মেঘের ওপর আকাশ উড়ে পর্ব -০৫

#মেঘের_ওপর_আকাশ_উড়ে
#Part_05
#Writer_NOVA

দুপুরবেলা খাবারের টেবিলে সবাই একসাথে বসেছে। সাবার বাবা আমিনুল ঢালী ঘনঘন দাড়িতে হাত বুলাচ্ছেন। মৃদুলকে মেয়ের জামাই করতে পেরে তিনি ভীষণ খুশি।তার ধারণা মতে মৃদুলের মতো ছেলেই হয় না। সোনার টুকরো ছেলে যাকে বলে। তার পাশে বসেছে সিয়াম। অপজিট চেয়ারে মৃদুল বসেছে। সাবা রুম থেকে এসে মৃদুলের পাশের চেয়ার টেনে বসতে নিলেই ওর মা নাসিমা বেগম চোখ পাকিয়ে তাকালো। মায়ের দিকে তাকিয়ে সাবা কিছু বুঝতে পারলো না। তাই চোখে বিস্ময় ভাব রেখে জিজ্ঞেস করলো,

— কি হয়েছে আম্মু?

— আমার সাথে একটু কিচেনে আয়।

সাবা কিছু বলার আগে নাসিমা বেগম ওর হাত ধরে হনহন করে কিচেনে নিয়ে গেলো। সাবা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,

— এভাবে টেনে নিয়ে এলে কেন?

— তোর কি বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে সাবা?

— কি করেছি আমি?

— জামাইকে না খাইয়ে তুই খেতে বসিস কোন আক্কেলে?

— আশ্চর্য, তোমাদের জামাইকে কি আমি খাইয়ে দিবো নাকি?

— এক চড় মারবো। তোকে বলছি খাইয়ে দেওয়ার কথা? এতো বেশি বুঝিস কেন?

— তাহলে?

— জামাইকে একটু বুঝেশুনে খাবার বেড়ে দিবি। ওর কি লাগবে না লাগবে সেদিকে খেয়াল রাখবি। খাওয়ার সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকবি। পানি এগিয়ে দিবি। তাহলেই না স্বামী-স্ত্রী ভালোবাসা বাড়বে।এগুলো কি এখন আমার শিখিয়ে দিতে হবে?

— কেন আম্মু, মৃদুল কি এই প্রথম আমাদের বাসায় এসছে? আর জীবনে আসেনি?

— হ্যাঁ, এসেছে। কিন্তু এই প্রথম জামাই হিসেবে এসেছে। তাই ওকে জামাই আপ্যায়ন করতে হবে। আপ্যায়নের কোন ত্রুটি চাই না আমি। যদি তুই কোন ঝামেলা পাকাস তাহলে এই বাসায় আসা বন্ধ। আমার মেয়ের জামাইয়ের কোন অযত্ন আমি সহ্য করবো না।

সাবা কাঁদো কাঁদো ফেস করে বললো,
— আমার থেকে এখন জামাই বেশি হয়ে গেলো? আমার কোন দাম নেই। যাও আসবো না তোমাদের বাসায়। আমি আমার শ্বশুর বাড়ি থাকবো। কেউ ভালোবাসে না আমায়। সে আসতে না আসতেই আদরের ভাগীদার হয়ে গেলো। আর আমি তো বানের জলে ভেসে আসছি।

— হয়েছে কথা কম বল। পোলাওয়ের বোলটা টেবিলে নিয়ে যা। জামাইয়ের খাওয়ার পর আমার সাথে খেতে বসবি। আমার কথার কোন হেরফের যেন না হয়।

সাবা দাঁত কিড়মিড় করে মায়ের কথা হজম করে নিলো। পোলাওয়ের বোলটা দুই হাতে নিয়ে ঠাস করে টেবিলে রাখলো। আমিনুল ঢালী, মৃদুল দুজন ব্যবসা সংক্রান্ত কথা বলছিলো। সাবা টেবিলে ঠাস করে বোল রাখতেই আমিনুল ঢালী মুখ কুঁচকে সাবাকে জিজ্ঞেস করলো,

— কি হয়েছে সাবা?

সাবা মুখটাকে বাংলা পাঁচের মতো করে বললো,
— কিছু না।

আর কোন কথা না বলে চুপচাপ সবার প্লেটে পোলাও বেড়ে দিতে লাগলো। সাবার মুখ দেখে সিয়াম জিজ্ঞাসু কন্ঠে বললো,

— কি হয়েছে রে আপু? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

— কিছু হয়নি। চুপচাপ খা।

— আম্মু তোকে কি বললো?

— যা খুশি তা বলেছে। তোর কি?

— আমার কিছুই না। আমি তো যাস্ট জিজ্ঞেস করলাম।

— তাহলে চুপচাপ গিলতে থাক।

— আচ্ছা।

সাবা সবার প্লেটে পোলাও বেড়ে দিয়ে রোস্ট তুলে দিলো। নতুন জামাইয়ের আপ্যায়নের কোন ত্রুটি রাখেননি নাসিমা বেগম। পোলাও, রোস্ট, ফ্রাই, ইলিশ মাছ ভাজা,গরুর গোশত, চিংড়ি মালাইকারী, রুই মাছ ভুনা, মুগ ডাল, পায়েস আরো নানা কিছু। পুরো টেবিল ভর্তি বাহারি খাবার। সেগুলো সার্ভ করার দায়িত্ব সাবার। মৃদুল সেটা টের পেয়ে কিছু সময় পরপর এটা, ওটা এগিয়ে দেওয়ার ফরমায়েশ দিচ্ছে। সাবার দিকে তাকিয়ে শয়তানি হাসি দিয়ে আবারো চেচিয়ে বললো,

— সালাদ!

সাবা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
— সালাদ তো প্লেটে আছে।

— লেবু লাগবে আরকি।

সাবা সালাদের বাটি ঘেটে দুই পিস লেবু মৃদুলের প্লেটে তুলে দিলো। সাথে সাথে মৃদুল আবার বললো,

— গোশতের বাটিটা দাও।

সাবা গোশতের বাটি এগিয়ে দিতেই মৃদুল নাক,মুখ কুঁচকে বা হাতে চামচ দিয়ে গোশত নাড়াচাড়া করে বললো,

— না গোশত খাবো না। রুই মাছ দাও।

সাবা তার বাবার পাশ থেকে রুই মাছের বাটি এগিয়ে দিলে গোশতের মতো নেড়েচেড়ে বললো,
— চিংড়ি মাছ দাও। এগুলো খেতে ইচ্ছে করছে না।

সাবা বুঝতে পারলো ওকে জ্বালানোর জন্য মৃদুল এমন করছে। তাই একবার চোখ, মুখ খিঁচে কিছু বলতে চাইলে ওর অবস্থা বুঝে কিচেনের দরজা থেকে নাসিমা বেগম চেচিয়ে বললো,

— কিরে সাবা, জামাই কি চায়? জলদী দে।

— দিচ্ছি আম্মু।

টেবিল ঘুরে সিয়ামের সামনে থেকে চিংড়ি মাছের বাটি এনে মৃদুলের সামনে রাখলো। তবে এবার মৃদুল বাটিতে হাত দেওয়ার আগে সাবা চামচ তুলে একের পর এক চিংড়ি মাছ মৃদুলের প্লেটে তুলে দিলো। আর শয়তানি হাসি দিয়ে মৃদুলকে বললো,

— আপনার না চিংড়ি মাছ অনেক পছন্দ। এগুলো সব কিন্তু শেষ করতে হবে। আমি কোন কথা শুনবো না।

মৃদুল চোখ দুটো গোল করে কিছু বলার আগে আমিনুল ঢালী বললো,

— জামাইয়ের চিংড়ি মাছ পছন্দ? তাহলে মাত্র দুটো দিয়েছিস কেন সাবা? আরো দুটো দে।

বাবার আদেশ পেয়ে টুপ করে আরো দুটো চিংড়ি মাছ মৃদুলের প্লেটে তুলে দিলো সাবা। মুখে তার বিজয়ী হাসি। মৃদুলের যে চিংড়ি মাছে এলার্জি তা জেনেও ওকে শিক্ষা দিতে জেনেশুনে সাবা এমন করলো। এদিকে মৃদুল পরেছে বিপাকে।সে পারছে না মাছ উঠিয়ে রাখতে,না খেতে। শ্বশুর কি না কি বলে সেই ভয়ে। সাবা এবার এক এক করে প্রতিটা পদ থেকে চামচ দিয়ে উঠিয়ে মৃদুলের প্লেটে তুলে দিলো। মৃদুল নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না। পুরো প্লেট ঠাসা। সাবা ওর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো,

— আমাকে জ্বালানোর শোধ তো আমি তুলবোই। এখন চুপচাপ এগুলো শেষ করে তারপর উঠবি। নয়তো আরো কিছু প্লেটে তুলে দিবো।

মৃদুল শুকনো ঢোক গিলে অল্প একটু করে মুখে দিতে লাগলো। চারটা চিংড়ি মাছ দেখেই ওর ভয় করছে। একটা খেলেই অবস্থা নাজেহাল। আর তিনটা শেষ করবে কি করে? সাবা দাঁত কেলিয়ে হাসছে। তা দেখে মৃদুল ওর পায়ে জোরে একটা পারা দিয়ে বসলো। সাবা আউচ করে চেচিয়ে পায়ে হাত দিয়ে বসে পরলো। আমিনুল ঢালী খাওয়া রেখে চেচিয়ে বললো,

— কি হলো তোর আবার?

সাবা একবার মৃদুলের দিকে তাকিয়ে ফোঁস ফোঁস করতে করতে নিচুস্বরে বললো,
— হাতিতে পারা মেরেছে।

সাবার কথা তার বাবা না শুনলেও সিয়াম ঠিকই শুনতে পেয়েছে। সিয়াম লেগপিস চিবুতে চিবুতে ভ্রু নাচিয়ে বললো

— কোন হাতি তা কিন্তু আমি জানি আপু!

— চুপ কর।

মৃদুল এমন একটা ভান করে খাচ্ছে যেন সে কিছুই করেনি। খাবার রেখে সাবার দিকে তাকিয়ে না জানার ভান করে আদুরে গলায় বললো,

— কি হয়েছে তোমার?

সাবা চোখ পাকিয়ে বিরবির করে বললো,
— কিছু না। আপনি গিলেন। গিলতেই তো বসছেন।তাই দিকপাশ না তাকিয়ে গিলতে থাকেন।

মৃদুল দুই ঠোঁট চোখা করে চুমু দেওয়ার ভান করে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। সাবা মনে মনে ভাবতে লাগলো মৃদুলকে কিভাবে শায়েস্তা করা যায়। আমিনুল ঢালী খাবার শেষ করে পায়েস বলে চেচিয়ে উঠলো। নাসিমা বেগম পায়েসের বাটি তার হাতে তুলে দিলো। আমিনুল ঢালী তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে মৃদুলকে বললো,

— তুমি বাবা আস্তে আস্তে খেতে থাকো। আমি বরং উঠছি। সাবার মা পায়েসের বাটিটা এখন রাখো। একটু পর রুমে পাঠিয়ে দিও।

আমিনুল ঢালী চলে গেলো। সিয়ামের খাওয়া শেষ।সেও উঠে পরেছে। কিন্তু মৃদুলের প্লেটের খাবার শেষ হওয়ার নামও নিচ্ছে না। নিবে কি করে একটু শেষ হলেই তো ডাবল খাবার তুলে দিচ্ছে সাবা। আজ ওকে খাইয়ে খাইয়ে মারবে। নাসিমা বেগম মৃদুলকে জিজ্ঞেস করলো,

— বাবা আর কিছু লাগবে?

— না আম্মু।

— একটু গোশত দেই।

— না, না আর লাগবে না।

নাসিমা বেগম মেয়েকে পাশ কাটিয়ে আবারো কিচেনে চলে গেলো। এঁটো বাসনপত্র ধুতে হবে। সে চলে যেতেই সাবা দ্রুত গোশতের বাটি হাতে নিয়ে মৃদুলের প্লেটে গোশত তুলে দিতে দিতে বললো,

— আরে লজ্জা পাও কেন মৃদুল। আমরা আমরাই তো। একটু গোশতই তো খাবা। তাতে আবার লজ্জা কিসের?

মৃদুল মুখে কিছু না বললেও সাবার দিকে তাকিয়ে খাইয়া ফালামু লুক দিলো। সেই দৃষ্টি এড়িয়ে সাবা শয়তানি হাসি দিলো। মৃদুল দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

— ডাল দাও।

মৃদুল ডাল চাইতেই সাবার মনে শয়তানি বুদ্ধি হানা দিলো। সামনে তাকিয়ে ওর বাবার হাত ধোয়া জুঠা পানির বাটিটা দেখতে পেলো। ডালের বাটি থেকে দুই চামচ ডাল জুঠা পানিতে ফেলে দিলো। এতে হলদটে কালারটা আরো গাঢ় হয়ে গেলো। মৃদুল এক হাতে মোবাইল টিপছিলো। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে ছিলো বলে দেখলো না। সাবা সেই বাটি থেকে চামচ উঠিয়ে এক চামচ মৃদুলের প্লেটে চালান করে দিলো। মৃদুল মোবাইল দেখতে দেখতে ডাল দিয়ে কিছুটা পোলাও মেখে যেই এক লোকমা মুখে তুলেছে ওমনি নাসিমা বেগম হুংকার দিয়ে সাবাকে বললো,

— আরে আরে করছিস কি? ওগুলো তো ডাল নয়। তোর আব্বুর হাত ধোয়া জুঠা পানি।

মৃদুল মোবাইল থেকে চোখ উঠিয়ে সাবার দিকে তাকালো। সাবা ধরা পরার ভয়ে চমকে উঠলো। মৃদুল একবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে আরেকবার সাবার হাতে থাকা বাটির দিকে তাকালো। সে দিকে তাকাতেই ওর ভেতর থেকে সব গুলিয়ে আসতে শুরু করলো। মুখের খাবার প্লেটে ফেলে, মুখ আটকিয়ে ওয়াক ওয়াক করতে করতে বেসিনে ছুট মারলো। সাবা হাসতে হাসতে চেয়ারে বসে পরলো। ইস, একটুর জন্য ধরা পরে গেলো। ওর মা আরেকটু দেরীতে আসলেই তো সবটুকু মৃদুলকে খাওয়াতে পারতো।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here