ভ্যাম্পায়ার_বর পর্ব ৩১+৩২

#ভ্যাম্পায়ার_বর (সিজন 2)
#পার্ট_৩১
#M_Sonali

দেখতে দেখতে কিছুক্ষণ সময়ের মাঝেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেল শ্রাবণ। একদম তরতাজা লাগছে এখন তাকে দেখতে। তবে শ্রাবণের মুখের দিকে তাকাতেই যেনো অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল চাঁদনীর। কেননা ওকে অসম্ভব হিংস্র দেখতে লাগছে। ওর চোখ দুটো একদম গাঢ় নীল রং ধারণ করেছে। সাথে মুখের মধ্যে থাকা ধাড়ালো লম্বা সরু দাঁত দুটো বেরিয়ে এসেছে বাইরে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এখন’ই চাঁদনীর গলায় নিজের দাঁত বসিয়ে দিয়ে চুষে চুষে সব রক্ত খেয়ে ফেলবে। চাঁদনী উঠে দাঁড়িয়ে ভয়ে কয়েক পা পিছনদিকে পিছিয়ে গেল। তখন’ই শ্রাবণও উঠে দাঁড়িয়ে ওর কাছে এগিয়ে এসে ওর গালে আবারও একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল।

ওর হাতে থাপ্পড় খেয়ে মুখটাকে ভোতা বানিয়ে ঠোঁট উল্টে ওর দিকে তাকালো চাঁদনী। সাথে সাথে কোনো কথা না বলে ওকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল শ্রাবণ। ওর এমন কান্ডে চোখ বড় বড় করে চাঁদনী মনে মনে ভাবতে লাগল এখনই হয়তো ওর গলায় নিজের দাঁত দুটো বসিয়ে দেবে শ্রাবণ। কিন্তু বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও তেমন কিছুই হলো না। এভাবে বেশ কিছুক্ষন থাকার পর পিছন দিক থেকে মিতুর গলা খাঁকারি শুনে ওকে ছেড়ে দিলো শ্রাবণ। তারপর রাগী গলায় বলে উঠলো,

— এই মেয়ে তোমার সমস্যা কি বলতো? আমার কোন কথা কেন শোনোনা তুমি? আজকে কত বড় একটা বিপদ হয়ে যেত তার কোন ধারণা আছে তোমার? শুধু ওদের থেকে নয় আমার থেকেও তোমার মস্ত বড় একটা বিপদ ছিল। যেটা থেকে অনেক কষ্টে তোমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছি আমি। তুমি কি ভাবো নিজেকে? নিজের কথা ছাড়া অন্য কারো কথার কোন দাম নেই তোমার কাছে তাই না? এই যে এত কিছু হল শুধুমাত্র তোমার জন্য হল। তুমি যদি আমার কথা মত ছাদে না উঠতে তাহলে এত বড় বিপদ হতো না। তুমি জানো আজকে কত বড় একটা বিপদ হয়ে যেত যদি ওরা তোমার রক্ত চুষে নিতে সক্ষম হতো! আর সেই বিপদ তোমার একার নয় বরং পুরো ভ্যাম্পায়ার জগতের সবার সাথে হতো।এত বড় একটা ভুল কি করে করতে পারো তুমি? ইচ্ছে করছে থাপ্পড় মেরে মেরে দুগাল একদম লাল করে ফেলি তোমার।

কথাগুলো একনাগাড়ে বলে রাগ কন্ট্রোল করার জন্য চাঁদনীর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়াল শ্রাবণ। তারপর থর থর করে কাঁপতে লাগল রাগে। ওর এ পরিমান রাগ দেখে গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো চাঁদনী। মিতুও দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে চুপচাপ। আর ভাবছে এর পরে কি হয়। তখনই চাঁদনী শ্রাবণের সামনে এসে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে দুই হাত দিয়ে নিজের দুই কান ধরে বললো,

— আই এম সরি, আসলে আমি বুঝতে পারিনি আমার সামান্য একটা ভুলের জন্য এত কিছু হয়ে যাবে। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর আমি তো জানি না যে এত বড় একটা বিপদ হবে। আর কেনই বা আমার সাথেই এসব হচ্ছে বার বার?

কথাগুলো বলতে চাঁদনীর দু চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পরল। ওর চোখর জল দেখতেই শ্রাবণের রাগ মুহূর্তের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেল। ও শান্ত হয়ে চাঁদনীর কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর হাতটা ধরে নিয়ে গিয়ে সোফার ওপর বসালো। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে ওর চোখ দুটো মুছে দিয়ে গম্ভির গলায় বলতে শুরু করল,

— আই এম সরি চাঁদ পাখি। আমি এভাবে তোমাকে আঘাত করতে চাইনি। কিন্তু কি করবো বল, তোমার এই সামান্য ভুলের কারণে আজকে সবকিছু শেষ হয়ে যেত। তীরে এসে তরী ডুবে যেতো। তুমি কল্পনাও করতে পারবে না তোমার সাথে কত কিছু জড়িয়ে আছে আমাদের ভ্যাম্পায়ার রাজ্যের। আর তুমি আসলে কে? তুমি যদি সব কিছু জানতে তাহলে হয়তো বুঝতে পারতে আমার এমন রেগে যাওয়ার কারণ। আজকে যদি ওই ভ্যাম্পায়ার দুজন তোমার রক্ত চুষে নিত, তাহলে তোমার শরীরের সব শক্তি ওদের মাঝে চলে যেত। আর ওরা তখন আমাদের পুরো ভ্যাম্পায়ার রাজ্য ধ্বংস করে দিতো। কোনভাবেই আর ওদের আটকাতে পারতাম না আমরা।

শ্রাবণের কথা শুনে চাঁদনী এবং মিতু দুজনেই ভীষণ অবাক হয়ে গেল। মিতু চাঁদনীর পাশে এসে সোফার উপর বসে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল শ্রাবণের দিকে। চাঁদনী বিশ্ময় চোখে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বললো,

— আমার সাথে আপনার ভাম্পায়ার রাজ্যের সবকিছু জড়িয়ে আছে মানে? আমি তো আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না! আর আমি কে, মানে? আমিতো সবার মত একজন সাধারন মানুষ। কিন্তু আপনি এমনভাবে বলছেন যেন আমি অসাধারণ কেউ?

ওর কথার উত্তরে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো শ্রাবণ। তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল,

— হ্যাঁ চাঁদপাখি তুমি সাধারন কেউ নও। তুমি অসাধারণের চাইতেও অসাধারণ কেউ। তবে তোমার জীবনের সব রহস্য এখন তুমি জানতে পারবে না। সেটা তোমার 25 বছর পূর্ণ হলেই তুমি জানতে পারবে। কারণ এখন যদি তোমাকে আমি সবকিছু বলে দিই তাহলে তুমি আর তোমার শক্তি পাবে না। এমনটাই বলা হয়েছে আমায়। তবে এই পাঁচটা দিন তোমাকে অনেক সাবধানে থাকতে হবে। যে কোনো মূল্যে তোমার নিজেকে সেভ রাখতে হবে ওই খারাপ ভ্যাম্পায়ারদের থেকে। নইলে তোমার সাথে সাথে আমাদের পুরো ভ্যাম্পায়ার রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তখন সবকিছু দখলে চলে যাবে ওই খারাপ ভ্যাম্পায়ারদের। তখন ওরা প্রতিটা মানুষের রক্ত চুষে মেরে ফেলবে। কাউকে শান্তিতে বাঁচতে দেবে না। সবার মাঝে আতংক বিরাজ করবে। আর এসব কিছুর থেকে একমাত্র তুমি সেভ থাকলেই বাঁচাতে পারবে। কারণ যখন তোমার 25 বছর পূর্ণ হবে তখন অার ওরা তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবেনা।

একনাগাড়ে এতটুকু বলে থেমে গেল শ্রাবন। চাঁদনী বেশ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে কিছু একটা ভাবলো। তারপর উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলো,

— আচ্ছা আমি বুঝতে পেরেছি এই পাঁচ দিন পার হওয়ার আগে আপনি আমাকে কিছু বলবেন না। আমি আপনাকে জোরও করব না জানার জন্যে। কারণ আমি বুঝতে পেরেছি আমার ভুলে কত বড় একটা বিপদ হতে যাচ্ছিল। কিন্তু আপনি শুধু আমাকে এটা বলুন যে, আপনি এতদিন কেন আমার কাছাকাছি আসেন নি। কেনো সব সময় দূরে দূরে থেকেছেন?আর আজকেই বা হঠাৎ করে কেন এলেন! আপনার থেকে কি এমন বিপদ ছিল আমার?

ওর কথার উত্তরে মুচকি একটা হাসি দিল শ্রাবণ। তারপর ওর দিকে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলো,

— আমি তোমার প্রাণনাশের কারণ হতাম। কারণ তুমি যখন জেনে যাবে যে আমি একজন ভ্যাম্পায়ার। তখন থেকে পঁচিশ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত আমি তোমার সামনে আসতে পারব না। কারণ তোমার শরীরের রক্ত তখন ভীষণভাবে আকর্ষণ করবে আমায়। আর আমি সেই আকর্ষণ থেকে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারব না। তোমার রক্ত চুষে মেরে ফেলবো তোমায়। এমন টাই হওয়ার ছিল। তাই তোমার থেকে সবসময় দূরে থেকেছি।

ওর কথার উত্তরে চাঁদনী কিছু বলার আগেই পাশ থেকে মিতু বলে উঠলো,

— কিন্তু ভাইয়া এমনটাই যদি হয়! তাহলে তো চাঁদনীর এখনো 25 বছর পূর্ণ হয়নি। আর আপনি তো ওর সামনে বসে আছেন। তাহলে এখন কেন ওর রক্ত আকর্ষণ করছে না আপনাকে? কেন রক্ত চুষে কিছু করছেন না আপনি ওর? আর শ্রাবণী আপু’ই বা কেনো আসছে না এখানে?

— কারন আমার মতো শ্রাবণী ও একজন ভ্যাম্পায়ার। আর আমার চাইতে ও আরো বেশি আকর্ষিত হবে চাঁদনীর রক্তের দিকে। আমি যতোটুকু কন্ট্রোল করতে পারি নিজেকে। শ্রাবণী ততটুকুও পারে না।

— কিন্তু আমি তো শ্রাবণী আপুর সাথে অনেকদিন একই বাসায় একদম একা থেকেছি। কই তখন তো শ্রাবণী আপু আমার কোন ক্ষতি করেনি! বরং সব বিপদ থেকে আমায় বাঁচিয়েছে। তাহলে উনি কেন আমার রক্ত চুষে খাবে? এসব কি বলছেন আপনি? আমি তো আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না শ্রাবণ!

উত্তেজিত কণ্ঠে উপরের কথাগুলো বলে উঠলো চাঁদনী। ওর কথায় ছোট্ট করে একটি নিশ্বাস নিয়ে ওর দিকে ঘুরে বসে ওর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে শ্রাবণ বললো,

— মনে আছে চাঁদ, যেদিন তোমাকে আমি বিয়ে করে নিয়ে আসলাম। সেদিন শ্রাবণী কতটা তাড়াহুড়ো করছিল তোমাকে আমার সাথে বিদায় করে দিতে! তুমি কি ভুলে গেছো সেই দিনের কথা? সূর্য যখন ডুবে যাচ্ছিল তার আগেই তোমাকে দ্রুত সেই বাসা থেকে ওর সামনে থেকে নিয়ে এসেছিলাম আমি!

— হ্যাঁ মনে আছে আমার। সেদিন আমি শ্রাবণী আপুর আচরনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। কারণ হঠাৎ করে উনার আচরণ কেমন যেন পাল্টে গিয়েছিল। যেন আমাকে বাসা থেকে তাড়িয়ে দিতে পারলে বাঁচেন। আমিতো মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম যে হয়তো আমাকে সে বোঝা মনে করছে। তাই এত তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বিদায় করে দিচ্ছে। কিন্তু এটার আসল কারণ কি ছিল শ্রাবণ? আমি সবকিছু জানতে চাই, প্লিজ আমাকে সব কিছু খুলে বলুন!

— সেদিন যদি সূর্য ডোবার আগে তোমাকে ওর সামনে থেকে না সরানো হতো, তাহলে ও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারত না। তোমার রক্ত চুষে সেদিন রাতেই তোমাকে মেরে ফেলতো। এতে তোমার সাথে সাথে আমাদের পুরো ভালো ভ্যাম্পায়ার রাজ্য শেষ হয়ে যেত। কারণ তোমার সাথে অনেক কিছু জড়িয়ে আছে। যেটা সবই তোমার অজানা। তবে সময় এলে জানতে পারবে। তাই সেদিন তোমাকে বাঁচানোর জন্যই এভাবে তোমাকে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছিল শ্রাবণী। আর আমিও দ্রুত সেখান থেকে তোমায় নিয়ে চলে আসি। কিন্তু আসার সময় মাঝপথে যখন দেখতে পাই সূর্য প্রায় ডুবে যাচ্ছে তখন বুঝতে পারি চারদিক থেকে তোমার জন্য বিপদ এগিয়ে আসছে। তাই বাধ্য হয়ে সেদিন তোমার গলায় কাপড় দিয়ে তোমাকে অজ্ঞান করতে হয়েছিল আমায়।

— হ্যাঁ আর যখন আমার জ্ঞান ফেরে তখন আমি নিজেকে এমন একটা রুমে আবিষ্কার করি যে রুমের কোন দরজা ছিল না। কোন জানালা ছিল না। চারিপাশে শুধু দেওয়াল আর দেওয়াল। আর সেই দেওয়ালের সাথে টাঙানো ছিল আমার অনেকগুলো ছবি। কিন্তু সেই ছবিতে থাকা আমার আমি কে আমি চিনতে পারিনি। কেমন যেন অচেনা লাগছিল। কিছু কিছু আমার সাথে অবিকল মিল হলেও, কিছু ছবিতে কেন জানিনা মনে হচ্ছিলো ওটা অন্য কেউ, আমি নই। এসবের কারণ কি শ্রাবণ? আর সেদিন রাত্রে কেনইবা আমাকে ওই রুমের মাঝে আটকে রেখেছিলেন আপনি? কেন কাছে যাননি আমার?

— ওই রুমের রহস্যগুলো তুমি 25 বছর পূর্ণ হলে জানতে পারবে। এখন তোমায় বলতে পারবোনা। আর আমি তোমার কাছে না যাওয়ার কারণ সেটা তোমাকে আগেই বলেছি। আমার থেকে তোমার প্রাণ সংশয় ছিল। আর সেদিন রাত্রে আমিও তোমার কাছে যেতে পারতাম না কারণ সূর্য ডোবার পর তোমার প্রতি ভীষণভাবে আকর্ষিত হতাম আমি। এতে করে রক্ত চুষে নিলে তোমার মৃত্যু হত। সাথে সবকিছু শেষ হয়ে যেত। কিন্তু পরবর্তীতে সেদিন রাত কেটে যাওয়ার পর তুমি যখন জানতে না যে আমি একজন ভাম্পায়ার। তখন তোমার কোন ক্ষতির আশঙ্কা ছিল না আমার থেকে।

ওর কথার উত্তরে চাঁদনী এবং মিতু দুজনই বেশ কিছুক্ষন চুপ করে রইলো। তারপর মিতু বলে উঠলো,

— আচ্ছা ভাইয়া আপনার কথা সবই বুঝলাম। কিন্তু আমি একটা কথাই বুঝতে পারছি না, যে আপনার থেকে যদি সত্যিই চাঁদনী 25 বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ভয় থাকে। জীবন সংশয় থাকে। তাহলে আপনি এখন ওর সামনে বসে আছেন কিভাবে? এখন কেন আপনার রক্ত চুষে নিতে ইচ্ছা করছে না? আকর্ষিত ই বা কেন হচ্ছেন না ওর রক্তে?

— কারন আমার ভ্যাম্পায়ার পিপাসু মনের কাছে ভালোবাসাটা হয়তো জিতে গেছে। আমিও ভেবেছিলাম ওর সামনে আসলে হয়তো আমি ওর রক্ত চুষে ওকে মেরে ফেলবো। কিন্তু না, আমার ভালবাসাটা ওর প্রতি এতটাই তীব্র যে, ওর কাছাকাছি বসে থেকেও ওকে মেরে ফেলার জন্য রক্তের দিকে আকর্ষিত হচ্ছি না আমি। বরং ভালবাসাটা যেনো আরো বেড়ে যাচ্ছে ওর প্রতি।

কথাগুলো বলেই চাঁদনীর দিকে আবেগি দৃষ্টিতে তাকাল শ্রাবণ। চাঁদনী ওর চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। কেন জানি না ভীষণ লজ্জা লাগছে তার। সে মাথা নিচু করে লজ্জামাখা মুখ করে বসে রইলো। মিতু ওদের অবস্থা বুঝতে পেরে সেখান থেকে মুচকি হাসি দিয়ে আরেক রুমে চলে গেল। শ্রাবন এক মুহূর্ত দেরি না করে ওকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আবেগি গলায় বলে উঠল,

— খুব ভালোবাসি চাঁদ পাখি। যতটা ভালবাসলে নিজের ভ্যাম্পায়ার মন কে কন্ট্রোল করে রক্তের পিপাসা থেকেও নিজেকে আড়াল করে রাখা যায়। ঠিক ততটুকু ভালোবাসি আমি তোমায়। যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

চাঁদনী ওর কথার কোন উত্তর দিল না। পরম আবেশে মাথাটা ওর বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রাখলো।
#ভ্যাম্পায়ার_বর (সিজন ২)
#পার্ট_৩২
#M_Sonali

শ্রাবণের বুকে মাথা রেখে ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে চাঁদনী। এমন শান্তির ঘুম হয় তো এর আগে কখনো ঘুমায় নি সে। কিন্তু শ্রাবণের চোখে কোন ঘুম নেই। কারণ সে যে একজন ভ্যাম্পায়ার। আর ভ্যাম্পায়ারেরা তো কখনো ঘুমায় না। সে এক নজরে তাকিয়ে আছে তার চাঁদ পাখির দিকে। আর এক হাত দিয়ে আলতো করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। একটু পরপর কপালে নিজের ভালবাসার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। মনের মাঝে হাজারো চিন্তা কাজ করছে এখন তার। কিভাবে চাঁদনীকে এই কয়েকদিন প্রটেক্ট করবে। এসব কথা ভেবেই যেন বারবার বুকটা কেঁপে উঠছে। কারণ শ্রাবণ খুব ভালভাবেই জানে চাঁদনীর ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার এই বাকি দুদিন অনেক ঝড় পোহাতে হবে ওদের। কারণ ওই খারাপ ভ্যাম্পায়ারে রা যে করেই হোক ওকে মেরে ফেলার চেষ্টা করবে। কারণ ওর যদি 25 বছর পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে খারাপ ভ্যাম্পায়ারেরা আর কখনও নিজেদের উদ্দেশ্য সফল হতে পারবে না। রাজত্ব করতে পাড়বে ভ্যাম্পায়ার রাজ্যের ওপর। কারণ তখন চাঁদনীর হাতে তাঁদেরকেই মরতে হবে।

তবে এতো কিছুর মাঝেও নিজেকে চাঁদনীর রক্তের পিপাসা থেকে মুক্ত করে ওর কাছে আসতে পারার আনন্দটা কেও ভীষণ ভাবে উপভোগ করছে শ্রাবণ। সব চিন্তা ভুলে যেন চাঁদনীকে কাছে পাবার এ ভালো লাগার সময়টা ভীষণভাবে আনন্দিত করছে তাকে। কিন্তু এখনো সময় আসে নি দুজনে এক হওয়ার। স্বামী-স্ত্রীর মতো নিজেদের জীবন শুরু করার। কারণ চাঁদনীর 25 বছর হওয়ার আগে ওদের মাঝে এমন কিছু ঘটলে সে তার শক্তি হারিয়ে ফেলবে। তখন আর ওই খারাপ ভ্যাম্পায়ারদের হাত থেকে চাঁদনীকে বাঁচানো কোনভাবে সম্ভব হবেনা তার। আর তাছাড়া এখন শ্রাবণী ও কোন ভাবে ওদের কাছে থেকে সাহায্য করতে পারবে না। কারণ শ্রাবণী যদি একটিবার চাঁদনীর আশেপাশে কোথাও আসে। ওর গায়ের গন্ধ শ্রাবনীর নাকে গিয়ে পৌঁছায়, তাহলে ওই খারাপ ভ্যাম্পায়ারদের আগে শ্রাবণী নিজেই হয়তো চাঁদনী কে মেরে ফেলার চেষ্টা করবে। কারণ তখন সে নিজের কন্ট্রোলে থাকবে না।

তাই এসব কথা ভেবে ভেবে অনেক বেশি চিন্তা হচ্ছে শ্রাবণের। এদিকে ও যখন চাঁদনীর কাছে এসে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পেরেছে। তখন মিতুকে তার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। কারণ শ্রাবণ চায় না ওদের জন্যে মাঝখান থেকে একটি মেয়ে নিজের জীবন হারাক। সামনে যে অনেক বড় বিপদ অপেক্ষা করে আছে সেটা শ্রাবণের না জানা নয়। তাই মিতুকে কোন বিপদে ফেলতে চাইছে না সে। তাই ওকে নিজের বাসায় পৌঁছে দিয়ে এসেছে।

এসব কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ চাঁদনীর ডাকে ধ্যান ভাঙ্গলো ওর। চাঁদনীর দিকে তাকাতেই ও ছোট্ট করে গালে একটি চুমু এঁকে দিয়ে বলল,

— এই যে মিস্টার ভ্যাম্পায়ার, কি এত ভাবছেন আপনি? আর ঘুমাচ্ছেন না কেন হ্যাঁ? রাত তো অনেক হয়েছে। নাকি আমাকে শুধু ঘুম পাড়াবেন নিজে ঘুমাবেন না?

ওর কথা শুনে মুচকি হাসি দিলো শ্রাবণ। তারপর ওর গালটা আলতো করে টেনে দিয়ে বললো,

— তুমি কি এখনো বুঝতে পারোনি চাঁদপাখি, যে আমি কখনো ঘুমাই না। কোনো ভ্যাম্পায়ারই কখনো ঘুমায় না। তাদের চোখে ঘুম নেই।

ওর কথায় চোখ বড় বড় করে তাকায় চাঁদনী। তারপর লাফিয়ে উঠে বসে বিস্ফোরিত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে ওঠে,

— তার মানে আপনারা কখনোই ঘুমান না? সব সময় এইভাবে জেগে থাকেন?

ওর প্রশ্নের উত্তরে আবারো একটা মুচকি হাসি দেয় শ্রাবণ। তারপর ও নিজেও উঠে বসে চাঁদনীর দু গাল ধরে হালকা টেনে বলে,

— জ্বী ম্যাডাম, আমরা কখনোই ঘুমাই না। সবসময়’ই জেগে থাকি।

— ওয়াও অনেক ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো। আচ্ছা আপনারা আর কি কি করেন না! আর কি কি করেন যেটা মানুষের সাথে মেলেনা। বলুন না প্লিজ, আমি তো আসলে জানিনা যে ভ্যাম্পায়াররা আসলে কেমন হয়। কিন্তু যখন একটা ভ্যাম্পায়ারের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে তখন সবকিছু জানতে ইচ্ছে করছে। বলুন প্লিজ আমি সব জানতে চাই আপনাদের ব্যাপারে।

ওর কথার উত্তরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো শ্রাবণ। তারপর ছোট করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে রহস্যময় হাসি দিলো। অতঃপর চাঁদনীকে হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে বুকের সাথে মিলিয়ে নিয়ে শক্ত করে জরিয়ে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

— এখন এতটা জানার আগ্রহ কেন আসছে চাঁদপাখি? এতদিন তো আমাকে দেখে ভয়ে পালাতে। এখন বুঝি ভয় করছে না?

শ্রাবণের এমন কান্ডে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো চাঁদনী। ও যে এভাবে জড়িয়ে ধরবে সেটা ভাবতেই পারেনি সে। যদিও সে শ্রাবণ কে অসম্ভব ভালোবাসে। কিন্তু তবুও এমন একটা পরিস্থিতিতে ভীষণ লজ্জা করছে তার। এভাবে লজ্জা পেতে দেখে শ্রাবণ খুব দ্রুত নিজের থেকে সরিয়ে দিল ওকে। তারপর ওর কাছ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অন্যদিকে ঘুরে গিয়ে বলল,

— আমি একটু বাইরে থেকে আসছি চাঁদনী। তুমি নিজের দিকে খেয়াল রেখো। আর খবরদার ভুল করেও কোনো দরজা-জানালা খুলবে না। যতক্ষণ না আমি আসছি।

কথাটা বলে চোখের পলকে কোথাও যেন হাওয়া হয়ে গেল। শ্রাবন এর এমন কান্ডে কোন কিছুই বুঝতে পারলো না চাঁদনী। বেক্কলের মত শুধু ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ কি হলো কিছুই যেন মাথায় ঢুকছে তার।

সারাটা রাত নির্ঘুম কেটে গেল চাঁদনীর। কারন সকাল আট টা বাজতে চললো কিন্তু শ্রাবণ এখনো ফিরে আসেনি। এখনো ওর কোনো সারাশব্দ নেই। এদিকে ওর কথামত রুম থেকে বের হচ্ছেনা চাঁদনী। কেন জানি না বারবার মনে হচ্ছে ওর কোনো বিপদ হয়েছে। কি করবে কোন কিছুই বুঝতে পারছে না। ফোন টাও নেই যে তাকে ফোন করে ডেকে নিয়ে আসবে। তাই বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো ফ্রেশ হতে। তখনই ওয়াশরুমের আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজের গলার লকেটের দিকে চোখ পড়ল ওর। আর তখনই খেয়াল করলো লকেট টা হালকা ভাবে জ্বলছে এবং নিভে যাচ্ছে। ও বুঝতে পারল না এমন হওয়ার কারণ কি। কিন্তু বারবার মনটা কু ডাকতে শুরু করলো ওর।

দ্রুত ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে চলে আসলো। বুকের মাঝে ভীষন ছটফট করছে তার। বারবার শ্রাবণকে চোখের সামনে দেখতে ইচ্ছে করছে। তখনই ওর মনে পড়ে গেল লকেটের মাদ্ধমে শ্রাবণকে ডাকার কথা। সাথে সাথে লকেটটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে চোখ বন্ধ করে একমনে শ্রাবনকে স্মরণ করতে লাগল। আর পাগলের মত ডাকতে লাগল। এভাবে বেশ অনেকটা সময় কেটে গেল। কিন্তু না শ্রাবণ এখনো রুমে আসলো না। বা ওর কোনো সাড়াশব্দও মিলল না কোথাও। এবার যেন ভয় আরও দ্বিগুণ ভাবে বেড়ে গেল চাঁদনীর মনে। কি করবে কোন কিছুই বুঝতে পারছেনা সে। এক মন বলছে দরজা খুলে বাইরে বের হতে। তো আরেক মন বলছে শ্রাবণ নিষেধ করে গেছে। বাইরে বের হওয়া যাবে না। এখন কি করবে কোন কিছুই মাথায় আসছে না তার। হঠাৎ রুমের দরজার ওপর বিকট শব্দে বারি পরায় কেঁপে উঠলো চাঁদনী। দরজায় এমন ভাবে শব্দ হতে লাগলো যেনো এখনি ভেঙে যাবে। ভয়ে যেনো চাঁদনীর কলিজা শুকিয়ে গেলো। সেই সাথে দরজার শব্দটাও আরো বেশি বাড়তে লাগলো।

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

গল্পটা আর হয়ত তিন থেকে চার পর্ব পর্যন্ত হবে। এখন ধীরে ধীরে সব রহস্যের জাল খুলে যাবে। আজকে হয়তো অনেকটাই রহস্য খুলেছে। ধন্যবাদ সবাইকে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here