বৃষ্টি শেষে রোদ পর্ব -০৯+১০

#বৃষ্টি_শেষে_রোদ (পর্ব ৯)
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ

তেজস্ব সূর্যটা রক্তিম হয়ে অস্তমিত হওয়ার পথে। থমথমে পরিবেশে তাপ খুব একটা নেই। তবুও অনেকটা পথ সাইকেল চালিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘামে ভিজে উঠছে শরির। রিদ পকেট থেকে টিসুর প্যাকেট টা বের করে টিসু গুলো হাতে নিয়ে প্যাকেট টা ছুড়ে ফেলে দিল এক পাশে। চুপচাপ আরশির কপালে ও গালে জমা ঘাম গুলো মুছে দিতে শুরু করলো। মুছতে মুছতে কিছুটা হেসে বলে,
“ভাগ্যিস আসার সময় মুখে আটা-ময়দা মেখে আসিস নি। নয়তো মুখ একদম প্লাস্টার হয়ে যেতো।”
“সেগুলো কে মেকআপ বলে। নট আটা-ময়দা।”
“ঐ একই কথা। এই তোরা মেয়েদের কারণে কয়দিন পর মানুষ অনাহারে ম’রবে।”
“কেন, আমরা মেয়েরা আবার কি করলাম?”
“তোদের কারণেই দেশে আটা ময়দার দাম তরতর করে বাড়ছে। আগে মানুষ ভাত না পেলে রুটি খেতো। তোদের কারণে এখন সেটাও পারবে না। কারণ দিন দিন চালের চেয়েও আটা-ময়দার দাম বেশি হয়ে যাচ্ছে।”

একটা শ্বাস ছাড়লো আরশি। রিদকে থামিয়ে বলে,
“হয়েছে, আপনাকে আর রাষ্ট্রিয় চিন্তাবিদ হতে হবে না। সন্ধা হয়ে যাচ্ছে বাসায় চলুন।”
বলেই উঠে দাড়লো আরশি। রিদ হাত থেকে টিসু গুলো ফেলে আরশির ওড়নার এক পাশ দিয়ে নিজের মুখ, গলা ভালো করে মুছে নিল। আরশি নিজের মাঝে বিড়বিড় করে বলে, ‘মেয়েদের অপমান করার স্বাদ আজ মিটাবো আমি।’

সাইকেল নিয়ে দুজন কিছুটা দুর যেতেই আরশি সাইকেল থামিয়ে বলে,
“আইসক্রিম এনে দিবেন, গরম লাগছে খুব।”
রিদ আরশিকে দাড়াতে বলে চুপচাপ কিছু দুর গিয়ে একটা আইসক্রিম নিয়ে এলো। আরশি ওটা হাতে নিয়ে বলে,
“আপনার জন্য আনেন নি?”
“না আমার ইচ্ছে করছে না।”
“তাহলে আমার জন্য আরো একটা নিয়ে আসুন, একটায় হবে না আমার।”

যেখানে আবদার টা আরশির, সেখানে ‘না’ বলার সাধ্য নেই রিদের। চুপচাপ গিয়ে আরেকটা আইসক্রিম এনে বলে,
“গলে যাওয়ার আগে শেষ কর। তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে। বাবা-মা সবাই হয়তো অনেক আগেই বাসায় চলে এসেছে।”

আরশি দুই হাতে দুইটা নিয়ে বলে,
“সাইকেল টা ধরেন।”
রিদ সাইকেল ধরতেই হাটা শুরু করে আরশি। রিদ মাঝখানে দাড়িয়ে দুই হাতে দুইটা সাইকেল ধরে বলে,
“এক জায়গায় বসে শেষ কর।”
আরশি হাটতে হাটতে বলে,
“বসার সময় নেই। সন্ধা হয়ে যাচ্ছে।”

দুই হাতে দুইটা সাইকেল ধরে হাটছে রিদ। যদিও একটু অসুবিধা হচ্ছে। তবুও ম্যানেজ করে নিচ্ছে কোনো ভাবে। পাশেই দুই হাতে দুইটা আইসক্রিম নিয়ে হেলেদুলে হাটছে আরশি।
পাঁচ মিনিট গেলো আরশির এখনো আইসক্রিম শেষ হলো না। দশ মিনিট, পনেরো মিনিট পরও শেষ হলো না আইসক্রিম। ক্রিম গুলো গলে অলরেডি আরশির হাতে মাখামাখি হতে শুরু করেছে।
রিদ দু’হাতে দুইটা সাইকেল নিয়ে হাটতে হাটতে বিরক্তিকর ভাবে বলে,
“খাচ্ছিস নাকি নাটক করছিস? দু’টো আইসক্রিম খেতে এতোক্ষণ লাগে? এদিকে দু’টো সাইকেল সামলাতে সামলাতে হাতে ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে আমার।”
আরশি একটু ন্যাকা স্বরে বলে,
“এই তো শেষ আর একটু কষ্ট করেন প্লিজ।”

বিশ মিনিট গেলো। তবুও শেষ হলো না আইসক্রিম। দুটো সাইকেল মাঝে মাঝে এদিক সেদিক চলে যেতে চাইলে তা সামলাতে সামলাতে রিদ হাতের ব্যাথায় বিরক্ত হয়ে আরশিকে ধমক দিলেও তা কানে নেয় না আরশি। থামতে বললেও থামছে না। দেড়ি হয়ে যাচ্ছে বলে আরো দ্রুত পায়ে হাটছে সে।

রিদের হাতের ব্যাথা ও তীব্র বিরক্তমাখা মুখটা দেখেই যেন দারুণ আনন্দ পাচ্ছে আরশি। মুচকি হেসে নিজের মাঝে বিড়বিড় করে বলে, ‘আমরা মেয়েরা হাতে মা’রি না, বুদ্ধিতে মা’রি। একটু আগেতো ঠিকই আটা-ময়দার বাহানায় মেয়েদের অপমান করছিলে বাবু। আমরা ছাড় দিলেও ছেড়ে দিই না। এখন বুঝো মজা।’

নিজের মাঝে বিড়বিড় করে কথা গুলো বলছে আর মিটিমিটি হাসছে আরশি। আরশির মিটিমিটি হাসি চোখে পরতেই রিদ এবার ভালোই বুঝতে পারে, আরশি ইচ্ছে করেই তাকে কষ্ট দিচ্ছে। এবার দাড়িয়ে গিয়ে রাগী গলায় বলে,
“পিচ্চির বাচ্চা,,, তোকে যদি আর কখনো বাইরে নিয়ে আসছি তো আমার নাম পাল্টে রাখিস।”

””””””””””””””””””””””””””’

পরদিন সকালে বাসায় চলে যায় ফুপিরা। সাথে চলে যায় আরশিও। সন্ধার আগে মা রুমকিকে ডেকে বলে ছাদ থেকে কাপর গুলো নিয়ে আসতে। ল্যাপটপ নিয়ে বসে ছিল রিদ। হটাৎ মায়ের মুখে কাপরের কথা শুনে ক্ষনিকটা চমকালো সে। আরশি কি তার শাড়ি গুলো নিয়েছিল? চেক করতেই দেখে ব্যাগ দু’টো আগের জায়গাতেই আছে। মেয়েটা দেখি সত্যিই মাথা মোটা। কোনো কিছুই ঠিকঠাক মতো করে না। তবে অবশ্য মেয়েটাকে মনে মনে ধন্যবাদ জানালেও মন্দ হয় না। এমনিতেও দু’তিন দিন পাশে পাশে থেকে এখন চলে যাওয়ার কারণে সকাল থেকেই তার কথা মনে হচ্ছিল খুব করে। যাকে সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মিস করা। এখন এই শাড়ির বাহানায় তার কাছে যাওয়ার একটা সুজুগ তৈরি হয়ে গেলো। কারণ এমনি এমনি গেলে নিজের আত্মসম্মানে লাগে। সে বুঝে যাবে তাকে দেখতেই তার বাসায় চলে গেলাম। আমি ছেলে মানুষ, আমার একটা এক্সট্রা ভাব আছে না?

সন্ধায় কলিং বেল চাপলে ফুপি এসে দরজা খুলে দিল। রিদকে দেখে হাসি মুখে ঘরে নিয়ে গেলো তাকে। দেখে আরশি নুডলস রান্না করছে। রিদকে দেখেই আরশি স্বাভাবিক গলায় বলে,
“এসেছেন?”
রিদ ক্ষনিকটা অবাক হয়ে বলে,
“এমন ভাবে বললি, যেন আগে থেকেই জানতে আমি আসবো! আর শাড়ি গুলো রেখে এসেছিস কেন?”

আরশি নুডলস নাড়তে নাড়তে বলে,
“ইচ্ছে করেই রেখে এসেছি।”
“কেন!”
“রেখে আসলে আপনি নিয়ে আসবেন জানতাম, তাই।”
“পিচ্চি মেয়ে দিন দিন খুব ফাজিল হয়ে যাচ্ছিস।”
“দেখতে হবে বউ টা কার।”
আরশির এমন কথায় ক্ষনিকটা ভ্যাবাচেকা খাওয়ার মতো কৌতুহলী দৃষ্টিতে চেয়ে রিদ বলে,
“কার?”
“আমার জামাইর।”
“জামাই কে?”
“যার সাথে বিয়ে হবে সে।”
এবার নিশ্চুপ হয়ে কয়েক সেকেন্ড আরশির দিকে চেয়ে রইল রিদ। রিদকে নিশ্চুপ দেখে আড়চোখে রিদের দিকে তাকাতেই রিদ তার এক কান চেপে ধরে বলে,
“নাস্তা শেষে তাড়াতাড়ি পড়ার টেবিলা আয়। পাকনামো বের করছি তোর।”

পুরোটা সময় পড়া নিয়ে খুব বকা শুনতে হলো আরশিকে। বেচারি গাল ফুলিয়ে বসে আছে বইয়ের দিকে চেয়ে। রিদও পাশে বসে একটা বই পড়ছে। বই টা সাথে করেই নিয়ে এসেছিল হয়তো। প্রিপারেশন নিচ্ছে। সে প্রচুর পড়ুয়া। তাদের বাড়িতে গেলেও বেশির ভাগ সময় পড়তে দেখা যায় তাকে। সে ক্ষেত্রে আরশি হলো ঠিক তার উল্টো। মাঝে মাঝে মনে হয়, মেয়ে মানুষ এত পড়ে লাভ কি? ভাবতেই রিদ আড়চোখে তাকালো তার দিকে। পূনরায় বইয়ের দিকে মন দিল সে। এই মুহূর্তে রিদকে চরম বিরক্তিকর মনে হচ্ছে তার। ইচ্ছে করছে মাথাটা চেপে ধরে বইয়ের মাঝেই চেপ্টা করে ফেলতে। এই এক জায়গাতেই শুধু মানুষটাকে বিরক্তিকর মনে হয় তার।

খাওয়া শেষে বেলকনিতে বসে ফোন টিপছে রিদ। রাত তখন সাড়ে এগারো টা। আরশি তার পাশে এসে বসলে রিদ ফোনের দিকে চেয়ে বলে,
“ঘুমাস নি?”
“না পরে ঘুমাবো।”
রিদ এবার ফোন রেখে বলে,
“রাত এগারোটা থেকে দুইটা, এই সময়ের ঘুম কত গুরুত্বপূর্ণ জানিস? এই সময় টা না ঘুমালে বাকি একুশ ঘন্টা ঘুমালেও এই ঘুম পূর্ণ হবে না। যা ঘুমিয়ে পর।”
“আমাকে এত জ্ঞান দিয়ে নিজে তো ঠিকই জেগে থাকবেন।”
“আমি বড়ো আর তুই বাচ্চা মেয়ে।”

‘হুহ আইছে বড়ো মানুষ।’ কথাটা বিড়বিড় করে বলে রিদের দিকে তাকায় আরশি। রিদ ভ্রু কুচকে বলে,
“কিছু বললি?”
“বলছি, একটা ইচ্ছে আছে, ওটা পূরণ হলে তারপর ঘুমাতে যাবো।”
“কি সেটা?”
“জানেন আমার বান্ধবির বয়ফ্রেন্ড নাকি তাকে গান শুনিয়েছে।”
কথাটা চাপা মনে হলেও রিদ পাত্তা না দেওয়ার মতো করে বলে,
“তো আমি কি করবো?”
“আপনি তো গান গাইতে পারেন।”
“তো?”
“এখন আমাকে একটা গান শোনাতে হবে।”
“আমি কি তোর বয়ফ্রেন্ড?”
“আমি কি সেটা বলেছি? আমার তো আপনি ছাড়া তেমন কেউ নাই। তাই ভাবলাম ইচ্ছে হয়েছে যখন আপনার থেকেই গান শুনবো।”
“গান গাওয়ার মুড নেই এখন।”
“প্লিজ একটু।”

রিদ এবার একটু রাগী দৃষ্টিতে চেয়ে বলে,
“ঘুমোতো যেতে বলেছি তোকে।”
ক্ষনিকটা মন খারাপ হলো আরশির। চলে যেতে চাইলে রিদ কি বুঝে তার হাত ধরে শান্ত গলায় বলে,
“ওকে ফাইন। বস এখানে।”
চুপচাপ রিদের পাশে বসলো আরশি। এখানে গিটার নেই, তাই এমনিই গাওয়ার প্রস্তুতি নিল রিদ। আরশির দিকে চেয়ে বলে,
“বাংলা নাকি ইংলিশ?”
আরশি কিছুটা ভেবে বলে,
“উম,,,,, বাংলা।”

রিদ কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে গলা পরিষ্কার করার ভঙ্গিতে একটু গলা ঝাকি দিয়ে গাওয়া শুরু করলো,,,

“কতটা হাত বাড়িয়ে দিলে তোমার মন ধরা যায়?
কতটা পথ পাড়ি দিলে তোমার প্রেম ছোঁয়া যায়?(×২)
পাব কি পাবো না জানি না,,,,, তোমাকে তো বুঝি না,,,,
পাব কি পাবো না জানি না,,,,, তোমাকে তো বুঝি না,,,,,,,,,,,,,,

তবু তোমার প্রেমে আমি পড়োছি,,,,,,,,
বেচে থেকেও যেন মরেছি,,,,,,,,
তোমার নামে বাজি ধরেছি,,, ধরেছি,,,,,,,,,,,”

গালে এক হাত দিয়ে মাথা কাত করার ভঙ্গিতে খুব মনোযোগ দিয়ে রিদের দিকে চেয়ে আছে আরশি। এতটুকু গাইতেই খুব নমনীয় গলায় বলে,
“সত্যি?”
রিদ গান থামিয়ে বলে,
“কি?”
“গানের মাঝে যেটা বলেছেন সেটা কি সত্যি?”

রিদ মুহুর্তেই কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে চেহারায় রাগী ভাব নিয়ে বলে,
“পিচ্চি বলে কি! এটা যাস্ট একটা গান। যেটা তোর আর শুনতে হবে না। এবার কানের নিচে একটা খাওয়ার আগে যা চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়?”

এবার খুব রাগ হলো আরশির। অভিমানী দৃষ্টিতে চেয়ে উঠে হাটা শুরু করলো রুমের দিকে। যেন ইচ্ছে করছে গ’লা টি’পে ধরতে। কত রোমান্টিক একটা মুহুর্ত তৈরি করে আবার সেটাতে হুট করে পানি ঢেলে দিল এই লোক। অসহ্য,,,,,,,,,,,,,

To be continue……………….#বৃষ্টি_শেষে_রোদ (পর্ব ১০)
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ

সাজ সকালে মুখে পানি পড়তেই ঘুম ভাঙলো রিদের। এক রাশ বিরক্তি নিয়ে সামনে গ্লাস হাতে দাড়ানো আরশির দিকে তাকাতেই দেখে হাসছে সে। এই সকাল সকাল ঘুমের মাঝে পানি ঢালার মতো বিরক্তিকর আর কিছু আছে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না। তবুও এই বিরক্তিকর কাজটা করে সে নির্লজ্জের মতো হাসছে।

এবার বিরক্তির সাথে চেহারায় রাগান্বিত ভাব রেখে আরশির এক হাত চেপে ধরে রিদ। আচমকাই এভাবে ধরায় পালাতে চেয়েও ব্যর্থ হলো আরশি। রিদ উঠে দাড়িয়ে অন্য হাতে মুখে লেগে থাকা পানি গুলো মুছে বলে,
“এটা কি ছিল?”
আরশি এখনও মুখে হাসি ধরে রেখে বলে,
“ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।”
রিদ চেহারায় রাগান্বিত ছাপ রেখে আবারও স্বাভাবিক গলায় বলে,
“এতো আলগা পিরিত তো আমি দেখাতে বলিনি।”
“আপনি কেন বলবেন, আমি কি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম?”

কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল রিদ। অতঃপর শান্ত গলায় বলে,
“এখন আর ভয় পাস না আমাকে?”
আরশি দু’দিকে ‘না’ সূচক মাথা নাড়ালো। রিদ কিছু একটা বোঝার ভঙ্গিতে উপর-নিচে হালকা মাথা নাড়িয়ে ‘আচ্ছা’ বলে আরশির দুই হাত একজায়গায় করলো। আরশির দু’হাত রিদ এক হাত দিয়ে জোড়ে চেপে ধরে হাটা শুরু করে ওয়াশ রুমের দিকে। আরশি উহ্ সূচক শুব্দ করে নিজেকে ছাড়াতে চেয়েও ব্যর্থ হলো। এবার একটু ভয় পেলো এটা ভেবে এই লোক কেন আমাকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাচ্ছে?

ওয়াশরুমে ঢুকে দেখে অর্ধেক পানি ভর্তি একটা বালতি রাখা আছে। রিদ ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,
“বাহ্ সব দেখি রেডি করাই আছে।”
আরশি এবার ব্যাপার টা বুঝতে পেরে ক্ষনিকটা কান্নার ভান ধরে বলে,
“স্যরি স্যরি স্যরি ভাইয়া, আর জীবনেও এমন কিছু করবো না। এই প্রমিস করছি।”

রিদ এবার তার হাত ছেড়ে এক পাশে দাড় করিয়ে বলে,
“কান ধরে দশ বার উটবস কর।”
ওয়াশ রুমে আশেপাশে কারো দেখে ফেলার ভয় নেই। তাই আরশি বাধ্য মেয়ের মতো কান ধরে উটবস করতে শুরু করলো। নয় পার হয়ে দশবার হতেই রিদ চুপচাপ বালতির পুরো পানিটাই ঢেলে দিল আরশির গায়ে। শারা শরির ভিজে গেলে যেন বোকা বনে গেলো আরশি। অবাক ভঙ্গিতে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে অতঃপর বলে,
“কান ধরার শাস্তি দিয়েছেন কান ধরেছি। তাবুও ভিজিয়ে দিলেন?”
রিদ এবার গাল টেনে একটা হাসি দিয়ে বলে,
“এটা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ স্কয়ার। কেউ আমাকে একটু ভালোবাসা দিলে আমি তাকে বহুগুণ ভালোবাসা ফিরিয়ে দিই। হিহিহি।”

বলেই চুপচাপ বেড়িয়ে গেলো রিদ। রাগে শরির রি রি করলেও কিছু বলতে পারছে না আরশি। নিজের দিকে তাকাতেই যেন এবার কাঁন্না পাচ্ছে খুব।

আরশির মা টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছেন। রিদ তার কাজে হেল্প করছে আর ফুপি-ভাতিজার দুখের-সুখের আলাপ করছে।
এর মাঝে এই সাজ সকালে আরশিকে ভেজা অবস্থায় দেখে ক্ষনিকটা চমকালো তার মা। কারণ জানতে চাইলে আরশি পরপর কয়েকটা নিশ্বাস নিয়ে যেন বেলুনের মতো ফুলছে। কিছুক্ষণ ফোঁস ফোঁস করে অতঃপর ক্ষনিকটা কাদু ভাব নিয়ে বলে,
“তোমার ভাইয়ের ছেলে করেছে এ কাজ। বিনা দোষে এই সাজ সকালে কাক ভেজা করে দিয়েছে আমায়।”

পূনরায় কাজে মন দিল তার মা। স্বাভাবিক ভাবে বলে,
“বিনা বাতাসে তো আর গাছের পাতা নড়ে না।”
“আমি কিছু করিনি।”
“তুমি কত ধোয়া তুলসীপাতা, সেটা তো রিদের ভেজা টি-শার্ট দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”

মায়ের কথা আরশি কিছুটা হতাশ হয় আরশি। মা হয়েও ভাইয়ের ছেলের পক্ষ নিয়ে নিজের মেয়ের বিরোদ্ধে রায় দিচ্ছে? দেশ থেকে ন্যায় বিচার উঠে যাচ্ছে দিন দিন।

“””””””””””””””””””””””””””

সকালে সবার নাস্তা শেষে যার যার ব্যস্ততায় উঠে চলে গেলেও এখনো টেবিলে নাস্তা নিয়ে বসে আছে ফারুক। একটু একটু করে খাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে খাবার টা শেষ করতে চাইছে না আজ।

সবাই উঠে চলে গেলে রুহির দিকে চেয়ে ফারুক বলে,
“ভাবি, এখানে বসো। তোমার সাথে কথা আছে একটু।”
রুহি কৌতুহল নিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে বলে,
“হুম ভাইয়া বলুন।”
ফারুক ক্ষনিকটা মৃদু হেসে বলে,
“প্রথমত আমাকে তুমি বা তুই করে বললেই আমি বেশি খুশি হবো। কারণ বয়সেও আমি আপনার ছোট। আর দ্বিতীয়’ত স্যরি।”

রুহি কিছুটা কৌতুহলী দৃষ্টিতে চেয়ে বলে,
“আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু স্যরি কেন?”
“ঐ দিনের ঘটনার জন্য। বিশ্বাস করুন ভাবি আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি। আরশি হোচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার সময় শুধু সেভ করেছিলাম এটুকুই। আর হুট করে রিদ ভাই এসে হয়তো ভুল বুঝে এমন একটা সিকুয়েশন ক্রিয়েট করে ফেলেছে। বিষয়টা পুরোটাই একটা মিস আন্ডারস্টেনিং।”

হুট করে ঐ টপিক উটায় রুহি কিচুটা বিব্রত হয়ে বলে,
“দেখো, যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমি মনে করি ওসব নিয়ে আর না ভাবাটাই ভালো হবে।”
ফারুক পূনরায় বলে,
“যদিও আমার মনে হয় আমি কোনো ভুল করিনি। তবুও ভাবি, নিজেকে অপরাধী মনে হয়। আমার মনে হয় আমার ক্ষমা চেয়ে আত্মিয়তার সম্পর্কটা সুন্দর রাখা উচিৎ। আমি জানি, রিদ ভাই আমার সাথে কথা বলতে চাইবে না। তবুও ভাবি আপনি তার সাথে আমার একটু কথা বলিয়ে দিবেন? আমি যাষ্ট ক্ষমা চাইবো আর কিছু না।”
প্রতি উত্তরে কিছুক্ষন চুপ থেকে রুহি বলে,
“আচ্ছা, দেখি কি করা যায়।”

“””””””””””””””””””””””””””””””

বেলকনিতে গিয়ে দাড়ালে বাইরে রিদের গাড়ি দাড় করানো দেখে চমকালো আরশি। সকালে গিয়েছিল, এখন আবার হুট করে আসার কারন কি?
বুঝতে না পেরে বেলকনি থেকে রুমে ফিরে আসে সে। তখনি রিদ রুমে প্রবেশ করে ক্ষনিকটা তাড়া দেখিয়ে বলে,
“রেডি হয়ে নে, বাইরে যাবো।”
“কেন?”
“গেলেই দেখবি।”
“আম্মু,,,,,,,”
“ফুপিকে বলেছি আমি। এখন যা বলছি চুপচাপ তাই কর। আমি কিছুক্ষণ ওয়েট করছি, দশ মিনিটের মাঝে রেডি হয়ে বাইরে আয়।”
বলেই বেরিয়ে গেলো রিদ। জানার কৌতুহল থাকলেও প্রশ্ন করার সুজুগ পেলো না আরশি।

রেডি হতে প্রায় পনেরো মিনিট সময় লাগলো তার। তাড়াহুড়ো করলেও পাঁচ মিনিট লেট। যাই হোক, এর জন্য কিছু শুনতে হয়নি তাকে। আরশি রেডি হয়ে বের হলে রিদ ফুপিকে ডেকে বলে,
“আমরা যাচ্ছি ফুপি।”
ফুপি তাদের কাছে এসে বলে,
“আচ্ছা, ওর বাবা ফেরার আগেই তারাতাড়ি ফিরে আসিস বাবা। নাহলে আবার রেগে যেতে পারে।”

রিদ অন্য দিকে তাকিয়ে নিজের মাঝে বিড়বিড় করে বলে, ‘বউ নিয়ে বাইরে গেলে শশুরের এতো সমস্যা কিসের?’
পাশ থেকে আরশির মা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কিছু বললি?”
রিদ ক্ষনিকটা মৃদু হেসে বলে,
“না ফুপি তেমন কিছু না। তাড়াতাড়িই ফিরে আসবো।”
“আচ্ছা, ফি আমানিল্লাহ।”

“”””””””””””””””””””””””””””””””

ছাঁদের মাঝে একটা খোলা রেস্টুরেন্টে বসে আছে দুজন। আরশি কৌতুহল নিয়ে রিদের দিকে চেয়ে বলে,
“আমরা এখানে কার জন্য অপেক্ষা করছি।”
“রুহির জন্য।”
রিদ শান্ত গলায় কথাটা বললেও অনেকটাই অবাক হয় আরশি। অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে বলে,
“রুহি আপু! হটাৎ এই জায়গায়!”
“হুম। বলল, বিয়ের দিন যাইনি তাই আজ যেন তোকে নিয়ে তার সাথে দেখা করি।”

কিছুটা নার্ভাস হয়ে গেলো আরশি। রুহি আপুর সাথে নিশ্চই দুলাভাইও আসবে। এতকিছুর পর ভাইয়ার সামনে দাড়াতে হবে, ভাবতেই কেমন যেন লাগছে তার। যেন এমনটা জানলে রিদের সাথে আসা দুরে থাক, বাসা থেকেই বের হতো না সে।
ভাবতে ভাবতেই রুহি আপু উপস্থিত হয় সেখানে। নার্ভাস হওয়া চেহারা এবার অবাক হওয়ায় রুপ নিল। রুহিকে দেখে খুশি হলেও পাশে ফারুককে দেখে অনেকটা অবাক হলো রিদ নিজেও।

রুহি সামনে আসতেই উঠে দাড়িয়ে গেলো রিদ। এক পলক ফারুক-কে দেখে নিয়ে শান্ত গলায় রুহির দিকে চেয়ে বলে,
“ও তোর সাথে কেন?”
শান্ত ভাবে প্রশ্ন করলেও রিদের রাগ বুঝতে সময় লাগলো না রুহির। এবার আরেকটু কাছে গিয়ে রিদের এক হাত ধরে বলে,
“দেখ, ভুল বুঝিস না ভাই। ফারুক তার ভুল বুঝতে পেরেছে। তাই সে এসেছে তোদের কাছে তার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইতে।”

রিদ পূনরায় শান্ত ভাবে বলে,
“এটা কি শুধুই একটা ভুল ছিল?”
রুহি পূনরায় তাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলে,
“দেখ যা হওয়ার হয়ে গেছে। ভুলে যা ওসব। ভুল বড়ো হলেও ক্ষমা করা মহৎ গুন।”
এর মাঝে ফারুকও পাশ থেকে বলে,
“আ’ম রিয়েলি স্যরি রিদ ভাই। ফান করতে গিয়ে আমার এমনটা করা ঠিক হয়নি। আমি আমাজ কাজের জন্য লজ্জিত। ছোট ভাই মনে করে ক্ষমা করে দিন, প্লিজ।”

রিদ কিছু না বলে চুপচাপ দাড়িয়ে রইল। ফারুক এবার আরশির দিকে চেয়ে দু হাত জোর করে বলে,
“আপু সত্যি আমি সেদিন মজা করতে গিয়ে এমনটা হয়ে গেছে। আমি আমার ভুল স্বীকার করছি। ভাই হিসেবে ক্ষমা করে দিন। আমি আপনাদের সবার কাছেই ক্ষমা পার্থী।”

দুজনের কাছে ক্ষমা চেয়ে সবটা স্বাভাবিক করে নিল ফারুক। ফারুকের মাঝে অপরাধবোধের ছাপ দেখে আর কিছু বলতে পারলো না রিদও। রিদকে ক্ষমা করতে দেখে এবার আরশিও ক্ষমার দৃষ্টিতে তাকালো। মানুষ মাত্রই ভুল। আর ক্ষমা করাটাও মহৎ গুন।

একসাথে বসলো চারজন। ফারুক অনেকটা হাস্যজ্জল মুখে ওয়েটারকে ডেকে খাবার অর্ডার দিল। যেন আজ খুব খুশির দিন তার। বিকেলটা চারজন একসাথে উপভোগ করে বিদায় নিল তারা। ফারুক হাসি মুখে রিদের সাথে হ্যান্ডসেক করে কোলাকুলি করে নিল। অতঃপর আরশির দিকে চেয়েও নমনীয় ভাবে বিদায় দিল ফারুক।

বিদায় নিয়ে আরশির হাত ধরে গাড়িতে উঠে বসলো রিদ। জানালা দিয়ে হাত নারিয়ে পূনরায় বিদায় জানিয়ে ছুটলো আরশিদের বাড়ির উদ্দেশ্য। আরশিকে পৌছে দিতে হবে তাড়াতাড়ি।

রুহি গাড়িতে উঠে বসলো। ফারুক গাড়ির পাশে দাড়িয়ে এক পলক তাকালো রিদের গাড়ির দিকে। কিছুটা মুচকি হেসে নিজের মাঝে বিড়বিড় করে বলে,
“সব কিছু এতটুকুতেই শেষ নয়। আর না আমিও একটুকুতে হার মেনে নেওয়ার মানুষ। নিজেকে ছোট করেছি মাত্রই আত্মিয়তার সম্পর্ক টা সুন্দর রাখতে। আমার আঘাতের স্বাদ ঠিকই উপভোগ করতে হবে দুজনকে। অপেক্ষাটা শুধু সঠিক সময়ের।”

To be continue……………

~ আসসালামু আলাইকুম। ব্যস্ততার জন্য এতদিন না দিতে পারার পারার জন্য দুঃখিত। এবার থেকে রেগুলার গল্প পাবেন ইন’শা আল্লাহ্।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here