বিকেলে ভোরের ফুল পর্ব ১৭

#বিকেলে_ভোরের_ফুল

#পর্ব_১৭

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

আস্তে আস্তে ফুল উঠে দাড়ালো।পড়ে যাওয়ার ফলে কনুইয়ের খানিকটা অংশ ছড়ে গেছে তাতে বিন্দু বিন্দু রক্ত কণা জমে গেছে। ফুল উঠে জামাকাপড় ঝাড়লো। তারপর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে জুতোটা পরে সামনের দিকে হাঁটা ধরলো। কিন্তু গেইটে কড়া পাহারার ব্যবস্থা করে রেখেছে ওর বাবা।তাই বাধ্য হয়ে দেয়াল টপকে বাইরে বেরোয় ফুল। কিন্তু প্রবলেম হচ্ছে ও তো পুলিশ স্টেশন চেনে না।বাইরে কখনও একা একা বের হয়নি।কলেজ থেকে বাড়ি,বাড়ি থেকে কলেজ এটুকুই ওর চলাফেরা এর বাইরে ওর কোথাও যাওয়া নিষেধ। ফুল এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। কাউকে কি জিজ্ঞেস করবে??যদি না বলে।উফফ ফুল বিরক্তি হয়ে হাঁটতেছে। রাস্তার চারপাশে মানুষ নিজ নিজ মতো করে চলাফেরা করতেছে। ফুল ওড়না দিয়ে ভালো করে নিজের মুখটা ঢেকে দিয়েছে যাতে ওকে কেউ চিনতে পারে না।

ফুল ভাবছে আর আনমনে হাঁটছে তখনই ওর সামনে একটা সিএনজি এসে থামল।এতে ফুল হকচকিয়ে গেল। সিএনজি চালক বলল,

–“আফা কই যাবেন??”

ফুল আমতা আমতা করে বলল,

–“য যাব মানে।”

–“হ কন না কই যাবেন??”

–“পু পুলিশ স্টেশনে যাব।”

–“ওহ,উঠেন আমি নামায় দিবানে।”

ফুল সাতপাঁচ না ভেবে সিএনজি তে উঠে পড়ে।চালক পুলিশ স্টেশনে এসে থামায়। ফুল গাড়ি থেকে নেমে পুলিশ স্টেশনের ভেতরে যেতে নিলেই গাড়ি চালক ডেকে উঠল,

–“আফা আমার ভাড়াটা দিলেন না যে।”

ফুল এগিয়ে এসে বলল,

–“ওহ হ্যা।”

ফুল ব্যাগ থেকে টাকা বের করে লোকটাকে দিলো। তারপর সোজা ভেতরে চলে গেল।সব পুলিশ যার যার কেবিনে বসে আছে। ফুল একজায়গায় দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে পুলিশ স্টেশন দেখতেছে। হঠাৎ একজন পুলিশ এসে ফুলের সামনে দাড়াতেই ফুল কেঁপে উঠল।

–“কি চাই??”

–“না ম মানে আমি একজনের সাথে দেখা করতে চাই।”

–“কার সাথে?? পুলিশ নাকি কোন আসামি।”

–“আসামি।”

–“তাহলে আপনাকে অসি সাহেবের কাছে যেতে হবে।স্যারের রুম এই দিকে।”

বলেই লোকটা চলে গেল। ফুল ও এক পা এক পা করে ওসি সাহেবের কেবিনের দিকে এগোলো।অসি সাহেব কারো সাথে কথা বলতেছেন বলে ফুল দরজা নক করল না।দরজাটা হাল্কা খুলে উঁকি মারল। ভেতরে বসে থাকা ওসিকে দেখেই ফুল দ্রুত বাইরে চলে এলো।

–“আরে এতো সেই আঙ্কেলটা। ওনার সাথে তো বাবার খুব ভালো সম্পর্ক। ইনি তো কোন ভাবেই আমাকে স্পর্শের সাথে দেখা করতে দেবে না। তাহলে আমি কি স্পর্শের সাথে দেখা করতেই পারব না??”

ফুল হতাশ হয়ে পুলিশ স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে পড়লো। কিচ্ছু ভালো লাগছেনা ওর।স্পর্শকে দেখার জন্য ওর মন আকুল হয়ে আছে।স্পর্শ এখন কি করছে কে জানে???

অন্ধকার কারাগারে বসে আছে স্পর্শ। এখানে থাকতে ওর একদম ভালো লাগছে না।মশার কামড়ে ওর গায়ের বিভিন্ন অংশ ফুলে উঠেছে।শতশত মশা ওকে ঘিরে রেখেছে। ঠোঁটের এক কোণে এখনও রক্ত জমাট বেঁধে আছে।খুব জ্বালা করছে অথচ কেউ এখনো ওকে ড্রেসিং করেনি।করবেই বা কেন??স্পর্শ বসে বসে হাত পা নাড়াচ্ছে বারবার। মশার কামড় থেকে বাঁচতে হলে এটা করতে হবে।একা একটা গারদে স্পর্শকে রাখা হয়েছে। আজকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে স্পর্শকে।কিন্তু ও তেমন কিছুই বলেনি।

এমন সময় একজন পুলিশ এসে স্পর্শকে খাবার দিয়ে যায়।স্পর্শ খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে দেখল তাতে রুটি আর ভাজি।স্পর্শ রুটি হাতে নিয়ে খানিকটা ছিঁড়ল।একি এটা রুটি না চামড়া।এত শক্ত কেন??স্পর্শ রুটিটা প্লেটে রেখে দিলো।এসব খাবার খাওয়া যায় নাকি??অথচ এসব খাবার আর মশার কামড় খেয়েই ওর বাবা দশটা বছর জেলে থেকেছে। একথা মনে পড়তেই ওর চোখ দুটো ভিজে উঠলো। একজন পুলিশ এসে বলল,

–“স্পর্শ তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে তোমার পরিবার।”

স্পর্শ চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো।স্পন্দন ওর মামা ও বাবা আসল।স্পর্শ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।কি বলবে ও বুঝতে পারছে না।স্পন্দন রাগি সুরে বলল,

–“স্পর্শ এসব কি?? তুই এসব কেন করলি??জানিস না ওই আজমল চৌধুরী ঠিক কতটা ক্ষমতাবান লোক। ওনার সাথে পেরে ওঠা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারপরও তুই।”

স্পর্শ কোন কথা বলছে না চুপ করে আছে।মামা বললেন,

–“স্পর্শ তোর একবার তোর মায়ের কথা ভাবা উচিৎ ছিল। তুই জানিস তোর মা এখন কতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”

স্পর্ল এবার মুখ খুলল,

–“মা, মায়ের কি হয়েছে মামা??মা ভালো আছে তো??”

স্পর্শের বাবা বলল,

–“তুমি কি তোমার মাকে সুস্থ থাকতে দিয়েছো?? তোমার মা এখন কোন পরিস্থিতিতে আছে সেটা তুমি জানো??”

স্পর্শ কোন কথা বলল না।স্পন্দন বলল,

–“তুই জানিস না তোর এখন কি ভয়ানক শাস্তি হতে পারে। আজমল চৌধুরী তোকে ছাড়বে না।”

–“ভাগ্যে যা লেখা আছে তাই হবে।”

–“তোকে ছাড়া আমরা থাকব কিভাবে ভেবে দেখেছিস। এতগুলো বছর পর বাবাকে পেয়েছি‌। এখন আবার তুই। আমরা থাকব কিভাবে??মা কিভাবে থাকবে?”

স্পর্শ ওর ভাইয়ের হাত ধরে বলল,

–“তুমি তো আছো ভাইয়া। তুমি প্লিজ সবটা সামলে নিও।”

–“আমি নিজেকে সামলাতে পারছি না সেখানে বাকি সব কিভাবে সামলাব??”

স্পন্দন কাঁদছে।ও স্পর্শকে খুব ভালোবাসে। ছোটবেলা থেকে বাবার অভাব ওই পূরণ করে এসেছে। কিন্তু এখন স্পর্শের এই অবস্থা দেখতে পারছে না স্পন্দন। কথা বলার সময় শেষ হওয়াতে সবাইকে বের হয়ে যেতে হয়।

🍁🍁🍁

ফুল ফুটপাত থেকে উঠে দাঁড়ায়।চোখ মুছে আবার হাঁটতে লাগলো। এখন বাড়ি ফিরে যাবে। দেরি করে ফিরলেও কোন সমস্যা নেই কারণ ওর রুমে কেউ ভুলেও পা রাখে না। হাঁটতে হাঁটতে ওর চোখ গেল সামনের গাড়ির দিকে। গাড়িতে বসা লোকটাকে ওর চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু ততক্ষণে গাড়িটা চলে গেছে। ফুল আনমনেই বলে উঠে,

–“আরে এটা রাজির আঙ্কেল না??হ্যা সেটাই তো মনে হচ্ছে। পাশের দুজন তাহলে কে ছিল??আঙ্কেল কি স্পর্শের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন??হ্যা তাই হবে হয়তো!! গাড়িটা তো পুলিশ স্টেশনের দিক থেকেই এসেছে।ইশশ আরেকটুখানি ওখানে থাকলে আঙ্কেলের সাথে স্পর্শের সাথে দেখা করতে পারতাম।ধ্যাত,,,,,।”

ফুল একটা সিএনজি ডেকে বাড়িতে চলে এলো। দেয়াল টপকে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। কিন্তু প্রবলেম হলো বাড়িতে ঢুকবে কিভাবে??ব্যাগসহ দেখলে তো সবাই সন্দেহ করবে। ফুল অনেক ভেবে বুদ্ধি বের করল।ওর রুমের বারান্দায় যে শাড়িটা ঝুলছে তার সাথে ব্যাগটা বেঁধে দিলো তারপর মেইন দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকলো।ড্রয়িং রুমে তেমন কেউ নেই ওর দাদি সোফায় বসে পান খাচ্ছে। আর সার্ভেন্টরা কাজ করছে। ফুল কে দেখেই ওর দাদি বলে উঠলো,

–“ফুল এইহানে আয়।কই গেছিলি??”

ফুল দাদির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

–“বাগানে গিয়েছিলাম।”

একথা শুনে দাদি গালে হাত দিয়ে বলল,

–“কি কস?? তুই তো হারাদিন ঘরেই থাকতি এহন কি হইছে তোর??”

ফুল বিড়বিড় করে বলল,

–“শুরু হয়ে গেল বুড়ির গোয়েন্দা গিরি করা।বুড়ি মরেও না।মরলে শান্তি পাই। আমার জীবনটা নরক করে দিলো।”

–“ওই মাইয়া কি বিড়বিড় করস। কিন্তু তুই যে এইহান দিয়া বাইরে গেলি আমিতো দেখলাম না।সেই সাঝ থাইকা আমি এইহানে বইয়া আছি।”

ফুল এগিয়ে এসে টেবিল থেকে চশমাটা নিয়ে ওর দাদির চোখে পরিয়ে দিয়ে বলল,

–“চোখে চশমা না থাকলে আমাকে কেন চোর ডাকাত আসলেও দেখতে পাবে না।”

বলেই ফুল চলে যেতে নিলে ওর দাদি ডেকে বললেন,

–“এই হোন আজকে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়বি। কাইন্দা কাইন্দা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবি দেখবি তিনি তোরে মাফ কইরা দিছে।”

ফুল থমকে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

–“আমি কোন অপরাধের ক্ষমা চাইব??”

–“আরে মাইয়া তুই যেই এতদিন পরপুরুষের সাথে মেলামেশা কইরা আইছোস তার লাইগা মাফ চাইবি। তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে যা চাইবি আল্লাহ তোরে তাই দেবে।”

শেষের কথাটা শুনে ফুল আগ্রহী হয়ে বলল,

–“সত্যি আমি যা চাইব আল্লাহ তাই দেবে??”

–“হ দেবে।”

ফুল আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেল। বারান্দায় গিয়ে শাড়িটা আর ব্যাগ টা গুছিয়ে রেখে দিলো।

রাত তিনটার সময় ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে ফুল তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে। নিজের জন্য নয় স্পর্শের জন্য প্রান ভরে প্রার্থনা করে। তারপর আর ঘুমায় না একেবারে ফজরের নামাজ পড়ে তারপর ঘুমায়।

সকালে সার্ভেন্ট এসে ফুলকে ডেকে তুলে ড্রয়িং রুমে যেতে বলে। ফুল উঠে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখল ওর বাবা আর দাদি কথা বলতেছে।ফুলকে দেখে ওর বাবা বলল,

–“তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। আজকে কোর্টে যেতে হবে। তোমাকে সাক্ষী দিতে হবে। আর একটা কথা সম্পূর্ণ স্পর্শের বিরুদ্ধে কথা বলবে তুমি। আমি চাই ওর কঠোর শাস্তি হোক।”

ফুল মাথা দুলিয়ে রুমে চলে গেল। রেডি হয়ে বাবার সাথে কোর্টে গেল। সিলেটের সবচেয়ে বড় আইনজীবী কে ঠিক করেছে ফুলের বাবা।ওনি চান এই কেসটা জিততে। কোর্টে গিয়ে ফুল স্পর্শের বাবাকে দেখতে পেল কিন্তু কাছে যেতে পারল না।ওর বাবা ওকে পুতুলের ন্যায় বসিয়ে রেখেছে। বিচার শুরু হওয়ার একটু আগেই স্পর্শকে আনা হয়। ফুল স্পর্শের দিকে তাকালো। একদিন পর স্পর্শকে দেখল এতেই ফুলের মনে হচ্ছিল যেন এক বছর পর দেখতেছে। ফুল অপলক চোখে স্পর্শের দিকে তাকিয়ে আছে। ওদিকে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। দু’পক্ষের উকিল বিভিন্ন নোটিশ দিচ্ছে। শেষমেশ ফুলকে কাঠগড়ায় ডাকা হলো। ফুল শুকনো ঢোক গিলে কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়।ওর সামনাসামনি কাঠগড়ায় স্পর্শ দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে।স্পর্শ এখনও ফুলের দিকে তাকায়নি।ফুলকে ওর আইনজীবী বলল,

–“ফুল তুমি বলো কিভাবে আসামি স্পর্শ তোমাকে কিডন্যাপ করে আটকে রেখেছিল এবং কি কি অত্যাচার করেছিল?? তুমি তা নির্ভয়ে বলো।”

ফুল শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

–“আমাকে কিডন্যাপ করা হয়নি।আমি স্পর্শের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলাম।”

ফুলের এরকম বয়ানে উপস্থিত সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এমনকি স্পর্শও ফুলের দিকে তাকালো।

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here