ভাগ্যের সীমারেখা পর্ব -০৭ ও শেষ

#ভাগ্যের_সীমারেখা [০৭]
#ফারজানা_আক্তার

হাত কাঁপছে বুক কাঁপছে কষ্ট হচ্ছে হৃদপিণ্ড ছা’র’খা’র হয়ে যাচ্ছে তবুও দুই ঠোঁট নাড়িয়ে ইহানকে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেনা ইনাইয়া। অপরাধীর ন্যায় সে বসে আছে ইহানের সামনে একটা পার্কে। মনে হচ্ছে যেনো মহা বড় একটা ভুল সে করেছে যার অপরাধে তাকে বিয়ে নামক শাস্তি দিয়েছে ইহান। রাত এখন ঠিক ৯টা। বিয়ের পর্ব শেষ হতেই সবাই চলে গিয়েছে, শান্তাকে ইহানের বন্ধুরা পৌঁছে দিয়েছে।
একটু আগেই ইনাইয়ার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়েটা হয়ে গেলো দু’জনের। ইনাইয়ার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না সে মুহুর্তেই কুমারী থেকে একজন বিবাহিত নারীতে রুপ নিয়েছে। কাজি অফিসেই ওদের বিয়েটা সম্পন্ন হয়েছে। আইডি কার্ডের জন্য ঝামেলা হলে সেটা টাকা দিয়ে সল্ভ করে জন্মনিবন্ধন দিয়ে হয়ে যায়।
সবকিছু গোলাটে লাগছে ইনাইয়ার কাছে। ইহান শুধু একটা কথা বলেছে ইনাইয়াকে আর সেটা শোনার সাথে সাথেই সে অমত প্রকাশ করতে পারেনি আর। ইহান বলেছিলো বিয়েটা যদি ভালোই ভালোই সে না করে তবে ওর সাথে ওর বান্ধবী বোন দুলাভাই সবার জীবন অতিষ্ট করে দিবে সে। এতেই ইনাইয়া ভয় পেয়ে যায়। অথচ ইনাইয়া জানেইনা এটা শুধু ওকে ভয় দেখানোর জন্যই বলেছে ইহান। ইনাইয়া ইহানের রা’গা’ন্বি’ত দৃষ্টি দেখেই সহজে ওর বলা কথাটা বিশ্বাস করে ফেলে।

অনেকক্ষণ চুপ থেকেই ইহান বলে “এভাবে সরল সেজে বসে থাকা লাগবেনা আর। তুমি যে কেমন তা আর জানতে বাকি নেই। চলো বাসায় যাবো।”

“আমি যবোনা আপনার সাথে কোথাও।”

“তোমার প্রেমিক আসবেনা তোমায় নিতে। সে এখন তার বউয়ের সাথেই আছে।”

কথাটা ইনাইয়ার কর্ণকুহর হতেই সে বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়। কপাল কুঁচকে যায় ওর। কি বলছে ইহান যেনো মাথায় ঢুকছেনা ওর কিছু। রাগ রাগ ভাব নিয়ে জড়ানো কন্ঠে বলে “কি বলতে চাইছেন আপনি? সীমা অতিক্রম করবেননা দয়া করে। আমার কোনো প্রেমিক নেই। ”

“ও তাহলে আমার ছোট ভাই শাহিন কে হয় শুনি? কি সম্পর্ক ওর সাথে তোমার? কি ভেবেছো? তুমি লুকিয়ে রাখলেই আমি জানতে পারবোনা।”

“কিছু লুকাইনি আমি লোকানোর মতো কোনো সম্পর্ক শাহিন ভাইয়ের সাথে আমার তৈরি হয়নি। আপনি ভেবে বলছেন তো যা বলছেন?”

“এতো মিথ্যা একটা মেয়ে কিভাবে বলতে পারে তা তোমাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না কখনো। সিরিয়াসলি। ”

কিছুটা বিরক্ত হয়ে কথাগুলো বলে ইহান। ইনাইয়ার কষ্ট হচ্ছে এভাবে তার স্বপ্ন দেখা পুরুষটা ওকে ভুল বুঝেছে দেখে। ইনাইয়া এবার আর থাকতে পারলোনা। গড়গড় করে সব বলে দিলো শাহিনের সব কথা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব শুনে ইহান থ মে’রে গিয়েছে। নিজেকে খুব নিকৃষ্ট মনে হচ্ছে ওর। এভাবে কোনো মেয়ের সাথে কখনো ব্যবহার করেনি সে অথচ আজ নিজের ভালোবাসার সাথেই কিনা এতো জঘন্য আচরণ করলো। পাশে দাঁড়ানো লম্বা আকাশি গাছে জোরে একটা ঘু’শি মা’র’লো ইহান। ইহানের রাগ আর এমন রুপ দেখে ইনাইয়া ভয়ে চুপসে গিয়েছে একেবারে। ইহান ইনাইয়ার চোখের দিকে তাকাতে পারছেনা, শাহিনের উপর ক্ষোভ আর ঘৃণা তিব্র পরিমাণে বাড়তে লাগলো ওর।
***********
আজ সবার উপস্থিতে আবারো বিয়ে হয়েছে ইহান আর ইনাইয়ার।
শাহিনকে সেদিন বাসায় ফিরেই ইহান সাবধান করেছিলো ইনাইয়ার দিকে চোখ দিলে ইহান ভুলে যাবে শাহিন তার ভাই। শাহিনের জানা আছে ওর ভাইয়ের রাগ সম্পর্কে। ইনাইয়া এখন ওর ভাইয়ের বউ এটা ভাবতেই ওর রাগ হচ্ছে। কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারছেনা সে। ভাইয়ের ভয়ে সেদিন থেকে ইনাইয়া যেখানে থাকে সেই স্থান সাথে সাথেই ত্যাগ করে শাহিন আর এটা দেখে রিতুর ঠোঁটে প্রশান্তির হাঁসি ফোটে।

ইহানের বাবা শুরুতে একটু অমত প্রকাশ করলেও পরে সব মেনে নেয় কারণ ইনাইয়াকে ওদের ঘরের সবাই খুব পছন্দ করে, আর সীমা তো ইনাইয়ার জন্য পাগল।
*
আজ ইহান আর ইনাইয়ার বাসর রাত। লাল টুকটুকে বেনারশী পরে একহাত লম্বা ঘোমটা দিয়ে বসে থাকার জায়গায় ইনাইয়া একটা হলদে রংয়ের সুতোর থ্রি পিচ পরিধান করে খোলা চুলে দাঁড়িয়ে আছে ইহানের রুমের বারান্দায়। ইহান এখনো রুমে আসেনি। সেদিনের ইহানের করা ভুলের জন্যই আজ ইহান রুমে আসার আগেই সব খুলে সাধারণ বেশে দাঁড়িয়ে আছে ইনাইয়া। তাকে বধু বেশে একান্ত প্রহরে দেখার সুযোগ সে ইহানকে দিতে চায়না। মানুষটার প্রতি যে বড্ড অভিমান জন্মেছে বুকের গভীরে।
হঠাৎ পুরুষালি এক কঠিন কন্ঠে গায়ে কাঁপা দিয়ে উঠলো ইনাইয়ার। ইহান বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে বলে “আমি আসার আগেই চেঞ্জ করে নিলে। দুই চোখের তৃষ্ণাটাও মেটাতে দিলেনা। এতো অভিমানী কেনো তুমি মায়াপরী?”

চুপ হয়ে রইলো ইনাইয়া। “মায়াপরী” শব্দ টা যেনো তার বুকে ঝ’ড় তুলে দিয়েছে মুহুর্তে। ইহান একটু এগিয়ে ইনাইয়ার পাশে এসে ওর ডানহাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় ভরে বলে “যেদিন ছাঁদে প্রথম দেখেছিলাম তোমায় সেদিনই তোমার চোখের মায়ায় ডুবে গিয়েছিলাম। নিজেকে কন্ট্রোল করতে চেয়েছি, নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করেছি বহু তবুও তোমার জন্য অনুভূতি গুলো ছটপট করতো। ধীরে ধীরে তোমায় ভালোবেসে ফেলে এই অবুঝ হৃদয় টা। তুমি কী জানো তুমি যখন সীমাকে পড়াতে আসতে তখন ইচ্ছে করেই আমি সেই রুমে গিয়ে বই হাতে বসে থাকতাম। বই পড়া ছিলো বাহানা মাত্র, আঁড়চোখে সারাটা সময় শুধু তোমাকেই দেখে যেতাম আমি। তোমার আপা আর দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলে সব ঠিক করে রেখেছিলাম যাতে তোমার ফাইনাল পরিক্ষার পরই তোমাকে নিজের করে ফেলতে পারি কিন্তু শাহিনের জন্য সব এলোমেলো হয়ে গেলো। রিতু তোমাকে দেখেছিলো শাহিনের সাথে কথা বলতে তারপর ও আমায় বলে তোমার সাথে শাহিনের প্রেমের সম্পর্ক। মাথায় র’ক্ত উঠে গিয়েছিলো এটা শুনে তাই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি রাগের বসে তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তোমায় বিয়ে করেছি যাতে শাহিন তোমার থেকে দূরে সরে যায়।

আমার এই ভুলটার জন্য কী ক্ষমা করা যায়না আমায়? ইনু।”

ইনাইয়া কিছু না বলেই ইহানের বুকে মুখ লুকালো তারপর খুব ধীর কন্ঠে একটা শব্দ উচ্চারণ করলো “কখনো ছেড়ে যাবেননা তো আমায়?”

“নাহ কখনো ছেড়ে যাবোনা তোমায়। খুব খুব বেশি-ই ভালোবাসি তোমায়। প্রমিজ করছি আর কখনোই ভুল বুঝবোনা তোমায়। আগলে রাখবো শেষ নিঃশ্বাস অব্ধি। ”

ইনাইয়া চোখ বুঝে নেয়। এই বুঝি তার #ভাগ্যের_সীমারেখা?
ভালোবাসার মানুষের বুকে যে এতো সুখ তা আজ প্রথম উপলব্ধি করতে পারলো সে। মনে মনে ভাবতে থাকলো আরো আগে কেনো এই মানুষটা এলোনা তার জীবনে। ভালোবাসা এতো সুন্দর কেনো?

**************সমাপ্তি**************

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here