বাদলা দিনের কৃষ্ণচূড়া পর্ব -০৩

#বাদলা_দিনের_কৃষ্ণচূড়া❤️
#লেখনীতে:সারা মেহেক

ফিকে হলদে রঙের আলোকচ্ছটায় বর্ষনমুখর পরিবেশ আলোকিত হয়ে উঠলো। ক্ষণেই মেঘের গর্জনে কেঁপে উঠলো বাতাবরণ। কম্পিত হলো সুহানার সর্বাঙ্গ। তারই রেশ ধরে নেত্রজোড়া মেলে চাইলো সে। কি মনে করে অস্পষ্ট পরিবেশে একবার দৃষ্টি বুলালো সে। অমনিই তার দৃষ্টিজোড়া আটকে গেলো নাজের উপর। প্রবল বর্ষনের অস্পষ্ট পরিবেশেও সে স্পষ্ট দেখতে পেলো, নাজ এদিকেই চেয়ে আছে। নাজের দৃষ্টি হতে পরিত্রাণ পেতে তৎক্ষনাৎ সে পুকুরের পানিতে ডুব দিয়ে নিজের সর্বাঙ্গ অদৃশ্য করে ফেললো। পানিতে ডুবে ডুবেই সে ঘাটের পিছনে কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষের নিচে অবস্থান করলো।

অকস্মাৎ সুহানাকে ডুব দিতে দেখে খানিক চমকে উঠলো নাজ। তার দৃষ্টি হয়ে উঠলো অস্থির৷ ঘাড় উঁচিয়ে দূর দৃষ্টি দিয়ে সুহানাকে খুঁজতে লাগলো সে। ক্ষণিকের চেষ্টাতেও সুহানাকে নজরবন্দী করতে পারলো না নাজ। ফলে ব্যর্থ হয়ে চমকিত গলায় স্বগোতক্তি করে বললো,
” আরে! মেয়েটা গেলো কোথায়!”

নাজের পাশে তার আরেক চাচাতো ভাই মিরাজ দাঁড়িয়ে ছিলো। নাজের মুখে এরূপ কথা শুনে মিরাজ চমকিত দৃষ্টিতে এদিক ওদিক চেয়ে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
” কোন মেয়ে? কোথায় মেয়ে?”

মিরাজের প্রশ্নে সকলের মনোযোগ মুহূর্তেই মিরাজের উপর চলে এলো। নাজ পড়লো বিপাকে। এবার ব্যাপারটা সে সামলাবে কি করে! ক্ষণিক সময়ের ভাবনায় সে সকলের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সে বললো,
” ঐ দূরে বৃষ্টির মধ্যে ছোট একটা মেয়ে খেলছিলো। হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেলো ও। ওকেই খুঁজছিলাম। ”

নাজের কথায় মিরাজের খানিক সন্দেহ থাকলেও সে কথাটি বিশ্বাস করে নিলো। এমনকি উপস্থিত সকলেই নাজের কথা বিশ্বাস করে নিলো। শুধু হাবিব ব্যতিরেকে। নাজের কথানুসারে ছোট মেয়েটির অকস্মাৎ উধাও হয়ে যাওয়া তাকে ভীত করে তুললো। চাচাতো ভাইগণের মধ্যে মেদযুক্ত তুলতুলে শরীরের অধিকারী হাবিব ভীষণ ভীতু গোছের একটি ছেলে। ছোট থেকে ছোট কোনো ব্যাপারে সে জ্বি’ন ভূ’ত টেনে আনা ব্যক্তি। এই দিনেদুপুরে নাজের কথায় সে ভীত হয়ে পড়লো এবং ভেবেই নিলো, নিশ্চয়ই ছোট মেয়েটি একটি জ্বি’ন। সে সূত্র ধরেই অল্পবিস্তর কম্পমান ভয়ার্ত কণ্ঠে হাবিব বললো,
” নির্ঘাত ঐটা জ্বি’ন ছিলো। না হলে এভাবে দিনেদুপুরে হুটহাট উধাও হয়ে যাবে কেনো!”

হাবিবের কথা শোনামাত্র নাজ বিরক্ত নিয়ে হাবিবের মাথায় গাট্টা মেরে বললো,
” হ্যাঁ মেয়েটা জ্বি’ন। চল তোকে ওর কাছে দিয়ে আসি। এটলিস্ট তোর মতো ভীতুর ডিম থেকে তো রেহাই পাবো। ”

নাজের কথার সাথে সহমত প্রকাশ করলো তন্ময়, মিরাজ ও রাকিব। হাবিব পড়লো অথৈ সাগরে। তিন তিনজন থাকার পরও কেউ তাকে সমর্থন করলো না। উল্টো সকলেই নাজের পক্ষে অবস্থান নিলো! হাবিব খানিক গোসসা হলো। বললো,
” তোরা কেউই আমাকে সাপোর্ট করলি না! যদি মেয়েটা সত্যিই জ্বি’ন হয়?”

এ পর্যায়ে তাদের মধ্যে বয়সে ছোট রাকিব বললো,
” তো? এখন কি তোর উপর এসে আছর করবে? করলে বলিস। গ্রামের কবিরাজের কাছে নিয়ে গিয়ে ঝাঁটা পেটা করে জ্বি’ন তাড়াতে বলবো আমরা। ”

রাকিবের কথায় হাবিব ব্যতিরকে সকলেই একত্রে হো হো করে হেসে উঠলো। নাজ, তন্ময়, মিরাজ, হাবিব ও রাকিব, এরা প্রত্যেকেই সম্পর্কে একে অপরের চাচাতো ভাই। এর মাঝে তন্ময় ও রাকিব আপন দুই ভাই। এদের মাঝে নাজ সবচেয়ে বড় এবং রাকিব সবচেয়ে ছোট৷ তবে তাদের বয়সের পার্থক্য খুব বেশি একটা নয়৷ দু মাস, পাঁচ মাস, এক বছর, দুই বছর, এই তাদের বয়সের পার্থক্য। কিন্তু নিজেদের মধ্যে বেশ ভাব থাকায় প্রত্যেকেই একে অপরকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করে। নাজ ও তন্ময় এর বয়সের পার্থক্য দু মাস। তারা দুজনে গত দুই মাস পূর্বে আমেরিকা থেকে পড়ালেখা শেষ করে দেশে ফিরেছে। দেশে ফিরেই তারা তাদের পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিয়েছে। যে ব্যবসার মূল হর্তাকর্তা বছর দুয়েক পূর্বে তাদের দাদাজান থাকলেও এখন ব্যবসার মূল দায় দায়িত্ব নাজের বাবার ঘাড়ে। শহুরে ছেলেগুলোর দরিয়া গ্রামে আসার কারণ তাদের একমাত্র ফুফাতো ভাই রায়হান সরদারের বিয়ে। নাজের একমাত্র ফুফুর বিয়ে হয় দরিয়া গ্রামের সরদার পরিবারের বড় ছেলের সাথে। নাজের দাদাজান প্রথম পর্যায়ে নাজের ফুফুর বিয়ে গ্রামে দিতে দ্বিমত জানান৷ কিন্তু মেয়ের পছন্দের কাছে শেষমেশ হার মেনে নেন তিনি। সে সূত্রেই নাজের ফুফু বিয়ে হয় গ্রামে এবং গ্রামেই তাদের বসবাস।

রায়হান সরদারের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে সাগরিকার সাথে। আগামী সপ্তাহের শেষেই তাদের বিয়ে। রায়হান ও সাগরিকা একে অপরকে ভালোবাসে বলেই পারিবারিক সম্মতিতে তাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে। সুহানা ও সাগরিকার বাবা ওমর মোল্লা কৃষক হওয়ায় প্রথম পর্যায়ে রায়হানের বাবা ও মা এ বিয়েতে দ্বিমত পোষণ করেন৷ কিন্তু একমাত্র ছেলের জেদের কাছে তাদের হার স্বীকার করে নিতে হয়। ফলে তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা বিয়ে দিতে রাজি হোন। পরে অবশ্য তাদের এ অনিচ্ছা স্বেচ্ছায় পরিণত হয়। রায়হানের মা সাগরিকাকে দেখামাত্রই পছন্দ করে নেন। বাড়ির বউ রূপে গুণে অনন্য হবে, এই তো তার চাওয়া। যেহেতু সাগরিকার মাঝে এর দুটোই উপস্থিত সেহেতু এ বিয়েতে পরবর্তীতে ওমর মোল্লার পেশা কোনো প্রভাব ফেলেনি।
নাজ ও তার চাচাতো ভাইয়ের দলবল সাগরিকার রূপ ও গুণের প্রশংসা শুনে তাদের ফুফুকে এমনকি সাগরিকার পরিবারের কাউকে কোনো আগাম সংবাদ না পাঠিয়েই লুকিয়ে দেখা করতে বেরিয়ে পড়ে। একারণেই প্রথম পর্যায়ে তারা ওমর মোল্লার বাড়ি খুঁজছিলো এবং এক পথিকের বদৌলতে তন্ময় সে বাড়ির ঠিকানা পেয়েও গিয়েছিলো। কিন্তু এখনও তারা ভারী বর্ষণের ফলে ওমর মোল্লার বাড়িতে পৌঁছাতে পারলো না।

ধীরেধীরে বৃষ্টির গতি কমে আসছে। বাতাবরণ হিম শীতল হয়ে আসছে। চলমান হাওয়ার গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে, কমে আসছে তার বেগ। দু চারটা পাখি পত্রপল্লবের ঝাড় হতে বেরিয়ে দীগন্ত পানে ছুটতে আরম্ভ করেছে। সুহানা ঘাটের আড়াল হতে সেচ ঘরের দিকে উঁকি মারছে। সে অপেক্ষায় আছে, নাজ ও তার দলবল কোন মুহূর্তে স্থান ত্যাগ করবে। তবেই সে পুকুর হতে উঠে বাড়ির পথে পা বাড়াবে। কিন্তু ছেলেগুলো যে এখনও সেচ ঘরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সুহানার এ আকুল অপেক্ষার মাঝে তাদের প্রতিবেশি ছোট্ট একটি ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে পুকুরপাড়ে এলো। সাগরিকার কথানুসারে সে সুহানাকে খুঁজতে লাগলো। কিন্তু ঘাটের আড়ালে লুকিয়ে থাকায় সুহানাকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলো সে। ফলে ঘাটের সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে হাঁক ছেড়ে সে ডাকতে লাগলো,
” সুহানা বুবু? ও সুহানা বুবু? চাচি তোমারে ডেকে পাঠাইছে। জলদি আসো। কই তুমি?”

ছোট্ট ছেলেটির হাঁকডাক সুহানার কর্ণগোচর তো ঠিকই হলো, পাশাপাশি তার এ উচ্চস্বরের ডাক প্রতিধ্বনিত হয়ে নাজের কর্ণকুহর অব্দিও পৌঁছালো। মুহূর্তেই নাজের ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো লব্ধ হাসি। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলো সুহানার নাম।
ভাগ্যক্রমে ছোট্ট ছেলেটির বদৌলতে মিষ্টি কণ্ঠের অধিকারিণীর নামটি জানা হয়ে গেলো নাজ এর। পুনরায় সুহানার দেখা পাবার জন্য সে অধীর আগ্রহী দৃষ্টিজোড়া পুকুরঘাটে নিবদ্ধ করলো। এদিকে সেই ছেলেটির ডাকে সুহানা তড়িঘড়ি করে ঘাটের আড়াল হতে বেরিয়ে এলো। দ্রুততার সহিত সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা জলসিক্ত সালোয়ার কামিজ শরীর হতে ক্ষীণ আলগা করার প্রয়াস চালালো। কিন্তু অতিরিক্ত জলে সিক্ত হওয়ায় পোশাক তার শরীরে আঠার মতো লেপ্টে রইলো। ছোট্ট ছেলেটি সুহানাকে পুনরায় তাড়া দিলো। এ পর্যায়ে মায়ের বকুনি ও মা’রের ভয়ে সুহানা সালোয়ার কামিজে সময় অপচয় না করে দ্রুততার সহিত ওড়না মাথায় দিয়ে আলগা আলগাভাবে শরীর আবৃত করে নিলো। অতঃপর বেগবান পায়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মাঝেই সে ধানক্ষেতের আইলের মাঝ দিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ালো। তার পিছু পিছু ছুটলো সেই ছেলেটিও।

ঝিরিঝিরি বর্ষণে নাজ মুগ্ধ নয়নে সুহানাকে দেখছে। আচ্ছা, মেয়েটিকে তার এতোটা আকর্ষণীয় লাগছে কেনো? গ্রামীণ বাতাবরণে বেড়ে উঠা খাঁটি সৌন্দর্যের অধিকারী বলে? না কি এর পিছনে অন্য কোনো কারণ আছে? তবে অন্যান্য সাধারণ মানুষের ন্যায় নাজ সুহানার রূপের প্রেমে পড়েনি। সে সুহানার মিষ্টি কণ্ঠের মোহে আটকা পড়েছে।

কিয়ৎক্ষণের মাঝেই বৃষ্টিরা মেঘের আড়ালে পাড়ি জমালো। প্রকৃতি ফিরে পেলো তার চিরচেনা তবে সতেজ এবং নির্মল রূপ। পক্ষীকুলেরা ক্ষণিকের জন্য অবস্থান করা আশ্রয়স্থল হতে নিজেদের নীড়ের পথে পাড়ি জমালো। বর্ষার শীতল ছোঁয়ায় বাতাবরণে প্রবাহিত হচ্ছে হিম অনিল। স্বচ্ছ পত্রপল্লবে আবৃত বৃক্ষরাজি অনিল দোলায় দুলছে, সাঁই সাঁই ধ্বনি তুলছে। প্রকৃতির এ অপরূপ সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে, কৃষ্ণচূড়ায় আবৃত সুহানার কণ্ঠ ও রূপের প্রেমে পড়ে কিয়ৎক্ষণের জন্য চারপাশ যেনো ভুলে বসলো নাজ। কাঁধে তন্ময়ের ছোঁয়া ও ডাকে তার সম্বিত ফিরে এলো। সে আমতাআমতা করে বললো,
” হ্যাঁ হ্যাঁ বল।”

তন্ময় নাজের এহেন আচরণে সন্দেহজনক সুরে জিজ্ঞেস করলো,
” কি ব্যাপার নাজ? তুই হঠাৎ হঠাৎ কোথায় হারিয়ে যাচ্ছিস? অদ্ভুত তো? ”

নাজের কোনো জবাব দেওয়ার পূর্বেই হাবিব পুনরায় ক্ষীণ ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো,
” নিশ্চয়ই নাজের উপর কোনো জ্বি’ন পরি আছর করেছে। এজন্যই মাঝেমধ্যে এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। ”

হাবিবের এহেন কথা শুনে সকলেই বিরক্তিভরা চাহনিতে তার পানে চাইলো। নাজ খানিক ভার গলায় বললো,
” আহো ভাতিজা আহো। সবার আগে তোমার ঘাড়ে উঠে বসি। ”
এই বলে সে হাবিবের দিকে পা বাড়ালো। হাবিব ভীতসন্ত্রস্ত গলায় বললো,
” কি ব্যাপার নাজ? তোর উপর কি সত্যি…. ”
হাবিবের কথা সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই নাজ তার মাথায় জোরালো একটা গাট্টি মেরে বললো,
” কবে যেনো তোকে এসব কারণে আচ্ছামতো ধোলাই দিয়ে বসি। আমার সামনে আর একবার জ্বি’ন, ভূ’ত নিয়ে কথা বললে খবর আছে। ”
এই বলে সে সেচ ঘরের বাইরে পা বাড়ালো। তার পিছু পিছু এলো বাকি চারজনে। পাঁচজনে সারি বেঁধে ঐ একই ধানক্ষেতের আইল দিয়ে ওমর মোল্লার বাড়ির পথে পা বাড়ালো।

.

অকস্মাৎ উদিত হওয়া কুটুমদের দেখে মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো রশিদা বেগমের। দিশেহারা হয়ে পড়লেন তিনি। ভীষণ অস্থিরতার সহিত দু মেয়েকে বলতে লাগলেন,
” আল্লাহ গো আল্লাহ, মেয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে এমনে লোকজন আসবে চিন্তাও করিনি। এখন কি করমু। তাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কি করমু। ঐ সাগরি, তোর বাপরে ফোন লাগা। ক্ষেত থেকে আসার সময় কুটুমদের জন্য নাস্তাপানি আনতে বল।”

মায়ের এরূপ অস্থিরতা দেখে সাগরিকা ঠোঁট চেপে হাসলো। মা’কে বললো,
” এতো চিন্তা করো না আম্মা। তোমার এ ভয়ংকরী চিন্তাভাবনা দেখে কুটুমরা ভয়ে পালিয়ে যেতে পারে। তখন কি একটা কেলেংকারী হয়ে যাবে ভাবতে পেরেছো?”

সাগরিকার টিপ্পনীমূলক কথায় সুহানা মুখ লুকিয়ে হেসে ফেললো। ওদিকে রশিদা বেগম এসব কথা কর্ণগোচর করলেন না। বরং এক ছুটে রসুইঘরে চলে গেলেন। আপাতত আগত কুটুমদের জন্য ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা শরবতের ব্যবস্থা করতে হবে। রশিদা বেগম চলে যেতেই সাগরিকা বিছানায় বসে পড়লো। সুহানাকে বললো,
” বুবু? ওরা মোটে পাঁচজন না?”

সুহানা খানিক বিরক্তি প্রকাশ করে বললো,
” হুম। জানিস, সাগরি? ওদের মধ্যে একজন আমাকেই আমাদের বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞেস করেছিলো।”

সুহানার কথা কর্ণপাত হওয়া মাত্রই বিস্ময়ে সাগরিকার মুখ হা হয়ে এলো। কণ্ঠে আকাশসম বিস্ময় নিয়ে বললো,
” বলিস কি বুবু! কোথায় জিজ্ঞেস করেছে তোকে?”

সাগরিকার প্রশ্নের প্রত্যুত্তর স্বরূপ সুহানা পুরো ঘটনা খুলে বললো। সুহানার নিকট হতে পুরো ঘটনা শুনে সাগরিকা নিজেদের রুমের জানালা হতে সোজাসুজি সামনে তাকালো। ওমর মোল্লার নিজস্ব ভিটেতে দুটো টিনের ঘর আছে। একটিতে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনে থাকে। আরেকটিতে সুহানা ও সাগরিকা থাকে। সাগরিকার বিয়ে উপলক্ষে সেই টিনের ঘরের একদম সোজাসুজি আরো দুটো টিনের ঘর নির্মাণ করছেন ওমর মোল্লা। পুরোনো টিনের ঘরে মাটির মেঝে থাকলেও নতুন টিনের ঘরে পাকা মেঝের ব্যবস্থা করছেন তিনি৷ সেই নতুন টিনের ঘরের কাজ প্রায় হয়ে গিয়েছে। শুধু সময় করে জানালা লাগানো বাকি। এই টিনের ঘরেই নাজ’দের বসানো হয়েছে।
বাড়িতে এসে ভেজা কাপড় বদলাতে বদলাতে নাজ’দের আগমন দেখে অবাক হলো না সুহানা। কারণ নাজ’রা এখানে আসবে, এ সম্পর্কে সে পহেলা হতেই অবগত। শুধু নাজ জানে না, সুহানা এ বাড়িরই মেয়ে।

সুহানা ও সাগরিকা নাজ ও তার চাচাতো ভাইদের নিয়ে আলোচনা করছে। এরই মাঝে রসুইঘর হতে সুহানাকে ডেকে পাঠালেন রশিদা বেগম। সুহানা আসতেই তার হাতে শরবতের ট্রে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
” মাথায় ভালো মতোন ওড়না দিয়া কুটুমদের শরবত দিয়ে আয়। ”

রশিদা বেগমের এহেন আদেশে মনে মনে অনিচ্ছা প্রকাশ করলো সুহানা। এ মুহূর্তে নাজ এর সামনে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার। কিন্তু মায়ের আদেশ নাকচ করার মতো দুঃসাহসও নেই তার। সে জানে, এ দুঃসাহসিক কাজের পরিণাম হবে, সৎ মায়ের মুখ থেকে নিজের মৃ’ত মায়ের সম্পর্কে মন্দ কথা শোনা। যা সে কখনোই চায় না। ফলশ্রুতিতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে ট্রে হাত নিয়ে নতুন ঘরের দিকে পা বাড়ালো। পথিমধ্যে এক হাতে ট্রে ধরে অপর হাত দিয়ে মাথায় ভালোমতো ওড়না দিয়ে নিলো সুহানা।

নাজ’দের কথার মাঝেই ট্রে হাতে রুমে প্রবেশ করলো সুহানা। তৎক্ষনাৎ সকলের দৃষ্টি গিয়ে ঠেকলো সুহানার উপর। অকস্মাৎ এ বাড়িতে সুহানাকে দেখে ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লো নাজ। সে স্বপ্নেও সুহানাকে এখানে আশা করেনি। তার বিস্ময় তার মুখশ্রীতে স্পষ্টরূপে ফুটে উঠলো। এদিকে ট্রে হাতে সুহানাকে দেখে বাকি চারজনে ধরে নিলো, সুহানাই রায়হানের হবু বউ। তাদের হবু ভাবী। রাকিব তো সুহানার উদ্দেশ্যে বলেও ফেললো,
” আপনিই তাহলে রায়হান ভাইয়ের হবু বউ। মিনস, আমাদের হবু ভাবী।”

রাকিবের মুখনিঃসৃত ‘বউ’, ‘ভাবী’ সম্বোধন শুনে নাজ এর হৃদয় যেনো মুহূর্তেই বিখণ্ডিত হয়ে গেলো।
®সারা মেহেক(সকলে রেসপন্স করার চেষ্টা করবেন। গল্পটি কেমন লাগছে জানাতে ভুলবেন না।)

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here