মুক্ত_পিঞ্জিরার_পাখি পর্ব ১৩

#মুক্ত_পিঞ্জিরার_পাখি
#পর্বঃ১৩
#Ipshita_Shikdar
৩৯।
দুই দিন কেটে গিয়েছে আরিজের এক্সিডেন্টের। এই দুইদিন পক্ষী আরিজের সম্পর্কিত সবকিছুই একা হাতে সামলেছে পক্ষী। যুবককে কাপড় পড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে নিজ হাতে খাবার ও ঔষধ খাওয়ানো পর্যন্ত সবই নিজ আগ্রহ করেছে। এতে তাদের সম্পর্কের সমীকরণ না বদলালেও অনুপাত পরিবর্তিত হয়েছে ঠিকই। অনেকটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও কথোপকথনই দেখা যায় তাদের মাঝে।

“লাঞ্চের সময় যে হয়েছে তা কি খেয়াল আছে মহাদয়?”

খাণিকটা রসিকতার সুরেই ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কথাটি বলে ফেলে পক্ষী। আরিজ দরজা সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা যুবতীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলে।

পরক্ষণেই মুখশ্রী কিছুটা বিকৃত করে বলে উঠে,

“পরে খাবো। গোসল করিনি কতদিন গা ঘিনঘিন করছে!”

“সেব কী কথা আরিজ! ডাক্তার তো ক্ষততে পানি লাগাতেই না করেছে।”

বেশ গম্ভীর ও চিন্তিত ভঙ্গিমাতেই নয়ন্তিনী বেগম কথাটা বললেন। পক্ষীও সায় জানিয়ে বলল,

“হুম, তাই-ই তো। তাছাড়া শীতের সময়, দিন কয়েক গোসল না নিলে তেমন কিছুই হবে না।”

সবার কাছে যুবকের কথাটি সমর্থন না পেলেও, সে সিদ্ধান্তে অটল। সবাই যখন তাকে বুঝাতে ব্যস্ত তখনই হঠাৎ নয়না বলে উঠেন,

“ও যেহেতু মানতে প্রস্তুত নয়, তাহলে একটা কাজ করা যায়। তা হলো- ও নিজে গোসল করলে তো ক্ষততে পানি লাগিয়ে ফেলবি তাহলে অন্যকেউ গোস্লে তোকে হেল্প করলেই হবে। কী বলো পক্ষী?”

পক্ষী কিছু না ভেবেই বলে ফেলে,

“খুব ভালো বুদ্ধি খালা। আমির ভাই… ”

তাকে কথা শেষ করতে দিয়েই নয়না আদেশ করার ন্যায় বলেন,

“তাহলে তুমি ওকে গোসল করিয়ে দিয়ো। তুমিই তো ওর স্ত্রী, তোমারই দায়িত্ব।”

কথাটা প্রথমে খেয়াল না করায় কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও পরক্ষণেই আরিজ ও পক্ষী একই সাথে চেঁচিয়ে বলে উঠে,

“কী!”

তাদের আচমকা চেঁচানোতে চমকে উঠে সেখানে উপস্থিত সকলে। এমনকি কাজটা করা আরিজ ও পক্ষী নিজেরাও অস্বস্তিতে পড়ে গেল। নয়ন্তিনী বেগম বিষয়টি বুঝতে পারলেও না বুঝার ভান করেই জিজ্ঞেস করে,

“এমন করার কী আছে, আজব! তুমি আরিজকে সাহায্য করো, ছেলেটার আবার গোসল না করলে অস্বস্তি লাগবে। আমি আর বুবু এসে ঘণ্টা খাণেক পর তোমাদের দেখো যাবো।”

বলেই নয়নাকে নিয়ে তিনি বের হয়ে যান। আর পিছনে এক অস্বস্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফেলে যান একজোড়া নরনারীকে।

কয়েক মুহূর্ত পেরিয়ে গেলে আরিজ মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে শ্যামাঙ্গিনীর দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস করে, সফলও হয়ে যায়। পক্ষী তার দিকে তাকাতেই সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমতাআমতা করে বলে উঠে,

“সমস্যা নেই, আমি একা করতে পারবো। তুমি শুধু ওয়াসরুমে একটা চেয়ার রাখো, তারপর আমাকে সেখানে বসিয়ে দিয়ে আসো।”

পক্ষী বলতে চাচ্ছিলো সে সাহায্য করতে সক্ষম, কিন্তু কোনো এক দ্বিধার বেড়াজালে তা আর বলা হলো না। আরিজের কথামতোই তাকে বসিয়ে দিয়ে এসে দরজা চাপিয়ে বাহিরে দাঁড়ায় যুবতী। খাণিক বাদেই বাথরুম থেকে চাপা আর্তনাদ কানে আসতেই হচকচিয়ে সেদিকে ছুটে সে।

বলা বাহুল্য, আরিজ বামহাত দিয়ে মগ ব্যবহার করতে পারছে না বলে ক্ষত হাত ব্যবহার করতে যেতেই ব্যথা পায় এবং হাত থেকে মগ নিচে পড়ে যায়।

শ্যামাঙ্গিনী গোসলখানায় প্রবেশ করে যুবকের দিকে তাকাতেই লজ্জায় লজ্জাবতী লতিকার ন্যায় মাথা নুয়ে ফেলে। কারণ আরিজ যে নগ্ন বক্ষে শুধু থ্রি কোয়াটার প্যান্ট পড়ে বসে আছে। তবে পক্ষীকে দেখে একটুও লজ্জা পায়নি আরিজ। এতে যেন তার কিছুই আসে যায় না, বরং তার চোখেমুখে ছেয়ে আছে বিরক্ত গোসল করার মতো সহজ কাজও সম্পাদন করতে না পারায়।

হঠাৎই কেমন একটা স্ত্রীর দায়িত্ববোধ জেগে উঠে তার। নিজেকে আদেশ করার ন্যায় বলে,

“ধর্মমতে আমি স্ত্রী হই এই লোকটার, আমার উপর হক আছে তার যতদিন স্ত্রী আছি।”

অতঃপর সব ভাবনা-চিন্তা ও দ্বিধার জলাঞ্জলি দিয়েই পক্ষী বলে উঠে,

“দিন, আমিই সাহায্য করছি।”

আরিজও যেহেতু একদফা চেষ্টা করেও ব্যর্থতা ব্যতিত আর কিছুই পায়নি। তাই পরাজিত সৈনিকের ন্যায় নিরবেই সায় জানায়। তার সম্মতি পেতেই পক্ষী ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে যায়।

মগের দ্বারা সচেতনতার সহিত জল দিয়ে গা ধুয়ে দেয়, তাতেও যেন কাজ করছে তীব্র অস্বস্তি। কিন্তু গায়ে সাবান মাখাতে যেয়েই হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠে। হৃদপিণ্ডের এতোটা ধকধকানি জীবনে এই প্রথম অনুভব করছে যে। কী যে এক অনুভূতি! মনে হচ্ছে এখনই শ্বাসরোধ হয়ে মারা যাবে কিংবা হৃদয়টাই বিস্ফোরিত হবে কয়েক মুহূর্তের মাঝে।

অবাককর ব্যাপার হলো, এসব কিছুর মাঝে একবিন্দুও বিরক্তি কিংবা রাগ কাজ করছে না কাজটি সম্পাদনা করতে। অথচ এসব কিছুর মাঝেই বোধ করছে এতোটা ভালো লাগা, যতোটা কখনো অনুভব করেনি সে। মনে মনেই নিজেকে প্রশ্ন করে উঠে,

“শুধুই কী দায় থেকে করছি এই লোকটার জন্য এসবকিছু? নাকি অন্যকোনো অনুভূতি কাজ করছে আড়াল হতে?”

কিন্তু আফসোস এই প্রশ্নটি উত্তর শ্যামাঙ্গিনী জানে, অথবা জানলেও মানতে বেশ নারাজ সে। তাই সব ভুলে নিজ কাজেই ব্যস্ততাতেই ডুবে সে।

আরিজের মাঝেও চলছে নানা অনুভূতির সংমিশ্রণ, যার অর্থ কিংবা ফলাফল কিছুই সে জানে না। শ্যামাঙ্গের এই নারীটির আলতো স্পর্শ যতোবার তার দেহে ততবারই এক অন্যরকম শিহরণ অনুভব হচ্ছে তার, যতবার তার কাছে আসছে ততবার এক অন্যরকম সুভাষ নাকে লাগছে তার, এই সুভাষ সে আগে কখনো পায়নি। কেমন এক তীব্র আকর্ষণীয় মধুময় সুভাষ, যা চাইলেও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

আনমনেই সে ভেবে উঠে,

“বার কয়েক তো প্রিয়কেও জড়িয়ে ধরেছি, তার মাথাটা কাঁধে রেখেছি। কিন্তু এতোটা ভালোলাগা… এতোটা ভালোলাগা কখনো অনুভব হয়নি। এই নারীটির জন্য অনুভূতিগুলো সবার থেকে এতো ভিন্নরূপেই তৈরি হচ্ছে কেন?”

এর উত্তর তার জানা নেই, কারণ জীবনে এমন অনুভূতিই সে পোষণ করেছে প্রথম। তাই এই অনুভূতির নাম কিংবা তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সময় তো লাগবেই। শুধু ভালোবাসা উপলব্ধিটা সময় শেষ হওয়ার আগে হওয়া আবশ্যক, নাহলে সারাজীবন মনভরা বেদনা বয়ে বেড়াতে হয়।

‘ভালোবাসার অভিজ্ঞতা খুব কম মানুষের থাকা, কিন্তু উপলব্ধিটা তাদের মাঝেও খুব ক্ষুদ্রাংশের সময় মতো হয়। ফলাফল ভালোবাসার অভিজ্ঞতার সাথে বিরহবেদনার অভিজ্ঞতাও হয়ে যায়।’

৪০।
বেশ দূরে সমুদ্র সৈকত, বড় জানালাটি সমুদ্রমূখী হওয়ার পরও তা দেখার উপায় নেই। অবশ্য আওয়াজ ও বাতাস পাওয়া যাচ্ছে বেশ, যা প্রমাণ দিচ্ছে নোনাজল বহু কাছেই প্রিয়ার। জানালার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়া, তার ঝলমলে চুলগুলো এদিকওদিক ছুটছে মুক্ত পাখির মতো। তবে সেদিকে ধ্যান নেই যুবতীর, হাতের মোবাইলটার মাঝেই তার সব ধ্যান স্থির। কারো একটা কল বা ম্যাসেজের অপেক্ষা চলছে যে বেশ।

তখনই তার রুমমেট শ্রেয়া তথা সহকর্মী বলে উঠে,

“প্রিয়া ম্যাডাম, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচে নামতে হবে। সবাই বীচে যাচ্ছে।”

বলে তিনি নিজেই বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে যায়। প্রিয়াও এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটাকে একবার দেখে বিছানায় ফেলে পরিধানের উদ্দেশ্যে কাপড়-চোপড় বের করতে শুরু করে।

আজ তার মাঝে বেশ অভিমান কাজ করছে, যার সবটাই নিজের প্রিয়জনদের প্রতি। পালক কেন এত স্বার্থপর হলো, বাবা-মা কেন তাকে বুঝলো না, আরিজ কেন তার আগের মতো খোঁজখবর নিচ্ছে না, আরও কত কী ভাবনা তার মাথায় চলছে।

৪১।
আরিজের গোসল শেষ হওয়ার পর তার কথানুযায়ী তাকে লুঙ্গি দিয়ে ওয়াশরুমের দরজা চাপিয়ে বের হয়ে যায় পক্ষী। খাণিক বাদেই ডাক পড়ে তার ঘরে নিয়ে আসার জন্য। আরিজ তার ঘাড় জড়িয়ে কিছুটা তার উপর ভর দিয়ে বিছানার দিকে যাত্রা শুরে করে।

বিষয়টা নাটকীয়ভাবে বেশ রোমাঞ্চকর মনে হলেও শ্যামাঙ্গিনীর মাঝে কাজ করছে তীব্র ক্লান্তি। যদিও সেদিন বড় খালা বলেছিলেন আরিজ পাঁচ ফুট আট কিন্তু লোকটাকে আরও বেশিই লম্বা মনে হয় তার, সেই সাথে পেটানো শরীর। এত ভার কী আর নিতে পারে পক্ষীর ক্ষুদ্র দেহ! এ যে বড়োই কষ্টসাধ্য কাজ তার জন্য।

আনমনেই একবার মিনমিন করে বলে উঠে,

“ভাগ্যিস শুধু একপায়ে লেগেছে, দু’পায়ে হলে তো আমি একদম… কী লম্বুরে বাবা! পুরাই যেন খাম্বা!”

আরিজ পক্ষী খুব কাছেই থাকায় কথাটা কিছুটা অস্পষ্ট হলেও মূলভাব ও ‘খাম্বা’ বলাটা বেশ বুঝতে পারে সে। কপাট রাগ দেখিয়ে বলে উঠে,

“কিছু বললে মনে হলো…”

ভয়ে গুটিকয়েক ঢোক গিলে শ্যামাঙ্গিনী। ইশারায় নাকোচ করে বিছানায় বসিয়ে দেয় তাকে। তারপর তাকিয়ে দেখে যুবকের মাথাভর্তি চুল বেয়ে বেয়ে জল পড়ে সিক্ত করছে তার দেহ। এই দৃশ্যটা কেন যেন বড়ো আকর্ষণ করছে তাকে, এই প্রথম কোনো পুরুষের প্রতি এমন আকর্ষণ কাজ করছে তার।

হঠাৎই ভেবে উঠে,

“আচ্ছা, প্রথমের জন্য কখনো এমন লেগেছে?”

প্রথমে মাঝে সে মুগ্ধতা খুঁজে পেতো, তার জন্য হৃদয়ভর্তি শ্রদ্ধা ছিল; তবে ভালোবাসা ছিল কিনা তা তার জানা নেই। আর কখনো খুঁজতেও যায়নি। খুব ক্ষুদ্র বয়সে সে কোথায় যেন পড়েছিল, “তুমি যাকে ভালোবাসো তাকে নয়, যে তোমায় ভালোবাসে তাকে সঙ্গী করো।” সেটা মেনেই সে আগাচ্ছিল, কিন্তু মাঝে যে ঝড় এসে হানা দিবে কে জানতো!

প্রথমের কথা মনে পড়তেই আরিজের প্রতি কার্যকর অনুভূতির জন্য কেন যেন অপরাধবোধ হয় তার। যেন এ এক নিষিদ্ধ কাজ। খুব দ্রুতোই নিজেকে সামলে তোয়ালে নিয়ে আরিজের চুল মুছে, তাকে টিশার্ট পরিধানে সাহায্য করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। এর মাঝেই কখন যে তার চুলগুলো খোপার বাধন ভেঙে পালিয়ে মুক্ত প্রজাপতির মত এদিকওদিক ছুটছে বুঝতেও পারেনি।

এদিকে আরিজের মনটা বেশ বিচলিত এই মুহূর্তে। মেয়েটার বাঁকা চুলগুলোর আলোড়ন যেন তার হৃদয়ে যেয়ে লাগছে। এ অনুভূতিটাকে সে মেনে নিতে পারছে না। তখনই হঠাৎ কল রিংটোন বেজে উঠে, তার মনে পড়ে যায় প্রিয়ার কথা। সাথে সাথেই এই অনুভূতিগুলোকে মিথ্যে বলে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে।

৪২।
সাগরের পাড়ে একাকিই হাঁটছে প্রিয়া, কোনো এক অজানা কারণে এখানে মানুষজন খুব কম। হাতের ফোনটার দিকে বার কয়েক তাকিয়ে পুনরায় কল করে আরিজের নাম্বারে।

“প্রেম-ভালোবাসা মানুষকে মৃত্যুকামী না বানালেও বেহায়া বানায় বড়ো। আত্মসম্মানবোধটাই যেন তখন শূণ্য হয়ে পড়ে।”

এ দুটো বাক্য শুনেছিল সে আগে। আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here