বৃষ্টি থামার শেষে পর্ব -০৭

# বৃষ্টি থামার শেষে
পর্ব-৭
ইশা আর অনির প্রেম টা হয়েছিল রুপার জন্য। রুপার কাছে ইশার ভালোলাগার কথা শুনে অনি যেন অনেক টা সাহস পেল। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে অনিক নীল শাড়ী, এক গুচ্ছ রজনীগন্ধা ফুল নিয়ে হোস্টেলের সামনে এসে ইশা কে ফোন করে বলেছিল, একটু নিচে আসবি?
অসময়ে অনির আগমনে ইশা যেমন একটু চমকে গিয়েছিল তেমন খুশিও হয়েছিল খুব। দ্রুত পায়ে ছুটে এসেছিল অনির কাছে। হাতে শাড়ির ব্যাগ আর রজনীগন্ধা গুচ্ছ গুলো গুজে দিয়ে বলেছিল এগুলো তোর। শুক্রবার বিকেলে শাড়ি পরে এইখানে দাড়াবি। আমি তোর জন্য অপেক্ষা করবো।

ইশার কাছে সমস্ত ব্যাপার টা মনে হয়েছে স্বপ্নের মতো। অনেক টা সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। শেষ বিকেলের আলোটা তখন মরে এসেছিল প্রায়। সূর্য তখন ডুবুডুবু করছে। ভালোলাগায় পুরো সময় টা আচ্ছন্নের মতন কাটলো ইশার। রুমে ফিরে গিয়েও অনেক ক্ষন বসে রইলো। শাড়ির ব্যাগ টা তখন ও খুলে দেখেনি। মুগ্ধতার রেশ যখন একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছিল, তখন শাড়িটা খুলে দেখেছিল। ভিতরে ছোট এক টুকরো কাগজে লেখা ছিলো, আজ থেকে সারাজীবনের জন্য তোর শাড়ি কেনার দায়িত্ব নিলাম। থাকবি তো আমার পাশে এমন করে!

ইশার চোখে খুশিতে পানি এসে গেল। সব টা যেন সুন্দর এক স্বপ্ন। এই স্বপ্ন চলতে থাকুক অনন্তকাল ধরে।

সেই শুক্রবার সদ্য প্রেমে পড়া প্রেমিক যুগল সারাটাদিন ব্যস্ত শহরে ঘুরে বেড়ালো। শহরের অলিতে গলিতে এরপর সুযোগ পেলেই দুজনে বাদাম খেতে খেতে হাটতো। রোজ সন্ধ্যায় পার্কে বসে গল্প করতো। এই গল্পগুলো শুধু নিজেদের গল্প ছিলো। নতুন নতুন প্রেমে যারা পড়ে তাদের সমস্যা হলো এরা পৃথিবীর যাবতীয় সবকিছু ভুলে যায়। ঠিক তেমন এরা দুজনেও ভুলে গেল যে তূর্য নামে কেউ একজন আছে। তূর্য ইশাকে ফোন করলে ইশা ব্যস্ততার বাহানা দিয়ে ফোন রেখে দেয়। অনিক ও এর ব্যতিক্রম নয়। তূর্য ঠিক এই ভয়টাই যেন পাচ্ছিলো।
এক বিকেলে তিনজন দেখা করতে এলে তূর্য বুঝে যায় যে এই দুটো মানুষ যতটা কাছাকাছি নিজেরা এসেছে, ঠিক ততটাই দূরে ওকে ঠেলে দিয়েছে।

অবচেতন মন তূর্য কে বলে দেয়, ওদের স্পেস দরকার তূর্য। তুই কেন শুধু শুধু ওদের মধ্যে যাস।
নিজেই অনেক টা গুটিয়ে নেয় বন্ধুদের কাছ থেকে। হঠাৎ যেন অনিকের খেয়াল আসে। খেয়াল আসে ইশার ও।
দেখা করে চেষ্টা করে নিজেদের মধ্যের দূরত্ব টুকু মিটিয়ে নিতে। সব ভুলে তূর্য আবারও আগের মতো হয়ে যায়। কিন্তু আগের মতো বন্ধুদের পায় না। ইশাকে ফোন করে আড্ডার কথা বললে এড়িয়ে যায়, অনিও এড়িয়ে যায়। অথচ ওদের দুজনের ফেসবুক একটিভিটি বলে দেয় যে দুজনের জম্পেশ আড্ডা চলছে।

এরপর দিনগুলো যেন আড়ম্বরহীন ভাবেই কেটে যায়। ছটফটানি তূর্য হঠাৎই যেন নিশ্চুপ হয়ে যায়। দলবেঁধে আকাশে ওড়া পাখি যেমন নিস্তেজ হয়ে যায় দলভেঙে তূর্য ও তেমন হয়ে যায়।
ইশা আর অনিক কিছুই বুঝতে পারে না। তারা আগের মতো ই উচ্ছল হাসিখুশি থাকে।

তূর্য মাঝেমধ্যে বলতো, তোরা বদলে গেছিস খুব।

ইশা হাসতে হাসতে বলেছিল, বদলে যাওয়া দরকার রে দোস্ত। তুই ও যা।

যদিও কথাগুলো হাস্যচ্ছলে বলা। তবুও তূর্যর খুব খারাপ লাগতো। এই খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক না সেটা তূর্য টের পেয়েছিল অনেক দিন বাদে। এই খারাপ লাগার অর্থ ভয়ানক। ও ইশাকে কোনোভাবেই অনির পাশে মানতে পারছে না। ইশার হেসে হেসে অনির সাথে কথা বলা, শাড়ি পরে রিকশায় ঘুরে বেড়ানো, টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার সাজিয়ে আনা কোনোটাই ও মানতে পারে না। যত নিজেকে শান্ত রাখতে চায় তারচেয়ে দ্বিগুণ উত্তেজিত হয়ে যায়। নিজের মন কে বারবার বোঝাতে চাইলেও সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। একদিন তূর্য ইশাকে ফোন করে বলে,
“কালকের দিন টা তুই আমার সাথে থাকবি।

এইটুকু বলে ফোন কেটে দেয়। উত্তরের আশাও করে না আর।

পরদিন ইশা ব্যস্ততাকে দূরে ঠেলে তূর্যর সাথে দেখা করতে যায়। তূর্য রিকশা নিয়ে এখানে ওখানে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করে। ইশা তূর্যর বিচলিত মুখ দেখে বুঝতে পারে যে কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে বারবার জানতে চায়। এরমধ্যে অনিক ইশা কে ফোন দিলে তূর্য বলে, খবরদার তুই ফোন ধরবি না। আজকের দিন টা তুই শুধু আমার।

ইশা শেষ কথাটা শুনে বিস্মিত না হয়ে পারে না। বলে, কী বলতে চাইছিস খুলে বলতো?

তূর্য তখন ক্রোধে অন্ধ হয়ে যায়। একহাতে নিজের চুল শক্ত করে টানে। ইশা ব্যস্ত গলায় বারবার জানতে চায়, কী হয়েছে?

তূর্য নিজেকে ধাতস্থ করে রিকশাওয়ালাকে রিকশা থামাতে বলে। রিকশা থামিয়ে লোক সমাবেশ কম এমন জায়গায় এসে হঠাৎই ইশার হাত চেপে ধরে বলে, ইশা আমি তোকে ভালোবাসি।

ইশা স্তব্ধ হয়ে যায়। কোনোভাবে ঠোঁট নেড়ে বলে, কী বললি?

তূর্য অসহায় গলায় বলে, বিশ্বাস কর আমি এমন টা চাইনি। কিন্তু কিভাবে যেন হয়ে গেল।

ইশা কঠিন গলায় বলেছিল, আমি অনিকে ভালোবাসি।

তূর্য দুহাতে মুখ ডেকে বসে পড়লো। ইশা রাগী গলায় বলল, ছিঃ! তোর কাছ থেকে এমন টা আশা করিনি।

রাগে অন্ধ হয়ে দিগবিদিক শূন্য তূর্য ইশার দুই বাহু চেপে ধরে বলল, আমি খারাপ! তাহলে তুই কী? তুই যখন প্রেমে পড়েছিলি তখন কী ধোঁয়া তুলসীপাতা ছিলি!

ইশাও গলা চড়িয়ে বলেছিল, হ্যাঁ। আমি তো আর অনির জীবনে কেউ থাকা অবস্থায় ভালোবাসি নি, তাই আমি ধোঁয়া তুলসীপাতা ই বটে।

হঠাৎ ই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে তূর্য বলল, আমি কী তাহলে এখন মরে যাব?

ইশাও রাগে যেন পাগল হয়ে গেছে। বলল, অনিকে ভালোবাসার কথা তো তোকেই আমি জানিয়েছিলাম তূর্য! তুই তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলি! এইভাবে আমাকে কষ্ট দিলি!

তূর্য যেন আকাশ থেকে পড়লো। বলল, এসব কী বলছিস তুই! আমি কী ইচ্ছে করে তোর প্রেমে পড়েছি! তুই যেমন অনির প্রেমে পড়েছিস, আমিও তেমন…..

“ওহ তাহলে তুই অনির উপর জেলাস ছিলি?”

“মানে?”

“মানে হলো আমরা দুজন একসাথে আছি বলে তোর সহ্য হচ্ছে না। এইজন্য চাইছিস সম্পর্ক টা ভেঙে দিতে।”

“আমি সম্পর্ক ভাঙতে চাইছি”?
অনি বিস্মিত হয়ে কথা টা বলল।

“তা নয়তো কী? আমরা দুজন একসাথে হ্যাপি আছি সেটা তুই সইতে না পেরে ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিস!”

“তোর কথা সত্যি। আমি আসলেই তোদের দুজনকে একসাথে দেখতে পারছি না। মনে হচ্ছে এরচেয়ে মরে যাওয়া ভালো।

ইশা রাগী গলায় বলল, তাহলে মরে যা! তোর জায়গায় আমি থাকলে মরেই যেতাম। ছিঃ তোর লজ্জা করেনা! এই হলো অনি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড!

তূর্য বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইলো। ব্যাপার টা আরও গড়াতো যদি না দুজনের চোখে পাব্লিকের মজা দেখার ব্যাপার টা চোখে পড়তো।

এই ব্যাপার টা অনিক পর্যন্ত গড়িয়েছে। এক কালের প্রানের বন্ধুকে ইশা বিশ্রীভাবে অনিকের সামনে অপমান করলে তূর্য নতমস্তকে সব টা মেনে নিলো। তূর্য তীর্যক হেসে বলল, তোর কিছু বলার নেই।

অনিক রাগ হোক আর ঘেন্না হোক, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সেদিনও মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিলো। ইশা অনিকের উদ্দেশ্য বলেছিল, অনি আজ থেকে ওর সাথে আমি আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। তুই যদি রাখতে চাস তাহলে সেটা তোর ব্যাপার।

তূর্য হেসে বলেছিল, একবার বলবি তো আমার দোষ টা কোথায়? আমি যদি দোষী হয়ে থাকি তাহলে তোরা দুজন ও সেই দোষে সমান দোষী।

ইশা সেই বৃষ্টির মধ্যে ই গটগট করে হেটে গিয়েছিল। অনিক কে তূর্য বলল, তুই বলতো আমার দোষ টা কোথায়?

অনিক সেদিন কথা বলেনি। চুপচাপ বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করে গেছে। সেটাই ছিলো তিন বন্ধুর একসাথে দাঁড়িয়ে গল্প করা।
তার দিন দশেক বাদে আসাদ গেট থেকে মোহাম্মদপুর যাওয়ার মোড়ে তূর্য বাইক এক্সিডেন্ট করলো। হেলমেট পরে থাকার কারনে মাথার আঘাত থেকে বাঁচলেও একটা পা গুড়ো হয়ে গেছিলো। খবর পেয়ে হসপিটালে ছুটে এসেছিল দুই বন্ধুই। কিন্তু তূর্য তখন কথা বলার মতন অবস্থায় ছিলো না।

তূর্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য মাদ্রাজ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এয়ারপোর্টে ছাড়তে এসে অনিক বলেছিল, সব ভুলে গিয়ে আমরা আবার এক হতে পারি না।
তূর্য স্মিত হেসে মাথা নেড়ে সায় জানালো। ইশা তখন হাপুস নয়নে কেঁদে চলছে।
অনিক ছলছল চোখ নিয়ে বলল, আমরা আবার আগের মতো হয়ে আড্ডা দেব। তুই ফিরে আয় এরপর তিনজন মিলে সমুদ্র দেখতে যাব। সমুদ্রের জলে সব ভুল, মান, অভিমান ধুয়ে ফেলে নতুন করে বাঁচবো।

তূর্য আস্তে করে বলেছিল, আচ্ছা।

প্লেনে উঠে মনে মনে তূর্য বলেছিল, দোস্ত তোরা কথা রাখিস নি। তাই আমিও রাখলাম না। তোরা ভালো থাকিস। বেঁচে থাকলে আর কোনোদিন তোদের সামনে আসবো না।

চলুক?……..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here