ভালোবাসি তোমায় পর্ব -২৪+২৫

#ভালোবাসি_তোমায় (something special)
#A_mysterious_love_story
#ইরিন_নাজ
#পর্ব_২৪

এক হাত সমান ঘোমটা টেনে বসে আছে হুর। কিছুক্ষন আগে লিয়া তাকে ফাইয়াজের রুমে বসিয়ে দিয়ে গেছে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট রোজের কম্বিনেশন এ সাজানো হয়েছে সম্পূর্ণ রুম টাকে। সাদা কালোর মিশ্রনে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে রুম টা।

হুরের কিছুটা ভ’য় লাগলেও মনের ভিতর অন্যরকম প্রশান্তি, ভালো লাগা কাজ করছে। ফাইয়াজ যে তার জন্য এতোটা গভীর ভাবে চিন্তা করবে কখনোই ভাবে নি হুর। কজন স্বামী পারে তার স্ত্রীর জন্য এভাবে চিন্তা করতে। নিজের চিন্তা ভাবনা দিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে সে। বিদায় বেলার কথা চিন্তা করে ফাইয়াজের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেলো হুরের মনে।

~ফ্ল্যাশব্যাক :

বিদায় বেলায় হুর কে বিদায় দিতে হবে ভেবে যখন কাছের মানুষ গুলোর মন ছি’ন্ন বি’চ্ছি’ন্ন হয়ে যাচ্ছিলো সেই মুহূর্তে আজব কাজ করে বসে ফাইয়াজ। একটা গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলে ওঠে,

— আঙ্কেল, মামুনী, হৃদ, লিয়া গাড়িতে ওঠো।

ফাইয়াজের কথা ঠিক বুঝতে না পেরে হাসান সাহেব বললেন,

— না বাবা তোমরা আগে যাও। আমরা পরে আমাদের বাড়ির দিকে রওনা দিবো।

ফাইয়াজ পুনরায় বলে উঠলো,

— আঙ্কেল আমি আপনাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠতে বলি নি। আপনারা এখন আমার বাড়িতে যাবেন।

হাসান সাহেব অবাক হয়ে বললেন,

— তোমার বাড়িতে কেনো,,, ঠিক বুঝলাম না বাবা!

ফাইয়াজ হালকা হেসে বললো,

— হ্যা আমাদের বাড়িতে। আমি চাই আজ রাতটা আপনারা আমার বাড়িতে থাকুন। কাল নাহয় নিজের বাড়িতে যাবেন। আমি জানি হুর আপনাদের কতোটা ভালোবাসার। ওকে বিদায় দিতে আপনাদের অনেক বেশি ক’ষ্ট হবে। ও আমার সাথে চলে যাওয়ার পরও আপনাদের মাথায় হুর ভ’য় পাচ্ছে কিনা, কাঁ’দ’ছে কিনা এসব নিয়ে চিন্তা কাজ করতেই থাকবে। তাই আমি চাইবো আপনারা আমাদের সাথে যান। এতে করে আপনারাও চিন্তা মুক্ত থাকতে পারবেন। আর হুর ও নিজেকে সহজে মানিয়ে নিতে পারবে। ওর মনের দ্বি’ধা, ভ’য় গুলো দূর হয়ে যাবে।

উপস্থিত সকল আত্মীয় স্বজন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো ফাইয়াজের এমন চিন্তা ভাবনায়। কোনো ছেলে যে তার শ্বশুর বাড়ির লোকদের অনুভূতির এতোটা প্রাধান্য দিবে এটা সবার চিন্তা ধারার বাইরে ছিলো।

হাসান সাহেব নিজেও মনে মনে কয়েক দফা গর্ব করলেন ফাইয়াজ কে নিয়ে। মেয়ের জন্য তিনি খাঁটি হীরা বেছে এনেছেন। তার মনে ফাইয়াজের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো। এই ছেলে তার মেয়েকে ক’ষ্ট দিতেই পারে না। বরং এই ছেলে তার মেয়ের সাথে থাকলে তার মেয়ে সুরক্ষিত থাকবে এই বিষয়ে নিশ্চিত তিনি।

ফাইয়াজ হাসান সাহেবের হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বললো,

— দ্বিমত করবেন না আঙ্কেল। অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে আবদার করলাম।

হাসান সাহেব মুখ গম্ভীর করে বললেন,

— তোমার আবদার আমি রাখতে পারলাম না।

ফাইয়াজ আশাহত চোঁখে তাকাতেই উনি হালকা রা’গী স্বরে বললেন,

— আঙ্কেল কি বেটা বাবাই বল বাবাই! নাহলে তোর কোনো কথা রাখছিনা হুম।

ফাইয়াজ হেসে দিয়ে বললো,

— আচ্ছা বাবাই এবার তো আমার আবদার রাখো!

হাসান সাহেবও তাল মিলিয়ে বললেন,

— হ্যা এবার ঠিক আছে।

আত্মীয় স্বজনরা সবাই ফাইয়াজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। হুরের ভাগ্য নিয়ে সবাই বিভিন্ন কথা বলতে লাগলো নিজেদের মধ্যে। ছেলে যেমন সুদর্শন, তেমন ভালো। কেউ কেউ আবার বলতে লাগলো আমাদের হুর ও কি কম যায় নাকি! আর কিছু কূ’ট’নী টাইপ মহিলা মুখ বাঁকা করে খোঁ’চা মে’রে বলতে লাগলো ভালো থাকলেই হলো। পরে আবার পরিবর্তন না হয়ে যায় হুঁহ! হুর আর হুরের ফ্যামিলির কেউই এসব কথা কানে নিলো না। সকল আত্মীয়দের দেখভাল করার দায়িত্ব লিয়ার বাবা মা নিজ ইচ্ছায় নিলেন।

——

দরজা লাগানোর শব্দে ধ্যান ভাঙলো হুরের। নিজ চিন্তায় এতটাই মগ্ন ছিলো যে ফাইয়াজ এসেছে তাই টের পায় নি। নড়েচড়ে নিজেকে আরেকটু গুটিয়ে নিলো হুর। ঘোমটার ভিতর থেকে আড়চোখে ফাইয়াজের হাঁটাচলা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। কিন্তু হুর কে অবাক করে দিয়ে ফাইয়াজ cupboard থেকে নিজের কাপড় নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেলো। কথা তো দূর একবার চোখ তুলেও তাকালো না। হুর বসে বসে ভাবতে লাগলো কি হলো ব্যাপার টা।

কিছু সময় পর চুল মুছতে মুছতে বের হলো ফাইয়াজ। হয়তো শাওয়ার নিয়েছে। হুরের ও ইচ্ছা করছে শাওয়ার নিতে। এসব ভারী কাপড় আর স’হ্য হচ্ছে না। ফাইয়াজ হুরের সামনে এসে বললো,

— আর কতক্ষন এভাবে ঘোমটা মে’রে বসে থাকবে! তাও যদি নতুন বউ হতে তাহলে একটা কথা ছিলো। তোমার আমার বিয়ে তো সেই কবেই হয়েছে তাই এসব ফর্মালিটি করতে হবে না। যাও ফ্রেস হয়ে আসো।

ফাইয়াজের কথায় মুখ বাঁকালো হুর। মনে মনে বলতে লাগলো,

— মাত্র চার পাঁচদিন হয়েছে বিয়ের তাই নাকি আমি আর নতুন বউ নেই। তাহলে চার বছর বছর পর আসলে তো বলতো তুমি মহা পুরনো হয়ে গেছো। এতো পুরোনো বউ আমার লাগবে না!

এসব চিন্তা করে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে গর্ববোধ করলো হুর। ভাগ্য ভালো এখনই চলে এসেছে এই বাড়িতে।

— কি হলো যাও?

ফাইয়াজ পুনরায় তাড়া দিতেই ধীরে ধীরে বেড থেকে নামলো হুর। ধীর পায়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। লেহেঙ্গা পড়েছে বলে স্বস্তি নাহলে এতক্ষনে কতবার যে হোঁ’চ’ট খেতো! ওড়নার পিনগুলো খুলতে গিয়ে মহা মুশকিলে পড়লো সে। কোথায় কিভাবে পিন লাগিয়েছে কিছুই বুঝতে পারছে না। অনেক টানাটানির পর কয়েকটা খুলতে পারলো মাত্র। বাকিগুলো খুলছে না দেখে অস্থির হয়ে গেলো হুর।

এর মাঝেই হুরের মনে হলো কেউ যত্ন সহকারে পিন খুলে দিচ্ছে। আয়নার দিকে তাকাতেই দেখলো ফাইয়াজ মনোযোগ সহকারে পিনগুলো খুলছে। ফাইয়াজ একে একে লেহেঙ্গার ওড়নার সব পিন খুলে হেয়ার ক্লিপ খুলতে শুরু করলো। এতটাই আস্তে খুলতে লাগলো যাতে একটা চুলেও টা’ন না লাগে। হুর আয়নার ভিতরে মুগ্ধ দৃষ্টিতে ফাইয়াজ কে দেখতে লাগলো।

নিজের কাজ শেষ করে হুরের হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিলো ফাইয়াজ। হুর প্রশ্নসুচক দৃষ্টিতে তাকাতেই বললো,

— ফ্রেস হয়ে এটা পড়বে। যাও।

——

শাওয়ার শেষে প্যাকেট খুলতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেলো হুরের। অসম্ভব সুন্দর একটা শাড়ি। কালো সাদা মিশ্রনের শাড়িটাতে খুব সুন্দর করে কাজ করা কিন্তু শাড়িটা খুবই হালকা। এক কথায় চোখ ধাঁধানো সুন্দর। প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে ব্যাগে।

— এতো সুন্দর একটা শাড়ি। দেখেই তো পড়তে ইচ্ছা করছে। কিন্তু আমি তো শাড়িই পড়তে জানি না। আম্মু লিয়া এতো সুন্দর করে পড়িয়ে দেয় তাও উল্টায় উল্টায় পড়ি। এখন কি করি!!

কিছুক্ষন পর দরজা খুলে রুমে উঁকি দিলো হুর। ফাইয়াজ কে দেখতে না পেয়ে শাড়িটা কে ভালো করে পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়িটা পরার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু কিছুতেই হচ্ছে না দেখে বিরক্ত হলো হুর।

— মেয়ে হয়ে সামান্য শাড়িও পড়তে জানো না! লজ্জার বিষয়।

হুর রে’গে গিয়ে বললো,

— আমি যে শাড়ি পড়া দূর শাড়ি সামলাতেই পারি না এটা আপনি জানেন না! আপনি কেমন জামাই! এখন এসব বাদ আমার ফোন টা কোথায়! লিয়াকে আসতে বলুন।

ফাইয়াজ বললো,

— এখানে চুপচাপ দাড়াও আমি পড়িয়ে দিচ্ছি।

হুর ফাইয়াজের কথা শুনামাত্র কিছুটা পিছিয়ে গেলো। বললো,

— না না আমি পারবো। আপনাকে পড়াতে হবে না।

ফাইয়াজ চোখ রাঙিয়ে বললো,

— চুপচাপ দাড়াও। কোনো কথা শুনতে চাচ্ছি না।

ফাইয়াজ হুর কে সুন্দর করে শাড়ি পড়িয়ে দিতে লাগলো আর হুর চোখ বড় বড় করে দেখছে। ফাইয়াজ ছেলে হয়ে এতো সুন্দর করে শাড়ি পড়াতে পারে কিভাবে। হুর মিনমিন করে বললো,

— আপনি এতো ভালো শাড়ি পড়াতে পারেন কিভাবে! এর আগে কতজনকে শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছেন!

ফাইয়াজ শাড়ি পড়ানো কমপ্লিট করে উঠে দাঁড়ালো। হুরকে রা’গানোর জন্য বললো,

— তোমাকে একটা সিক্রেট বলি আমার এক ডজন গার্লফ্রেন্ড আছে। তাদের পড়িয়ে শিখেছি।

হুর বুঝতে পারলো ফাইয়াজ তাকে রা’গানোর জন্য এসব বলছে। তাই কিছু বললো না। নাক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

ফাইয়াজ হুর কে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে আরেকটা প্যাকেট খুলতে লাগলো। হুর কৌতূহলী দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো এই প্যাকেটে কি আছে। হুরকে অবাক করে দিয়ে ফাইয়াজ প্যাকেট থেকে টাটকা সাদা কালো গোলাপ দিয়ে তৈরী জুয়েলারি বের করলো। একে একে সবকিছু পড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষন হুরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ফাইয়াজ। অতঃপর হুরের কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,

— মাশাআল্লাহ। কোনো অংশে পরীর চেয়ে কম লাগছেনা আমার বউ কে।

লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেললো হুর। গালজুরে ছড়িয়ে পড়লো রক্তিম আভা। হঠাৎ করে নিজেকে শূন্যে আবিষ্কার করতেই ভ’য় পেয়ে গেলো হুর। ততক্ষনে ফাইয়াজ তাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে। হুর আলতো করে ফাইয়াজের গলা জড়িয়ে ধরলো।

বেলকনিতে প্রবেশ করতেই আরেক দফা অবাক হলো হুর। আজ মনে হয় তার অবাক হওয়ার দিন। চমৎকার করে সাজানো হয়েছে বেলকনিটাকে। ফাইয়াজের রুম আগে দেখলেও বেলকনিতে আজ প্রথম আসলো হুর। বিশাল বড় বেলকনি ফাইয়াজের। এক সাইডে অসংখ্য গাছ সুন্দর করে সাজানো। অন্য সাইডে একটা দোলনা আছে। দোলনাটাকেও কালো সাদা গোলাপে মোড়ানো হয়েছে। ফাইয়াজ হুরকে কোলে নিয়েই দোলনাতে বসে পড়লো। হুরের গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,

— জানতে চাইবে না আজ সবকিছু ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট কেনো!

ফাইয়াজের স্পর্শে হুশ ফিরলো হুরের। এতক্ষন সবকিছু দেখাতে মগ্ন ছিলো সে। ফাইয়াজের কোল থেকে নামার চেষ্টা করতেই হুর কে আরেকটু শ’ক্ত করে চে’পে ধরলো ফাইয়াজ। বলতে লাগলো,

— তোমার প্রিয় রঙ কালো আর আমার প্রিয় সাদা তাই সবকিছু ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট।

ফাইয়াজ ছাড়বে না বুঝতে পেরে থেমে গেলো হুর। ফাইয়াজ হুর কে আরেকটু নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে বললো,

— আজ কিছু কথা বলবো তোমায়। আমি চাইবো তুমি আমার সব কথা মনোযোগ সহকারে শুনবে আর মানবেও। প্রথমত, আমার বাবাকে কখনো কষ্ট দিবে না হুর। যখন কেউ ছিলো না তখন এই মানুষটাই আমাকে আগলে রেখেছে। কখনো ক’ষ্ট পেতে দেয়নি। এখন আমাদের দায়িত্ব বাবাকে ভালো রাখা। আর দ্বিতীয়ত, কখনো আমায় অবিশ্বাস করবে না। আমি যদি তোমার কাছ থেকে কিছু লুকিয়েও থাকি তবে তা অকারণে লুকাই নি মনে রাখবে। কোনো কারণে আমার উপর সন্দেহ হলে আমাকে আগে বলবে। আমি তোমার সন্দেহ দূর করবো। আমার কথাগুলো মানবে তো হুর?

হুর ছোটো করে জবাব দিলো,

— হুম।

ফাইয়াজ একগাল হেসে বললো,

— গান শুনবে হুর?

হুর কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাতেই ফাইয়াজ খালি গলায় গান ধরলো,

🎶তুই হাসলি যখন
তোরই হলো এ মন
তুই ছুঁলি যখন
তোরই হলো এ মন

দু’চোখে আঁকছে শীত
বাহারি ডাকটিকিট
দু’চোখে আঁকলো শীত
বাহারি ডাকটিকিট
আলসে রোদের চিঠি পাঠালো পিয়ন….

ফাইয়াজ এতো সুন্দর গান গাইতে পারে কল্পনাও করে নি হুর। ফাইয়াজের বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে মুগ্ধ হয়ে গান শুনতে লাগলো সে। শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে গেলো নিজেই টের পেলো না।

ফাইয়াজ গান শেষ করে হুরের দিকে তাকাতেই দেখলো হুর তার বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়েছে। দেখতে পুরোই বাচ্চা বাচ্চা লাগছে। ফাইয়াজ হালকা হেসে হুরের কপালে আর মাথায় গভীর চু’ম্ব’ন করলো। সুন্দর করে জড়িয়ে ধরে আপন মনে বিড়বিড় করে বললো,

— কখনো ভুল বুঝো না হুর। আমি যে তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু লুকিয়েছি। সব জানার পর আমাকে ছেড়ে যাবে না তো! না আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেবো না,,,, যেতে দেবো না কোথাও।
#ভালোবাসি_তোমায় (ধা’মাকা-১)
#A_mysterious_love_story
#ইরিন_নাজ
#পর্ব_২৫

আজ ১৫ দিন হতে চললো হুর ফাইয়াজদের বাড়িতে আছে। এর মাঝে কয়েকবার নিজের বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছে সে। ভালোই সময় কাটছে তার। ফরিদ সাহেব অফিসে যাওয়া একেবারে কমিয়ে দিয়েছেন। সব দায়িত্ব ফাইয়াজ কে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তার মতে তার এখন বয়স হয়েছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া তিনি অফিসে যান না। হুরের সাথে গল্প করে সময় কাটে তার।

এই কয়েকদিনে হুর অনেকবার ফারানের রহস্য খোঁজার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো প্রকার ক্লু পায় নি। হুরের মতে পুরো রুম সার্চ করা শেষ। কিন্তু এই রহস্য সমাধান হবে এমন কিছুই মিলে নি। ফাইয়াজ ও তার সাথে খুবই স্বাভাবিক আচরণ করে। হুর চায় ফাইয়াজ নিজের মুখে তাকে সব টা জানাক। তার বিশ্বাস আছে ফাইয়াজের উপর। নিশ্চয় বড় কোনো কারণ আছে এসবের পেছনে। ফাইয়াজের চোঁখে নিজের জন্য স্পষ্ট ভালোবাসা দেখে হুর। ফাইয়াজ যে তাকে পা’গ’লে’র মতো ভালোবাসে এটাও তার আচরণে স্পষ্ট। এইতো এই বাড়িতে আসার পরের দিনের ঘটনা। চুরি পড়তে গিয়ে অসাবধানতায় একটা চুরি ভে’ঙে হাতে ঢু’কে যায় হুরের। হালকা একটু ব্লি’ডিং ও হয়েছিল। তাতেই ফাইয়াজের সে কি পা’গ’ল পা’গ’ল অবস্থা। হুর কে যেমন ব’কে’ছে তেমনি যত্ন নিয়েছে ফাইয়াজ।

অবাক করা বিষয় হলো এই বাড়ির সম্পূর্ণ টা সিকিউরিটির মধ্যে থাকে। বাড়ির চতুর্দিক সিকিউরিটি গার্ড দিয়ে ঘেরাও করা। এতো গার্ড হুর আগের বার যখন এসেছিলো তখন দেখে নি। এখন কেনো এতো গার্ড রাখা হয়েছে জানা নেই হুরের। এই বিষয়ে ফরিদ সাহেব কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানিয়েছেন বিসনেস করার কারণে তাদের অনেক শ’ত্রু আছে। তারা যখন তখন এ’টা’ক করতে পারে। তারা সুযোগ খুঁজছে ক্ষ’তি করার। তাই ফাইয়াজ সিকিউরিটি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। হুরের কেনো যেনো মনে হয় ফরিদ সাহেব ও কিছু লুকাচ্ছেন। কিন্তু জানার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না হুর।

তবে একটা জিনিস হুরের বি’রক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল হুর গার্ড ছাড়া কোথাও যেতে পারে না। ফাইয়াজ তার জন্য পার্মানেন্ট দুটো গার্ড দিয়ে রেখেছে। হুর কোথাও গেলে তারা সাথে করে নিয়ে যায় আবার নিয়ে আসে। হুরের নিজেকে ব’ন্দি পাখি মনে হয়। আগে স্বাধীন ভাবে ঘোরাফেরা করতো সে আর লিয়া। কিন্তু এখন কোথাও যেতে পারে না। ফাইয়াজ দুইদিন আগে ক’ড়াক’ড়ি ভাবে নিষেধ করেছে ভার্সিটি থেকে যেনো এদিক ওদিক না যায়। সোজা ভার্সিটি যাবে আর বাড়ি ফিরবে। ঘুরতে ইচ্ছা হলে সে নিয়ে যাবে। তাই লিয়া তাকে নিয়ে যেতে চাইলেও সে পারে না।

——–

— একটা মেয়েকে তোরা ধরে আনতে পারছিস না। তোদের মে’রে ফেলতে বললাম তা পারলি না। উঠিয়ে আনতে বললাম তাও তোদের দ্বারা হচ্ছে না। আজ এতগুলো দিন ধরে তোরা শুধু ব্যর্থই হয়ে যাচ্ছিস। আর ওই মেয়ে সুখে সংসার করছে। তোদের আমি এতো টাকা দিয়ে পুষি কেনো! ইচ্ছা তো করে জানে মে’রে ফেলি সব ক’টা কে ।

গ’র্জে উঠে বললেন মোস্তফা চৌধুরী। তার পোষা লোকদের মধ্যে লিডার ধরণের লোকটা মিনমিন করে বললো,

— স্যার আমরা তোহ এতক্ষনে সাকসেসফুল হয়েই যেতাম। কিন্তু তার জন্যই তো পারছিনা। হুর মেয়ে টা তো কতবার প্রায় ম’র’তেই বসেছিল কিন্তু….। আর এখনো তাকে ক’ড়া সিকিউরিটির মধ্যে রাখা হয়েছে।

মোস্তফা চৌধুরী ফের গর্জে উঠে বললেন,

— এসব শুনতে চাই না আমি। এই শেষবার, শুনেছিস শেষ বারের মতো সুযোগ দিলাম। দুইদিনের মধ্যে আমার ওই মেয়ে কে চাই। তবে এবার মৃ’ত না জীবিত অবস্থায় চাই ; জীবিত। এবার ব্যর্থ হলে উপরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিস।

লোকগুলো মাথা নাড়িয়ে রুম ত্যাগ করলো। তারা জানে মোস্তফা চৌধুরী কতোটা ভ’য়া’ন’ক। সে যা বলে তাই করে।

মোস্তফা চৌধুরী দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে দাঁতে দাঁত পি’ষে বললো,

— সময় এসে গেছে। এবার শুধু রাণী কে চাই না ; রানীর সাথে রাজাকেও নিজের হাতের মুঠোয় চাই। রাজার সামনে রাণী কে মা’র’বো তাহলেই না খেলায় মজা আসবে। তারপর রাজাকেও পি’ষে মা’র’বো। রাজা, রাণী, রাজ্য সব শেষ। অনেক ক্ষ’তি করেছিস আমার রে। সব কিছুর শো’ধ তো নিতেই হবে।

নিজের কথা শেষ করে ভ’য়া’ন’ক হাসিতে মেতে উঠলো মোস্তফা চৌধুরী।

———

অফ পিরিয়ডে ক্যান্টিনে বসে আছে লিয়া আর হুর। দুইজন কফি খেতে এসেছিলো। হঠাৎ করে হুর বলে উঠলো,

— দোস্ত কতদিন তোর সাথে আমাদের প্রিয় পার্কে যাই না বল! আমার না খুব যেতে ইচ্ছা করছে। এই বন্দি বন্দি জীবন আর ভালো লাগে না। ওই পাহালোয়ান মার্কা গার্ড গুলো সারাক্ষন আগে পিছে লেগে থাকে।

লিয়া মুখ টা গোমড়া করে বললো,

— আসলেই রে কতদিন যাই না। আমারও খুব ইচ্ছা করে। কিন্তু ফাইয়াজ ভাইয়ার অনুমতি ছাড়া….

নিজের কথা সমাপ্ত করতে পারলো না লিয়া। তার পূর্বেই হুর লাফিয়ে উঠে বললো,

— আইডিয়া! চল দোস্ত লুকিয়ে বের হয়ে যাই।

লিয়া বলে উঠলো,

— না,,, না পরে আবার কোনো সমস্যা হলে! আর ফাইয়াজ ভাইয়ার অনুমতি ছাড়া যাওয়া ঠিক হবে না। নিশ্চই কোনো সমস্যা হতে পারে বলেই তোকে ক’ড়া পাহারার মধ্যে রেখেছে। আমার মনে হয় না এভাবে যাওয়া ঠিক হবে।

হুর লিয়ার হাত ধরে বললো,

— আরে এতো পে’রা খাচ্ছিস কেনো! কিছুই হবে না। আমরা ভার্সিটির পেছন দিকে যে দরজা আছে ওখান থেকে বেরিয়ে যাবো। এক ঘন্টার মতো থেকে ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই চলে আসবো। কেউ জানতে পারবে না। আর আমরা তো মাস্ক পড়ে যাবো কেউই চিনবে না আমাদের।

মনে দ্বি’ধা থাকা সত্ত্বেও রাজী হলো লিয়া। আসলে তারও যাওয়ার ইচ্ছা আছে। অনেক দিন ধরেই ইচ্ছা করছিলো কিন্তু ফাইয়াজের অনুমতি নেই তাই বলে নি। দুই বান্ধুবী চুপিচুপি পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লো নিজ গন্তব্যে।

——–

প্রায় ৫০ মিনিট হতে চললো লিয়া আর হুর পার্কে এসেছে। আজ পার্ক অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি শান্ত। একেবারেই মানবশূন্য বলা যায়। অনেক দূরে দুই একজন মানুষ আছে। হুর আসার পথে কিছু চিপস আর কোল্ড্রিংকস নিয়ে এসেছিলো। অনেকদিন পর দুই বান্ধুবী ভালো সময় কাটিয়েছে। হুর লিয়াকে বললো,

— চল দোস্ত এবার উঠি। আর কিছুক্ষন পর ভার্সিটি ছুটি হয়ে যাবে। তার আগেই আমাদের পৌঁছতে হবে।

লিয়া সায় জানিয়ে উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু পিছে ঘুরতেই আ’ত্মা কেঁ’পে উঠলো হুর আর লিয়ার। কয়েকজন গু’ন্ডা প্রকৃতির লোক বি’শ্রী হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভ’য়ে লিয়া আর হুর একে অপরের হাত শ’ক্ত করে চে’পে ধরলো। চোখে চোঁখে ইশারা করে পাশ কা’টিয়ে যাওয়া ধরতেই পুনরায় সামনে আসলো লোকগুলো। হুর নিজের মন কে শ’ক্ত করে বললো,

— কি ব্যাপার পথ আটকাচ্ছেন কেনো আপনারা! যেতে দিন আমাদের।

লোকগুলোর মধ্যে একজন খুবই জ’ঘ’ন্য হাসি দিয়ে বললো,

— কি করে যেতে দেই মামুনী! কতো সাধনার পর আমাদের হাতের নাগালে পেলাম তোমায়। তোমাকে ছেড়ে দেয়া মানে আমাদের জীবনের মায়া ত্যাগ করা। এখন তুমি ভালোয় ভালোয় আমাদের সাথে যাবে নাকি অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে!

হুরের কা’ন্না চলে এলো লোকটার কথায়। এখন বুঝতে পারছে ফাইয়াজের কথা অমান্য করে কতো বড় ভুলটা করেছে। এই জন্যই হয়তো হুর কে এতো ক’ড়া পাহারার মধ্যে রাখতো ফাইয়াজ।

হুর লিয়াকে ইশারায় কিছু বোঝালো। এরপর হঠাৎ দুইজন প্রা’নপনে ছু’টতে লাগলো। হুররা পালাচ্ছে বুঝতে পেরে লোকগুলোও তাদের পিছু নিতে শুরু করলো। হুর আর লিয়ার হাত ছুঁ’টে গেছে অনেক আগেই।

লোকগুলোর মধ্যে একজন হাতে থাকা লোহার দন্ডটা হুরের দিকে ইশারা করে ছু’ড়ে মা’র’লো। মুহূর্তের মাঝে মাটিতে মুখ থু’ব’ড়ে পড়লো হুর। পা থেমে গেলো লিয়ার ও। প্রানপ্রিয় বান্ধুবীর এই অবস্থা সহ্য করতে পারলো না লিয়া। মুখ চে’পে ধরে কেঁ’দে উঠলো। লোকগুলোও থেমে গেলো। একে অপরের দিকে তাকিয়ে বি’শ্রী’ভাবে হাসতে লাগলো।

চোখেজোড়া নিভুনিভু করছে হুরের। মাথার পেছন দিক থেকে গরম তরল জাতীয় কিছু গড়িয়ে পড়ার অস্তিত্ব অনুভব করলো হুর। হুরের মনে হচ্ছে আজই তার জীবনের শেষ দিন হতে চলেছে।

লোকগুলোর মধ্যে একজন বললো,

— সাথের টাকেও ধর। একে স্যারের কাছে দিবো আর আরেকটা আমাদের কি বলিস তোরা!

সবাই মিলে বি’ক’ট শব্দে হাসতে লাগলো। লিয়া হুরের কাছে আসতে নিলে হুর অনেক ক’ষ্টে গলায় জো’র দিয়ে বললো,

— পা,,পালা লিয়া। আ,, আমার কাছে আসিস না।

লিয়া তারপরও আসতে চাইলে হুর হাত জো’র করে চোখ দিয়ে কা’কু’তি-মি’নতি করতে লাগলো যেনো লিয়া পালিয়ে যায়। তার ভুলের জন্য এই মেয়েটা কেনো শা’স্তি পাবে। তার ভাগ্যে যা আছে হবে। ফাইয়াজের নাম বিড়বিড়িয়ে জ্ঞান হারালো হুর।

হুরের চোখ দিয়ে করা অনুরোধ ফেলতে পারলো না লিয়া। চোঁখের পানি মুছে উল্টোদিকে দৌড় দিলো। বান্ধুবী কে এই অবস্থায় ছেড়ে যেতে বুকটা ছি’ন্ন বি’চ্ছি’ন্ন হয়ে যাচ্ছে লিয়ার। কিন্তু কিছু করার নেই। পালাতে পারলে ফাইয়াজ কে জানাতে পারবে। একমাত্র ফাইয়াজ ই পারবে হুরকে এই বি’প’দ থেকে রক্ষা করতে।

দুইজন লোক লিয়ার পিছনে ছুটলো কিন্তু লিয়াকে না পেয়ে ফেরত এলো তারা। নিজেদের মধ্যে হা হু’তাশ করতে করতে হুর কে গাড়িতে তুলে প্রস্থান করলো।

চলবে?

(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here