দেখা যায়। রুমাল দিয়ে মুখ মুছে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে বাসের জন্য। তৃষ্ণায় বুক ফেঁটে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কত যুগ ধরে পানি পান করছে না।
-” পানি খাও,ঠান্ডা পানি ভালো লাগবে।

আষাঢ়কে দেখে ঝুমঝুমির রাগ হলো না। মনে-মনে আষাঢ়কে খুঁজছিল সে। এতদিনে আষাঢ়ের হাবভাব দেখে অভ্যস্ত সে। পানির বোতল হাতে নিয়ে এক চুমুকে অর্ধেক শেষ করে বলল, ধন্যবাদ।
-” শুধু ধন্যবাদ? ভালোবাসা নয়?
-” বলেছি তো সময় লাগবে।
-” আজ দশদিন হয়ে গেল। সময় শেষ হয়নি?
-” আরো লাগবে।
-” ব্যাস আরো দিলাম সময়। সময়ের শেষ তিথিতে উত্তর কিন্তু ‘হ্যাঁ’ চাই।

আষাঢ়ের বাচ্চামো কথা শুনে মুচকি হাসলো ঝুমঝুমি। এক হাসিতেই কাবু আষাঢ়। বুকের ভিতরে ঢিপঢিপ শব্দ করছে। প্রসারিত হাসলো নিজেও। ঝুমঝুমির ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে বলল, তুমি আমার প্রেমে পরে গেছ তেজপাতা।
-” মোটেও নয়।

নিজের মনোভাব আড়াল করার চেষ্টা করল ঝুমঝুমি। আষাঢ় বাঁধ মানলো না। নিজের মতো করে কথা বলতে লাগলো। ঝুমঝুমি বিরক্ত না হয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনলো আষাঢ়ের কথা। ঠোঁটে লেগে আছে মিষ্টি হাসি, আনন্দের হাসি, তৃপ্তির হাসি।

এদিকেই বাইক নিয়ে আসছিল মেঘ। হঠাৎ ওর চোখ যায় বেঞ্চে বসা দুজন কপোত-কপোতীর পানে। মেয়েটিকে সে চিনে কিন্তু ছেলেটি? এই প্রথম কোনো ছেলের সাথে ঝুমঝুমিকে হেসে-হেসে কথা বলতে দেখে পুরো শরীর কেঁপে উঠল। রাগ বাড়লো দ্বিগুণ। শরীরের শিরা-উপশিরায় রক্ত দ্বিগুণ গতিতে বইতে লাগলো। হাতের মুষ্টি শক্ত হলো। চোখ দুটো জ্বলন্ত আগুনের ফুলকি। দু’হাত চেপে ধরলো মাথার চুল। হিংস্র রূপের মেঘকে দেখতে পেলো না ঝুমঝুমি। সে তখন আষাঢ়ের কথাতেই মত্ত। ঝড়ের বেগে বাইক চালিয়ে পিছন রাস্তা ধরল। ইচ্ছে করেই ঝুমঝুমির সামনে দাঁড়ালো না। ঠোঁটে শয়তানি হাসি। ঘাড় নেড়ে লোকিং গ্লাসে নিজেকে দেখে বিড়বিড় করল, খুব শীগ্রই বিয়ের পিঁড়িতে বসবি ঝুমঝুমি।

______________

রুমের ভিতরে টিশার্ট পরে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে নীরা। খানিক পূর্বেই তৃষ্ণা পানি-পানি করে মুচেছে ফ্লোর। জানালায় ভিজা গামছা রাখা । বাড়িওয়ালি আন্টিদের ফ্রিজে কয়েক বোতল পানি রেখে ওইগুলো পানি ভর্তি বালতিতে ভিজিয়ে রেখেছে জানালার ধারে। ফ্যান চালু করায় রুমের ভিতরে শীতল হাওয়া বইছে। ঝুমঝুমির বুদ্ধিকে বারবার বাহবা দিচ্ছে তৃষ্ণা-নীরা। দেওয়ালে পা রেখে উপন্যাসে দৃষ্টি রেখেই তৃষ্ণা বলল,
-” ঝুমি তোর বাসার সব ঠিকঠাক?
-” হুম ।
-” শয়তান মেঘ আর ওর মা ঝামেলা করছে না কেন? ওরা এত শান্ত কেন? ডালমে কুছ কালা হে।

চিন্তার ভাঁজ পড়ল ঝুমঝুমির কপালে। নীরার কথাগুলো ফেলে দেওয়ার মতো নয়। বেশ কয়েকদিন ধরেই ব্যাপারটা ওর কাছে সন্দেহজনক লাগছে। মেঘের হুমকি, মামীর কড়া বাক্য সবকিছুরই মুচন ঘটেছে। শান্ত পরিবেশ। রাস্তায় মেঘের সাথে দেখা না হওয়া, ফোনে বিরক্ত না করা এমনকি মায়ের সাথেই এনিয়ে কথা হয় না আর। সত্যিই কী সবকিছুর ইতি টানা হয়েছে নাকি জীবনে আসতে চলেছে কঠিন ঝড়।

ঝুমঝুমিকে ভাবতে দেখে তৃষ্ণা-নীরার পিঠে চড় বসালো। রাগী গলায় বলল, নীরা তুই আসলেই বলদ। শয়তান মেঘ বিরক্ত করছে না ব্যাপারটা ভালো নয়? ঝুমি এখন আরামসে সময় কাটাতে পারে। কষ্ট পায় না। আমরা তো চেয়েছিলাম মেঘ বিরক্ত না করুক।

নীরা ঠোঁট বাঁকিয়ে ঝুমঝুমির কোলে মাথা রাখলো। দুহাতে ঝুমঝুমির মুখটা চেপে ধরে বলল, আপদ বিদায় হয়েছে। এখন থেকে আমি রেগুলার মন থেকে নামাজ পড়ব আলসেমি করব না। আচ্ছা ঝুমি তুই কি আষাঢ় ভাইকে ভালোবাসিস?
-” বিয়ের আগে কীসের ভালোবাসা? ভালোবাসা শব্দটি পবিত্র। পবিত্র সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্য থাকতে পারে না থাকতে হয় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে।
-” তুই ডিরেক্ট বিয়ের কথা বলছিস?

তৃষ্ণার কথা প্রতিউত্তরে ঝুমঝুমি চুপ রইল কিছুক্ষণ। মন, বিবেকের তাড়নায় এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। বিবেক বলে আষাঢ় ছেলেটা ভালো তোর সাথে জড়িয়ে ভালো ছেলেটার ভবিষ্যত্ নষ্ট করিস না। অন্যদিকে মন বলে, আষাঢ় তোর সবকিছু জেনেই ভালোবেসেছে। ছেলেটাকে কষ্ট দিস না।

দুইয়ের মধ্যে ঝুমঝুমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। ‘হ্যাঁ’ বলবে নাকি ‘না’ বলবে বুঝতে পারছে না। মাথায় হাত রেখে বলল, এখনও জানি না।

তৃষ্ণা-নীরা কথা বাড়ালো না। ঝুমঝুমির মন অন্যদিকে ঘুরানোর জন্য নানান ধরনের আলাপ-আলোচনা করল। হাসলো কিছুক্ষণ। মনকে সতেজ রাখার জন্য হাসির প্রয়োজন। হাসলে শরীর ও মন সুস্থ থাকে।

______________

ডিভানের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে নাজিম। ভোঁতা মুখটি ফোনের স্ক্রল করা লাস্ট ম্যাসেজে। কঠিন মন খারাপ ওর। সদ্য প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে মুখটা চুপসে পাকা লিচুর মতো দেখতে হয়েছে। দুহাতে গাল চেপে ধরে ব্লক করা আইডিকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রিচেক করে আহত সুরে বলল,
সাত দিনের প্রেমে তুমি ছিলে আমার জীবনসঙ্গিনী,
কে জানতো তুমি মেয়ে নও বরং আস্ত এক কালনাগিনী।
দুধকলা দিয়ে আমি পুষেসি কালনাগিনী তোমায়,
সাতদিনে দশ হাজার টাকা আমার গেল নর্দমায়।।

কবিগুরু নিজামের টাকার শোক পালন করতে দেখে হিরণ হেসে গড়াগড়ি। ফোনটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মেয়েটির পিকগুলো বের করে আবারও হাসলো। মিরাজ হিরণের পাশে দাঁড়িয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল, বারবার বলেছি মেয়েটা প্রতারক। ছবিগুলো গুগোল কালেক্টেড। কিন্তু আমার কথা শুনিস নি ভালো হয়েছে দশ হাজার টাকা গচ্চা করে।

মুখ ফুলালো নাজিম। কাঁদো-কাঁদো মুখ নিয়ে বলল, পৃথিবীটা ভরে গেছে ছলনাময়ীর ভিড়ে,
মনটাকে আমার চিন্ন-ভিন্ন করে।

ধমকে উঠল আষাঢ়। সে নাজিমের উপর বেশ বিরক্ত। নাজিমের ধোঁকা খাওয়া দেখে নয় বরং ঝুমঝুমিরকে অস্বস্তিতে ফেলে দেওয়ার জন্য।

আজ সকালে ঝুমঝুমি যখন ছাদ থেকে নেমে তৃতীয় তলায় আসছিল তখনি আষাঢ় পথ আটকায় ঝুমঝুমির। তাদের মধ্য বিনিময় হয় ফুলের পাঁপড়ি। আষাঢ় পাঁপড়ি ঝুমঝুমির দিকে ছুঁড়ে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করে ঠিক তখনি নাজিম এসে কবিতা বলে,বিড়াল ডাকে ম্যাওম্যাও, কুকুর ডাকে ঘেউ,
আষাঢ়-ঝুমঝুমির ভালোবাসা জানবে না তো কেউ।

কবিতা শেষ করে আবারও বলে, প্রিয় আষাঢ় এক্ষুনি চলো ঘরে, মনটা আমার কেমন-কেমন করে, থাকেনা তো ঘরে, চায় শুধু একজনারে।

নাজিমের কবিতা শুনে লজ্জায় ঝুমঝুমি দ্রুত হেঁটে চলে যায়। আষাঢ়ের ইচ্ছে ছিল আরো কিছুক্ষন সময় কাটানোর কিন্তু হাদারাম নাজিমের জন্য তা আর হলো না। দাঁত কিড়মিড় করে রুমে ঢুকে আষাঢ়। সেই থেকে নাজিমের উপর সে বেশ ক্ষেপা। এখন আবার ছ্যাকাখোর কাহিনীর বিস্তার আলাপ।

দু-ঘন্টা নাজিম দেবদাস জীবন পার করলো। মনের দুঃখে ফেসবুকে ঢুকতেই দেখল সুন্দরী এক মেয়ে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। খুশিতে আত্মহরা নাজিম ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করে ম্যাসেজের উত্তর দিল,

“তুমি আমার মন আকাশে উড়ে চলা বার্ড
তুমি আমার মোবাইল ফোনের ছয়শো টাকার কার্ড,
তুমি আমার ফুলদানীতে জমে থাকা ছাই
তুমি আমার গলার মাঝে ফাঁ’স লাগানো টাই ।”(কালেক্টেড)

নাজিমের আবারও প্রেমে পড়া দেখে বাকিরা অবাক হলো না। কারণ অনেক বছরের বন্ধুত্ব ওদের। কতবার যে ছ্যাকা খেয়েছে তার অন্ত নেই। মেয়েরা টাকার কথা বলতে দেরি ওর দিতে দেরি হয় না। বন্ধুর মতিগতি সুবিদার না ওরা জানে। ছোট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে নাজিমকে ছেড়ে দিয়ে বাকিরা নিজেদের কাজে মগ্ন হলো।

__________

মেয়র হান্নানের মুখোমুখি বসেছে হিরণ। হান্নানের চোখ জোড়া লাল টুকটুকে। কেঁদেছে বুঝা যাচ্ছে। হিরণ বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, আমাকে শান্ত করে আপনি ভেঙে পড়ছেন আব্বা? আপনিই তো আম্মার মৃ’ত্যু’র পর আমাকে নিজের হাতে গড়েছেন।

মেয়র হান্নান কান্না গিলে নেওয়ার চেষ্টা করল। স্ত্রীকে হারিয়েছে বিশ বছর আগে। হিরণ তখন অনেক ছোট। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেননি ওনি। তার উপর স্ত্রীকে অসম্ভব ভালোবাসার ফলে দ্বিতীয় নারীর প্রতি মন কিংবা শরীর কিছুই টানেনি। ছোট্ট হিরণ যখন মা-মা করতো তখন মেয়র হান্নান বন্ধুর মত হিরণের পাশে থেকেছে। একমাত্র ছেলে ছাড়া জীবন অন্ধ ওনার। নিজের হাতে মানুষ করা ছেলেটি ওনার একমাত্র ভালো বন্ধু। সেজন্যই হয়তো হিরণ সবকিছুই বাবাকে বলে ফেলে। মেয়র হান্নান ওনার অতীত সম্পর্কে সবকিছুই হিরণকে শেয়ার করেছেন। মেয়র হান্নানের প্রেমের বিয়ে। অনেক কষ্টে প্রিয় মানুষটিকে নিজের করে পেয়েও কয়েক বছর সংসার করে হারিয়েছে জীবন-সঙ্গিনীকে।

বাবাকে কাঁদতে দেখে হিরণ চুপ করে রইল। আজ ওর মায়ের মৃ’ত্যু বার্ষিকী। এই দিনটায় দুজনেই একান্ত নিজেদের মধ্যে সময় কাটায়। হিরণের খুব কষ্ট হচ্ছে আজ। বুকটা কষ্টে ছিঁড়ে যাচ্ছে তবুও নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। ও ভেঙে পড়লে যে বাবাও আরো কষ্ট পাবে।

নিজেকে সবদিক থেকে শক্ত করে বাবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য লাগাম ছাড়া কথা শুরু করল নিজ থেকে,
-” আব্বা আপনার বয়সে সবাই নাতি-নাতনী দেখে ফেলেছে আপনি এখনও বউমা ঘরে তুলেন নাই।

ছেলের কথায় হাসলো হান্নান। বুঝতে পারে ছেলের উদ্দেশ্য। নিজেকে সামলে বলে, আব্বা আর কয়েকটা দিন ধৈর্য্য ধরেন। জানেন না সবুরে মেওয়া ফলে।
-” সবুরে মেওয়া ফলতে-ফলতে বউ চলে যাবে অন্যর ঘরে। ভোটের আগেই বিয়েটা ঠিক করলে হয় না?
-” চিন্তা করবেন না আব্বা। আফনের যে মেয়েটা পছন্দ হইছে আমি তারেই বউমা বানামু। ইলেকশন শেষ হোক খালি।
-” আচ্ছা যা ভালো বুঝেন। আসেন আজ আমি রান্না করব আপনি আমায় সাহায্য করবেন।
-” চলেন তাইলে।

বাপ ছেলে মিলে রান্নায় ব্যাস্ত হলো। মনের কষ্ট মনেই চেপে রেখে মুখে ফুটিয়ে তুলল খুশির হাসি। এভাবেই খারাপ মুহূর্তকে মুছে এগিয়ে যেতে হয় সামনের দিকে। পিছুটান থাকবে, মনের কষ্টও থাকবে তাই বলে জীবন থেমে থাকবে না। জীবনকে এগিয়ে নিতে হবে।

##চলবে,

আগামীকাল গল্প দেওয়ার চেষ্টা করব তবে শিওর না। গতকাল দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু পুরাতন ব্যান্ডেজ খুলে নতুন ব্যান্ডেজ লাগানোর জন্য ডক্টরের কাছে গিয়েছিলাম তাই লিখা হয়নি। আমি দুঃখিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here