মেঘের_পরে_মেঘ পর্ব ৭

#মেঘের_পরে_মেঘ
পর্ব:০৭
জাহান আরা

নিলু নেই আজ ৫ দিন হলো,এই ৫ দিনেই রেহানা বেগম সংসারে সবার নতুন নতুন রূপ দেখতে শুরু করেছে।
সন্ধ্যায় রেহানা বেগমের কোমড় ব্যথা করছিলো।রেহানা বেগম বড় বউকে ডেকে বললেন একটু তার কোমরে বাম মালিশ করে দিতে।

বড় বউ আসলো না।অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর তিনি নিজেই উঠে গেলেন,গিয়ে দেখেন বড় বউ তার ছেলেকে নিয়ে দুষ্টামি করছে।

রেহানা বেগম রেগে গেলেন খুব।চিৎকার করে বললেন,”তোমারে যে কইলাম আমারে একটু বাম মালিশ কইরা দিতে কোমরে,কানে যায় নাই তোমার?”
বড় বউ ও সমান তেজের সাথে উত্তর দিলো,”সারাদিন স্কুলে কাটিয়ে রাতটাতে আমার বাচ্চাদের কাছে পাই,সেটা আপনার হাত পা টিপার জন্য না।আমি কোনো বডি ম্যাসাজ পার্লার দিই নি যে হাত পা টিপাটিপি করবো আম্মা।”

রেহানা বেগমের ধারণা ও ছিলো না তার মুখের উপর এভাবে কথা বলতে পারে কেউ।
ওদিকে কোমর ব্যথায় তিনি অতিষ্ঠ হয়ে গেলেন।

কথা না বাড়িয়ে গেলেন মেজো বউয়ের রুমে। মেজো বউকে বলতেই মেজো বউ বললো,”আম্মা,আমার কাজ আছে।পরীক্ষার খাতা দেখতে হবে।এখন তো যেতে পারবো না।”

রেহানা বেগম আর কথা বাড়ালেন না।বউদের মনোভাব বুঝে গেলেন তিনি।তার ভাবনাতেও ছিলো না এভাবে সবার থেকে অবহেলা পাবেন তিনি কখনো।ঠিক সেই সময় তার নিলুর কথা মনে পড়লো।নিলু থাকলে কারো পা ধরতে হতো না তার এরকম করে।নিলু যদি একবার শুনতো রেহানা বেগম কোঁকাচ্ছেন,নিলু নিজেই এসে হাত পা টিপে দিতো।কাপড় গরম করে স্যাঁক দিতো।

ইদানিং সকালে নাশতা বানানো হয় না।চা টাও হয় না।বউয়েরা দোকান থেকে দুধ,বিস্কিট আনিয়ে নেয়।রেহানা বেগমের কথা কারো মনে থাকে না।বড় বউ বলে মেজো বউ আনবে রেহানা বেগমের নাশতা,মেজো বউ বলে বড় বউ আনবে।
সকাল হলে রেহানা বেগমের খুব লজ্জা করে তাই।তাকে নিয়ে বউদের মধ্যে কেমন অবহেলার ভাব।

রাতে শাহেদ দোকান থেকে বাসায় ফেরার পর রেহানা বেগম শাহেদের রুমে গেলেন।
শাহেদের কাছে সব কথা বললেন।মায়ের আজকের কান্না দেখে শাহেদের ভীষণ আফসোস হলো মায়ের জন্য।
মা’কে বললো শাহেদ,”কি আর করার আছে মা।ওরা তোমার আদরের বউ,ওদের বাবার বাড়ি থেকে কতো উপহার এসেছে।আমার বউ তো তোমার এতো আদরের ছিলো না।আমার শ্বশুর বাড়ি থেকে ও কিছু দিতে পারে নি ওরা।আমার বউয়ের সাথে কি ভাবীদের তুলনা চলে মা?
নিলু ভুল বলে নি সেদিন মা,আমি তো বউ আনি নি।কাজের মেয়ে এনেছি ঘরে। আমার বউকে তো আমিই সম্মান দিই নি। তুমি আর কি সম্মান দিবে।
তোমার খুশির জন্যই তো নিলু চলে গেলো এবাড়ি ছেড়ে। এখন কেনো মা আফসোস করো নিলুর জন্য?

আর শুনো মা,ওনারা আমার ভাবী হয়,আমার স্ত্রী নয় ওনারা কি ব্যবহার করলো না করলো তা আমাকে না বলে ভাইয়াদের বলো।ভাইয়ারা তো তোমার সুপুরুষ,বউয়ের বিচার করে। আমাকে বললে না তুমি সেদিন আমি বউয়ের গোলামী করি।আমার কাছে বিচার দিয়ে কি লাভ হবে মা?”

শাহেদ এভাবে কথা শুনিয়ে দিবে রেহানা বেগম ভাবেন নি।
লজ্জায় যেনো রেহানা বেগমের মাথা কাটা গেলো।
আসলেই তো!
বউদের বাপের বাড়ি থেকে পাঠানো জিনিসপত্র দিয়ে তিনি বউদের মূল্যায়ন করেছেন।ব্যবহার দিয়ে করেন নি কখনো।সব জিনিস তো বউদেরই যা এনেছে ওরা।রেহানা বেগমের কি লাভ তাতে?
তবে কেনো এসব জিনিস নিয়ে তিনি এতোদিন এরকম খারাপ ব্যবহার করেছেন?

নিজের রুমে একা শুলো নিলু।মিরু মায়ের সাথে শুয়েছে।শিলু আর নিরু একসাথে।
রাত ১২ টা বাজে।নিলুর চোখে ঘুম নেই কোনো।
বুকের ভিতরটা পুড়ে যাচ্ছে কারো বিরহে।
কতো যুগ কেটে গেলো যেনো শাহেদ নিলুকে বুকে নিয়ে ঘুমায় না।শাহেদের গায়ের ঘ্রাণ মিস করছে নিলু।
কি করছে শাহেদ এখন?
শাহেদ ও কি নিলু কে ভাবছে?
নিজেকে আর মানাতে পারলো না নিলু। কল দিলো শাহেদ কে।
কল দিয়েই অবাক হলো নিলু।শাহেদ ওর নাম্বার ব্লকলিস্টে দিয়েছে।
কান্না এসে গলার কাছে দলা পাকিয়ে রইলো। কাঁদলো না নিলু তবুও।
বাকি রাতটা কাটলো নিলুর নির্ঘুম।শত চেষ্টা করে ও ঘুমাতে পারলো না নিলু।

সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা আকাশীরং শাড়ি পরলো নিলু।চুলে হাত খোপা করে হিজাব বেঁধে নিলো।চোখে জিরো পাওয়ারের চশমা,কাঁধে নতুন ব্যাগ।
নিলুকে অভাবনীয় সুন্দর লাগছিলো। সাবিনা বেগম মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে।

নিলু মা’কে সালাম করে বাসা থেকে বের হলো ব্যাংকের উদ্দেশ্যে।

শাহেদ সকালে ফোন হাতে নিয়ে দেখে নোটিফিকেশন এসেছে অনেকগুলো। নিলু কল দিয়েছে তাকে।রেডি হয়ে রাস্তায় বের হয়ে এলো শাহেদ।দোকানের উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলো। আজ রিকশা নিবে না বলে ঠিক করলো শাহেদ।
হাটতে হাটতে ভাবছে শাহেদ নিলুর কথা।ভাবছে অতীতের কথা।ভাবছে প্রথম দিনের কথা নিলুকে যেদিন দেখেছে।
হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে নিলু এসেছে ১ লিটারের একটা আইসক্রিম নিতে দোকানে।এই ঠান্ডায় কেউ আইসক্রিম খেতে পারে?

আইসক্রিম দিতে দিতে শাহেদ সে কথা বললো নিলুকে।নিলু হেসে জবাব দিলো,”যে যেটা ভালোবাসে,হাজার প্রতিকূলতা থাকলেও সে ভালোবাসেই।”

এই একটা কথা শাহেদকে ভীষণভাবে তোলপাড় করে দিলো।সত্যিই তো বলেছে মেয়েটা।

অথচ বিয়ের পর কখনো শাহেদ নিলুর জন্য শখ করে আইসক্রিম নিতে পারে নি। একবার নিয়েছিলো। পরদিন সকালে নিলু এসে বললো,”আর কখনো এরকম কিছু আনবে না।”

শাহেদ জিজ্ঞেস করলো,”কেনো?”

নিলু জবাব দিলো,”আমি কি বাচ্চা না-কি এখনো আইসক্রিম খাবো যে,এখন আমি বড় হয়েছি না।বউ হয়েছি।”

নিলু না বললেও শাহেদ বুঝতে পেরেছিলো আসল কারণ কি ছিলো নিলুর এ কথা বলার।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে শাহেদ রাস্তার মাঝ বরাবর চলে গেলো।
উল্টো দিকে ফুল স্পিডে আসা প্রাইভেট কার ও খেয়াল করলো না শাহেদ ভাবতে ভাবতে।

গাড়ির ড্রাইভার ও পারলো না গাড়ি কন্ট্রোল করতে।মুহুর্তের মধ্যে কি থেকে কি হয়ে গেলো যেনো।শাহেদ কিছু টের পেলো না,শুধু চোখে ভেসে উঠলো নিলুর কান্না মাখা মুখ।
নিলুর মুখ দেখতে দেখতেই শাহেদ জ্ঞান হারালো।
চলবে……?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here