বৃষ্টি শেষে রোদ পর্ব -১১

#বৃষ্টি_শেষে_রোদ (পর্ব ১১)
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ

আজ শুক্রবার। প্রতি সাপ্তাহের নিয়ম অনুযায়ী অগন্তুকের চিরেকুট রেখে যাওয়ার তিন রাতের মাঝে আজ শেষ রাত। তাই অগন্তুক কে জানতে রাত জাগা পাখির মতো বেলকনিতে দৃষ্টিতে রেখে বসে আছে আরশি। গত দু’দিন ধরে পাহারা দিয়েও কোনো সু-ফল পায়নি। বৃহস্পতিবার সকালে বেলকনিতে কোনো চিরেকুট ছিল না, আজ শুক্রবারেও ছিল না। তার মানে শনিবার সকালে চিরেকুট পাওয়া যাবে এতে শতভাগ নিশ্চিত সে।

ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখে রাত ৩ টা। ঘুমে চোখ দু,টো জ্বলছে তার। অলরেডি দু’বার চোখে পানি ছিটিয়েছে। তবুও জেদ ধরে বসে আছে। আজ এই লুকোনো চিরেকুটের মালিককে হাতেনাতে ধরতে হবে তার।

চোখ কচলে চুপচাপ বেলকনির দরজার সামনে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলো সে। না, বেলকনি পুরোই ফাঁকা। বাইরেও কারো সাড়াশব্দ নেই। হতাশ হয়ে দুলতে দুলতে আবারও রুমে এসে বসলো সে। দেখতে দেখতে প্রায় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলো। ঘুমে মাথা ব্যাথা করছে তার। হেলান দেওয়ার জন্য একটা বালিশ পেছনে রেখে চোখ বুঁজে বসে আছে সে। ধরেই নিল, আজও অগন্তুক আসবে না। চোখের পাতা বন্ধ হতেই যেন রাজ্যের সব ঘুম এসে আঁকড়ে ধরেছে তাকে।

মায়ের ডাক শুনে চোখ মেলে তাকায় সে। তখন সকাল আট টা। এর আগেও নাকি তিনবার ডেকে গেছে মা। ঘুম না হওয়ায় চোখ দুটো এখনো জ্বলছে। ঘুমকাতুর ক্লান্ত শরিরে বিছানা থেকে নেমে দুলতে দুলতে বেলকনির কাছে এসে দাড়ালো। ভালো করে তাকাতেই যেন সব ঘুম উড়ে গেলো মুহুর্তেই। আজ চিরেকুটের সাথে একটা গোলাপও রাখা।

বিরক্তিতে যেন এবার নিজের চুল নিজেরই ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে আরশির। তবুও চুপচাপ কাগজটা হাতে তুলে নিয়ে খুললো সেটা।

‘রাত জাগা পাখি,
একজন ঘুমকাতুরে রমনীর জন্য এমন সম্মোধন একদমই বেমানান। তবুও আজ এই সম্মোধনেই লিখতে ইচ্ছে হলো খুব। কাগজে ফুটিয়ে তোলা এই লুকোনো ভালোবাসার অংশ টুকু তোমার আড়ালে রাখতে চেয়ে গত তিন রাত বাইরে বসে অপেক্ষায় জেগে জেগে হাজারো মশার কামড় খাওয়ার অনুভূতিটা তীব্র প্রশান্তিতে রুপ নেয় তখনই, যখন ভাবি আমার প্রিয় মানুষটাও আমার অপেক্ষায় তিনটি রাত নির্ঘুম কাটিয়েছিল।’

আর কিছুই লিখা ছিল না কাগজে। তবুও আজকের চিরেকুট সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে আরশিকে। তার কারণ, অগন্তুক কিভাবে বুঝতে পারলো সে তার অপেক্ষায় জেগে ছিল? আর এটাই বা জানলো কিভাবে সে ঘুম পাগল মেয়ে? তিনি কি সত্যিই খুব পরিচিত কেউ? লুকিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করা মানুষটা আরশি যাকে সব সময় সন্দেহ করে সত্যিই সে নয়তো? উফ, হয়তো আরেকটু জেগে থাকতে পারলেই হাতেনাতে ধরা যেত তাকে।

“””””””””””””””””””””””””””””

কেটে গেলো আরো কিছু দিন। তিন দিন পর রিদের ফ্লাইট। যার জন্য বাড়িতে ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে রুদ্র চৌধুরী। আত্মিয়-স্বজন সবাইকে ফোনে দাওয়াত দিলেও কি মনে করে ফুপিদের দাওয়াত দিতে তাদের বাসায় চলে গেলো রিদ।

দরজা খুলে ভাইয়ের ছেলেকে দেখে মুখে হাসি ফুটে উঠে ফুপির। রিদ ভেতরে আসতে আসতে মৃদু হাসি রেখে বলে,
“তোমাদের আবার বিরক্ত করতে চলে এলাম ফুপি।”
ফুপি কিছুটা হেসে বলে,
“এক চ’র খাবি উল্টাপাল্টা কথা বললে। ফুফির বাসায় আসবি না তো কোথায় যাবি হুম?”
কিছুটা হাসলো রিদ। হাটতে হাটতে নিজের মাঝে বিড়বিড় করে বলে,
‘একদম ঠিক বলেছো ফুপি। আমার জানটাই তো এই বাড়িতে পড়ে আছে। না এসে থাকি কিভাবে?’

ফুপি কিছুটা ভ্রু কুচকে বলে,
“কি সব বিড়বিড় করিস?”
রিদ ফুপির দিকে চেয়ে বলে,
“বলছি, ফুপি তো মায়ের মতোই। তো ছেলে মায়ের কাছে আসবে না তো কোথায় যাবে?”

একটা প্রশান্তির নিশ্বাস নিল ফুপি। তিনি দুই মেয়ের মা হলেও কোনো ছেলে সন্তান নেই তার। সত্যিই রিদকে দেখে মাঝে মাঝে মনে হয় এটাই তার ছেলে। রিদ একটা প্যাকেট টেবিলের উপর রেখে বলে,
“আঙ্কেল তো এখনো ফিরেনি মনে হয়?”
ফুপি তার কাছে এগিয়ে এসে প্যাকেট টা হাতে নিয়ে বলে,
“আসার সময় হয়েছে, চলে আসবে একটু পর। আর এগুলো কি?”
ফুপি প্যাকেটের ভেতর আইসক্রিম ও চকলেট এর বক্স গুলো দেখে প্রশ্ন করলে রিদ স্বাভাবিক ভাবে বলে,
“ওগুলো আরশির জন্য। ওর পছন্দের খাবার।”

ফুপি এবার কিছুটা বিরক্তি নিয়ে রিদের দিকে চেয়ে বলে,
“খাবার না ছাঁই। তোকে এসব আনতে নিষেধ করেছি না? দুদিন পরপর এসব এনে ফ্রিজ ভর্তি করে রাখিস। আর এই হাবিজাবি খেয়ে ভাত একদমই খেতে চায় না ফাজিলটা।”
ক্ষনিকটা মুচকি হাসলো রিদ। মুখে হাসি ধরে রেখে বলে,
“কোথায় সে?”
“তার রুমেই পড়ছে।”

আরশির রুমের দিকে এগিয়ে গেলো রিদ। হটাৎ রিদকে দেখে একটু হলেও চমকাবে আরশি। ভেতরে প্রবেশ করতেই যেন মাথায় বাজ পড়ল তার। আহত হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে আরশি। কপালে লেগে থাকা লাল তরল পদার্থ দেখেই যেন বুকটা ধুক করে উঠলো তার। রিদ ছুটে তার কাছে গিয়ে ফ্লোরে বসে মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিল। চোখে মুখে অস্থিরতার ছাপ। রিদকে দেখে আরশি খুব আহত গলায় বলে,
“এসেছেন? আমি ভেবেছিলাম ম’রার আগে আর আপনার মুখটা দেখা হবে না।”
রিদ উত্তেজিত গলায় বলে,
“কি সব উল্টাপাল্টা বকছিস? আর এসব কিভাবে হলো?”

আরশি আবারও আহত আহত গলায় বলে,
“বাতরুমে পা পিছলে,,,,,”
রিদ উত্তেজিত ভাবে তাকে উঠাতে গেলে আরশি তার হাত ধরে থামিয়ে বলে,
“একটা সত্যি কথা বলবেন?”
“কি কথা।”
“আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার আগে আমি একটা কথা জানতে চাই। এটাই আমার শেষ ইচ্ছা। আপনার মুখ থেকে একবার শুনতে চাই। সত্যি করে বলুন, আপনি কি আমায় ভালোবাসেন?”

এতোক্ষন উত্তেজিত হয়ে থাকলেও এবার শান্ত হয়ে গেলো রিদ। কপালের দিকে ভালো করে তাকাতেই এবার প্রচুর রাগ হলো তার। কপালে আঙুল ছুঁইয়ে অতঃপর নাকের কাছে এনে বুঝতে পারে এটা রক্ত না।

চোর ধরা খাওয়ার মতো চোখ বুঁজে নিল আরশি। এমন ফাজলামির শাস্তি স্বরুপ পাক্কা দশ মিনিট কান ধরে এক পায়ে দাড়িয়ে থাকতে হলো তাকে। এবার নিজের৷ প্রতি প্রচুর রাগ হচ্ছে তার। ইশ কেন যে টিভিতে দেখে এভাবে ভালোবাসা কথা বের করতে গেলাম? শেষে এসে ভালোবাসায় প্রকাশের বিপরীতে কান ধরে দাড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। ওফ অসহ্য।

“”””””””””””””””””””””””””””””””””

কেটে গেলো আরো দু’দিন। আজ বিকেলেই বাসায় ফিরে আসে রোহান। আগামি কাল সকালে রিদ বেড়িয়ে যাবে বাসা থেকে। আজ রাতে সবাইকে দাওয়াত দেওয়ায় মেহমানরাও আসতে শুরু করেছে দেখে তারাতাড়িই বাসায় ফিরলো রোহান।

হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ ফুল। বাসায় প্রবেশ করতেই রুমকিকে দেখে ডেকে বলে,
“এই বাতি লেবু ধর। এগুলো তোর জন্য।”
বাতি লেবু বলায় কিছুটা রাগ হলেও ফুল দেখে আপাতত সেই রাগ চলে গেলো রুমকির। দেখে কম করে হলেও একশো টা ফুল আছে এখানে। দু’হাতে ফুল গুলো নিয়ে রোহানের দিকে চেয়ে বলে,
“এগুলো আমার জন্য? আপনি এনেছেন, রিয়েলি! সূর্য কোন দিকে উঠলো আজ?”

রোহান টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে বলে,
“আসার সময় দেখলাম একটা বাচ্চা ছেলে ফুল গুলো নিয়ে মন খারাপ করে দাড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলে বলে, আজ বিক্রি করতে পারেনি। তার প্রতি মায়া হলো তাই সব গুলোই নিয়ে নিলাম। ভাবলাম ফেলে দিয়ে কি করবো, তোর তো আবার গোলাপ খুব পছন্দ। তাই নিয়ে এলাম।”

রুমকি কৌতুহলী দৃষ্টিতে চেয়ে বলে,
“আপনাকে কে বললো আমার গোলাপ পছন্দ?”
“পছন্দ না হলে কি সেদিন রুহির বরের বিয়ের গাড়ি থেকে গোলাপ চুরি করতি?”

বলেই একটু ভাব নিয়ে চুপচাপ চলে গেলো রোহান। ফুল হাতে অবাক হয়ে দাড়িয়ে আছে রুমকি। জানতে ইচ্ছে হচ্ছে সেদিন লুকিয়ে ফুল চুরির বিষয়টা রোহান ভাই কিভাবে জানলো?

“””””””””””””””””””””””””””””””””

রাতে খাওয়া শেষে রিদকে বিদায় ও শুভ কামনা জানিয়ে মেহমানরা চলে গেলো একে একে। বিষন্ন মনে মনে ছাদে দাড়িয়ে ছিল রিদ। বিদায়ের সময়টা ঘনিয়ে আসতেই যেন বুকটা ভাড়ি হয়ে উঠছে তার। তাই তো মন খারাপ প্রকাশ না পেতে সবার থেকে আড়ালে এসে দাড়িয়ে আছে। এর মাঝে তার সামনে এসে দাড়ালো আরশি। আজ একদমই হাস্যজ্জল বা চটপটে ভাবটা নেই। বিষণ্ন মনে মাথা নিচু করা।

রিদের এবার খুব করে কাঁদতে ইচ্ছে হলেও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলে,
“পিচ্চিটা মন খারাপ করে আছে কেন?”
আরশি মাথা তুলে স্বাভাবিক ভাবে বলে,
“আপনাকে শুভ কামনা জানাতে এসেছি। দোয়া করি সব সময় খুব ভালো থাকুন। স্বপ্ন পূরণ করে তাড়াতাড়ি সহি সালামতে ফিরে আসুন আমার,,,, মানে আমাদের সবার কাছে।”

বিষণ্নতার মাঝেও কিছুটা মুচকি হাসলো রিদ। আরশির দু’গালে হাত রেখে নমনীয় গলায় বলে,
“ইন’শা আল্লাহ্।”
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল আরশি। অতঃপর হুট করে বলে,
“আমার খুব ভয় হচ্ছে।”
রিদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কেন?”
আরশি আবারও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলে,
“আমি শুনেছি ইংল্যান্ডে নাকি চারপাশে সব সাদা চমরার মেয়েরা ঘুরে বেড়ায়। যদি আপনি তাদের ধোঁকায় পড়ে,,,,,,”

বাকিটুকু বলার আগেই রিদ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
“লাইফে যদি নির্দিষ্ট কেউ থাকে, যাকে দেখে অনুভব করা যায় আমার নিজের একটা ভালোবাসার মানুষ আছে। তাহলে দুনিয়ার সব সুন্দর্য এক করে সামনে এনে দিলেও ভালোবাসার মানুষটাই সবার উর্ধে থাকে। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। আমার স্বপ্নের স্বপ্নচারিনীর চেয়ে অন্য সবই আমার কাছে মূল্যহীন। সেই মানুষটাই আমার একমাত্র মুগ্ধতা।”

নিশ্চুপ হয়ে কিছুক্ষণ রিদের দিকে চেয়ে রইল আরশি। অনেক্ষন আটকে রাখা কাঁন্নাটা যেন আর ধরে রাখতে পারলো না সে। হুট করেই রিদকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠে সে। কাঁদু স্বরে হিচকি তুলে বলে,
“খুব মিস করবো আপনাকে।”

বুকটা কেঁপে উঠলো রিদের। বুকের ভেতর চিনচিন ব্যাথাটা যেন বহুগুন বেড়ে গেলো মুহুর্তেই। এই বয়সে আরশি এতটা আবেগি হয়ে যাবে তা হয়তো ধারণারও বাইরে ছিল। এখনো জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলছে মেয়েটা। এটা কি সত্যিই ভালোবাসা নাকি এই বয়সের আবেগ?

To be continue……………….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here