মনমোহিণী পর্ব -শেষ

#মনমোহিণী
#Last_Part
#Writer_NOVA

এরপরের ঘটনাগুলো চোখের পলকে ঘটে গেলো। বিয়েটা এক বিকেলে তাড়াহুড়ো করে অনাড়ম্বরে হয়ে গেলো। ঘুমিয়ে গেছিলাম। হুট করে দরজায় কেউ করা নাড়লো। আরামের ঘুম ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে হলো না। আম্মু-আব্বুর থেকে কেউ উঠবে ভেবে দুই বোন ঘাপটি মেরে শুয়ে রইলাম৷ করাঘাত বেড়ে চলছে। আব্বু উঠে দরজা খুললো। অপরপাশ থেকে কারো তেমন টুঁ শব্দ এলো। চোখ বুজে এলো। হঠাৎ আম্মু আমায় ধাক্কা দিয়ে বলছে,

‘নোভা একটু আয় তো!’

আম্মুর গলা কিছুটা শঙ্কিত জড়ানো ছিলো। আমি ভয় পেয়ে হুরমুর করে উঠলাম। কোন অঘটন ঘটলো না তো। এলোমেলো পা ফেলে পাশের রুমে যেতেই আরেকবার শর্কড। সোফায় এনাজ ও তার বাবা বসে আছেন। আমি অবাক চিত্তে সবার দিকে নজর দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

‘কি হয়েছে?’

ঘটনার আকস্মিকতায় তাদেরকে সালাম দিতেও বেমালুম ভুলে গেছি। গত পরশু আমাদের পরিবার এনাজদের বাসা থেকে ঘুরে এলো। দিন-তারিখের পাকা কথা দিয়ে এসেছে। এর মধ্যে এতো রাতে হবু বর-শ্বশুরকে দেখে আমার কি রিয়েকশন দেওয়ার দরকার তাই বোধগম্য হচ্ছে না। এনাজ সোফায় বসে আছে। চোখ দুটোতে কিছু হারিয়ে ফেলার দুঃখে কাতর। আমি তো এখানে তাহলে হারালোটা কাকে? লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে দুই হাতে আমার এক হাত জড়িয়ে বসে রইলো।

‘মা, তুমি একটু বুঝাও। গতকালও ভালো ছিলো। সকাল থেকে পাগলামি করছে। কোথা থেকে কি শুনেছে কে জানে! সন্ধ্যা বেলা এখানে আসার জন্য বায়না ধরেছে। আজকে রাতেই তোমাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে।’

আমি কি হাসবো নাকি কাঁদবো? উনি তো দিব্যি বাস্তব জ্ঞান অভিজ্ঞ ছেলে। তাহলে এমন ছেলেমানুষীর মানে কি? আম্মু দাঁড়িয়ে না থেকে আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে গেলো। বাবা বিস্মিত নয়নে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। হবু শ্বশুর মশাই বললেন,

‘কাজী নিয়ে আসতে চেয়েছিলো। অনেক কষ্টে আটকিয়েছি। এখন এর মধ্যে তোমাকে বিয়ে করবে।ওর অনুষ্ঠানের দরকার নেই। এতো করে জিজ্ঞেস করলাম কারণ কি আমাকে বল। কিছু বলছে না।’

এনাজ করুণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার হাতটাকে এমনভাবে ধরেছে যে ছেড়ে দিলে চড়ুই পাখির মতো করে ফুড়ুৎ করে উড়াল দিবো। উনাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম,

‘আপনি চিন্তা করেন না। আমি দেখছি বিষয়টা।’

হাঁটু মুড়ে সামনে বসে মোলায়েম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,

‘কি হয়েছে বলেন তো?’

উনি শ্বাস ছেড়ে বললো,
‘তোমাদের বাসার থেকে মানুষ যাওয়ার পর আমার কাছে একটা কল আসে। একটা ছেলে আমাকে কল দিয়ে হুমকি-ধামকি দেয়। তোমাকে বিয়ে করলে আমায় মেরে ফেলবে। তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না। প্রথমে বিষয়টা আমলে নেইনি।তো গতকাল বিকেলে ভিন্ন নাম্বার থেকে কল আসে। এবার ওরা বলে তোমাকে গায়েব করে দিবে। তুমি কিছুতেই আমার হবে না। আমি তোমাকে হারাতে পারবো না। তাই যতদ্রুত বিয়েটা করে ফেলতে চাই।’

খুশি হবে এই কারণে যে কেউ আমাকে হারাতে চায় না বলে পাগলামি করে রাত এগারোটা বাজে হাজির হয়েছে। নাকি দুঃখ পাবো আমার বিয়ে হয়ে যাবে বলে। সে রাতে একটা অব্দি এনাজকে বুঝিয়ে কাজ হলো না। ও আমাকে বিয়ে করে সাথে নিয়ে এখান থেকে যাবে। কি আর করার! তার পাগলামি সামলাতে পরদিন বিকালে খুরমা দিয়ে আমাদের বিয়ে হয়ে গেলো। আমি মনে মনে কল করা সেই আগন্তুককে বেশ ঝারলাম। বিনা ডিটারজেন্ট ধুলাম। একদিনে সে যতটুকু পেরেছে আমার বিয়ের জিনিসপত্র কিনে ফেলেছিলো। সেগুলো দিয়ে পরিপূর্ণ সাজিয়ে নিয়ে গেলো। বিদায়ের সময়টুকুতে আমার চোখ দিয়ে পানি পরেনি। কারণ আমার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিলো না যে আজ আমি পরের বাড়ি চলে যাবো। তবে যখন গাড়িতে উঠানো হলো তখন চোখের পানি পরছিলো অনরবত।

বাসরঘরে দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে চুমু খেলো।আমার চিবুক উঠিয়ে নাকের সাথে নাক হালকা ঘঁষে সে আবদারের সুরে বললো,

‘সারাজীবন আমার থেকো মনমোহিনী।’

এত সহজ সরল চাওয়া। তবু এর মধ্যে ছিলো অনেক কঠিন কিছু। আমি উত্তরে কিছু বলতে পারলাম না। লজ্জায় মাথা নিচু করে রেখেছিলাম। সে কোলে মাথা রেখে লম্বা করে শুয়ে পরলো। আচমকা এমন হওয়ায় আমি আড়ষ্ট হওয়ার সুযোগ পেলাম না।

‘মাস খানিক পরিচয়ে তুমি আমার বউ। সবকিছু কেমন অবিশ্বাস্য লাগছে। ভালোবাসি বউ।’

বিয়ের একদিন পর আমি এই তাড়াহুড়ো করে বিয়ের রহস্য জানতে পারলাম। এতে আমি ভয়ংকর রাগলাম উনার ওপর। ইমরান ভাইয়ার সাথে আমার স্বামী মহোদয় একটা বাজি ধরেছিলো। আমাকে যদি দুই দিনের ভেতরে বিয়ে করতে পারে তাহলে আমাদের হানিমুনের খরচ ইমরান ভাইয়া দিবে।আর যদি এনাজ বাজিতে জিততে না পারে তাহলে ইমরান ভাইয়ার বিয়ের খরচ এনাজ দিবে। তাই এতো তাড়াহুড়ো করে বিয়েটা হয়ে গেলো। অবশ্য এটা সত্যি ছিলো যে কেউ কল করে এনাজকে হুমকি ধামকি ঠিকই দিয়েছে। সেই মানুষটা কে হতে পারে আমি খুঁজে বের করতে পারিনি। এই ঘটনা জানার পর ভয়াবহ রাগ করলাম আমি। হানিমুনে তো গেলাম না। পরদিন বাসায় চলে এলাম। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, দেবর আমাকে সমর্থন করলো।উনারা সাফ সাফ বলে দিলো ওকে ইচ্ছে মতো শাস্তি দিবে। ওর শিক্ষা না হওয়া অব্দি ওকে ক্ষমা করবে না।

এরপর দেখতে দেখতে কেটে গেলো এক মাস। সপ্তাহ খানিক ভয়ংকর রেগে থাকার পর কেনো জানি মানুষটার ওপর থেকে সব রাগ সরে গেলো। তবু এতো সহজে তো ছেড়ে দেওয়া যায় না। কি করা যায় বলুন তো?

লেখা শেষ করে খাতাটা বন্ধ করলাম। চারিদিকে শুনশান নীরবতা বিরাজ করছে। শ্বশুর বাড়ি ফিরে এসেছি একুশ দিন হলো। এতক্ষণ আপনারা যা পড়লেন সব আমি একটু একটু করে খাতায় লিখেছি।
স্লথ গতিতে কেউ আমার দিকে এগিয়ে আসছে। কে আবার হবে বলুন তো? আমার উনি! মগ ভর্তি কফি এনে টেবিলের ওপর রেখে চুপচাপ পাশে দাঁড়ালো। এক পলক তার দিকে তাকিয়ে কফির মগ হাতে নিলাম।এই মানুষটাকে যতবার ভাবি ভালোবাসবো না ঠিক ততবারই নতুন করে ভালোবেসে ফেলি।

‘রাত তো অনেক হলো। ঘুমাবে না?’

‘তুমি ঘুমাচ্ছো না কেনো?’

‘তোমাকে জড়িয়ে ধরে কোলবালিশ না বানালে আমার ঘুম আসে না।’

ফিক করে হাসি আসতে নিলে আটকে ফেললাম। হাসা যাবে না। গম্ভীর মুখে একবার তাকিয়ে কফির মগে চুমুক দিলাম।

‘রাত জেগে এতো কি লিখো তুমি?’

‘তোমার না জানলেও চলবে।’

‘আমি কিন্তু সবটা তোমাকে না জানিয়ে পড়ে নিয়েছি।’

‘ভালো করেছো।’

‘আমায় কি ক্ষমা করা যায় না?’

‘তুমি কি করেছো তা কি ভুলে গেছো এনাজ?’

‘হোক বাজি ধরে কিন্তু তোমার সাথে বিয়েটা তো হয়েছে। তাছাড়া সত্যি বলছি তোমায় ছাড়া আমার দিন কাটছিলো না। ভীষণ খারাপ যেতো দিনগুলো। তাই আমি বাজিতে রাজী হয়েছি। তোমায় দ্রুত নিজের করে নেওয়া হলো। আর হানিমুনের খরচটা বেঁচে যেতো।’

‘তা দ্বিতীয় লাভটা কি হলো?’

‘কি করে হবে? তুমি যাওয়ার জন্য রাজী হচ্ছো না।গেলে তো দুজন থেকে তিনজন হতাম আমরা।’

‘মুখে লাগাম দাও।’

‘কেনো দিবো? আমার বউকে আমি যা খুশি বলবো। অন্যেরা শুনবে কেন?’

‘ঘুমিয়ে পরো। সকালে তোমার অফিস আছে।’

‘এবারের মতো মাফ করে দাও না! সত্যি বলছি আর হবে না।’

‘কেনো আরেকটা বিয়ে করার চিন্তা করছো নাকি তুমি?’

‘তোওবা তোওবা বউ কি বলো? একটার রাগ ভাঙাতে পারি না। আরেকটা হলে তো আমায় পাগলাগারদে যেতে হবে।’

একটু থেমে চোখ মুখে অপরাধবোধ ফুটিয়ে তুলে আমার পায়ের কাছে হাঁটু ভেঙে বসলো। দুই বাহু তার শক্ত হাতে ধরে নিচু গলায় বললো,

‘প্লিজ মাফ করে দাও। আমি আমার ভুলের জন্য অনুতপ্ত। আমার এমনটা করা ঠিক হয়নি। আমি শিকার করছি আমার দ্বারা বিশাল ভুল হয়েছে। এর জন্য তুমি যেই শাস্তি দিবে তাই মাথা পেতে নিবো।’

মাথা নুইয়ে ফেললো। তার টলমল চোখ দুটো আমার দৃষ্টি থেকে এড়ালো না। অনেক হয়েছে এবার থাক। মাফ করেই দেই। যা হওয়ার হয়েছে। পিছনের অতীত টেনে ধরে সামনে আগানোর দরকার নেই। এতে বর্তমান ও ভবিষ্যত দুটোই নষ্ট হয়ে যায়।সে যখন তার ভুলে অনুতপ্ত আমারো উচিত সব ভুলে স্বাভাবিক হওয়া। নিজের গালে ঠেস দিয়ে হাত রেখে বললাম,

‘যেই শাস্তি দিবো তাই মেনে নিবে?’

‘হুম।’

‘তাহলে তো কঠিন শাস্তি দিতে হয়।’

‘যে শাস্তি দেওয়ার দাও। তবে তোমায় ছেড়ে দূরে যেতে বলো না। আমি থাকতে পারবো না।’

‘এই শাস্তির কথা তুমি চিন্তাও করো না। তোমাকে আমায় ছেড়ে দূরে কোথাও যেতেও দিবো না।’

সে চমকে আমার দিকে তাকালো। আমি চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করতেই সে উঠে আমায় জাপ্টে ধরলো।এরপর শূন্যে উঠিয়ে চারিদিকে গোল গোল করে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,

‘ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।অনেক ভালোবাসি তোমায়!’

‘আমিও! এবার নামান নয়তো পরে যাবো।’

একটু আগের বিষন্নতা তার চোখ মুখে নেই। বরং সেখানে ভিড় করেছে হাসি-আনন্দের ছটা। আমি সিরিয়াস মুখ করে বললাম,

‘শাস্তি কিন্তু বাকি আছে।’

‘মাথা নামিয়ে কুর্নিশ করার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,
‘আজ্ঞা করুন মহারাণী। আপনার শাস্তি এই মহারাজ মাথা পেতে গ্রহণ করবে।’

কিছু সময় ভাবার ভান করলাম। যা দেখে সে কিছুটা ঘাবড়ে গেলো। যদিও উপরে এমন ভাব ধরেছে সে ঘাবড়াচ্ছে না। আমি আমাদের পুরো গল্পটা যে খাতায় লিখেছিলাম তা হাতে ধরে বললাম,

‘আপনার শাস্তি হলো আমাদের এই গল্পটার একটা নাম খুঁজে দিবেন।’

উনি বুকে হাত দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,
‘আল্লাহ, বাঁচালে! আমি তো ভয় পাচ্ছিলাম কি শাস্তি দাও তুমি।’

আমি খিলখিল করে হেসে উঠলাম। সে মুগ্ধ হয়ে তা দেখলো। এরপরে এক হাতে তার কাছে টেনে নিয়ে বললো,

‘আমাদের গল্পের নাম হবে “মনমোহিণী”। যে মনমোহিণী শুধুই এনাজের। আর কারো নয়।’

[বাচ্চা মেয়েটাকে কেউ বকা দিয়েন না। প্রচুর মানসিক চাপে আছি। এর মধ্যে গল্পটা চালানো সম্ভব হচ্ছিলো না।তাই শেষ করে দিলাম।আমার গল্পের জগৎ থেকে হারিয়ে যাওয়ার সময় এসে গেছে।নতুন বছর ফিরে নাও আসতে পারি।এটাই নোভানাজের শেষ গল্প।এরপর ওদের নিয়ে আর কোন গল্প আসবে না। তাই গল্প সম্পর্কিত দুই লাইন ভালো-মন্দ মন্তব্য আশা করছি। দয়া করে আজকে নাইস, স্টিকার কমেন্ট থেকে দূরে থাকবেন।

নতুন বছরের অগ্রীম শুভেচ্ছা❤️।]

#সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here