ভালোবাসার স্পর্শানুভুতি পর্ব ১৪

#ভালোবাসার_স্পর্শানুভূতি
#রাইমা_মিমি
#পর্ব_১৪

তারার গান শেষ হতেই হাত তালিতে চারদিক ছেয়ে গেল। এতো সুন্দর গান গেয়েছে সে।

ক্লাসে ২জন স্যার ছিলেন। যারা সংগীত ডিপার্টমেন্ট এর। তারাই এখানে অডিশনের বিচারক হিসেবে আছেন।

তাদের মধ্যে একজন বলে উঠলেন-

১ম জন- ইউর ভয়েস ইজ টু মাচ গুড। তোমার চচেহারার সাথে সাথে তোমার ভয়েসটাও অনেক সুন্দর। তোমার ভয়েসটা রিয়েলি অনেক সুন্দর। তোমার তো সংগীত ডিপার্টমেন্ট এ থাকা উচিত ছিল। তুমি ওই ডিপার্টমেন্ট এ গেলে কেন? যাই হোক। তোমার ভয়েস অনেক ভালো। আরো রেওয়াজ করলে আমার মনে হয় আরো ভালো হবে।(হেসে)

২য় জন- হ্যা। স্যার ঠিকি বলেছেন। আর হ্যা ইউ আর সিলেক্টেড। কংগ্রাচুলেশনস। (হেসে)

তারা- থেংক ইউ স্যার। থেংক ইউ সো মাচ।(বলেই এক্সাইটেড হয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বেড়িয়ে গেল)

তারা খুশি মনে হলরুম থেকে বের হয়ে হাটা শুরু করে বাড়ির উদ্দেশ্যে। আজ সে অনেক খুশি। সে ভাবতেও পারছে না সে এতোগুলো স্টুডেন্টদের মধ্যে সিলেক্ট হয়েছে। যেখানে স্যার রা খুব কঠিনভাবে সব পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

তারা হাটতে হাটতে এগুচ্ছে। হুট করেই বকুলতলায় কিছু দেখে থমকে দাঁড়ায়। হলরুম থেকে বকুলতলাটা একটু দূরে হওয়ার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবে বুঝা যাচ্ছে ৮-৯ ছেলে মেয়ে বসে আছে বকুল গাছের নিচে।

বকুল গাছের নিচে তারারা ছাড়া সচরাচর খুব একটা ছাএছাএী বসে না। তাই তারার কাছে কনফিউজ লাগছে এরা কি তন্নিমারা নাকি অন্য কেউ।

তারা- এরা কি রিমারা? কিন্তু এরা কি করে হবে? ভার্সিটি তো সেই কখন ছুটি দিয়ে দিয়েছে। ওদের তো এতোক্ষণে চলে যাওয়ার কথা। তাহলে? (চিন্তিত ভঙ্গীতে)

তারা- আরে ধুর অন্য কেউ তো হতে পারে। ওরা শুধু শুধু এতোক্ষণ বসে থাকবে কেন? তাছাড়া ৮-৯ জন। চলে যাই বরং।(বলেই এগুতে নেই।)

তারা- না এক মিনিট। যদি ওরা হয়! একবার দেখি আসি বরং। দেখে আসলে তো আর সমস্যা নেই। ওরা না থাকলে তো চলেই যাব।(বলেই হাটা দেয় বকুলতলার দিকে)

তারা গিয়ে দেখে সত্যি তার বন্ধুরা সাথে রাত গ্যাং ও আছে। শুধু রাত নেই।

তারা- আরে তোরা এখানে? এখানো যাস নি?(বন্ধুদের উদ্দেশ্যে) আর তোমরা এখানে? তোমরাও যাও নি এখনো?(রাত গ্যাংকে উদ্দেশ্য করে)

তন্নিমা- না আসলে তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। তোর সিলেকশনের খবর শুনেই যাব বলে বসে ছিলাম।

আকাশ- আর আমরা তাদের কম্পানি দিচ্ছিলাম।

তারা- তাই বলে এতোক্ষণ। পুরো ২ঘণ্টা বসেছিলি তোরা?

রিমা- আরে ছাড় তো ও কিছু না।

রবিন- আরে ওসব ছাড় বল তোর সিলেকশনের কি খবর?

তারা- আই এম সিলেক্টেড।(এক্সাইটেড হয়ে)

আনিকা- রিয়েলি?(এক্সাইটেড হয়ে)

তারা- ইয়েস।(হেসে)

সবাই একে একে তারাকে কংগ্রাচুলেশনস জানালো। তারপর সবাই আবার গোল হয়ে বসে গেল বকুল গাছের নিচে।

সবাই নানারকম কথোপকথনে ব্যস্থ। শুধু একজোড়া চোখ বারবার তার চারপাশ ঘুরে কাউকে খুঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু আঁখিযুগল যাকে খুঁজছে সে তার দৃষ্টির সীমানার বাইরে আছে। তাই সে বার বার ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছে। আর মনের মাঝে সৃষ্টি করছে এক সুপ্ত অভিমান। সেই অভিমানের কি নাম দেয়া যায় তা সেই চোখের অধিকারীণির জানা নেই। তারপরেও মন যেন মানতে চায় না। বারবার তার অভিমানকে নাড়া দিয়ে দেয়। চোখ যেন না চাইতেও তার খুঁজে বিভোর হয়ে আছে।

হুট করে ধপ করে কেউ যেন তারার পাশে এসে বসে পড়ে। কিন্তু এতে তার খুজ নেই। সে তো আড়চোখে কাউকে চিরুনি তল্লাশে ব্যস্ত।

রাত- হেই মিস। কাকে খুজছো আমাকে?(একদম তারার কানের কাছে গিয়ে)

হুট করেই এমন কানের কাছে এসে এবং তারা অন্যমনস্ক থাকায় ভয় পেয়ে যায়। পাশে তাকিয়ে দেখে রাত তার ৩২ পাটি দাঁত বের করে ক্লোজআপ মার্কা হাসি দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

হুট করেই নিজের পাশে রাতকে দেখে এবং রাতের কথা শুনে ভড়কে গেল তারা। কিন্তু অভিমানে কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে নিল তারা। তার মতে রাতের উচিত ছিল সবার প্রথমে এসে তাকে জিজ্ঞেস করা তার সিলেকশনের কথা এবং অভিনন্দন জানানো। যা রাত করে নি। বরং আরো দেড়ি করে এসেছে।

তারার এমন মুখ ফিরিয়ে নেয়া রাতের মোটেও ভালো লাগে নি। তবুও বন্ধুদের সামনে কিছু না বলে তারাকে আবার জিজ্ঞেস করল।

রাত- কি হলো? এমন মুখ ওই দিকে করে আছো কেন?(গম্ভীর হয়ে)

এবারেও তারার নো রেসপন্স।

রাতের এবার রাগ উঠছে। এই মেয়েটা এতো ঘাড় ত্যাড়া কেন? সহজ কথা সহজে কেন বুঝেন? শুধু তার রাগ তুলে।

রাত আবার জিজ্ঞেস করল।

রাত- কি সমস্যা কথা বলছো না কেন? কিছু কি হয়েছে?

এবারেও নো রেসপন্স।

এবারে রাতের রাগ ধপ করে ডেং ডেং করে মাথা উপরে উঠে কান দিয়ে ধোয়া বের হওয়ার মতো হচ্ছে।

এদিকে,

তারা- ব্যাটা খবিশ। সব বলতে পারছিস কিন্তু একবারও আমার সিলেকশনের কথা বলতে পারছিস না? একবারো জিজ্ঞেস করতে পারছিস না আমি সিলেক্ট হয়েছি কি না? ব্যাটা খচ্চর। আমি কোনো কথাই বলব না তোর সাথে।(কাঁদোকাঁদো ফেস করে মনে মনে)

তারার রিয়েকশন রাত বুঝতে পারছে না। তাই সে তার রাগকে প্রাধান্য দিয়ে। সবাই উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়ার মতো বলে থুক্কু রেগে বলে।

রাত- চুপ। সবাই একদম চুপ। আজকের মতো এখানেই সবার আলাপ আলোচনা শেষ। সবাই বাসায় যাও। আর তুমি চলো।(বলেই তারার হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগল)

এদিকে রাতের রাগের কারণ কেউ বুঝতে পারল না। কি থেকে কি হয়ে গেল কেউ বুঝতে পারছে না।

মেঘ- এর আবার কি হলো?

আকাশ- আমরা তো কেউ কিছু বলিও নি বা করিও নি। তাহলে?

রবিন- বুঝতে পারছি না।

নিপা- একে এমনিও বুঝা যায় না। চল সবাই যাওয়া যাক।

তন্নিমা- হুম। আল্লাহ হাফেজ।

বলেই সবাই হাটা ধরল নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

এদিকে তারাকে টেনে এনে রাত গাড়ির সাথে চেপে ধরে।

রাত- কি সমস্যা তোমার হ্যা? কথা বলছো না কেন? কি সমস্যা? স্পিক আপ ডেম ইট।(রেগে জুড়ে চিল্লিয়ে)

রাতের চিল্লানিতে তারা ভয় পেয়ে গেল। আর এতোক্ষণের জমানো সাহস ভেঙে চুড়ে ধুমড়ে মুচড়ে গেল।

রাত- কি হলো বলছো না কেন?(রেগে)

তারা- ও ওই আ আপনি আপনি।

রাত- কি আপনি আপনি করছো। বলো ভালো করে।(রেগে)

তারা এবার একটু সাহস জুগিয়ে চোখ বন্ধ করে টপাটপ বলে দিল তার মনের কথা।

তারা- কেন কথা বলব আমি আপনার সাথে? আপনি কি আমার সাথে কথা বলেছেন? একবারও জিজ্ঞেস করেছেন আমি সিলেক্ট হয়েছি কি না? আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন? না তো? তাহলে কেন কথা বলব আমি আপনার সাথে? আমার কি মান সম্মান নেই? আমি বলব না কথা আপনার সাথে।(চোখ বন্ধ করে একদমে কথা গুলো বলে জোরে একটা শ্বাস নিল তারা)

রাত এবার বুঝতে পারছে তারা কেন এতোক্ষণ কথা বলেনি।

রাত- তো এই হলো কারণ। মহারাণী অভিমান করে আমার উপর। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি নি বলে। অভিনন্দন জানাই নি বলে। বাহ। আমার কলি তো দেখি আমার চিন্তার থেকেও অনেক ফাস্ট। আমি তো ভেবেছিল অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হবে আমার ফুলের কলিকে মানাতে। কিন্তু এখন তো দেখছি খুব একটা কষ্ট করতে হবে না। কলি অলরেডি আমার জন্য ফিল করতে শুরু করেছে। আমার গুরুত্ব তাহলে অনেকটাই সৃষ্টি হয়েছে তারার মনে। হায়। এখন শুধু তোমার মনে আমার জন্য ভালোবাসার অনুভূতিটা সৃষ্টি হওয়ার অপেক্ষা।(মনে মনে ভেবেই একটা মুচকি হাসি দিল রাত)

যা তারা দেখতে পেল না। কারণ তার চোখ জোড়া এখনো বন্ধ।

তারার ভয়ে চোখ বন্ধ করে রাখা মুখটা দেখতে রাতের কাছে ভিষণ ভালো লাগছে। কারণ এ মুখের অধিকারীণি এখন তার জন্য ফিল করে। যা সে এতো দিন মন প্রাণ দিয়ে চেয়ে এসেছে।

তাও মুখে একটু গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে বলল।

রাত- তাই নাকি? আমি জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল নাকি? আর ছাড়া তুমিই বা কবে থেকে আমার কথার গুরুত্ব দেও?

তারা- ঠিকি তো। উনি তো ঠিকি বলেছেন। আমি কেন উনার কথা গুরুত্ব দিচ্ছি। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেই কি বা না করলেই বা কি? তাও কেন বার বার আমার মন উনার কথা শুনতে চাইছে?কেন মনে হচ্ছে উনার কথাই সবচেয়ে বেশি ইম্পরট্যান্ট? (মনে মনে মন খারাপ করে)

রাত- কি হলো? কি ভাবছো? বলো।

তারা- আব না মানে মানে।(মাথা নিচু করে)

রাত- তুমি কি সত্যি আমার কথার গুরুত্ব দাও তারা? দিলে পারতে আমি যখন বলে গেছিলাম আমার জন্য দাঁড়াতে তখন তুমি না দাঁড়িয়ে চলে যেতে? পারতে? পারতে না। পেরেছো কারণ তুমি আমার কথা কোনো গুরুত্বই দাও না। আমার কথায় তোমার কিছু এসে যায় না।

তারা- আসলে তখন…….(তারাকে আর বলতে না দিয়ে)

রাত- থাক আমি আর কিছু শুনতে চাই না। ভেবেছিলাম তোমাকে একটা শাস্তি দিব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার সে অধিকার নেই। মনে হয় আমি আমার অধিকারের থেকে বেশি করতে চেয়েছি।

তারা- দেখুন আমি তখন…………..

রাত- প্লিজ আর কিছু বলো না। চলো তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি।

তারা- না আমি একায় যেতে পারব। কেউ যদি ভাবে আমার উপর তার কোনো দায়িত্ব নেই তাহলে তাকে আমাকে বাসায় পৌছেও দিতে হবে না। কারণ তাহলে তার এই অধিকারও নেই।(মন খারাপ করে মাথা নিচু করে)

রাত- তারা বেশি বুঝো না চলো।

তারা- না।

রাত- তারা প্লিজ চলো।

তারা- না।

এরপর রাত এমন এক কাজ করল।যাতে তারার অবস্থা হা। কি থেকে কি হয়ে গেল সে বুঝতেই পারল না।

এদিকে,

আহমেদ ভিলা,

রায়হান- অনি অনি অনি।

অনিমা- আহ। এতো গুলো বছর হয়ে গেল আর তোমার এই ষাড়ের ডাক গেল না। উফ অসহ্য।

রায়হান- দেখ তুমি কিন্তু আবার আমাকে ষাঁড় বলে অপমান করছো।

অনিমা- তো আমার বাপের কি?

রায়হান- তোমার বাপেরি সব। কারণ আমি তোমার বাপের একমাএ মেয়ের জামাই।

অনিমা- এসব ফালতু না বকে বলো কি বলবে?

রায়হান- বলছি না কি…..(বলেই একটু এগিয়ে গেল অনিমার দিকে)

রায়হানের এগুনো দেখে অনিমা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

অনিমা- কি?(ভ্রু কুঁচকে)

রায়হান- বলছি…….

একদম অনিমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে যেই অনিমাকে জড়িয়ে ধরতে যাবে তখনি অনিমা দিল এক চিল্লানি।

কেন দিল তা কালকে বলব। আজকে টাটা। হি হি হি।

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here