মন তুমি ছুঁয়ে দেখো না পর্ব -৮+৯

#মন_তুমি_ছুঁয়ে_দেখো_না
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
#পর্বঃ০৮
অথৈর ভীষণ মন খারাপ।কারন গতকাল ইহান বাড়িতে আসেনি।আর সেটা যে ওর সাথে রাগ করেই আসেনি।তা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে অথৈ।অথৈকে মন খারাপ করতে দেখে পিহু বলে উঠল,
‘ এভাবে মুখটা হুতুম পেঁচার মতো করে না থেকে।গিয়ে রুদ্রিক ভাইয়া আর ইহান ভাইয়ার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেহ।তাহলে দেখবি সব ঠিক হয়ে গিয়েছে।’

অথৈ গোমড়ামুখে বলে,
‘ কিভাবে যাবো তাদের সামনে?কোন মুখে যাবো?আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে।অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি আমি।’

রিধি অথৈর কাঁধে হাত রেখে চোখের ইশারায় আশস্ত করে বলে,
‘ কিছু হবে না।আমরা আছি তো।’

আহিদ আর প্রিয়ানও সায় জানালো।অথৈ শ্বাস ফেলল।এখন উপায় একটাই।রুদ্রিকের কাছে ক্ষমা চাওয়া।রুদ্রিক ওকে মাফ করে দিলে ইহানও আর ওর সাথে রেগে থাকবে নাহ।মনে মনে সবটা ঠিক করে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো অথৈ।তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের দিক তাকিয়ে বলে,
‘ আমি যাবো।তোরাও কিন্তু আমার সাথে সাথে থাকবি।’

সবাই ঘাড় কাত করে সম্মতি দিল।

____________
নার্ভাসন্যাসে ঘামছে অথৈ।দুহাত ক্রমাগত ঘষে যাচ্ছে।এটা ওর স্বভাব।পিছন থেকে রিধি,পিহু,প্রিয়ান আর আহিদ ওকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে সামনে এগিয়ে যেতে।
ওদের জ্বালাতনে অথৈ রেগে তাকাল ওদের দিকে।তারপর বলে,
‘ এমন করছিস নে তোরা?এসব করে আমার নার্ভাসন্যাস আরোও বাড়িয়ে দিচ্ছিস বেয়া’দপ গুলো।’

প্রিয়ান ঘাড় চুলকে বলে,
‘ তাহলে কি করব?’
‘ আমি যেখানে যাবো শুধু আমার পিছনে পিছনে আসবি মাথামোটা কোথাকার।’

রিধি বলল,
‘ আর কথা বাড়াস না তো অথৈ।তুই যা।’

ভার্সিটির বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বাইকে বসে বসে সিগারেট টানছে রুদ্রিক।বাকিরাও ওর সাথে আছে।ইহান,নীল,সাফাত আর অনিক।সাফাত মুখ ফুলিয়ে বসে আছে।কারন কাল ওর অযথা রাগারাগির কারনে কেউ ওর সাথে কথা বলছে না।ইহানের মুড খারাপ।কারন কাল অথৈকে ওভাবে চড় মেরে এখন ওর নিজেরই যেন কলিজা ছি’ড়ে যাচ্ছে।ইহানকে এমন গোমড়ামুখ করে বসে থাকতে দেখে রুদ্রিক গম্ভীর গলায় বলে,
‘ আমার সামনে এইভাবে মুখ লটকিয়ে থাকবি না।কাল পাকনামি করে কেন গিয়েছিলি ওকে মারতে?আমি কি পারতাম না ম্যানাজ করতে?তার আগেই নিজে একেবারে মেরে ধরে রাজা ধীরাজ হয়েছে।এখন নিজেই এমন ভ্যাবলার মতো বসে আছিস।জাস্ট অসহ্যকর।’

রুদ্রিকের এমন কথায় ইহানের মুখটা আরও ছোট হয়ে গেল।বিরক্তর মুডে একটানে সিগারেটটা টেনে শেষ করে আবার একটা ধরালো।ওর বিরক্তিকে আরোও বাড়িয়ে দিতে এসে হাজির হলো জেনি,সিয়া,মারিয়া।জেনি গিয়েই রুদ্রিকের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।তারপর বলে,
‘ কাল কোথায় ছিলে তুমি রুদ্র?আমি তোমায় কোথায় কোথায় খুঁজেছি।’

রুদ্রিক ওর দিকে না তাকিয়ে ভারি স্বরে বলে,
‘ আমার নাম রুদ্রিক।যদি আমার নাম ভালোভাবে ডাকতে না পারিস।তাহলে ডাকবি না।’
‘ বাট এটা তো আমি আদর করে ডাকি।’
‘ বাট আই হেইট দিস।’

জেনি মুখটা একটুখানি করে বলে,
‘ আচ্ছা ডাকবো না।এখন শোনো মম না তোমায় একবার আমাদের বাড়িতে যেতে বলেছে।’
‘ পারব না যেতে।’
‘ ওহ কাম ওন রুদ্রিক।এমন করে বলছ কেন?’

রুদ্রিক চোয়াল শক্ত করে বলে,
‘ জেনি এমনিতেই মন মেজাজ খারাপ।আর আমাকে বিরক্ত করো নাহ।জাস্ট লিভ।’

জেনি আবার কিছু বলতে নিবে তার আগেই রুদ্রিক ধমকে উঠল,
‘ জাস্ট গো এওয়ে।’

জেনি ভয়ে পেয়ে সরে গেল।সিয়া এসে জেনির পাশে দাঁড়াল।জেনি আর সিয়া প্রায় একই ধাঁচের।তবে মারিয়া ওদের থেকে ভিন্ন।ওদের সাথে বন্ধুত্ব করেছে।এখন না চাইতেও ওদের সজ্ঞ ছাড়তে পারে না।মারিয়া চুপচাপ আরেক পাশে দাঁড়িয়ে আছে।নীল এসে ওর পাশে দাঁড়াল।মারিয়া সেটা টের পেতেই পিটপিট করে তাকাল।নীল মুঁচকি হেসে বলে,
‘ কাল আসো নি কেন?’

নীল ওর এতোটা কাছে দাঁড়াতে মারিয়ার বুক ধুকপুক করতে লাগল।হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে।কাঁপা গলায় মারিয়া বলে,
‘ এম..এমনি ভা..ভালো লাগ..লাগছিলো নাহ।’
‘ কাঁপছ কেন?’
‘ কোথায় কাঁপছি?’

নীল মুঁচকি হাসল।ও কাছে আসলেই যে মেয়েটার কাঁপাকাঁপি বেড়ে যায় তা খুব ভালোভাবেই জানে।নীল ধীর স্বরে বলে,
‘ কাল ফ্রি আছ?’

হঠাৎ এমন প্রশ্নে অবাক হয়ে তাকায় মারিয়া।প্রশ্ন করল,
‘ কেন?’
‘ আগে বলো ফ্রি আছ কিনা।’
‘ আছি।’
‘ কাল সকাল সকাল তৈরি থেকো।তোমাদের বাড়ির সামনে আসব আমি তোমায় নিতে।ঠিক সকাল নয়টায়।মনে থাকে যেন।’

কথাগুলো বলেই সরে গেল নীল।নাহলে দেখা যাবে এই মেয়ে কাঁপতে এখানেই পরে যাবে।এইদিকে মারিয়ার সারা মুখে লালাভ আভা ছড়িয়ে পরেছে।ঠোঁটের কোণে লজ্জাতুর হাসি।ও জানে নীল ওকে ভালোবাসে।ও নিজেও নীলকে ভালোবাসে।কিন্তু লজ্জার কারনে ও বলতে পারে না ওর মনের কথা।তবে নীল আজ যা বলল তাতে মনে হচ্ছে কাল নীল ওকে প্রপোজ করবে।এতোদিন এই দিনটারই অপেক্ষায় ছিল মারিয়া।অবশেষে কাঙিত সময় এসেই পরেছে।উত্তেজনায় বুক কাঁপছে ওর।শুধু কালকের জন্যে এখন অপেক্ষা।
—–
কাচুমাচু করে রুদ্রিকের সামনে এসে দাঁড়াল অথৈ।পিছনে রিধি,পিহু,প্রিয়ান আর আহিদ।এদিকে ইহান,সাফাত,নীল আর অনিক তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।ইহান বোনের কান্ড কারখানা দেখছে।তবে কিছু বলছে না।ও দেখতে চায় অথৈ ঠিক কি করতে পারে।
অথৈ অনেকক্ষন যাবত হাশফাশ করছে রুদ্রিকের সাথে কথা বলার জন্যে।কিন্তু বলতে পারছে না।রুদ্রিক ওর এমন মোচড়ানো দেখে গম্ভীর গলায় বলে,
‘ আমার সামনে দাঁড়িয়ে এইভাবে সাপের মতো মোচড়াচ্ছে কেন?’

রুদ্রিকের এহেন কথায় অথৈ আরোও নড়েচড়ে দাঁড়ায়।তারপর আঁড়চোখে ইহানের দিকে তাকায়।ইহান এতোক্ষন ওর দিকেই তাকিয়েছিল।অথৈ তাকাতেই ইহান দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।এদিকে ইহানকে এইভাবে ওর থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে দেখে অথৈ করুন চোখে তাকায় ভাইয়ের দিকে।যেভাবেই হোক রুদ্রিকের কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে।অথৈ মনে মনে সাহস জোগাড় করে বলে উঠল,
‘ আস..আসলে…ভাইয়া। আসলে হয়েছে কি…!’

অথৈকে থামিয়ে দিয়ে রুদ্রিক ভ্রু-কুচকে বলল,
‘ আসলে নকলে না করে সোজা কথায় আসো।এভাবে আমার সামনে তোতলাবে নাহ।’

অথৈ রুদ্রিকের এমন এটিটিউট দেখে ওর রাগ লাগছে।এইভাবে তিতা করলার মতো কথা বলার কি আছে আজব?একটু ভালোভাবে কথা বলা যায় নাহ?পরক্ষণে আবার ভাবে রুদ্রিকের থেকে ভালো ব্যবহার আশা করা আসলে বোকামি।ও যেই জঘন্য ব্যবহার রুদ্রিকের সাথে করেছে।সেই তুলনায় রুদ্রিক বেশ ভদ্র ব্যবহারই করছে ওর সাথে।অথৈ কণ্ঠে জোড় এনে বলল,
‘ আসলে ভাইয়া সেদিন কিছু না জেনেই আপনার সাথে ওরকম ব্যবহার করা আমার উচিত হয়নি।আমি নিজের ব্যবহারের জন্যে খুবই লজ্জিত।আমাকে ক্ষমা করে দিবেন ভাইয়া।আমি ভীষণ লজ্জিত।’

রুদ্রিক বাঁকা চোখে তাকাল অথৈর দিকে।পরক্ষণে ভ্রু উঁচু করে বলে
‘ আর যদি বলি আমি তোমায় ক্ষমা করব নাহ,তাহলে?’

অথৈ রুদ্রিকের কথায় বেশ ঘাবড়ে যায়।ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
‘ ক্ষমা আপনাকে করতেই হবে।’
‘ মগের মুল্লুক নাকি?এখন কি আমার কাছ থেকে তুমি জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিবে?ক্ষমা করতে হয় মন থেকে।’
‘ প্লিজ ভাইয়া ক্ষমা করে দিন না।আপনি যা বলবেন আমি তাই করব।তাও আমায় ক্ষমা করবেন।’

অথৈর এই কথায় রুদ্রিকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।অথৈর দিকে তীর্ছা চোখে চেয়ে বলে,
‘ আমি যা বলব তাই করবে?’

অথৈ ভয় পেয়ে গেল একটু।লোকটা এমন করে বলল কেন?নিজের কথায় কি এখন নিজেই ফেসে যাবে না কি? অথৈ আমতা আমতা করে বলে,
‘ হ…হ্যা আপনি যা বলবেন তাই করব।’

রুদ্রিকের ইহানের দিকে তাকাল।ওকে উদ্দেশ্য করে বলে,
‘ কিরে ইহান?শুনেছিস তোর বোনের কথা?এখন আমি যা বলব ও না কি তাই করবে।কিরে কি বলিস?’

ইহান জানে রুদ্রিক এমন কিছুই করবে না যাতে ওর বোনের সম্মানহানি হয়।রুদ্রিককে ও প্রচন্ড বিশ্বাস করে।ইহান চোরা চোখে অথৈর দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
‘ দোষ যেহেতু ও করেছে।তাই যা শাস্তি দেওয়ার তুই দিতে পারিস।আর আমি এটাও জানি তুই এমন কিছুই করবি না যেটা আমি পছন্দ করব নাহ।’

রুদ্রিক অথৈকে উদ্দেশ্য করে বাঁকা হেসে বলে,
‘ আগামী এক সপ্তাহ আমি যা বলব তুমি তাই করবে।আজ পর্যন্ত কেউ সাহস করেনি কেউ আরিহান রুদ্রিকের কলারে হাত দেওয়ার সেটা তুমি করেছ।এখন আমি যা বলব তুমি তাই করবে।তবে ভয় নেই আরিহান রুদ্রিক এমন কোনো কিছুই করবে না যাতে তোমার সম্মানহানি হয়।এটা তোমার আর ইহানের কাছে আমার ওয়াদা।’

অথৈ হা করে তাকিয়ে আছে রুদ্রিকের দিকে।এই লোক যে এইভাবে তাকে ফাসিয়ে দিবে কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি ও।অথৈ বলে উঠল,
‘ তাই বলে এক সপ্তাহ?’
‘ হ্যা এক সপ্তাহ।রাজি থাকলে বলো।নাহলে নেই।’
‘ আ…আচ্ছা আমি রাজি।’

রুদ্রিক শয়তানি হাসি হেসে মনে মনে বলে,
‘ এটা তো শুধু বাহানা।এক সপ্তাহ না।তোমাকে সারাজীবনের জন্যে আমার কাছে রাখার ব্যবস্থা করব আমি।একবার যে মেয়ে রুদ্রিকের চোখের দিকে তাকিয়ে রুদ্রিকের কলার ধরার সাহস দেখিয়েছে।সেই মেয়েকে আমি রুদ্রিক কোনোদিন হাতছাড়া করব নাহ।তোমাকে তো এই আমার হতেই হবে।যে করেই হোক।’

#চলবে_________
কাল অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পরেছিলাম। তাই লিখতে পারিনি।ক্ষমা করবেন আমায়।আপনাদের অপেক্ষা করানোর জন্যে।#মন_তুমি_ছুঁয়ে_দেখো_না
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
#পর্বঃ০৯
মির্জা বাড়িতে সকালের নাস্তা করতে বসেছে একত্রে সবাই।আতিক মাহাবুব বার বার তাকাচ্ছেন গম্ভীর মুখে বসে নাস্তা করতে থাকা রুদ্রিকের দিকে।বেশ অনেকক্ষন যাবত চেষ্টা করছেন রুদ্রিকের সাথে কথা বলার জন্যে কিন্তু পারছেন নাহ।
‘ দাদু?আপনাকে আর একটা রুটি দেব?’

রোজার কথায় নড়েচড়ে বসেন আতিক মাহাবুব।রোজার প্রশ্নের উত্তর দিলেন,
‘ নাহ, লাগবে না।আর তাছাড়া তুমি বোসে নাস্তা করতে পারো নাহ?যার যেটা লাগবে সে সেটা নিয়েই খেতে পারবে। ‘
রোজা হেসে বোসে পরল।আতিক মাহাবুব এইবার রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে গলা খাকারি দিয়ে বলেন,
‘ রুদ্রিক? তোর সাথে কথা আছে।’

রুদ্রিকের গম্ভীর স্বরের জবাব,
‘ বলো।আমি শুনছি।’
‘ ইম্পোর্ট্যান্ট কথা।’

রুদ্রিক এইবার সোজাসুজিভাবে তাকালো আতিক মাহাবুবের দিক।বলল,
‘ বলো।’

আতিক মাহাবুব জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলেন,
‘ তুমি বলেছিলে তুমি ফ্রি হলে আমার সাথে যাবে মেয়ে দেখতে।সেই কথা কি ভুলে গিয়েছ?’

রুদ্রিক শান্ত কণ্ঠে বলে,
‘ না,ভুলেনি।’
‘ তাহলে তুমি কবে যাবে?কতোদিন তো হয়ে গেল।’
‘ আমি তো বললাম আমি ফ্রি হলে জানাবো।’
‘ কি এমন কাজ আছে তোমার?যে একেবারে ফ্রি হওয়ার সময়টুকু তুমি পাচ্ছো নাহ।’

রুদ্রিক ত্যারা জবাব দিল,
‘ তাহলে তুমি এমন আমার পিছনে হাত ধুয়ে পরেছ কেন?আমার এখনো স্টাডি কম্পলিট হয়নি।’

আতিক মাহাবুব ভ্রু-কুচকালেন নাতির কথায়।বললেন,
‘ সেটা নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।তুমি শুধু আমাকে একটা নাতবউ এনে দেও।তারপর তোমাকে আর লাগবে না।আমার নাতবউকে আমি আমার কাছেই রাখবে।’

রুদ্রিক জুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে কপাল কুচকে বলল,
‘ বিয়ে যেহেতু আমাকে তুমি করাবেই।তাহলে আমার বিয়ে করা বউকে আমি তোমার কাছে কেন রাখতে যাবো?আর এতোই যেহেতু শখ। তাহলে নিজেই তো বিয়ে করে নিতে পারো।’

রোজা ফিক করে হেসে দিল।আরিয়ানও হাসছে।আর আরহাম সাহেব মুখ লুকিয়ে হাসছেন।তার বাবাকে শুধুমাত্র রুদ্রিকই পারে বশে আনতে।আতিক মাহাবুব রেগে বলেন,
‘ চরম অসভ্য হয়েছিস তুই।’
‘ সেটা আমি জানি।নতুন কিছু বলো।’

আতিক মাহাবুব না পেরে ইমোশনাল ব্লাকমেইল করলেন রুদ্রিককে।
‘ আমার সাথে এইভাবে কথা বলছিস।আজ তোর মা আর দাদি থাকলে তাদের তো ফিরিয়ে দিতি নাহ।আর আমি বুড়ো হয়ে গিয়েছি দেখে তোর কাছে আমার কথার কোনো দাম নেই।’

রুদ্রিক জানে এটা তার দাদু তাকে ব্লাকমেইল করার জন্যে অভিনয় করছেন।রুদ্রিকের খাওয়া শেষ।ও টেবিল থেকে উঠে যেতে যেতে বলে,
‘ ওকে ফাইন কাল যাবো আমি।হ্যাপি?’

আতিক মাহাবুবের ঠোঁটের কোণে চওড়া হাসি ফুটে উঠল।উনিও খাবার শেষ করে নিজের রুমে চলে গেলেন।রুমে গিয়ে নিজের পিএ সিয়ামকে ফোন দিলেন।ফোন রিসিভ করতেই সিয়াম সালাম দিলো।আতিক মাহাবুব সালামের উত্তর দিয়ে বলেন,
‘ সিয়াম?ওদিকের কি খবর?আমার নাতবউ আর রুদ্রিক কতোদূর এগিয়েছে।দু দিনের খবর তো আমায় দিলে নাহ।’

সিয়াম দাঁত দিয়ে নখ কাটতে লাগল।দুদিনের খবর সে ইচ্ছে করেই দেয়নি।কিভাবে বলবে ও এই কথা যে তার নাতবউ প্রথম কথাতেই সোজা রুদ্রিকের কলার ধরার সাহস করেছে।যদি ওকে টু’স করে গুলি করে উড়িয়ে দেয়?যদি বলে আমার নাতির কলার ধরল আর তুমি চুপচাপ দেখছিলে গর্দ’ভ।সিয়ামের কোনো সারাশব্দ না পেয়ে আতিক মাহাবুব বলে উঠলেন,
‘ কথা বলছ না কেন?’
‘ আসলে স্যার..’
‘ আসলে নকলে বাদ দেও।সোজা কথা বলো।’

সিয়াম লম্বা শ্বাস ফেলল।উপায় না পেয়ে সবটা বলল আতিক মাহাবুবকে।
‘ স্যার রুদ্রিক বাবাকে একটা মেয়ে প্রপোজ করেছিল। এইজন্যে রুদ্রিক বাবা রেগে গিয়ে ওই মেয়েকে একটু ভয় দেখিয়েছিল।যাতে পরবর্তীতে এমন কাজ করার সাহস ওই মেয়ে না পায়।মেয়েটা ওর বান্ধবীদের কাছে গিয়ে কাঁদতেছিল।আর অথৈ মামনি সেটা দেখে ফেলে।আর জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে।ওই মেয়ের বান্ধবীরা আসল ঘটনা না বলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব দোষ রুদ্রিক বাবার দিয়ে দেয়।ব্যস অথৈ মামনি রেগে একদম রণ’চন্ডী হয়ে যায়।মামনির বন্ধুরাও তাকে থামাতে পারছিল না।সোজা গিয়ে রুদ্রিক বাবার কাছে যান।রুদ্রিক বাবাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করে তার উত্তর দিতেই সে সোজা রুদ্রিক বাবার কলার টেনে ধরে।অথৈ মামনিকে থামাতে না পেরে ইহান তাকে জোড়ে থাপ্পড় মারে।তারপর আসল ঘটনা বুঝিয়ে বলে।সব বলায় অথৈ মামনি নিজের দোষ বুঝতে পারে হয়তো।তাই এর পরের দিন রুদ্রিক বাবার কাছে মাফ চাইতে চলে যায়।রুদ্রিক বাবা তাকে এক শর্তে ক্ষমা করবেন বলেছে তা হলো আগামী এক সপ্তাহ রুদ্রিক বাবা যা বলবেন অথৈ মামনীর তাই করতে হবে।আর অথৈ মামনি রাজিও হয়ে যান।কারন উনা বিনা দোষে রুদ্রিক বাবার সাথে মিসবিহেইব করেছে তাই।’

সিয়াম গরগর সব কথা বলে দেন আতিক মাহাবুবকে।সিয়াম ভাবল এই বুঝি জোড়সে একটা রামধমক খাবে।আর হলোও তাই।তবে যে কারনে ভয় পাচ্ছিল সে কারনে নাহ।তার ঠিক উল্টোটা হলো।
‘ হতচ্ছা’রা তুমি সেটা আজ আমায় বলছ।এতো ইন্ট্রেস্টিং একটা ঘটনা।’
‘ এ্যাঁ?’
‘ এ্যাঁ না হ্যা।’

তারপর খুশিতে গদগদ হয়ে বলেন,
‘ আগামী এক সপ্তাহ রুদ্রিক আর অথৈ একসাথে থাকবে।সিয়াম সকল ব্যবস্থা করো। যে করেই হোক এই এক সপ্তাহে ওদের কাছাকাছি আসতেই হবে।আর খেয়াল রাখবে তাদের একান্ত সময়ে যাতে অন্য কেউ ঢুকে ওদের ডিস্টার্ব করতে না পারে।’

সিয়াম অবাক হয়েই বলে,
‘ ওকে স্যার।আমি খেয়াল রাখব।’

আতিক মাহাবুব ফোন কেটে দিলেন।সিয়াম অবাকের রেশ ধরেই বলল,
‘স্যারের মাথা নিশ্চ’য়ই খারাপ হয়ে গিয়েছে।’
____________
রিধি তারাহুরো করে ভার্সিটিতে ঢুকছিল।খেয়াল করেনি যে সামনে ইহান আসছে।ও যেতে নিতেই ইহানের সাথে জোড়েসোড়ে একটা ধাক্কা খায়।ইহানের শক্তপোক বুকের সাথে রিধির মুখটা গিয়ে জোড়ে বারি খায়।ফলে ও নাকে অনেকটা ব্যথা পায়।রিধি ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে,
‘ উহুহু! উফ নাকটা বুঝি আমার শেষ।ও আল্লাহ্। ‘

ইহান নিজেও বুকে ব্যথা পেয়েছে।তবে রিধির ব্যথাতুর কণ্ঠ শুনে ওর দিকে তাকাল।রিধি দুহাতে ওর নাক চেপে ধরে রেখেছে দেখে ইহান আলতো স্পর্শ করে রিধির হাতটা সরিয়ে দিল।দেখতে লাগল রিধি কোনো গুরুতর আঘাত পেয়েছে না কি।এদিকে রিধি ইহানের স্পর্শে পুরো বরফের মতো জমে গিয়েছে।ওর হৃৎপিন্ডটা অসম্ভবভাবে জোড়ে জোড়ে বিট করছে।ইহানের হাতের একেকটা স্পর্শ ওর বুকের ভীতর তীব্রভাবে তোলপাড় সৃষ্টি করছে।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে ওর।ইহান দেখল রিধির নাকটা লাল হয়ে গিয়েছে।তাই ইহান বলল,
‘ বেশি ব্যথা লেগেছে?’

রিধি মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে ইহানের দিকে।সেইভাবেই বলল,
‘ হ্যা অনেক ব্যথা।’

ইহানের ভ্রু-কুচকে আসে।কপালে চিন্তার রেখা পরে।বলল,
‘ কোথায় ব্যথা করছে?বলো আমাকে।ডক্টরের কাছে যাবে?’
‘ বুকে ব্যথা করে।খুব ব্যথা করে।এই ব্যথা কোনো ডাক্তার ভালো করতে পারবে না।’

ইহান অবাক হয়ে বলে,
‘ আরে কি বলছ এসব?কি এমন হয়েছে?যে ব্যথা ডাক্তার সারাতে পারবে নাহ।’

এতোক্ষনে হুশ আসে রিধির।ও এতোক্ষন কি বলছিল নিজের অজান্তে।রিধি সজ্ঞানে আসতেই নিজের কর্মকান্ডে মন চাচ্ছে লজ্জায় ম’রে যেতে। লজ্জা শরম ত্যাগ করে কি বলে যাচ্ছিলো ও এগুলো।লজ্জায় রিধি হাশফাশ করে বলে,
‘ কোন ব্যথা? কিসের ব্যথা?আমার কোনো ব্যথা নেই।আসছি আমি হ্যা?অথৈ অপেক্ষা করছে।’

কোনোরকম উল্টাপাল্টা বলে রিধি একদৌড়ে চলে গেল।ইহান ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে চিন্তিত কন্ঠে বিরবির করল,
‘ কি হলো মেয়েটার?কিসব উল্টাপাল্টা বলে গেল?বেশি কি ব্যথা পেয়েছে?’

ইহানের চেহারায় চিন্তার ছাপ পরে রইল।
——–
রিধি অথৈদের কাছে এসে হাটুতে ভর দিয়ে হাপাতে লাগল।ওকে এমনভাবে দৌড়ে আসতে দেখে প্রিয়ান বলল,
‘ কিরে?তোরে কি কুত্তায় দৌড়ানি দিছে নাকি?এমনে দৌড়াইয়া কইত্তে আইলি?’

পিহু নাক মুখ কুচকে বলে,
‘ এইগুলো কি ধরনের কথা?তোর ভাষা শুনে আমার গা গুলাচ্ছে।’

প্রিয়ান রাগি গলায় বলল,
‘ তো?তোরে কেউ কইছে আমার কথা শুনতে?তুই কানে তুলা দিয়া থাক।’

আহিদ বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
‘ তোরা কি একটা দিন শান্তিতে থাকতে পারিস নাহ?’

পিহু আর প্রিয়ান একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচি মেরে উল্টোদিকে তাকিয়ে থাকে।

অথৈ রিধিকে পানির বোতল দেয়।রিধি সেটা পান করে নিতেই অথৈ বলল,
‘ এখন বল।এমন হুরমুর করে কোথা থেকে আসলি?’
‘ আর বলিস না।আজ তো আমি শেষ হয়ে গিয়েছিলাম।তোর ভাই আমাকে কাঁচা চি’বিয়ে খেতো।’

আহিদ ভ্রু-কুচকে বলল,
‘ সোজাভাবে বলতে পারিস নাহ একটা কথা?’

প্রিয়ান চুলে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে বলে,
‘ আরে ভাই এই মেয়েদের স্বভাবই এমন।কথারে শুধু ত্যানা প্যাঁচাতে থাকে।’

পিহু কটমট করে তাকায় প্রিয়ানের দিকে।তা দেখে প্রিয়ান ধমকে উঠে,
‘ ওই একদম এমনে তাকাবি নাহ।তোরে কি আমি কিছু বলছি?’
‘ তোর একটা কথাও আমার সহ্য হয় না।’
‘ আর আমার তোরে সহ্য হয় না।’
‘ তো আমি মনে হয় তোর কোলে গিয়ে বসে থাকি?’

‘ চুউউউউউপ।’ অথৈ চিৎকার করে উঠল।পিহু আর প্রিয়ান থেমে যায়।

অথৈ দাঁত কিরমির করে আহিদকে উদ্দেশ্য করে বলে,
‘ আহিদ এই দুটোকে চুপ থাকতে বল।এমনিতেই আমি চিন্তায় বাঁচি না।আর এই দুটোর জ্বালা আরোও একশো ডিগ্রি চিন্তা বারিয়ে দেয়।আমি কিন্তু সত্যি এদের খু’ন করে ফেলব।’

পিহু প্রিয়ান ঠোঁটে আঙুল চেপে একসাথে বলে,
‘ আর একবারও ঝগড়া করব না।সত্যি এইযে চুপ করলাম।’

পিহু রেগে প্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ এই তুই আমার কথা নকল করলি ক্যান?’

প্রিয়ানও একই সুরে বলে,
‘ তুই করেছিস নকল আমি নাহ।’

আবার শুরু হয়ে যায় এদের টম এন্ড জেরির ঝগড়া।অথৈ আর রিধি কপাল চাপড়াতে লাগল।আহিদ হাসতে হাসতে বলে,
‘ এরা কোনোদিন সুধরাবে না।শুধু ওদের উপর চিল্লিয়ে এনার্জি লস করিস তোরা।’

রিধি রেগেমেগে বলে,
‘ তোরা থামবি?আমাকে বলতি দিবি কিছু?’

পিহু আর প্রিয়ান সাময়িকের জন্যে থেমে যায়।কারন রিধি রেগে গিয়েছে।আর রিধি রাগ মানেই পিঠের উপর ধামধুম ঘুষি খাওয়া।আর তারা সেটা খেতে চায় না।পিহু আর প্রিয়ানকে থামতে দেখে অথৈ,রিধি আর আহিদ সস্তির নিশ্বাস ফেলল।তারপর রিধি একটু আগের ঘটনা সবটা বলল ওদের।রিধি এমন পাগলামো কথা শুনে ওর হাসতে হাসতে শেষ।আর রিধি মুখ ফুলিয়ে রেখেছে।কিন্তু এতো হাস্যার মাঝে অথৈর চিন্তার শেষ নেই।আজ থেকে রুদ্রিক ওকে যা বলবে ওর তাই করতে হবে।না জানি লোকটা ওকে দিয়ে কি কি করায়।ভেবেই গলা শুকিয়ে আসছে ওর।

#চলবে__________
ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।কেমন হয়েছে জানাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here