ময়ূখ পর্ব -২৬+২৭

#ময়ূখ
#পর্ব-২৬
#লেখিকা_আনিকা_রাইশা_হৃদি

৭৬.
‘আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?’
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম।আমি মৌন।’
‘মৌন তুই? কেমন আছিস?’
‘আলহামদুলিল্লাহ, আছি কোনো রকম। তুই কেমন আছিস? তোর ছেলেটা কেমন আছে?’
‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।’
‘সুমি, একটা কথা বলতাম। কিভাবে যে বলি।’
‘আরে, বল। এতো ফর্মালিটি কেন?’
‘সুমি আমাকে একটু তোর বাড়িতে আশ্রয় দিবি। বেশি না দুইটা মাস। তারপর দেখি কি করা যায়।’
‘এই মৌন কি হইছে? ভাইয়ার সাথে কোনো ঝামেলা?’
‘সেসব না হয় পরেই শুনবি। আমাকে একটু আশ্রয় দিবি কিনা বল। নাহয়, একটা ঘর ভাড়া দিস আমাকে। চিন্তা করিসনা। টাকা প্রতিমাসে পাবি।’
‘একটা থাপ্পড় খাবি বেয়াদব মেয়ে। আমি টাকা চাইছি তোর কাছে। চলে আয় খুলনা। আমি আছিনা।’

মৌন মলিন হাসে। বিপদের সময় পর আপন হয়ে যায় আর আপন মানুষ পর! আরো কিছু কথা বলে কল কাটে মৌন। খাটে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে জীবন উপলব্ধি করছে সে।

সুমির সাথে ফরিদপুর সরকারি কলেজে পড়া কালে পরিচয়।ইন্টার ২য়বর্ষ থাকাকালেই বিয়ে হয়ে যায় সুমির। খুবই সখ্যতা ছিলো মৌনর সাথে। সুমি পাড়ি জমায় খুলনা। সেদিন নিউমার্কেটে দেখা। সুমির স্বামী উসমান দুবাই প্রবাসী।একটা ছেলে আছে একবছরের।শ্বাশুড়ির সাথে খুলনা থাকে। মৌনকে অনেক করে বলেছিলো যেতে।মৌন সুযোগটা বিপদে গ্রহণ করলো। নিমগাছটায় আজ একটা শালিক পাখি বসে। তার সঙ্গী নেই। উড়ে গেছে কি? দূর-দূরান্তে।

_________________

রাত আটটা বাজে। মৌনর বাড়ির সামনে এসে থামলো সাদা মার্সিডিজ গাড়িটা। রাস্তায় জ্যামের কারণে নিভৃতের ফরিদপুর পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেছে। সাদা টি-শার্ট আর টাউজার পরনে নিভৃত। তার ঝাকড়া চুলগুলো এলোমেলো, অবিন্যস্ত। ফর্সা মুখমন্ডল ঘর্মাক্ত। উঠানে চেয়ারে বসে আলম পাশের বাড়ির মফিজের সাথে গল্প করছিলেন। নিভৃতকে দেখে হেসে উঠে দাঁড়ালেন। কুশল বিনিময় করলেন অনেকটা সময়। নিভৃতের ছটফটানি বেড়ে চলেছে দ্বিগুণ থেকে দ্বিগুণ হারে। লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেললো,
‘আংকেল, মৌন কোথায়?’
‘মৌন ওঁর ঘরে। যাও আব্বা তুমিও যাও। হাতমুখ ধুয়ে বিশ্রাম নেও। অনেকটা পথ আসছো।’

বাড়ির সবাই নিভৃতকে দেখে উচ্ছ্বসিত। রথির মনে হচ্ছে আপদ বিদায় হবে আর মর্জিনা ভাবছেন ঘরের চাল বাঁচবে।

৭৭.
মৌন খাটে বসে পেটে হাত বুলাচ্ছে। কত কথা জমে আছে তার মনে। সব কিছুর বিচার দিচ্ছে দুইমাসের বাবুটাকে। বেশ লাগছে তার।
‘মৌন।’

এই প্রথম প্রিয় মানুষটার মুখে নিজের নাম শুনে থমকে যায় মৌন। মাথা উঁচিয়ে সামনে তাকায় সে। এলোমেলো, বিধস্ত নিভৃত দাঁড়িয়ে। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে তার দিকে। নিভৃত ধপ করে ফ্লোরে হাঁটু ভর দিয়ে বসে পড়ে। মাথা নিচু করে মুখটা চেপে ধরে রাখে অনেকটা সময়। অতঃপর লালবর্ণ চোখ নিয়ে তাকায় মৌনর মুখপানে। নিভৃতের চোখে একরাশ অসহায়ত্ব। মৌন মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সে। নিভৃত টলমলে পায়ে মৌনর পাশে এসে বসলো। কাঁপা কাঁপা হাতে মৌনের মুখটা স্পর্শ করার চেষ্টা করলো। তবে মৌন তা হতে দিলোনা। সড়িয়ে দিলো নিভৃতের হাত।
‘এই মেয়ে। আই এম সরি।’

মৌন অপরদিকে নিশ্চল তাকিয়ে আছে। নিভৃতের কোনো কথাই তার কানে বাজছেনা। নিভৃত হাতটা ধরতে গেলে মৌন সড়িয়ে নেয় নিজের হাত। সিক্ত অথচ শক্ত কন্ঠে বলে,
‘অধিকার ফলাতে এসেছেন? নিন আমি উন্মুক্ত করে দিলাম নিজেকে। নিজের চাহিদা মিটিয়ে বেরিয়ে যান।’
‘এই এসব কি বলছো তুমি?’
‘কেন? শুনতে পাচ্ছেন না? আপনাদের সবার হাতের পুতুল তো আমি। একবার খেলবেন আবার ছুঁড়ে ফেলবেন। আবার ইচ্ছে হলে উঠাবেন। ইচ্ছে না হলে পায়ে পিষে ফেলবেন।’
‘প্লিজ, মৌন। আমি সরি বলছি তো। বাসায় চলো।’
‘একদম আমার নাম মুখে নিবেন না। একটা বছর সংসার নামের ছেলেখেলা করেছি তখন তো আমার নাম ধরে ডাকেন নি। আজ কেন? নাকি আমাকে মেরে আপনার স্বাদ মেটেনি? মারতে এসেছেন? মারতে পারেন। আমি কিছু বলবোনা। আমার বাড়ির লোকগুলো না বড্ড স্বার্থপর। তারাও আপনাকে বাঁধা দিবেনা।’

নিভৃত আবার মৌনর হাতটা ছুঁতে চায়। তবে মৌন এবারেও নিজের হাত সরিয়ে নিয়েছে। নিভৃত অসহায় ভঙ্গিতে চেয়ে আছে কেবল। মৌন উঠে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। সবাই পেয়েছেটা কি! যে যেভাবে পারছে সে সেভাবে ব্যবহার করে যাচ্ছে তাকে। তার কি কোনো আত্মসম্মান নেই। নিভৃতের এই দ্বিমুখী জটিল ব্যবহার আর কতদিন সহ্য করবে মৌন!নিভৃত মৌনর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। মৌন হালকা কন্ঠে বললো,
‘আপনি চলে যান নিভৃত। আমি আর ফিরবোনা। আমি আপনার আর রুহানি আপুর মাঝে একটা কাঁটা। আমি নিজে থেকে সরে আসলাম নিভৃত। আপনি চলে যান।’

নিভৃত নরম কন্ঠে বলে,
‘আমি ক্ষমা চাচ্ছিতো। আর এমন হবেনা প্লিজ চলো।’
‘আপনি এই মুহূর্তে চলে যাবেন নিভৃত। নয়তো আমার মরামুখ দেখবেন আপনি।’
‘মৌন!’

নিভৃত রাগে, অভিমানে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। মর্জিনা, রথি বাইরে কান পেতে ছিলেন। তারা শত ডেকেও নিভৃতকে আটকাতে পারেনি। মৌনকে ইচ্ছে মতো কথা শুনালেন মর্জিনা। মৌন টু শব্দটি করেনি। কেবল নিচের দিকে তাকিয়ে মলিন হেসেছে। মনে মনে বিরবির করেছে,
‘তুমি কিন্তু আমার গর্ভধারিণী ছিলে মা!’

নিজের ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে নিভৃত। আশেপাশে যা ছিলো সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে সে। বাড়ির মানুষ সবাই অবাক নিভৃতের ব্যবহারে। রুমি ফোন দিয়ে সব জানায় মিরাকে। মিরা নিভৃত কিংবা মৌন কাউকেই ফোনে পাচ্ছেন না। কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন। তবে রাত অনেক। নাজমুল এমনতেই অসুস্থ। ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়েছেন। শত ইচ্ছা
সত্ত্বেও ফরিদপুর ছুটে আসতে পারেননি তিনি।

৭৮.
পাখির কিচিরমিচির ডাকে ঘুম ভাঙে পুষ্পর। পাশে তাকিয়ে মৌনকে খুঁজে পায়নি সে। ভালোভাবে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কোথাও নেই তার আপা।
হঠাৎ চোখ যায় টেবিলের উপরে। একটা চিঠি আর একহাজার টাকার নোট চাপা দেওয়া। চিঠিটা ধরে কিছু লাইন পড়ে চিৎকার করে মাকে ডাকে পুষ্প। পুষ্পের চিৎকার রথি, নিতু, মর্জিনা ছুটে আসেন। রথি হাই তুলতে তুলতে বলে,
‘এই চেঁচাচ্ছিস কেন তুই?’

পুষ্প রথির কথায় পাত্তা না দিয়ে বলে,
‘মা, আপা চলে গেছে।’

মর্জিনা যেন খুশি হয়ে যান মুহূর্তে। হেসে বলেন,
‘ভালোই তো হইছে। জামাইবাড়িই তো মাইয়াগো আসল বাড়ি।’

পুষ্প ভিজা কন্ঠে বলে,
‘মা, আপা দুলাইভাইদের বাড়ি যায় নাই।’
‘তাইলে?’

পুষ্প চিঠিটা পড়া আরম্ভ করেছে।

মা,
আমি চলে যাচ্ছি। তোমার আপদ বিদায় হচ্ছে মা। অনেক কষ্ট আর বুক ভরা যন্ত্রণা নিয়ে তোমার কাছে আসছিলাম মা। ভেবেছিলাম তোমার আঁচলের তলায় একটু ঠাঁই পাবো। আমি কি খুব বেশি বুজা হয়ে গেছিলাম মা। কতটা যন্ত্রণা! ঠিক কতটা কষ্ট নিয়ে আমি এসেছি তুমি যদি জানতে মা! একহাজার টাকা রেখে গেছি মা। আশাকরি, আমরা তিনদিনে এর চেয়ে বেশি খাইনি। রথি, আমি তোর সংসার ভাঙতে আসিনি। এসেছিলাম একটু আশ্রয়ের আশায়। আমার উপরে রেগে থাকিসনা বোন। তোদের বড্ড ভালোবাসি।

মৌন।

চিঠিটা শুনে থমকে আছে সবাই। নিতু মুখে উড়না চেপে কাঁদছে। পুষ্প মর্জিনার হাতে টাকাটা দিয়ে ভেজা কন্ঠে বললো,
‘নেও, মা। তোমার খাবারের দাম নাও।’

সকালে উঠে নিভৃত ছুটে আসে মৌনদের বাড়িতে। তবে কাঙ্খিত মুখটা যে এখানে নেই। নিভৃত গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

মিরা, নাজমুল গাড়িতে বসে আছেন। ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে দুজনে রওনা দিয়েছেন।দুজনেই উদ্বিগ্ন। নাজমুলকে আসতে মানা করেছিলেন মিরা তবে তিনি শুনেননি। হঠাৎ মিরার কাছে একটা কল এলো।
‘হ্যালো?’
‘ফরিদপুর হাইওয়েতে একটা গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে। ছেলেটার অবস্থা ভালোনা। আমরা ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। আপনি যেই হোন উনার পরিবারকে একটু জানিয়ে দিবেন। ইমার্জেন্সি কলে আপনার নাম্বারটা পেয়েছি।’

হাত থেকে মোবাইলটা নিচে পড়ে গেলো মিরার। তিনি ‘বাবুই’ বলে এক চিৎকার দিলেন। পাশ থেকে নাজমুল বলে যাচ্ছেন,
‘এই কি হয়েছে? কি হয়েছে?’
#ময়ূখ
#লেখিকা_আনিকা_রাইশা_হৃদি
#পর্ব-২৭

৭৯.
‘মোল্লা ভাই, গাড়ি ঘুরান। ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে চলেন।’

চিৎকারে করে বলেন মিরা। নাজমুল আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করেন,
‘কি হয়েছে মিরা? হাসপাতালে কেন?’
‘আমার বাবুই এক্সিডেন্ট করেছে নাজমুল। আমার বাবুইয়ের কিছু হলে আমি মরে যাবো নাজমুল। একদম মরে যাবো।’

স্বামীর বুকে আছড়ে পড়েন মিরা। নাজমুলের চোখের কোণ ঘেষে বেয়ে পড়ে নোনাজল।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে নিভৃতকে রাখা হয়নি। মিরা, নাজমুল পাগলের মতো খুঁজে বের করেন নিভৃতকে। নিভৃতের ঘাড়ের একটা হাড় ভেঙে গেছে। মাথায়, হাত, পায়ে ভয়ানক জখম! তাকে তৎক্ষনাৎ এম্বুলেন্স করে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মিরা উদভ্রান্তের মতো কান্নাকাটি করছেন। নাজমুল স্ত্রীকে আগলিয়ে রেখেছেন সবটা দিয়ে। অপারেশন শুরু হয়ে গেছে। নিভৃত এখন ওটিতে।

_____________________

রিপ্তের হাতে ঠাস করে একটা থাপ্পড় পড়লো রথির গালে। বিকালে বাড়ি ফিরে সবটা সে পুষ্পের মুখে শুনেছে। রাগে কপালের রগগুলো প্রতিনিয়ত উঠানামা করছে তার। লালবর্ণ ধারণ করেছে তার মুখ। কেউ তাকে আটকিয়ে রাখতে পারছেনা। পাশ থেকে একটা ঝাড়ু তুলে নেয় সে রথিকে আঘাত করতে। রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে রিপ্ত। মর্জিনা এতক্ষণ আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছিলেন। এবার তিনি দৌঁড়ে এসে রিপ্তের হাত ধরলেন।
‘মাফ কইরা দে রিপ্ত৷ এবারের মতো মাফ কইরা দে। তোর দুইডা পায়ে ধরি।’

বলে মর্জিনা রিপ্তের পায়ে ধরতে গেলে রিপ্ত পা সরিয়ে নেয়। রথি উঠানের মাটিতে পড়ে আছে৷ রিপ্ত শক্ত কন্ঠে বলে,
‘আর পাপ বাড়াইয়েন না চাচি। নিজে পাপি হইছেন। আমারে আর পাপি বানাইয়েন না।’

মর্জিনা পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদেন। আফসোস হয় তার। যদি মেয়েটাকে একটু বুঝতেন!
‘এহন আর কান্দেন কেরে। একটু আশ্রয়ের আশায় আসছিলো মেয়েটা আর আপনারা ছিঃ। এমন মা থাকনের চেয়ে না থাকা ভালো। ছিঃ চাচি ছিঃ।’
‘আর চাচা আপনে। আপনারে আমি কি কমু। যে লোক মাইয়া বেইচা খায় তারে আমি কি কমু চাচা।’

আলম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘরে কি চলছিলো তিনি ঘুনাক্ষরেও টের পাননি। রিপ্ত আবার তেড়ে যেতে চায় রথির দিকে। তবে রিপ্তের বন্ধু মামুন তাকে ধরে ফেলে। রথি ভয়ে গুটিয়ে পাশে শসার টালের সাথে মিশে যাচ্ছে যেন। রিপ্ত চিৎকার করে,

‘মা* তোরে আমি তালাক দিতাম। খালি ওয়াদা বদ্ধ দেইখা। যার কারণে তোর লগে ঘর বাঁধলাম তারেই তুই কথা শুনাইলি। তোর মতন স্বার্থপর আর নাইরে রথি আর নাই। রথিরে আল্লাহর কসম তোরে আমি খুন করতাম একটা বাঁধা যদি না থাকতো।’
‘চাচি, খাইলে না হয় আমার টাকায় খাইতো। আমি আবার আনতাম। এমন না করলেও পারতেন চাচি। এতোটা স্বার্থপর কেমনে হইলেন চাচি।’

মামুনকে ছাড়িয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় রিপ্ত। যার সুখের জন্য সব করলো সেই নাকি অসুখী!

৮০.
নিভৃতের জ্ঞান ফিরলো আজ। প্রায় ৪৮ ঘন্টা অচেতন ছিলো সে। আইসিইউতে রাখা হয়েছিলো তাকে। ডাক্তার কেবিনে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। সাদা বেডটায় মুখে অক্সিজেন, হাতে স্যালাইন লাগানো অবস্থায় পড়ে আছে নিভৃতের নিথর দেহ। সাদাবর্ণের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আছে। মাথায় সেলাই পড়েছে চারটা৷ একপাশ থেকে চুল কেটে ফেলা হয়েছে। শিয়রে বসে আছেন মিরা। চোখের অশ্রু ফুরিয়ে গেছে যেন। পাণ্ডুর মুখ। নাজমুলও পাশে বসে আছেন। মাঝে হাইপ্রেশারের কারণে একদিন বেড রেস্টে থাকতে হয়েছিলো তাকে।

নিভৃত হালকা করে ঠোঁট নাড়ায়। কিছুই বুঝা যাচ্ছেনা তার কথা। মিরা আলতো করে নিভৃতের মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
‘কি চাই বাবুই। মাকে বল।’

নিভৃত ঠোঁট নাড়ায় আবার। কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার দেখে গেছেন তাকে। ডাক্তারের ভাষ্যমতে নিভৃত খানিকটা সুস্থ এখন। মিরা নিজের কানটা নিভৃতের ঠোঁটের কাছে নিয়ে যান। আস্তে করে আওয়াজ হয়। অক্সিজেন মাস্কটা খুলে দেন মিরা। নিভৃত বলছে,
‘মা, আ…….মা…….র। মো.…..ন। ক….ই?’

মিরা জবাব দিতে পারেন না। ছেলের মাথা, হাত, পায়ের ব্যান্ডিজে হাত বুলিয়ে অশ্রু ঝড়ান। মৌন নিখোঁজ আজ প্রায় দুইদিন। কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছেনা। মিরা ইতিহাস বিভাগের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীকে ফোন করেছেন। তবে কোথাও নেই মৌন। মিরা পাগল হয়ে যাচ্ছেন। একদিকে তার বাবুই আরেকদিকে স্বামী। মৌনর কোনো খোঁজ নেই। মিরা যেন অতল গহ্বরে পড়লেন।

____________________

হাসপাতালে থাকা দশটাদিন নিভৃত ছটফট করেছে। ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে পাশে যা পেয়েছে। স্যালাইন খুলে হাত দিয়ে গড়গড় করে রক্ত ঝড়িয়েছে। তবে কাঙ্খিত মুখটাকে কেউ এনে দেয়নি কেন! সময় গেলে যে সাধন হয়না!

আজ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে নিভৃতকে। সে এখন পাগলপ্রায়। রুহানির মৃত্যুর পরেও এতোটা পাগল সে হয়নি। হয়তো পেয়েও দ্বিতীয়বার হারিয়ে ফেলার শোকে। এ কেমন মায়া! এ কেমন বন্ধনের জোর!

খুঁড়িয়ে ঘরে ঢুকে নিভৃত। নরম গলায় ডাকে,
‘এই মৌন। তুমি কি বারান্দায়? এই মেয়ে আসো। দেখো আর মারবোনা তোমায়। আর বকবোনা।’

মৌন আসেনা। নিভৃত চিৎকার করে। চিৎকার করে বসে পড়ে ঘরের মেঝেতে। চোয়াল ঝুলে পড়েছে তার। দাঁড়িগুলো বড় হয়েছে অনেকটা। মিরা পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদেন। আল্লাহ এ কেমন পরীক্ষা নিচ্ছে? নিভৃতের আওয়াজে মিটি উড়ে আসে নিভৃতের ঘরে। অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছে সে। বাড়ির সবাইকেই অচেনা লাগে তার। নিভৃতের কাঁধে বসার সাহস পায়না মিটি। উড়ে চুপটি করে বসে থাকে টি-টেবিলে। মিরা ছেলের কান্না সহ্য করতে না পেরে জড়িয়ে ধরেন নিভৃতকে। নিভৃত বাচ্চাদের মতো কেঁদে বলে,
‘আমি ওকে ভালোবাসি মা। আমি ওকে ভালোবাসি।’

মিরা বলার মতো কোনো ভাষাই খুঁজে পাননা। পারলে এখনি মৌনকে ধরে নিয়ে আসতেন তিনি। ঘর থেকে বেরিয়ে যান মিরা।

৮১.
মিটিকে দেখে তার কাছে এগোয় নিভৃত। মিটি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছে। নিভৃত তাকে আলতো করে ধরে চুমু খায়। মলিন হেসে বলে,
‘তোমার বুবু বড্ড পঁচা মিটি। দেখোনা আমাকে ফাঁকি দিয়ে কোথায় যেন চলে গেছে। আমি কি অনেক খারাপ মিটি?’

মিটি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। সত্যিই তো তার বুবু কই?

নিভৃত খুড়িয়ে খুড়িয়ে রুহানির ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে। মাথা নিচু করেই বিরবির করে,
‘আমাকে ক্ষমা করো রুহানি। আমি মৌনকে বড্ড ভালোবাসি রুহানি। হলদেটে মুখের মায়াবী গড়নটাকে বড্ড ভালোবাসি।’

হঠাৎ কে যেন কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে,
‘তুমি সুখী থাকলে আমিও সুখী বাবুইপাখি। বুকের বাঁ পাশটায় জায়গা দিও তাকে।’

নিভৃত অবাক হয়। আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজে বেড়ায় ছোটবেলার প্রেয়সীকে। স্পষ্ট সেই সুর!

নিভৃত ধপাস করে খাটে বসে পড়ে। জীবন নামক যুদ্ধে সে অনেক ক্লান্ত। হঠাৎ করে নিভৃত উঠে দাঁড়ায়। পা খুঁড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে সে। মৌন নামের মেয়েটাকে তার বড্ড প্রয়োজন। প্রাণভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রয়োজন। নিভৃতকে বাইরে বেরোতে দেখে বাঁধা দেন মিরা। মায়ের বাঁধা মানেনা নিভৃত। এশার আজানের ধ্বনি চারপাশে। কি মায়াবী সে ধ্বনি। নিভৃত গাড়ি থামিয়ে মসজিদে ঢুকে পড়ে। নামাজে বসে দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে প্রিয় মানুষটাকে চায় নিভৃত। মাথার কাঁচা সেলাইয়ে টান পড়ায় রক্ত ঝড়ে পড়ছে। মোনাজাতরত অবস্থায় জ্ঞান হারায় নিভৃত।

_______________

বিশাল বড় পূর্নিমার চাঁদ আকাশে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। মৃদু বাতাস বইছে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা বলে,
‘রাজপুত্র। ও রাজপুত্র। তোমায় ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। তোমার উপর রাগ করে, ঘৃণা করে যে থাকতে পারিনা আমি! পুঁচকোটা তোমায় খুঁজে রাজপুত্র। কেন আমাকে ভালোবাসলে না রাজপুত্র? আমি মেয়েটা কি খুব খারাপ? তোমার বুকে একটু জায়গায়ই তো চেয়েছিলাম কেবল!’

কথাটা বলে মেয়েটা পেটে হাত বুলায়। কিছুক্ষণ আগের বলা কথায় নিজের উপর রাগ হয় তার। পেটে হাত রেখে মেয়েটা আবার বলে,
‘তোমার বাবা তো তোমায় চায়না সোনা। কেন এতো চাচ্ছো তাকে? আমি তোমার বাবা আর আমিই তোমার মা।’

আদোও কি তাই? আড়াইমাসের বাচ্চাটা কি পেটে থেকে এসব বুঝে? নাকি মেয়েটার মনের কোণে ঘুরে বেড়ানো সুপ্ত ইচ্ছে ; প্রিয় মানুষটাকে কাছে পাওয়ার?

(চলবে)…….
(চলবে)…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here