ভাগ্যের সীমারেখা পর্ব -০৬

#ভাগ্যের_সীমারেখা [০৬]
#ফারজানা_আক্তার

শীতের সন্ধ্যার হাওয়াগুলো বেশ কাঁ’টা দিয়ে দিচ্ছে শরীরে। অটোতে বসে আছে শান্তা আর ইনাইয়া। দুজনের মুখেই লেগে আছে সুখ সুখ আভা। ইনাইয়ার কেনো জানি অদ্ভুত রকমের ভালো লাগছে শান্তা আর আসিফের প্রেম কাহিনী শুনে। আসিফ তো প্রথমে শান্তার পরিচয় পেয়েই থ হয়ে গিয়েছিলো। আসিফের কল্পনার বাহিরে ছিলো তার অদেখা পরী টা বাস্তব পরীর থেকেও দ্বিগুণ সুন্দরী হবে।
আসিফ নিজের নাম নীল বলেছিলো শান্তাকে আর শান্তা বলেছিলো পরী। শান্তা ফেসবুকে বিভিন্ন ছবিতে দেখেছে আসিফকে তাই সে চিনতে পেরেছে তার ভালোবাসার মানুষকে। আসিফ কখনো শান্তার কাছে কোনো ছবি চায়নি তাই সে শান্তাকে আজকেই প্রথম দেখেছে। শান্তার মন খারাপ, এই সম্পর্ক যে ওর বাবা মা মেনে নিবেনা কখনো এটা শিউর শান্তা। অপরদিকে খতিজা খাতুন আর আব্রাহাম শান্তাকে দেখেই পছন্দ করে ফেলেছে।
শান্তাকে চিন্তিত দেখে ইনাইয়া বলে “আজ এতো খুশির দিন তোর মুখে বিরহ কেনো?”

“বাবা মা কখনো মেনে নিবেনা এই সম্পর্ক। ভয় হচ্ছে খুব আমার।”

“চিন্তা করিসনা, তোর সুখের জন্য উনারা মেনে নিবে এই সম্পর্ক দেখিস। তোর মায়ের সাথে যেদিন আমি প্রথম কথা বলেছিলাম সেদিনই আমি বুঝে গিয়েছি তোর সুখের জন্য উনারা সব করতে পারবেন।”

ইনাইয়া আর শান্তা বাসায় পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে দেখে বর্ণা আর রিহাও চলে এসেছে। ওরা দুজন এসেই বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে যায়।
এদিকে রাতের খাবার এখনো রান্না হয়নি কারণ চারজনই তো আজ বাসায় ছিলোনা। এক ফাঁকে শান্তা বাহির থেকে খাবার অর্ডার করে দেয়।
বাহিরের খাবার দেখে বর্ণা বলে “আজ আবার ট্রিট? তোর কী টাকা ফুরাইনা রে শান্তা বেবি?”

তারপর শান্তা সব খুলে বলে বর্ণা আর রিহাকে। আর বলে এই ট্রিট টা সে অনেক খুশি হয়ে দিচ্ছে। ওরা খেয়ে চুপচাপ শুয়ে পরে সবাই। সকালে উঠেই আবার নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটতে হবে তাই সবাই ঘুমিয়ে পরে দ্রুত। আজ জার্নি করে সবাই-ই ক্লান্ত ওরা।
**********
রিতু হঠাৎ কাউকে কোনো খবর না দিয়ে ইহানদের বাসায় চলে এসেছে সকাল সকাল। এসেই সে সোজা শাহিনের রুমে গিয়ে ওর কলার চেপে ধরে বলে “এভাবে কয়টা মেয়ের জীবন নষ্ট করেছিস তুই হ্যাঁ? আমি সব জেনে গিয়েছি, আর লুকাতে পারবিনা তুই, পারবিনা আর বোকা বানাতে আমায়। ভালোবাসার নাম করে বিভিন্ন কৌশলে আমার সব কে’ড়ে নিয়েছিস তুই, আবেগে বিশ্বাসে আমিও নাচতে নাচতে তোকে নিজের সব দিয়ে দিয়েছি উজাড় করে আর তুই কিনা এখন পাগল হয়ে গেছিস কোনো এক ভাড়াটিয়া মেয়ের জন্য? কে মেয়েটা? যার জন্য আমার জীবন তছনছ হয়ে যাচ্ছে।
আসিফ আমি প্রেগন্যান্ট জেনেও কিভাবে তুমি এমনটা করতে পারছো? আমরা তো গোপনে বিয়ে করেছি তাইনা? তাহলে কেনো তুমি আমার সাথে প্রতারণা করছো? আমি তো হালাল ভাবেই তোমার কাছে নিজেকে স্বপেছি তবে কেনো শাহিন কেনো?
আমি বারবার সবাইকে জানাতে চেয়েছি সবটা কিন্তু তুমি আজ নয়তো কাল এমন করে করে আর জানাতে দিলেনা কাউকে। তুমি যদি আমার সন্তানের বাবা না হতে তাহলে কসম করে বলছি তোমাকে দিয়ে আমি জেলের ঘানি টানাতাম।”

হাউমাউ করে কান্না করতে করতে কথাগুলো বলে রিতু। শাহিনের মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। যেনো কিছুই হয়নি সব স্বাভাবিক।
রিতুর কথা সব পুরো পরিবার দাঁড়িয়ে শুনলো। ইহান সাথে সাথেই কাজি ডেকে রিতু আর শাহিনের বিয়ে পড়িয়ে দেয়। শাহিন যেমনই হোকনা কেনো সে তার বড় ভাই ইহানকে খুব সম্মান করে। ইহানের কথা সে ফেলতে পারেনা তাই চুপচাপ বিয়ে করে ফেলে। ইহান রিতুর পরিবারকেও ফোন করে ডেকে নেয়। দুই দুবার বিয়ে করেও রিতুকে সে মেনে নিতে পারছেনা এখন কারণ ইনাইয়াকে পাওয়ার লোভ যে এখনো তার অন্তরে বাসা বেঁধে রয়েছে।

কেটে গেলো আরো কয়েকটা দিন। শাহিন এখনো রিতুর সাথে স্বাভাবিক হতে পারেনি। এর মাঝেই রিতু ইনাইয়ার সাথে শাহিনকে কয়েকবার কথা বলতে দেখেছে। রিতুর কষ্ট হচ্ছে খুব।
রিতু আর সহ্য করতে না পেরে ইহানের রুমে গেলো। ইহান অফিসের কিছু কাজ করছিলো বিছানায় আধশোয়া হয়ে।
রিতু এসে কান্নাজড়িতো কণ্ঠে বলে “ইহান ভাইয়া শাহিন এখনো সেই মেয়ের সাথে সম্পর্কে আছে। মেয়েটা জানে এখন শাহিন বিবাহিত তবুও সে কেনো শাহিনের সাথে সম্পর্ক রেখেছে আমি জানিনা। আমি ভেবেছি মেয়েটার সাথে কথা বলবো কিন্তু আগে আপনাকে জানানো প্রয়োজন মনে করেছি।”

ইহান ভ্রু কুঁচকে বলে “কোন মেয়ে?”

“সীমার টিয়টর আর চারতলার ভাড়াটিয়া ইনাইয়া।”

ইহানের মাথায় যেনো র’ক্ত উঠে গেলো ইনাইয়ার সাথে শাহিনের সম্পর্ক শুনে। ইনাইয়ার উপর রাগ হচ্ছে খুব। ইনাইয়া তার ভালোবাসা হয়ে কিভাবে পারলো একটা বিবাহিত ছেলের সাথে সম্পর্কে যেতে? ইহানের চোখে মুহুর্তেই চরিত্রহীন প্রমাণ হয়ে যায় ইনাইয়া।
রিতু কথাগুলো বলেই চলে যায় কাঁদতে কাঁদতে। ইহান রিতুকে বলেছে চিন্তা না করার জন্য, ব্যাপারটা সে দেখবে।
অথচ অনেক আগেই আফরোজা আর আব্রাহামের সাথে কথা বলে রেখেছে ইহান। ইহানকে দেখেই আব্রাহামের পছন্দ হয়েছে তারপর আবার ইহানের আর্থিক অবস্থাও ভালো সেসব ভেবে আফরোজা আর আব্রাহামও রাজি হয়ে যায়। শুধু ইনাইয়াকে এখনো কিছু জানাইনি ওর ইন্টারের ফাইনাল পরিক্ষা শেষ হওয়ার জন্য। ইহান আফরোজাকে কথা দিয়েছে ইনাইয়া যতটুকু পড়তে চায় সে পড়াবে।
কিন্তু এই মুহুর্তে শাহিনের সাথে ইনাইয়ার প্রেমের সম্পর্ক শুনে বেশ রেগে যায় ইহান। রিতু প্রেগন্যান্ট জেনেও শাহিনের এমন কৃতকর্মের জন্য ইহান একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। ইহান জানে রাগের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত খুব বড় ভুল হয় তবুও সে সেই ভুলটা করতে চায় নয়তো যে রিতুর স’র্ব’না’শ হয়ে যাবে অনেক বড়।
************
সন্ধ্যায় ইনাইয়া সীমাকে পড়াতে আসছে। এসে দরজায় বেল বাজাতেই ইহান দরজা খুলে অ’গ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইনাইয়ার দিকে। হঠাৎ ইহানের এমন রুপে ইনাইয়া ভয় পেয়ে যায়। যার সাথে এখনো পর্যন্ত একটা ছোট শব্দও আদান-প্রদান হয়নি তার এমন দৃষ্টিতে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।
ইনাইয়া কিছু বুঝে উঠার আগেই ইনাইয়ার হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে গটগট করে চার তলায় উঠতে থাকে ইহান। ইনাইয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইহানের দিকে। কিছু বলারও সাহস পাচ্ছেনা। তবুও কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে “ভাইয়া কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়? প্লিজ ছাড়ুন।”

“ওহ্ ভাইয়াও বানিয়ে ফেলছো আমায় তাহলে? মানে শাহিনের সাথে সব ফিক্সড করে ফেলছো।”

“অদ্ভুত তো কী বলছেন আপনি এসব।”

“চুপচাপ রুম থেকে নিজের জন্মনিবন্ধন নিয়ে আসো কাজ আছে, দ্রুত নাও। এখনো তো পারোনি আইডি কার্ডটা বানাতে পিচ্চি আর সরল সেজে আছো আবার মানুষের সংসারও ভা’ঙ’তে যাও।”

“মানে কী? কী বলছেন এসব?”

“যা বলছি তা করো চুপচাপ। যাও নিয়ে আসো যা আনতে বলেছি।”

দরজার বাহিরে হঠাৎ চেঁচামেচির শব্দ শুনে শান্তা বের হয়। বর্ণা আর রিহা টিউশনে গিয়েছে।
শান্তা বের হয়ে ইনাইয়ার কাছে গিয়ে জানতে চায় কি হয়েছে। ইনাইয়া কাঁদছে। কেনো জানি হঠাৎ খুব কষ্ট হচ্ছে আর কান্না পাচ্ছে ইনাইয়ার।
ইহান আরেকটা ধ’ম’ক দিতেই ইনাইয়া ছুটে রুমে চলে যায়। ইনাইয়া চলে গেলে শান্তার উদ্দেশ্যে ইহান বলে “ভালো হয়েছে তুমি এসেছো। আমাদের সাথে চলো তুমিও।”

শান্তা কিছু বুঝে উঠতে পারছেনা আসলে হচ্ছে টা কি। ইনাইয়া কাঁপা কাঁপা হাতে জন্মনিবন্ধনের কাগজটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বের হতেই আবার খপ করে ওর হাত ধরে ইহান হাঁটা দেয়। আবার শান্তাকেও বলেছে ভয়ের কিছু নেই, একটা কাজ আছে, সেটা শেষ করেই ফিরে আসবে সবাই। ইহান ড্রাইভ করতে করতে ওর বন্ধুদের দুই একজনকে কল করে বলে আসতে, জায়গার নাম টেক্সট করে দেয়। ইনাইয়া অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় ইহানের দিকে আর ভাবে “এই মানুষটার জন্যই কী আমার মনে উতাল পাতাল ঢেউয়েরা খেলা করে? এই মানুষটার জন্যই কী বুকটা চিনচিনে ব্যথা করে? যে আমায় অকারণেই আজ কাঁদাচ্ছে। ”

#চলবে_ইনশাআল্লাহ

ভুলত্রুটি মার্জনীয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here