বাসর পর্ব ৫

#বাসর
#৫ম_পর্ব


নাঈমের কবরের চারদিকে বাঁশের বেড়া দেয়া। নীলা সেই বেড়ার উপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। কবরের উপর তখন গুটিকয়েক জোনাকি পোকা মিটমিট করে জ্বলছে। দূরের বন থেকে কামিনী ফুলের মিষ্টি অথচ মনকাড়া গন্ধ আসছে বাতাসে ভেসে।
নীলা হঠাৎ কথা বললো।বললো,’আপনি আমায় ডেকেছিলেন কেন?ভয় পেয়েছিলেন বুঝি একা একা?’
‘না আমি ভয় পাই না। আমি পুরুষ মানুষ। পুরুষ মানুষ কখনো ভয় পায় না।’
‘তাহলে ডেকেছিলেন কেন?’
‘আপনার সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছিল। সারাদিন তো মানুষ ছিল আমার চারপাশে তাই কথা বলতে পারিনি। এখন পরিবেশ নীরব, নিস্তব্ধ।কেউ নেই আমার পাশে। এই তো কথা বলার সময়।তাই আমি আপনাকে ডেকেছি।’
‘আমার সাথে আপনার এতো কথা বলতে ইচ্ছে হয় কেন? আমি আপনার কে?’
এমন উদ্ভট প্রশ্ন শুনে নাঈমের যা মন খারাপ হলো! তবুও কী প্রিয়তম স্ত্রীকে তার মন খারাপি দেখানো যায়!সে মিষ্টি হেসে বললো,
‘স্ত্রী। আপনি আমার স্ত্রী হন।’
‘স্ত্রী! স্ত্রীকে তো আপনি ভালোই বাসেন না। ভালো বাসলে কী আর একা ফেলে চলে যেতেন? আমি আপনার সাথে কথা বলবো না। একটা কথাও আর বলবো না।’
এই সময় নাঈম কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,’বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি।ভালোবাসি বলেই তো আপনাকে ডাকি। আমি ডাকলেই আপনি কিন্তু রোজ দিন আসবেন।আমরা রাতভর জেগে জেগে গল্প করবো।’
নীলা এই কথা শুনে কী যে খুশি হলো!সে ফিসফিস করে বললো,’আপনাকে একটা কথা বলবো আমি?’
‘বলুন।’
‘আমিও আপনাকে ভালোবাসি।’
কথাটা বলে সে লজ্জায় মুখ লাল করে ফেললো।
এই সময় নাঈম বললো,’আপনি কী আমার পাশে একটু শুবেন? আমার খুব ইচ্ছে একসাথে দুজন শুয়ে থাকতে।’
নীলা মৃদু হেসে লজ্জায় লুকিয়ে যেতে চাওয়া শব্দে বললো,’আচ্ছা।’
তারপর নীলা একেবারে কবরের গা ঘেঁষে মাটিতে শুয়ে পড়লো এবং অল্পক্ষণের ভেতর ঘুমে তলিয়ে গেল।

সালমা বেগম টর্চের আলোতে দূর থেকে দেখলেন কবরের পাশে সাদা কাপড়ের মতো কিছু একটা চকচক করছে। তিনি দ্রুত পা ফেলে কবরের পাশে গেলেন।তার পেছনে পেছনে গেল সেলিম। তিনি কাছে গিয়ে চমকে উঠলেন। নীলা শুয়ে আছে কবরের গা ঘেঁষে। তার পরনে সাদা থান শাড়ি। এই শাড়িখানাই সারাদিন তার পরনে ছিল।রাতেও এই শাড়ি পরেই সে ঘুমোতে গিয়েছিল।সাদা শাড়ি পরে সবুজ লতাপাতার ভেতর শুয়ে ঘুমিয়ে থাকা নীলাকে কী যে পবিত্র দেখাচ্ছে! এমন একটা লক্ষ্মী মেয়ের জীবনে এতো কষ্ট কেন?
সালমা বেগমের চোখে জল নেমে এলো মুহূর্তে।সেলিমও তার চোখে হাত দিলো।তার চোখও কী খানিক ভিজে উঠেছে জলে?
সালমা বেগম নীলার গা স্পর্শ করে আস্তে করে তাকে ডাকলেন,’বউমা,ও বউমা?’
নীলা চমকে উঠে তাকাতেই দেখলো তার শাশুড়ি তার গা ছুঁয়ে আছে। এবং চারদিকে তাকিয়ে দেখলো ঘন অন্ধকার। সেই অন্ধকারের ভেতর টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে আছে সেলিম। সেলিমকে দেখে তার ভয়ে বুক জমে উঠলো।
সালমা বেগম বললেন,’মা এইখানে তুমি আসলা কেনো এতো রাইতে?জায়গাডা তো ভালা না!’
নীলা কথা বললো না।সে চুপচাপ উঠে বাড়ির পথ ধরলো। সালমা বেগমও আর কিছু বললেন না। চুপচাপ হাঁটছেন।কথা বললো সেলিম।সে থমথমে গলায় বললো,’কাল সকালে উনার বাপরে খবর দিবো আম্মা।’
‘কী খবর দিবি!’
আঁতকে উঠা গলায় জিজ্ঞেস করলেন সালমা বেগম। সেলিম বললো,’এইখানে উনারে কোন ভরসায় রাখবেন আপনি?উনার ব্রেইনের সমস্যা। পাগল ছাড়া কী নিশি রাতে কেউ এমনে কবরের পাশে গিয়ে শুয়ে থাকে!’
নীলা কথাগুলো শুনছে আর হাঁটছে।তার কাছে এই কথাটির জবাব আছে কিন্তু সে জবাব দিচ্ছে না। কারণ কথাটি তার কাছে সরাসরি বলেনি সেলিম।কথা বলেছে সালমা বেগমের কাছে।
সালমা বেগমই জবাব দিলেন। বললেন,’বউমা পাগল হইলে তো তুইও পাগল। তুইও তো ভাইয়ের লগে কবরে থাকতে চাইছিলে!’
সেলিম কী বলবে এখন।তার কাছে কোন যুক্তি নেই। তবুও সে বললো।বললো,’আম্মা, তুমি শুধু শুধু বিপদ ডাইকা আনতাছো।উনার এইখানে থাকার কোন মানে হয় না। ভাইয়া তো আর এখন নাই।আর উনারও তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। এখানে না থেকে বাড়িতে থাকলে উনি ভালো থাকবেন। উনাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দাও।’
সালমা বেগম ছেলেকে তখন ধমক দিলেন। কোনদিন ছেলেকে তিনি ধমক দেননি। সেলিমের মন খারাপ হলো। খুব মন খারাপ হলো। সালমা বেগম এ নিয়ে মাথা ঘামালেন না। তিনি ধীর পায়ে নীলার কাছে গেলেন। তারপর তার একটা হাত টেনে ধরলেন। নীলা ভয়ে জমে যাওয়া শরীর নিয়ে থমকে দাঁড়ালো। সালমা বেগম তখন স্পষ্ট গলায় বললেন,’নীলা আইজ থাইকা আমার বউ মা না শুধু সে আমার মাইয়াও। আমার মাইয়া আমারে ছাইড়া কোনো দিন যাইবো না। কোনো দিন না।’
তার শাশুড়ির এই ভরসার কথাটি শুনেও নীলার কান্না পেয়ে গেল।কী অদ্ভুত! নারীরা অত মায়াবতী হয় কেন!

ঘরে ফিরে সালমা বেগমের দু চোখ আর এক হলো না। অনেক্ষণ শুয়ে থাকার পর তিনি নীলাকে বললেন,’বউমা, তুমি আর ওইখানে যাইও না কেমন মা?’
নীলা বড় কাতর গলায় বললো,’আমি তার কথার অবাধ্য হবো কী করে আম্মা? তিনি যে আমার স্বামী!’
সালমা বেগম চমকে উঠলেন।
‘তার কথার অবাধ্যে যাইবা মানে?’
‘আম্মা তিনি আমার সাথে গল্প করতে ডাকেন। আমি ছাড়া আর কে গিয়ে তার সাথে গল্প করবে!’
সালমা বেগম বুঝতে পারলেন নীলা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে গেছে।সে তার নিজের ভেতরেই নাঈমের একটা স্বত্তা দাড় করিয়ে নিয়েছে। সেই স্বত্তার ডাকেই সাড়া দিয়ে সে রাত বিরাতে কবরের পানে ছুটে যায়। শুয়ে থাকে কবরের সাথে তার গা মিশিয়ে। কথাও বলে।
সালমা বেগম বললেন,’নাঈম তোমার সাথে কথা বলে ওইখানে গেলে?’
‘বলে।’
‘কী কথা বলে?’
নীলা লজ্জায় বালিশে মুখ লুকিয়ে ফেলে বললো,’কত কথা বলে!’
তারপর হি হি করে হেসে উঠলো নীলা।
কিন্তু এই হাসিটাকে সালমা বেগমের কিছুতেই অস্বাভাবিক মনে হলো না। কিংবা নীলাকে তিনি পাগলও ভাবছেন না। নীলার উপর দিয়ে কতটা দখল যে গিয়েছে তা তিনি জানেন। জানেন বলেই তিনি মা। একজন মায়াবতী মা!
———————————————————————
শেষ রাতে মায়ের ওমের মতো শাশুড়ির গায়ের ওমের ভেতর শুয়ে থেকে চোখ মুদে এলো নীলার।আর তখনই কান্ডটা ঘটলো।সে ঘুমে থেকেই দেখলো সন্ধ্যা হয়ে গেছে।আর তখন ঘরে কেউ নেই। সালমা বেগম কোথায় যেন গিয়েছেন। শুধু ঘরে আছে সেলিম।তার চেহারা কেমন অগ্নিমূর্তির মতো ধারণ করেছে।তার ঠোঁটে কেমন শয়তানি হাসি ঝুঁলে আছে।আর তার কাঁধে একটা মস্ত কালো রঙা ব‍্যাগ।সে এগিয়ে আসছে কেমন অদ্ভুত ভাবে হেঁটে। তারপর নীলার কাছে এসেই তার একটা হাত টেনে ধরলো। নীলাকে সে এবার টেনে হেঁচড়ে ঘর থেকে বের করে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নীলা ভয়ে আঁতকে উঠলো।সে তার সমগ্র শক্তি এক করে গলায় এনে মিশিয়ে চিৎকার করে ডাকলো তার শাশুড়ি মাকে। কিন্তু শাশুড়ি মা তার ডাক শুনতে পেলেন না।
কী ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছে নীলা। এই বিপদ থেকে তার বাঁচার উপায় কী?কে এসে বাঁচাবে এখন তাকে?


#চলবে__
#অনন্য_শফিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here