ভয়ংকর ভালোবাসা পর্ব ১

#ভয়ংকর_ভালবাসা।
#শতাব্দী_নাওয়ার।
#প্রথম_পর্ব।

কলেজে ভরা মাঠে সবার সামনে হুট করে এসেই আভাস যখন আমার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেয়,আমি ওর দিকে তাকিয়েই কাঁপতে শুরু করি।মুসলিম ঘরের মেয়ে আমি।অথচ সিঁদুর দিয়ে আমার মাথা ভর্তি।সিঁদুর নাকে পড়ে আমার নাকটা লাল হয়ে গেছে।
সিঁদুর পড়ে আমার সাদা কলেজ ড্রেস জায়গায় জায়গায় লাল হয়ে গেছে।

আমি মুসলিম পরিবারের সাধারণ একটি মেয়ে।প্রেম ভালবাসা থেকে সব সময় দূরত্ব বজায় রেখে চলি।আমার বাবা প্রেম ভালবাসা একদমই পছন্দ করেন না।
আম্মু আমাকে আগেই বলে রেখেছে আমি যেন কোন দিন কোন প্রেমে ট্রেমে না পড়ি।আব্বু কোন দিনই এসব প্রেম ভালবাসা মানবেনা।

ছোট বেলা থেকেই এই জন্য প্রেম বিরোধি আমি।যেখানে ভালবেসে কাউকে পাওয়াই যাবেনা সেখানে ভালবেসেই বা কি লাভ।
কষ্ট ছাড়া তো আর কিছুই পাবোনা।তাই ছোট বেলা থেকে এই পণ নিয়ে বড় হয়েছি যে,কোন দিন কাউকে ভালবাসবোনা।
আম্মু আব্বুর পছন্দে বিয়ে করবো।

কিন্তু আভাস সেই ৬ষ্ঠ শ্রণীতে পড়ি যখন তখন থেকে আমার পিছু নিয়েছে।
আভাস তখন ১০ম শ্রেণীর ছাত্র।আমি স্কুলে যেতাম ও আমার পেছন পেছন যেতো।আমি প্রাইভেট পড়তে যেতাম,আমার পেছন পেছন যেতো।ভয়ে হাত পা কাঁপতো আমার।

এভাবে এক বছর চলে গেলো।
হঠাৎ দেখি আভাসকে আর রাস্তা ঘাটে দেখা যায়না।মনে মনে ভাবি বাঁচলাম এবার।

এভাবে কেটে গেলো কত গুলো বছর।আভাসের আর দেখা নেই।আমিও ভুলে গেছি।পড়াশোনা করছি।
এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়ে যেই না কলেজে ভর্তি হলাম।
একদিন দেখি আভাস কলেজের সামনে এসে হাজির।
দেখেই মনে পড়ে গেলো এটা তো ওই ছেলে।চেহারা আগের মতই আছে,শুধু হাতে পায়ে অনেকটা বড় হয়ে গেছে।

সামনে এসেই জিজ্ঞেস করলো,কেমন আছো আরফা?
কাঁপা কাঁপা কন্ঠে উত্তর দিলাম জ্বী ভালো আছি।

আভাস:খুব সুন্দর হয়ে গেছো।অনেক বড় হয়ে গেছো।সেই ছোট্ট মেয়েটা এ কয় বছরে কত্ত বড় হয়ে গেছে ভাবতেই অবাক লাগছে।

আমি:আমার ক্লাস আছে,আমি এখন যাবো।
আভাস:একটু দাঁড়াও।জিজ্ঞেস করলেনা আমি কেমন আছি,এত দিন আমি কোথায় ছিলাম?আমাকে দেখতে কেমন লাগছে।

আমি চুপ করে আছি।

আভাস:ঠিকাছে আমিই বলছি,আম্মু আব্বু হঠাৎ ই আমাকে ঢাকার এক কলেজে ভর্তি করে দিলেন।আর তারাও চলে আসলেন ঢাকাতে।তাই আমরা ওখানে চলে গেছি।তোমাকে বলার জন্য খুঁজেছিলাম কিন্তু পাইনি।তাই না জানিয়েই চলে যেতে হয়েছে।

আমি:আচ্ছা।
আভাস:আমি এখন অনার্সে পড়ছি।বাবা মা সহ সবাই গ্রামে চলে এসেছি একবারে।ঢাকায় গিয়ে শুধু এক্সাম দিবো।
আমি:আচ্ছা।
আভাস:তুমি কি আচ্ছা আচ্ছা ছাড়া কিছু বলতে পারোনা?
আমি:আমার ক্লাস আছে প্লিজ আমাকে যেতে দিন।
আভাস:আচ্ছা যাও।কয়টা পর্যন্ত ক্লাস করবে?আমি অপেক্ষা করবো।

আমি জানিনা বলে চলে আসলাম।
আভাস দেখতে খুবই সুন্দর একটা ছেলে।যে কেউ ই ওকে দেখলে প্রেমে পড়ে যাবে।
আমার বান্ধবী স্নেহা দেখেছে আভাসের সাথে আমাকে কথা বলতে।
ও তো আমাকে দৌড়ে এসে বল্লো,দোস্ত!ছেলেটা কে রে?একদম নায়ক।
আমি জানিনা বলে চুপ করে ক্লাস করা শুরু করলাম।

ক্লাস শেষে আমি যখন বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।ঠিক তখনি আভাস এসে কোথায় থেকে যেন হাজির হলো।

আভাস:উফ!এই বুঝি তোমার আসার সময় হলো?কত ক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি জানো তুমি?
আমি:দেখুন আপনি আমার পেছন পেছন আসবেন না প্লিজ।কেউ দেখলে মন্দ বলবে।
আভাস:কেউ কিছু বলবেনা।তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
আমি:দেখুন আপনি চলে যান।
আভাস:না আমার কথা আছে তোমার সাথে।
আমি:আচ্ছা কাল শুনবো।আজ প্লিজ চলে যান।
আভাস:আচ্ছা কাল সকালে আমি আবার অপেক্ষা করবো।

আমি কোন কিছু না বলেই বাসায় চলে আসি।
এর পর ১০ দিনের মত কলেজে যাইনি।
১১ দিনের দিন কলেজে গিয়ে দেখি আভাস গেইটের সামনে দাঁড়ানো।
আমি দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিলাম আর তখনি আভাস আমার হাত ধরে টান দিয়ে দূরে নিয়ে যায়।

আমি:হাত ছাড়ুন প্লিজ।লোকে দেখলে খারাপ বলবে।
আভাস:এই কয়দিন কয় ছিলে তুমি?আমি প্রতিটা দিন অপেক্ষা করেছি সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত এই জায়গায়।
আমাকে কি মানুষ মনে হয়না?হ্যাঁ? (রাগি স্বরে)

আমি:আমি অসুস্থ ছিলাম। (যদিও মিথ্যে)

আভাস:উদ্বিগ্ন হয়ে,কি হয়েছে তোমার?এখন ঠিক আছো?সুস্থ হয়েছো?সরি সরি।আমি বুঝিনি আসলে।এই যে কানে ধরলাম মাফ করে দাও।

আমি:আপনি কোন ভুল করেন নি।মাফ চাইতে হবেনা।আপনি শুধু আমাকে যেতে দিন।আর প্লিজ এভাবে আমাকে আর রাস্তা ঘাটে ডাকবেন না।প্লিজ।

আভাস:আমি বলেছিনা কথা আছে তোমার সাথে।
আমি:জ্বী বলুন।
আভাস:না,এখন না।তুমি ক্লাসে যাও।ক্লাস শেষে বলবো।

আমি দ্রুত ক্লাসে চলে যাই।
ক্লাস শেষ করে যেই না বের হয়েছি তাড়াতাড়ি করে রিক্সা নিয়ে বাসায় চলে আসি।
মনে মনে ভাবলাম যাক বেঁচে গেছি।
কিন্তু রিক্সা থেকে বাসার গেইটের সামনে নেমেই দেখি আমার রিক্সার পেছনেই সে আরেক রিক্সায় বসা।আর শুধু এইটুকুই বল্লো,

বাসাটা চিনে গেলাম।ভালোই হলো।

আমি মনে মনে ভাবলাম ধুর!বিপদ আরো ডেকে আনলাম।

বাসায় কাউকেই কিছু বলিনা,কারণ গ্রাম অঞ্চলে মেয়েদের ছেলেরা বিরক্ত করলেই বিয়ে দিয়ে দেয়।
কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে আমি পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবো।
বাসায় বললে আমার পড়াশোনা যদি বন্ধ করে দেয়,তাই কিছু বলিনা বাসায়।

এরপর আম্মুকে বললাম,আম্মু আমি এখন থেকে ক্লাস করবোনা।আর কলেজে বেশি ক্লাস না করলেও হয়।শুধু এক্সাম দিবো।
আম্মু রাজি হলো।বল্লো বাসায় ভালো করে পড়বি তাহলে।

এরপর থেকে আর কলেজে যাইনা।কিন্তু আভাস বাসার সামনে এসে ঘুরঘুর করে।
একদিন পাশের বাসার একটা পিচ্চি এসে আমার হাতে একটা কাগজ দিয়ে বল্লো এটা একটা ভাইয়া দিয়েছে।

কাগজ টা খুলে দেখি,

আরফা,
আমার না বলা কথা গুলো হলো,
আমি তোমাকে ভালবাসি।
আর সেটা সেই ছোট বেলা থেকেই।আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
আগামীকাল কলেজ মাঠে প্রোগ্রাম আছে।কয়েকটা কলেজের ছাত্র ছাত্রী সেখানে এটেন্ড করবে।নাচ গানও হবে।তুমি যদি না আসো তবে আমি তোমার বাসায় এসে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবো।
সিদ্ধান্ত এখন তোমার।
ভেবে দেখো তুমি কি করবে।

ইতি
তোমার আভাস।

চিঠি পড়ে যেন আমি অজ্ঞান হবো হবো অবস্থা।
স্নেহা আমার বান্ধবী,ওকে ফোন করে সব কিছু জানালাম।ও বল্লো তুই প্রোগ্রামে আয়।এত মানুষ এর সামনে ও কিছুই করবেনা।আর যদি না আসিস,তবে যদি ও বাসায় চলে যায় তাহলে তোর পড়া লেখা তো বন্ধ হবেই।আন্টি মারতেও পারে।

আমি এমনিতেই একটু ভীতু।
স্নেহার কথায় প্রোগ্রামে আসলাম।
সবাই যখন প্রোগ্রাম দেখায় বিজি।
তখনি হুট করে কোথায় থেকে এসে আভাস আমার সীঁথিতে সিঁদুর পড়িয়ে দেয়।

আর আমি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শুধু জিজ্ঞেস করি,
-কেন করলেন এমনটা আমার সাথে?

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here